×

এই জনপদ

দুঃসহ স্মৃতি মনে পড়লেই আনমনা হয়ে যান রেনু

Icon

প্রকাশ: ০৮ ডিসেম্বর ২০২৩, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বিকুল চক্রবর্তী, মৌলভীবাজার থেকে : সেই দুঃসহ রাতের স্মৃতি মনে হলে আনমনা হয়ে যান শ্রীমঙ্গল কালীঘাট চা বাগানের রেনু রানী দে। যার জীবনের বিভীষিকাময় ও সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের এই গল্প শোনাতে গিয়ে কয়েক মিনিট নীরব ছিলেন রেনু রানী দে। তিনি একটি চেয়ারে বসেছিলেন। পাশেই আমি ও মুক্তিযোদ্ধা মোয়াজ্জেম হোসেন ছমরু আরো কয়েকজন বৃদ্ধ নারী। ওই দিন কি ঘটনা ঘটেছিল বলতে বললে তিনি ওই চেয়ারেই কয়েক মিনিটের জন্য নড়াচড়া বন্ধ করে দেন, এ সময় শুধু তার চোখ দিয়ে গড় গড় করে পানি গড়িয়ে পড়ছিল। আমরাও সে সময় নীরব ছিলাম। তার অবস্থা ছিল অনেকটা কমায় চলে যাওয়ার মতো। দুই তিন মিনিট পর চোখ মুছে তিনি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন সেই রাত ও এর পরের কাহিনী। ১৯৭১ এর মে/জুন মাস হবে। স্বামী সুধা রঞ্জন দে বাগানেই কাপড়ের ব্যবসা করেন। ফ্যাক্টরি লাইনে একটি কুঁড়েঘরে স্বামী সন্তান নিয়ে সুখেই বসবাস করছেন রেনু। তাদের সঙ্গে থাকতেন তার মা ও মাসি। তখন তার এক মেয়ে ৫ বছরের আর আড়াই বছরের এক ছেলে। ছিলেন পোয়াতি। কিছুদিন আগে বাগানের ফ্যাক্টরিতে ক্যাম্প করেছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। বাগানের কিছু কিছু মানুষ বর্র্ডার ক্রস করে ভারতে চলে গেছেন। সংসারে আর্থিক টানাপড়েনের কারণে হাতে কোনো অর্থকড়ি ছিল না। তাই তারা ভারতে যাননি। হানাদার বাহিনী বাগানে ক্যাম্প করার পর ভয়ে ভয়েই রাত কাটত। আর ভয়ে ভয়েই আসে এক ভয়ের রাত। এই ভয়ের রাতেই স্বামী-সন্তান নিয়ে শুয়েছেন রেনু রানী দে। অন্যপাশে মা ও মাসি। হঠাৎ শুনতে পান তাদের দরজায় প্রচণ্ড শব্দ। দ্রুতই তারা ঘুম থেকে ওঠেন। দেখেন দরজা ভেঙে পড়েছে। ঘরে বুটের শব্দ। কয়েকজন পাকিস্তানি জওয়ান ঘরে প্রবেশ করে। রেনুর স্বামী সুধা রঞ্জন দে কে ধরে বাইরে বের করে নেয়। মা, মাসি ও সন্তানদের ভয় দেখিয়ে ঘরের এক কোনে রাখে। তিন জন জওয়ান আসে তার পাশে। তাকে ওই বিছানাতেই শুরু করে নির্যাতন। একজন হাতে ধরে রাখে, দুই জন তাকে ক্রমান্বয়ে ধর্ষণ করে। এর পর তারা বলে তাকে ক্যাম্পে নিয়ে যেতে। পুরো ঘটনাই রেনু রানীর মা ও মাসির সামনেই তারা ঘটায়। রেনুকে ধর্ষণের পর তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যেতে টানা হেঁচড়া শুরু করে। তখন রেনু লাশ হয়ে পুরো শরীর ছেড়ে দেন। তিনি অজ্ঞান হয়ে গেছেন ভেবে ওই রাতে তারা রেনুকে আর ক্যাম্পে নিয়ে যায়নি। তারা তার স্বামীকে ধরে নিয়ে যায়। পর দিন তারা এই বাসা ছেড়ে চলে যান দুর্গা লাইনে। ভারতে যেতে চান। কিন্তু স্বামীকে ধরে নিয়ে গেছে। তাকে ছাড়া কিভাবে যাবেন। স্বামীর অপেক্ষায় বাগানেই থাকেন। স্বামী আজো ফিরে আসেন নি। দেশ স্বাধীন হলো। তার শরীরে পড়ল দাগ। আর স্বামীর শোকে পাগলপ্রায়। স্বাধীনতার ৫৩ বছরেও জানতে পারলেন না তার স্বামীর ভাগ্যে কি হয়েছিল। বাগানে থেকেই নানা যন্ত্রণা ও কষ্ট সহ্য করে তিন