৭০ মিলিয়ন ইউজার সত্ত্বেও
অ্যাডাল্ট সাইটে কেন বিজ্ঞাপন দিয়েছিল জোম্যাটো?
শেখ পিয়াশ ইসলাম
প্রকাশ: ৩০ মে ২০২৪, ১২:০২ পিএম
পর্ণ সাইটে বিজ্ঞাপন দিয়ে কতটা লাভবান হয়েছিল জোম্যাটো?
২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া জোম্যাটোর প্রতি মাসে অ্যাপ এবং ওয়েব ভিজিট হয় ২২ কোটি প্লাস এবং তাদের সক্রিয় ইউজার প্রায় ৭ কোটি। ২০১৪ সালের শেষের দিকে জোম্যাটো সিদ্ধান্ত নিলো তারা সারা রাত ফুড ডেলিভারি করবে। দারুণ কিছু অবশ্যই। কিন্তু তাদের দরকার ছিল একটা গ্রোথ হ্যাকের যাতে তাদের এই রাতের অর্ডার বেড়ে যায়। তারা নতুন নতুন অফার, ফ্রি ডেলিভারি আরো অনেক কিছু করেও খুব একটা সুবিধা করতে পারছিল না।
প্রমোদ রাও (ভিপি মার্কেটিং) বুঝতে পারলেন তাদের এই রাতের ফুড ডেলিভারি ব্যাপারটা জমাতে হলে এমন কিছু করা লাগবে যা টু দ্যা পয়েন্ট হয়। এমন হয় প্রমোদ নিউজপেপারে দেখতে পেলো ইন্ডিয়া পর্ণ দেখাতে গোটা দুনিয়ায় দ্বিতীয়, আগের কিছু বছরে প্রথমও হয়েছিল। তার মাথায় আইডিয়া এলো কিছু।
প্রমোদ সেই আইডিয়া জানালো জোম্যাটোর প্রতিষ্ঠাতা দীপিন্দর গোয়েলকে। দীপিন্দর শুনে বলল আইডিয়া ভাল কিন্তু এভাবে করে কয়দিন তুমি ট্র্যাফিক নিয়ে আসবে?
তখন প্রমোদ তার আইডিয়া খুলে বললো। সে বলল, পর্ণ কেউ দিনের বেলা দেখবে না, একটা গবেষণায় দেখা যায় ভারতের শহরগুলোতে পর্ণ দেখা শুরু হয় রাত ১টার পর থেকে আর সেটা মাঝে মাঝে ভোর পর্যন্ত। আমরা সারা বছর এই ক্যাম্পেইন চালাতেও পারবো না এটাও সত্য কিন্তু আমাদের রাতের ফুড ডেলিভারি যদি কেউ একবার নেয় সে রেগুলার হয়ে যাবার চান্স অনেক হাই। তাই আমাদের টার্গেট থাকবে ১০ দিনে যত বেশি সম্ভব কাস্টমার অ্যাকুজিশন করা। আর এই অর্ডারগুলোকে আমরা বিশেষ ট্র্যাকিংয়ে রাখবো, কারণ ৩০ দিন পরে আমরা পর্ণ সাইটে আর অ্যাড দিব না- তখন আমরা ডাটা পেয়ে যাচ্ছি যে রাতে কারা জেগে থাকে আর কারা অর্ডার করতে আগ্রহী।

ব্যস, যেমন কথা তেমন প্ল্যান। ২০১৫ সালের মার্চ মাসে জোম্যাটো পর্ণ সাইট জরিপ থেকে বেস্ট পপুলার মানে যেই সাইটগুলোতে ইন্ডিয়ান ট্র্যাফিক বেশি থাকে সেই সাইটগুলোর তালিকা করে। আর পর্ণ সাইটের ট্র্যাফিক কস্ট তারা কমে পাবে সেটা তারা আগেই বুঝতে পেরেছিল। যদিও ট্রাফিক্স জানকী দিয়ে সেটা করা যেত কিন্তু তারা ডিরেক্ট কিছু করেছিল।
মজার ব্যাপার হলো, ক্যাম্পেইন লঞ্চ করার দ্বিতীয় দিনে তাদের সার্ভার ডাউন হবার অবস্থা হয়েছিল। কারণ রাতে এমন কিছু হবে তারা বুঝতে পারেনি। এমনও ছিল এক রাতে অ্যাডসে তারা মিলিয়ন ক্লিক্স পেয়েছে। বুঝতে পারছেন কত কত নিউ অর্ডার আর ডাটা জোম্যাটো গ্রাভ করেছে সেই ৩০ দিনের প্ল্যান থেকে?
