×

সাময়িকী

মূলধারার কবি বেলাল চৌধুরী স্মরণে

Icon

প্রকাশ: ১০ নভেম্বর ২০২৩, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মূলধারার কবি বেলাল চৌধুরী স্মরণে
লেখক-শিল্পীদের মধ্যে অসাম্প্রদায়িকবোধ, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ভূমিকা, যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবতাবোধের ভিত্তিমূল পাকিস্তান আমলেও জোরালো ছিল, তা পরবর্তী সময়েও ছিন্ন হয়নি। পঞ্চাশ-ষাট দশকে সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে যুক্ত থাকা অগ্রসর কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকরা গৌরবের ভূমিকা পালন করেছেন। কবি বেলাল চৌধুরীও সেই গৌরবের পথে হেঁটেছেন। তারা এবং তাদের উত্তরাধিকাররা এখনো সক্রিয়। সেই ধারাবাহিক চেতনানির্ভর শিল্প-সাহিত্যের সজীব ও অগ্রসরমান ধারা তা আজ কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন শুধু হচ্ছে না, সেই ধারাকে চোরাস্রোতে নিয়ে যাওয়ার জন্য এক ধরনের স্বাপদনির্ভর চোরাগোপ্তা উন্মাদনা তৈরি করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে কবি বেলাল চৌধুরীদের মতো কবিদের কবিতার কাছে আমাদের ফিরে আসতে হবে বারবার। কবি বেলাল চৌধুরীদের মতো কবিদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিজাত ভূমিকা আমাদের ইতিহাস সংলগ্ন শুধু নয়, আমাদের শিল্প-সাহিত্যের মূলধারার বৈভবও। শিল্প-সাহিত্যের মাধ্যমে লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাবাদর্শের লড়াইটা কখনো মোটা দাগে বা কখনো সূ²ভাবে চলতে থাকে। এ থেকে শিল্পী ও লেখকরা কখনো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না। বেলাল চৌধুরীও তা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেননি। ভারত বিভাগের পর গোটা পাকিস্তান আমলে রাজনৈতিক অভিঘাতকে পাশ কাটিয়ে সাহিত্য-শিল্পকে প্রাণবান করার চেষ্টা হয়নি কখনো, বরং সেই সময়ের সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক চেতনায় বলিষ্ঠ। শিল্প-সাহিত্য হয়েছে স্বদেশ ও সমাজের দর্পণ, এই সত্যকে মেনে নিয়ে কবি-লেখক ও শিল্পীরা পাঠকের চৈতন্যকে প্রণোদনা দিয়ে জাগ্রত রেখেছেন। কবিদের অধিকাংশেরই চেতনায় জড়িয়ে ছিল তীব্র দেশপ্রেম। দুই. কবি বেলাল চৌধুরীর জন্ম ১৯৩৮ সালের ১২ নভেম্বর, ফেনীতে, আর মৃত্যু ২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল, ঢাকায়। ৯ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। কবি হিসেবে খ্যাতিমান হলেও তিনি প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও সম্পাদক হিসেবেও ছিলেন বিশিষ্ট। মৃত্যৃর আগ পর্যন্ত তিনি ধারাবাহিকভাবে কবিতাসহ বিভিন্ন লেখা নিরলসভাবে লিখেছেন। কলমকে হাত থেকে নামিয়ে রাখেননি- দূরবর্তী কোথাও। যদিও তার ইমেজে বোহেমিয়ান ও আড্ডাবাজের প্রবল ছাপ রয়েছে কিন্তু সেই ছাপ ছাপিয়ে তার সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের পরিধি কম বিস্তৃত নয়, বরং উল্লেখযোগ্যভাবে সংহত ও উজ্জ্বল; তার বিভিন্নমুখী লেখার স্পর্ধা- সেই প্রতিভাসে দেদীপ্যমান। কবিতা লিখতেন বলেই তার সঙ্গে আমাদের অনেকের পরিচয়। আমরা যারা কবিতা লেখার কারণে বিভিন্ন সময়ে তার কাছে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি, তারা তো জানি তিনি আপন করে নেয়ার জন্য উন্মুখ থাকতেন- আন্তরিকতায় ও ভালোবাসায়; বিশেষ করে তার বয়সের তুলনায় আমরা যারা দূরবর্তী ছিলাম বা ছিলাম কম বয়সি, তারা তো তার স্নেহে ও আগ্রহে কবিতা লেখা ও প্রকাশে বহুবিধ সহযোগিতা পেয়েছি, তা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে না বললে অশোভন হয়ে দাঁড়ায়। আর অন্যদিকে কবিতা বিষয়ক সাংগঠনিক ভূমিকায় তার কাছাকাছি থেকে- তার সান্নিধ্য আমরা যারা পেয়েছি- বেশ সময়ও ব্যয় করেছি, এই এক জীবনে- তা তো আর এক দিগন্তপ্রসারী উজ্জ্বলতা নিয়ে আছে। কবি বেলাল চৌধুরী, লেখক বেলাল চৌধুরী, সম্পাদক বেলাল চৌধুরী, জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি বেলাল চৌধুরী ও সর্বোপরি মানুষ বেলাল চৌধুরীর কথা আমরা বিভিন্নভাবেই বিভিন্ন দিক থেকেই বিভিন্নভাবে আজো শ্রদ্ধার সঙ্গে উপলব্ধি করি। কবিতা, গদ্য, অনুবাদ, সম্পাদনা, শিশুসাহিত্য মিলিয়ে বেলাল চৌধুরীর গ্রন্থ সংখ্যা পঞ্চাশের বেশি। ‘বল্লাল সেন’, ‘ময়ূর বাহন’, ‘সবুক্তগীন’ ছদ্মনামেও তিনি লিখেছেন। তার কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে নিষাদ প্রদেশে, আত্মপ্রতিকৃতি, স্থির জীবন ও নিসর্গ, জলবিষুবের পূর্ণিমা, সেলাই করা ছায়া, কবিতার কমলবনে, বত্রিশ নম্বর, যে ধ্বনি চৈত্রে শিমুলে, বিদায়ী চুমুক উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া তার কথাসাহিত্য, প্রবন্ধ ও গবেষণা গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানল, ডুমুরপাতার আবরণ, চেতনার রঙ চন্দ্রশিলা এবং লাকসাম দাদা ও অন্যান্য গল্প। কাগজে কলমে, মিশ্রচিত্রপট, নিরুদ্দেশ হাওয়ায় হাওয়ায়, জীবনের আশ্চর্য ফাল্গুন, নবরাগে নব আনন্দে, সুন্দরবন, সোঁদরবন ও রবীন্দ্রনাথ, মুহূর্তভাষ্য ইত্যাদি তার অন্যান্য গদ্যগ্রন্থ। শিশু-কিশোরদের জন্য বেলাল চৌধুরী লিখেছেন- সাড়ে বত্রিশ ভাজা, সপ্তরতেœর কাণ্ড-কারখানা, সবুজ ভাষার ছড়া। নিজের লেখার পাশাপাশি হোর্হে লুই বোর্হেস, পাবলো নেরুদা, ডিলান টমাস, অক্তাবিও পাজের মতো কবিদের লেখা তর্জমা করেছেন বেলাল চৌধুরী; সম্পাদনা করেছেন বেশ কিছু স্মারকগ্রন্থ। তার সম্পাদিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে- জলের মধ্যে চাঁদ ও অন্যান্য জাপানি গল্প, বিশ্বনাগরিক গ্যেটে, পাবলো নেরুদা- শতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি, শামসুর রাহমান সংবর্ধনাগ্রন্থ, পদাবলী কবিতা সংকলন ও কবিতায় বঙ্গবন্ধু। ছাত্র অবস্থায় বেলাল