বোনের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ করলেন দুবাই প্রবাসী জাহাঙ্গীর আলম
সাইফুল ইসলাম তালুকদার, ইউএই থেকে জানান
প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৪, ০২:২৭ পিএম
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন ভুক্তভোগী প্রবাসী জাহাঙ্গীর আলম। ছবি: ভোরের কাগজ
নিজের বোনের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ করলেন সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রবাসী জাহাঙ্গীর আলম। গত বৃহস্পতিবার (৪ জুলাই) প্রায় তিন কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেছেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে জাহাঙ্গীর আলম জানান, ভাগ্য বদলের আশায় পাড়ি জমিয়ে ছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে। নানা কৌশলে কয়েক দফায় জাহাঙ্গীর আলমের কাছ থেকে বিপুল অংকের টাকা নিয়েছিলো তার বোন রেজিয়া বেগম। স্বামীর ব্যবসা ও দুই ছেলেকে দুবাই পাঠিয়েছেন তার টাকায়। এছাড়াও ভূমি ও বাড়ির নির্মাণের কথা বলে হাতিয়ে নিয়েছেন দেড় কোটি টাকা। জমি ও বাড়ির সব খরচ ভাই বহন করলেও রেজিস্ট্রিতে লিখেছেন আমিনুল ইসলামের নাম। এসব প্রতারণার বিচার চেয়েছেন প্রবাসী জাহাঙ্গীর আলম।
জাহাঙ্গীর আলম আরো জানান, আপন বোন প্রবাসী ভাইকে সর্বস্বান্ত করে দিয়েছে। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে এই ঘটনা। বর্তমানে সবকিছু হারিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন দুবাই প্রবাসী জাহাঙ্গীর আলম। নিরাপত্তা হীনতায় ভুগছেন প্রতিনিয়ত। প্রবাস থেকে দেশে যাওয়ার সব রাস্তা বন্ধ করে লুটপাট করেছেন তার সহায়-সম্পত্তি, টাকা পয়সা ও গহনাসহ সব কিছুই। আপন বোন, ভগ্নীপতি এবং ভাগিনা অত্যন্ত কৌশল করে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে হাতিয়ে নিয়েছেন তার ৩ কোটি টাকার সম্পত্তি। জাহাঙ্গীর আলমকে মেরে ফেলার পরিকল্পনাও করেছেন আপন বোন রেজিয়া বেগম ও তার স্বামী নূর ইসলাম।
২০০৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন কায়দায় শ্যালকের কাছ থেকে ৭০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বোন, ভগ্নীপতি ও ভাগিনা শেখ জাহিদ পলাশ ও শেখ রাসেল পিয়াস। শ্যালকের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিয়েও ক্ষান্ত হননি নূর ইসলামের পরিবার। ২০১৮ সালে বোন, ভগ্নীপতি এবং ভাগিনা নতুন কৌশল শুরু করে। অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে এবং পরিকল্পিতভাবে জাহাঙ্গীর আলমকে ফাঁদে ফেলেন ওই প্রতারক দম্পতি। জাহাঙ্গীর