কিন্তু এটা নিয়ে কিছুদিনের মধ্যেই সুশীল সমাজে কথা শুরু হয়ে যায়। মানে ক্যাম্পেইনের দশম দিনে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। ততদিনে জোম্যাটো নিউ অ্যাকুজিশন করে ফেলেছে হিউজ। জোম্যাটো ভাবল এখন যদি তারা পর্ণ সাইটে অ্যাড বন্ধ করেও দেয় তাতেও কোন সমস্যা নেই; কারণ তাদের রাতের ফুড ডেলিভারি নিয়ে যা দরকার ছিল তা প্রায় অর্জন হয়ে গেছে। তাই ১৪তম দিনের মাথায় এসে জোম্যাটো পর্ণ সাইটে তাদের অ্যাড বন্ধ করে দেয়।
খুব মজার ইনসাইড জোম্যাটো ম্যানেজ করে নিয়েছিল এই ক্যাম্পেইন থেকে আর সেটা হলো কারা রাত জাগে আর তাদের রাতে কি কি খেতে ইচ্ছে করে সেই ডাটা। এক কোটি রাতের ফুড অর্ডার কাস্টমারকে দিয়ে তারা পরে আরো ৭০ লাখ কাস্টমার পেয়ে যায়।
ফান্ডিং নিয়ে যারা কাজ করবেন ভাবছেন তাদের বলবো, নাম্বারস নিয়ে কথা বলেন। হালাল সাবানের মার্কেটিং ৯০-এর দশকে চলছে কিন্তু এখন চলবে এমন কিছু যা ডোপেমেন থেকে আসে। আমি ইন্ডিয়ান বেশ কিছু পেইড মার্কেটিং ফোরামের মেম্বার হয়েছি শুধু তাদের আলোচনা শুনতে। আমি বলছি না ইন্ডিয়াতে যা চলে তাই আমাদের দেশে চলবেই, তবে অনেক খানি ইমপ্যাক্ট পরে বস।
নেক্সট একটা কেস নিয়ে আজ আলোচনা করবে নন্দি ওঝা নামক এক গ্রোথ হ্যাকার, সেখানে দেখবো কীভাবে ইনফ্লুয়েন্সারকে কাজে লাগিয়ে ইন্ডিয়ান ব্র্যান্ডগুলো তার প্রোডাক্টকে কাস্টমারের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে আর রিটেইন করাচ্ছে। সত্য বলতে উপরের জোম্যাটোর মত একটা কাজ একদা আমিও করেছিলাম আর সেটার আরওআই ছিল ২২০ শতাংশ! আপনি যখন ব্র্যান্ডকে একটা জায়গায় নিয়ে যেতে চান এর মানে হচ্ছে আপনি কাস্টমারের মাইন্ডে জায়গা করতে চান। কিন্তু মাথায় রাখবেন সেই কাস্টমারের চিন্তা প্রসেসটা কী আর সে জন্য আপনার বায়ার পারসোনকে অনেক ভালভাবে অ্যানালাইসিস করে আপনি মিডিয়া নির্ধারণ করবেন। ২০২৪ সালে এসেও যদি আপনি গল্পের সঙ্গে অঙ্ককে খুঁজে বের করতে না পারেন, তাহলে উপন্যাস লিখেন কিন্তু মার্কেটিং ক্যাম্পেইন না।
আগের মত বায়িং করি না। এখন কম করা হয়। এখন বেশি পড়া হয় আইএমসি নিয়ে, প্রোডাক্ট ম্যানেজমেন্ট নিয়ে, ইউএক্স নিয়ে, বিহেভিয়ার প্যাটার্ন নিয়ে, কন্টেন্ট ফানেলিং নিয়ে আর বিজনেস স্ট্র্যাটেজি নিয়ে। দুনিয়ার দারুণ দারুণ সব কাজ আর তার পেছনের রহস্য। মজার ব্যাপার হলো আমি টাটা গ্রুপের সেই মানুষটিকে নিয়ে বেশি এক্সাইটেড ছিলাম আর তাকে নিয়ে পড়তে গিয়ে দেখেছি টাটা তার মার্কেটিং টিমকে কতটা স্বাধীনতা দেয় কাজ করার জন্য। এ জন্য টাইটান আর টানিসক— এই নিয়ে গল্প আরেকদিন বলবো।
সেদিন দেশের একজন বেশ নামকরা ইকমের মালিক বলছিল ব্র্যান্ড অ্যাওয়ার্নেস ক্যাম্পেইন কেন রান করেন আর যদি করেনই তাহলে কী স্ট্র্যাটেজি ফলো করেন? আমার কথা হচ্ছে, সারা দুনিয়ার মেটাতে যত এড চলে তার ৭০ শতাংশ হয় ভিডিও ভিউজ আর ব্র্যান্ড অ্যাওয়ার্নেসে। তাহলে আমাকে বলেন কেন এত হয়?