সন্তানকে বড় করেছেন। জীবন আজ অস্তমিত। সরকার এই সব আত্মত্যাগী সম্ভ্রম হারানো মায়েদের মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা দিচ্ছে। কিন্তু বাগানে পড়ে থাকা এই রেনু রানীরা তা জানেন না। কেউ তাকে এমন প্রস্তাব দেয়ওনি। অতি সম্প্রতি শ্রীমঙ্গল উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রাক্তন ডেপুটি কমান্ডার মোয়াজ্জোম হোসেন ছমরু তার আবেদনটি করে দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে। কালীঘাট চা বাগানে এই রেনু রানীর ওপর যে বীভৎস ঘটনা ঘটেছে এমন নানা ঘটনার শিকার হন কালীঘাট চা বাগানের আরো ১৭/১৮ জন নারী। কেউ কেউ মারাও গেছেন। এই লাল সবুজের বাংলার ইতিহাসের একএকটি অংশই হচ্ছেন এই বীরমাতারা। তারা হলেন- ভক্ত তাঁতীর স্ত্রী বীরমাতা বীরাঙ্গনা বুল তাঁতী, নাথো তাঁতীর মেয়ে বীরমাতা বীরাঙ্গনা সাবি তাঁতী, সরগীয়া তাঁতীর স্ত্রী বীরমাতা বীরাঙ্গনা হেমলা তাঁতী, কুশ তাঁতীর মেয়ে বীরমাতা বীরাঙ্গনা শরশতি তাঁতী, দশরত কালোয়ারের মেয়ে বীরমাতা বীরাঙ্গনা লাখো কালোয়ার, নিধনী তাঁতীর মেয়ে বীরমাতা বীরাঙ্গনা তরু তাঁতী, মরতি তাঁতীর মেয়ে বীরমাতা বীরাঙ্গনা অঞ্জনা তাঁতী, অর্জুন তাঁতীর মেয়ে বীরমাতা বীরাঙ্গনা অঞ্জনা তাঁতী, নিধনী তাঁতীর অপর মেয়ে বীরমাতা বীরাঙ্গনা লতা তাঁতী, নেফুল তাঁতীর মেয়ে বীরমাতা বীরাঙ্গনা পারবতী তাঁতী ও আর্থ তাঁতীর মেয়ে বীরমাতা বীরাঙ্গনা দুলালী তাঁতী। তাদের প্রত্যেকের সঙ্গেই কথা বলেন এ প্রতিবেদক। এ সময় এই বীর মাতারা তাদের জীবনের বেদনাদায়ক বিভীষিকাময় সেই দিনগুলোর চিত্র তুলে ধরেন। বাড়িতে না থাকায় বাকি বীরমাতাদের সঙ্গে কথা বলা হয়নি। শ্রীমঙ্গল উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার কুমুদ রঞ্জন দেব বলেন, কালীঘাট চা বাগানে অনেক নারী নির্যাতিত হয়েছেন সেটা তিনি শুনেছেন। সরকার এখন বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিচ্ছে। আমরা খোঁজ করে সঠিক তথ্য নিয়ে তাদের আবেদন করতে সহায়তা করছি। এ ব্যাপারে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডারের দায়িত্বে থাকা উপজেলা নির্বাহী অফিসার আলী রাজিব মাহমুদ মিঠুন জানান, যাচাই বাছাইয়ের জন্য ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয় থেকে প্রায় ২০ জন বীরাঙ্গনার আবেদন তার কাছে এসেছে। যার অধিকাংশই চা বাগানের মায়েরা। তিনি টিম করে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছেন।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

১৬ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল কেনার অনুমোদন

১৬ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল কেনার অনুমোদন

পাচারকালে বিপুল পরিমাণ ডিজেলসহ আটক ১২

পাচারকালে বিপুল পরিমাণ ডিজেলসহ আটক ১২

দলের প্রধান সমন্বয়কারীর পদ ছাড়লেন জোনায়েদ সাকি

দলের প্রধান সমন্বয়কারীর পদ ছাড়লেন জোনায়েদ সাকি

ব্যবসায়ীর গুদাম থেকে ৩৮ হাজার লিটার ডিজেল জব্দ

ব্যবসায়ীর গুদাম থেকে ৩৮ হাজার লিটার ডিজেল জব্দ

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App