আলমের নামে ৬ শতাংশ জমি কেনার প্রলোভন দেখিয়ে নতুন ফাঁদে ফেলেন নূর ইসলাম ও তার পরিবার। জাহাঙ্গীর আলম বোন ও ভগ্নীপতিকে বিশ্বাস করে জমি কিনে বাড়ি তৈরির স্বপ্ন দেখেন। রাজি হয়ে যান তাদের জমি কেনার প্রস্তাবে। তখন থেকেই ৬০ লাখ টাকা মূল্যমান নির্ধারণ করে জনৈক ফারুক আহমেদের কাছ থেকে ৬ শতাংশ জমি কেনার প্রস্তাব দেন। ধাপে ধাপে দুবাই থেকে টাকা নেয়া শুরু করেন নূর ইসলাম ও রেজিয়া বেগম। জমির মালিককে টাকা প্রদান করেন এবং মৌখিক বায়নাও করেন জাহাঙ্গীর আলমের নামে। ততক্ষণে অধিকাংশ টাকা ব্যাংক একাউন্ট এবং নগদ ক্যাশের মাধ্যমে বোন এবং ভগ্নীপতির একাউন্টে দুবাই থেকে প্রেরণ করেন জাহাঙ্গীর।
আরো পড়ুন: শিক্ষকের ভালোবাসা: এক নীরব বিপ্লব
পরবর্তীতে ২০১৯ সালের ১০ জানুয়ারি ওই ৬ শতাংশ জমি রেজিস্ট্রি করেন দাগণভূঞা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে। ভগ্নীপতি, বোন এবং দুই ভাগিনা জাহাঙ্গীর আলমকে তথ্য গোপন করে ১৬ জানুয়ারি জমি রেজিস্ট্রি হবে বলে বাকি সব টাকা হাতিয়ে নেন। অথচ ওই মাসের ১০ তারিখেই জাহাঙ্গীরের নামে প্রতারণা করে ভগ্নীপতি নুর ইসলামের নামে ৩ শতাংশ জমি রেজিস্ট্রি করে নেন। তখন জাহাঙ্গীর আলম দুবাইতে অবস্থান করছিলেন। বিভিন্নভাবে জমির মোট মূল্য ৬২ লাখ টাকা প্রদান করেন জাহাঙ্গীর আলম। এতেও ক্ষান্ত হননি আপন বোন রেজিয়া ও তার স্বামী নূর ইসলাম। শুরু করেন ওই জমিতে বাড়ি তৈরির পরবর্তী ফাঁদ।
জাহাঙ্গীর আলম নিজের জমিতে বাড়ি তৈরি করবেন আশা নিয়ে পা দেন নূর ইসলামের নতুন ফাঁদে। ওই জমিতে বাড়ি তৈরি করতে জাহাঙ্গীর আলমকে টাকার জন্য চাপ প্রয়োগ করলে পুনরায় বাড়ি তৈরি করার টাকা প্রদান করতে থাকেন দুবাই থেকে। জাহাঙ্গীর আলমের পূর্বের ক্রয়কৃত ২ লাখ ইট দুবাইতে বসেই ভাগিনা পলাশকে দায়িত্ব দিয়ে বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু করান। এভাবে জাহাঙ্গীর আলম তার বোনকে বিশ্বাস করে বাড়ি নির্মাণ করতে কয়েক ধাপে প্রায় ৫৫ লাখ টাকা প্রদান করেন। যার যথেষ্ট প্রমাণাদি বিদ্যমান রয়েছে। এটাও বোনের অভিনব প্রতারণা ছিলো।
পরবর্তীতে, ২০২২ সালে জাহাঙ্গীর আলম দুবাই থেকে বাংলাদেশে গেলে দেখেন অন্য চিত্র। ততক্ষণে বাড়ি নির্মাণের কাজ প্রায় সমাপ্তির পথে। বিভিন্ন কারণে জাহাঙ্গীর আলমের সন্দেহ হলে রেজিস্ট্রি অফিসে খোঁজ নিয়ে দেখেন রেজিস্ট্রিকৃত জমির মধ্যে নূর ইসলাম যৌথ মালিকানায় রেজিস্ট্রি হয়েছে। শ্যালকের টাকা-পয়সা অর্থবিত্ত সব কিছু হাতিয়ে নিয়ে ভগ্নীপতি তার নিজ নামে ৫০ শতাংশ জমি রেজিস্ট্রি করে নিয়ে পুরো জমি ভোগ দখল করে আছেন। অথচ পুরো জমির মূল্য ৬২ লাখ, বাড়ি নির্মাণ বাবদ ৫৫ লাখসহ যাবতীয় খরচ জাহাঙ্গীর আলমের কাছ থেকে হাতিয়ে নেন রেজিয়া বেগম। বলা চলে, "পরের ধনে পোদ্দারি করা"। এভাবেই নিঃস্ব করে দিয়েছেন দুবাই প্রবাসী জাহাঙ্গীর আলমকে।