ব্র্যান্ড অ্যাওয়ার্নেস করার একটা ওয়ে আছে সেটা কী? AIDA মডেলের প্রথম ধাপ হচ্ছে "A" মানে Awareness কিন্তু এই Awareness এর ৫টি অবস্থা আছে যেটা জানা আপনার ব্র্যান্ডের জন্য অনেক দরকারি হবে। কারণ ব্র্যান্ড কমিউনিকেশন তাহলে কোন টোনে যাবে কিংবা কোন মিডিয়া কিভাবে ইউজ করতে হবে আপনি সেটা খুব সহজে বুঝতে পারবেন।
আরো পড়ুন- যে কারণে ১২ দেশে টিকটক নিষিদ্ধ
কী সেই ৫টা অবস্থা?
Unaware
মানে হচ্ছে আপনার টার্গেট অডিয়েন্স জানেই না যে তার একটা সমস্যা আছে কিংবা সে সমস্যাটাকে জীবনের একটা অংশ মনে করেই পার করে দিচ্ছে। কিন্তু আপনি জানেন এইটা একটা সমস্যা যা ঘুমিয়ে আছে। সুতরাং আপনার প্রোডাক্ট যদি এই স্টেজের অডিয়েন্সকে টার্গেট করতে চায় তাহলে পণ্যকে না, সমস্যাকে সামনে নিয়ে আসতে হবে।
Problem Aware
তারা জানে তাদের একটা সমস্যা আছে কিন্তু সেই সমস্যার সল্যুশন কি সেটা তারা জানে না। অর্থাৎ আপনি তাদেরকে পেইন পয়েন্ট চিনিয়ে দেবেন না, আপনি তাদের পয়েন্ট জানেন আর সেটার কতগুলো সল্যুশন আছে তা নিয়ে যাবেন তাদের কাছে।
Solution Aware
এখানে টার্গেট মার্কেট জানে বাজারে সল্যুশন আছে কিন্তু তারা কার কাছ থেকে সল্যুশন নিবে, কার কি ইউএসপি এইগুলো জানে না, মানে আপনার কাজ হচ্ছে এখানে নিজেকে অন্যান্য কম্পিটিশনের চেয়ে নিজেকে আলাদা প্রমাণ করা।
Product Aware
এই স্টেজে মার্কেট আপনার পণ্যকে চেনে এবং জানে কিন্তু আপনাকে নিয়ে তার ডিটেইল জানা নেই। কিংবা বলতে পারেন আপনার থেকে যে সে কিনবে সেই আত্মবিশ্বাস তার নাই।
Most Aware
এই স্টেজে উপরের সবগুলো নলেজ লেভেল সে পার করে আসছে, সে সমস্যা জানে, সল্যুশন জানে, আপনাকে চিনে এবং আপনাকে মানেও। এখন লাগবে ট্রিগার করার মত কিছু, যেটা তাকে কিনতে বাধ্য করে।
উপরের এই ৫টা ধাপ আপনার নেক্সট অ্যাওয়ার্নেস অবজেক্টিভ রান করার আগে একটু মিলিয়ে নেবেন এবং সেই অনুযায়ী সব ধরনের কন্টেন্ট, মিডিয়া, অফার- মোদ্দাকথা কম রুট ডিজাইন করবেন।
লেখক: শেখ পিয়াশ ইসলাম, সিনিয়র ম্যানেজার, ব্র্যান্ড অ্যান্ড ডিজিটাল ডিপার্টমেন্ট, নগদ লিমিটেড
