×

মুক্তচিন্তা

যুদ্ধ নয়, স্বচ্ছতার নতুন যুগ: ড্রোন প্রযুক্তিতে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের রূপরেখা

রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে

রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে

প্রকাশ: ১৫ নভেম্বর ২০২৫, ০৫:২১ পিএম

যুদ্ধ নয়, স্বচ্ছতার নতুন যুগ: ড্রোন প্রযুক্তিতে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের রূপরেখা

যুদ্ধ নয়, স্বচ্ছতার নতুন যুগ: ড্রোন প্রযুক্তিতে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের রূপরেখা

সারাদিন মিথ্যাচার, গুজব, পরনিন্দা, পরচর্চা এবং দুর্নীতির এক নতুন বিশ্বযাত্রা যা আমেরিকার জে এফ ক্যানেডির সময়কালের চাঁদে প্রথম লাইকা নামের কুকুরের ভ্রমণ কাহিনীকে হারিয়ে দিয়েছে। বর্তমান বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্র নায়ক ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শুরু করে, রাশিয়ার পুতিন, ভারতের মোদি পর্যন্ত, যেখানেই ঘাঁটাঘাঁটি করবেন শুধু প্রোপাগান্ডা আর প্রোপাগান্ডা। তবে চীনের বর্তমান ক্ষমতাসীন নেতা শি জিনপিং। তিনি একই সাথে চীনের রাষ্ট্রপতি, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তার মুখে খুব একটা গুজব বা মিথ্যাচার শুনিনি, হতে পারে তিনি কম কথা বলেন! যাইহোক বিশ্বের অর্থনীতির যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে যুদ্ধের পেছনে, তার মাত্র ১০% অর্থ যদি ড্রোন টেকনোলজি উন্নয়নে ব্যবহার করা হয়, তবে গোটা বিশ্বের অর্থনীতি থেকে শুরু করে অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, শিক্ষা, যোগাযোগ সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সকল ক্ষেত্রে মিরাকেলের মতো পরিবর্তন আনা সম্ভব। প্রশ্ন হলো এর সাথে ড্রোন টেকনোলজির সম্পর্ক কী? হ্যাঁ, সম্পর্ক আছে; সেটা হলো সামরিক শক্তি নয়, দরকার দুর্নীতি, গুজব, ষড়যন্ত্র, অপপ্রচার, মিথ্যাচার নিয়ন্ত্রণ করা, এবং সেটা এখন একমাত্র ড্রোন টেকনোলজির পক্ষেই সম্ভব যদি আমরা এই টেকনোলজিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারি।

ড্রোন প্রযুক্তি ও এর প্রাসঙ্গিকতা

ড্রোন কেবল অস্ত্র নয়; এটি একটি মোবাইল সেন্সর প্ল্যাটফর্ম যা উচ্চ রেজোল্যুশন ছবি, ভিডিও, জিওট্যাগড তথ্য এবং অন্যান্য পরিবেশগত ও লজিস্টিক সেন্সর ডেটা সংগ্রহ করতে সক্ষম। এই তথ্য দ্রুত খোলা হলে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন, সরবরাহ শৃঙ্খলা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে।  বিভিন্ন দেশে সাংবাদিকরা ড্রোন ব্যবহার করে সরকারি বর্ণনার সঙ্গে বাস্তবতা মিলিয়ে দেখেছেন, যা জনগণকে স্বচ্ছ তথ্য সরবরাহ করে।

ড্রোন প্রযুক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রসমূহ

সকল সকল স্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাজকর্ম থেকে শুরু করে ঘুষ গ্রহণের মতো অপরাধও ড্রোন সিস্টেমের মাধ্যমে সহজেই চিহ্নিত করা সম্ভব। অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের তদারক করা বা হুন্ডি সংক্রান্ত দুর্নীতি প্রতিরোধ করা সম্ভব। সমাজের চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসীদের মনিটরিং করা এবং আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা এবং অবৈধ আইন প্রয়োগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। দেশের সমস্ত বর্ডার গার্ডের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি করা বা যেকোনো ধরনের চোরাচালান প্রতিরোধ করতে ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করা জরুরি।

তথ্য সংগ্রহ ও প্রকল্প নজরদারি

ড্রোন নিয়মিত উড়িয়ে সরকারি অবকাঠামো যেমন সড়ক, সেতু, স্কুল অথবা হাসপাতালের নির্মাণ পর্যবেক্ষণ করা যায়। জিওট্যাগড ছবি এবং সময়ভিত্তিক ভিডিও থাকলে তদারকি সংস্থাগুলো বসে বসে দেখাতে পারে যে কাজ ঠিকমতো হচ্ছে কি না।

নির্বাচনী স্বচ্ছতা এবং গণতান্ত্রিক নিরাপত্তা

ভোটকেন্দ্র বা জনসভায় ড্রোন দ্বারা ভিজ্যুয়াল রেকর্ড রাখা হলে ভোট প্রক্রিয়ায় বিকৃতি বা জালিয়াতি সহজে চিহ্নিত করা যায়। অবশ্য, ব্যবহারের আগে আইনগত সীমা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং তৃতীয় পক্ষের যাচাই নিশ্চিত করতে হবে।

সাপ্লাই চেইন এবং জরুরি সেবা

ড্রোন ব্যবহার করে সরকারি সাবসিডি, ওষুধ এবং জরুরি সরবরাহ দ্রুত পৌঁছাতে পারে। Zipline-এর স্বাস্থ্য ড্রোন সার্ভিস দেখিয়েছে, রক্ত, ভ্যাকসিন এবং ওষুধ দ্রুত পৌঁছে যাওয়ায় মারাত্মক মৃত্যুর হার কমেছে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবা পৌঁছেছে।