আরো পড়ুন: আবুধাবিতে রেমিট্যান্স যোদ্ধার মৃত্যু
এতেও ক্ষান্ত হননি রেজিয়া ও তার স্বামী নূর ইসলাম। এরপর জাহাঙ্গীর আলমকে পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় করার নতুন কৌশল অবলম্বন করেন প্রতারক দম্পতি। সন্ত্রাসী কায়দায় জাহাঙ্গীরকে প্রাণপণে মেরে ফেলার বিশেষ কায়দা তৈরি করে ব্যর্থ হন রেজিয়া বেগম। তিনি ব্যর্থ হয়ে ছেলে শেখ জাহিদ পলাশ এবং শেখ রাসেল পিয়াসসহ স্থানীয়া ভাড়াটে সন্ত্রাসী দিয়ে কয়েকবার হামলা চালানো হয়। এরপর আপন ভাইকে প্রাণে মারতে না পেরে অন্যায়ভাবে ঠুকে দেন জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ৯০ লাখ টাকার চেক জালিয়াতির মিথ্যা মামলা। এবার জাহাঙ্গীর আলমের ওপর নতুন করে খড়গ নামলো। যেনো "মরার ওপর খাঁড়ার ঘাঁ"। বোনকে বিশ্বাস করে বাড়ি নির্মাণ করার জন্য নিজের ব্যাংক একাউন্টের চেক বই স্বাক্ষর করে বোনকে দিয়েছিলেন। বাড়ির কাজ করতে দাগনভূঁঞার ওই ব্যাংক থেকে যেনো সহজেই টাকা উত্তোলন করে বাড়ি নির্মাণের কাজ করতে পারেন। বোনের কাছে জাহাঙ্গীর আলমের রক্ষিত চেক দিয়ে আপন ভাইয়ের বিরুদ্ধে এনআই অ্যাক্ট. মামলা দায়ের করান রেজিয়া বেগম। যাতে সে জমি দাবি করতে না পারেন এবং দুবাই থেকে যেনো বাংলাদেশে আসতে না পারে।
মানবতার নির্মম পরিহাস, আপন ভাইকে সর্বস্বান্ত করে রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছেন বোন রেজিয়া দম্পতি। ওই জানুয়ারি মাসেই আত্মপক্ষ সমর্থন করতে জাহাঙ্গীর আলম ফেনী কোর্টে ২০২১ সালে কাউন্টার মামলা দায়ের করেন বোন, ভগ্নীপতি এবং ভাগিনাদের বিরুদ্ধে। বর্তমানে ভাই এবং বোনের দুটি মামলাই চলমান রয়েছে। তখন মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য এবং টাকা পয়সাসহ যাবতীয় সম্পত্তি ফেরত চেয়ে আইনি সহায়তাও চান জাহাঙ্গীর আলম।
এলাকায় সুপরিচিত মক্ষীরানি খ্যাত রেজিয়া বেগমের লোলুপ দৃষ্টির সমাপ্তি হয়নি এখনো। শুরু করেছেন নতুন কৌশল। জাহাঙ্গীর আলম দুবাই থাকায় পরিবারের সব সদস্যের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন, চুরি, ডাকাতিসহ বিভিন্ন ধারায় করেছেন আরো একটি মিথ্যা মামলা। যাতে করে টাকা-পয়সা, জমি, গহনা কিছুই ফেরত দিতে না হয় সেই পথ অবলম্বন করেছেন রেজিয়া বেগম, তার স্বামী নূর ইসলাম, ভাগিনা পলাশ ও পিয়াস।
প্রশাসনের কাছে প্রতারণার বিচার চেয়েছেন প্রবাসী জাহাঙ্গীর আলম।
