জুলাই সনদ ও সাংবিধানিক অনিশ্চয়তা
রাসেল আহমদ
প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:৪৩ পিএম
ছবি: রাসেল আহমদ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথকে ঘিরে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা নিছক প্রোটোকলগত বিভ্রান্তি নয়। এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক বৈধতার গভীর সংকটের ইঙ্গিত বহন করে। সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া সংবিধানস্বীকৃত ও অনিবার্য প্রক্রিয়া। কিন্তু একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে আলাদা শপথ,এই ধারণাটি রাষ্ট্রের প্রচলিত সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ ও তার বাস্তবায়ন আদেশ। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়েছে। এই যুক্তিতে সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাব বাস্তবায়নের তৃতীয় ধাপ শুরু করার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু মৌলিক প্রশ্ন হলো: একটি আদেশের মাধ্যমে কি সংবিধানের বাইরে নতুন একটি সাংবিধানিক কাঠামো তৈরি করা যায়?
বাংলাদেশের সংবিধান স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থনে সংবিধান সংশোধন সম্ভব। সেখানে কোনো ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর উল্লেখ নেই। অথচ জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ নিয়মিত সংসদের বাইরে একটি বিশেষ পরিষদ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে, যার মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোয় পরিবর্তন আনার কথা বলা হচ্ছে। এটি কার্যত বিদ্যমান সাংবিধানিক পদ্ধতির প্রতি অনাস্থা প্রকাশের শামিল।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), যারা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পথে, শুরু থেকেই এই আদেশের আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের বক্তব্য, রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতা থাকলেও সংবিধানবহির্ভূত কোনো ‘আদেশ’ দিয়ে নতুন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করা যায় না। যদি সংবিধান সংস্কারের প্রয়োজন হয়, তবে তা বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্য দিয়েই হওয়া উচিত। এই অবস্থান কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়; এটি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার প্রশ্ন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবি তুলছে। তাদের যুক্তি, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়েছে, সুতরাং সনদ বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক। কিন্তু গণভোটের ফলাফলকে চূড়ান্ত সামাজিক ঐকমত্য হিসেবে উপস্থাপন করা কি বাস্তবসম্মত?
ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৫৯ শতাংশ। ‘না’ ভোট পেয়েছে উল্লেখযোগ্য অংশ। আরও বড় প্রশ্ন,যারা ভোটে অংশ নেয়নি, তাদের অবস্থান কী? গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয় ঠিকই, কিন্তু সংবিধানের মতো মৌলিক দলিল পুনর্লিখনের ক্ষেত্রে নৈতিক বৈধতা কেবল উপস্থিত ভোটের হিসাব দিয়ে নির্ধারিত হয় না। গণভোটে জয় মানেই সামাজিক ঐকমত্য,এই সরলীকৃত ব্যাখ্যা বিপজ্জনক।
জুলাই সনদের প্রস্তাবগুলোও বিতর্কমুক্ত নয়। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা হ্রাস, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা প্রবর্তন,এসব প্রস্তাব রাষ্ট্রকাঠামোর মৌলিক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু এই পরিবর্তনের পদ্ধতি ও প্রেক্ষাপটই এখন প্রশ্নবিদ্ধ। একটি আদেশের মাধ্যমে বিশেষ পরিষদ গঠন করে তাকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলে কী হবে,তা অস্পষ্ট। এই অনিশ্চয়তা ভবিষ্যতে সাংবিধানিক অচলাবস্থার জন্ম দিতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো দ্বৈত বৈধতার ঝুঁকি। একদিকে থাকবে নির্বাচিত সংসদ,যার সাংবিধানিক ভিত্তি সুস্পষ্ট। অন্যদিকে থাকবে আদেশ-নির্ভর সংস্কার পরিষদ,যার বৈধতা বিতর্কিত। এই দ্বৈত কাঠামো ক্ষমতার সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে।
সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব যদি পরিষদে গৃহীত হয়, কিন্তু রাজনৈতিক ঐকমত্য অনুপস্থিত থাকে, তাহলে তা আদালতে চ্যালেঞ্জ হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যে যুক্তিতে বিশেষ পরিষদ গঠন করা হয়েছে,চ্যালেঞ্জ এড়ানোর জন্য-সেই যুক্তিই উল্টো নতুন চ্যালেঞ্জের দ্বার খুলে দিতে পারে।
আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন উপেক্ষিত হচ্ছে। সংবিধান কি রাজনৈতিক চুক্তির ফল, নাকি একটি প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতির দলিল? যদি প্রতিটি রাজনৈতিক সংকটের সমাধান হিসেবে নতুন ‘সনদ’ ও ‘আদেশ’-এর আশ্রয় নেওয়া হয়, তবে সাংবিধানিক স্থিতি ক্রমেই দুর্বল হবে। সংবিধানের ভেতরে থেকে পরিবর্তনের যে প্রক্রিয়া নির্ধারিত আছে, তা পাশ কাটিয়ে বিকল্প কাঠামো তৈরি করা দীর্ঘমেয়াদে বিপজ্জনক নজির স্থাপন করতে পারে।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রস্তাব নিয়েও মতভেদ রয়েছে। উচ্চকক্ষের গঠন, ক্ষমতা ও সংবিধান সংশোধনে ভূমিকা,এসব বিষয়ে প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ঐকমত্য নেই। অথচ এই মৌলিক প্রশ্নগুলো অনির্ধারিত রেখেই পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবি তোলা হচ্ছে। এটি রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় স্লোগান হতে পারে, কিন্তু সাংবিধানিক স্থিতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
বাস্তবতা হলো,যে সংসদ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে, সে চাইলে প্রচলিত সাংবিধানিক পদ্ধতিতেই সংশোধন আনতে সক্ষম। তাহলে বিশেষ পরিষদের প্রয়োজন কেন? যদি উত্তর হয়- মৌলিক কাঠামো তত্ত্বের সম্ভাব্য বিচারিক চ্যালেঞ্জ,তবে মনে রাখতে হবে, আদেশ-নির্ভর কোনো কাঠামোও বিচারিক পর্যালোচনার ঊর্ধ্বে নয়।
জুলাই সনদকে অনেকে গণআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল।যার পেছনে সমানভাবে মতানৈক্যও রয়েছে। গণভোটের ফলাফলকে সর্বজনীন সম্মতি হিসেবে ব্যাখ্যা করে দ্রুত বাস্তবায়নের পথে হাঁটা হলে তা বিভাজন আরও তীব্র করতে পারে।
রাষ্ট্রের সাংবিধানিক স্থিতি কোনো পরীক্ষাগার নয়, যেখানে অস্থায়ী রাজনৈতিক সমীকরণের ভিত্তিতে নতুন কাঠামো প্রয়োগ করা যায়। সংবিধান সংশোধন হতে পারে,কিন্তু তা হতে হবে স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বিদ্যমান সাংবিধানিক সীমারেখার ভেতরে। অন্যথায় ‘সংস্কার’-এর নামে যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তা স্থিতিশীলতার পরিবর্তে নতুন অনিশ্চয়তার দ্বার খুলে দিতে পারে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক
ই-মেইল: raselahmed1980bk@gmail.com