কৃষি সেক্টর এবং সিস্টেম অডিট

ড্রোনভিত্তিক প্রিসিশন কৃষি জমির মান নিরূপণ, সার ছিটানো বা কীটনাশক প্রয়োগ লক্ষ্য নির্ধারণে ব্যবহার করা যায়। সরকারি সহায়তা এবং বীজ/সার বিতরণে ড্রোনের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে যাচাই করা হলে জালিয়াতি ধরা সহজ হয় এবং প্রকৃত প্রাপ্যতা নিশ্চিত হয়।

নীতি, আইন এবং ঝুঁকি

ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করার সময় গোপনীয়তা লঙ্ঘন, নজরদারি এবং সাইবার ঝুঁকি থাকে। তাই রাষ্ট্রকে অবশ্যই আইন এবং প্রযুক্তিগত সীমা নির্ধারণ করতে হবে। প্রয়োজন: ওপেন ডেটা নীতি, এনক্রিপশন ভিত্তিক ডেটা সংরক্ষণ, স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের যাচাই এবং নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন রোডম্যাপ

বিশ্ব সামরিক ব্যয়ের ছোট একটি অংশ যদি পুনর্নির্দেশ করা যায়, তাহলে টেকসই ড্রোন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা সম্ভব। ২০২৪ সালের সামরিক ব্যয় ২৭১৮ বিলিয়ন ডলার হলে ১০% অর্থ (~২৭১.৮ বিলিয়ন ডলার) ব্যবহার করে জাতীয় ড্রোন রিসার্চ সেন্টার, স্থানীয় ম্যানুফ্যাকচারিং, প্রশিক্ষণ, আইনগত কাঠামো ও ওপেন ডেটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা যায়।

ধাপে ধাপে রোডম্যাপ:

১. পাইলট প্রকল্প নির্ধারণ যেখানে স্বচ্ছতা এবং দুর্নীতি ঝুঁকি বেশি

২. আইনি ফ্রেমওয়ার্ক ও ডেটা গার্ডিয়ানশিপ নিশ্চিত করা

৩. স্থানীয় প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেশন প্রোগ্রাম চালু করা

৪. ড্রোন ডেটা ওপেনিং ও নাগরিক তদারকি প্ল্যাটফর্ম বাস্তবায়ন

৫. সাফল্য মূল্যায়ন করে ধাপে ধাপে স্কেল আপ

যুদ্ধের বদলে দুর্নীতি প্রতিরোধে বিনিয়োগ করলে সামগ্রিক জনগণের কল্যাণে ব্যাপক পরিবর্তন আনা সম্ভব। ড্রোন প্রযুক্তি সঠিক নীতিগত নকশা ও নাগরিক অংশগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত হলে এটি কেবল প্রযুক্তিগত উপায় নয়, বরং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠবে। সরকার ও নাগরিক সমাজের মধ্যে সংলাপ গড়ে তুলতেই হবে যাতে ড্রোন ব্যবহারের নীতি, সীমা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়। এখনই পাইলট প্রকল্প আর নীতি রূপায়ণ শুরু করা সময়োপযোগী।

বিশ্বের ধনী দেশগুলো, ক্ষমতাধারী ব্যক্তি এবং কর্পোরেট নেতৃত্বের উদ্দেশ্যে একটি স্পষ্ট বার্তা:

যদি কাগজে কলমে হলেও আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী হয়ে থাকি, তাহলে এলন মাস্কের মতো একজনের ভোটের মতো, আমারও একটি ভোট। এখন ভাবুন, যদি দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকে, আর লন্ডন বা নিউইয়র্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ সত্ত্বেও জোহরান মামদানির মতো নেতৃত্বকে হারানো সম্ভব না হয়, তাহলে তা প্রমাণ করে অর্থ দিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখার সব চেষ্টা শেষ পর্যন্ত বিফল হয়েছে।

যদিও বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এখনও টাকা দিয়ে ভোট কেনাবেচা চলছে, তবু সেটি রোধ করা সম্ভব, যদি জনগণ নিজেদের ভোটাধিকার সঠিকভাবে প্রয়োগে সচেতন হয়। কিন্তু দুর্নীতিতে নিমজ্জিত রাষ্ট্র থেকে এমন আশা করা এখনো কঠিন। তবু প্রশ্ন থেকে যায়, বিশ্ব এখন কোন পথে হাঁটবে? আমরা কি চাই যুদ্ধ, নাকি শান্তি?

লেখক: রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন, rahman.mridha@gmail.com

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সাবেক দুই সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ

তনু হত্যা মামলা সাবেক দুই সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ

‘রূপায়ণ সিটি উত্তরা’ যেন ঢাকার ‘ক্যাসিনো সিটি’

‘রূপায়ণ সিটি উত্তরা’ যেন ঢাকার ‘ক্যাসিনো সিটি’ পরিচালনায় সম্রাটের ক্যাসিনো পার্টনার কাশেম

এক তরুণের কোমরে ৩ পিস্তল, গ্রেপ্তার করল পুলিশ

এক তরুণের কোমরে ৩ পিস্তল, গ্রেপ্তার করল পুলিশ

অনুমোদনহীন খাদ্য উৎপাদন, দুই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

অনুমোদনহীন খাদ্য উৎপাদন, দুই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App