চৌধুরী জড়িয়ে পড়েন বাম ধারার রাজনীতিতে, ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে যোগ দিয়ে কারাগারেও যান। ষাট ও সত্তরের দশকে কয়েক বছর কলকাতায় বসবাসের সময় সাহিত্য পত্রিকা ‘কৃত্তিবাস’ সম্পাদনায়ও যুক্ত হন কবি। পরে ‘পল্লীবার্তা’, ‘সচিত্র সন্ধানী’ ও ‘ভারত বিচিত্রা’ পত্রিকার সম্পাদনায় যুক্ত হন। আমরা জানি- কবি হিসেবে বেলাল চৌধুরী প্রথম জীবনে বোহেমিয়ান থাকলেও, পরবর্তী জীবনে বেশ শৃঙ্খলার সঙ্গে সম্পাদক ও অন্যান্য পদেও চাকরি করেছেন। কবি বেলাল চৌধুরী কলকাতা থেকে ১৯৭৪ সালে দেশে ফিরে আসেন, যোগ দেন প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনে। পরবর্তীতে ‘জাতীয় কবিতা পরিষদ’ ও ‘পদাবলী’ নামের কবিতা সংগঠন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০১৪ সালে ‘একুশে পদক’ পান কবি বেলাল চৌধুরী; পেয়েছেন- বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, নীহাররঞ্জন স্বর্ণপদক, জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কারসহ নানা সম্মাননা। কবি কবি বেলাল চৌধুরী একনিষ্ঠ সংগঠক হিসেবে বেশ কিছু সংগঠনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন, এর মধ্যে জাতীয় কবিতা পরিষদের সঙ্গে আমৃত্যু সম্পর্ক রেখেছিলেন, জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতিও ছিলেন তিনি। আশির দশকে কবিতা বিষয়ক চারটি সংগঠন গড়ে ওঠে। সংগঠনগুলো হলো- ‘পদাবলী’, ‘কবিকণ্ঠ’, ‘বাংলাদেশ কবিতা কেন্দ্র’ ও ‘জাতীয় কবিতা পরিষদ’। ১৯৮০ সালের ১৮ ডিসেম্বর ‘পদাবলী’ আত্মপ্রকাশ করে। এই সংগঠনটি দর্শনীর বিনিময়ে প্রথম কবিতা পাঠের আয়োজন করে, তা সে সময়ে অভিনবত্বে বেশ কৌতূহলোদ্দীপক ছিল। কবি বেলাল চৌধুরী ‘পদাবলী’র সঙ্গেও নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন। কবি আবুজাফর ওবায়দুল্লাহর নেতৃত্বে শামসুর রাহমান, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ, মাহমুদুল হক, রফিক আজাদ, রবিউল হুসাইন, হাবীবুল্লাহ সিরাজী প্রমুখ প্রগতিশীল কবিরা এই সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। তিন. ভারতবর্ষ ধর্মভিত্তিক পরিচয়ের পোশাকে বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। পূর্ব বাংলা হয়ে উঠল রাতারাতি পূর্ব পাকিস্তান! পাকিস্তানের অপর অংশ- পশ্চিম পাকিস্তান, যা পূর্ব পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন ও হাজার মাইল দূরবর্তী আর এক ভিন্ন বৈশিষ্ট্য নিয়ে ভিন্ন এক ভূখণ্ড! বিভিন্ন দিক থেকে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ছিল বিস্তর ব্যবধান- আলাদা ভাষা, জীবন পদ্ধতি এবং অন্যান্য সামাজিক ও জীবনাচরণও। ১৯৭১ আগ পর্যন্ত পুরো পাকিস্তান শাসনামলে এই ভূখণ্ডের মানুষরা বিভিন্ন বৈষম্যের শিকার হয়, তা রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও সামাজিক, যা এক ভয়াবহ ব্যভিচার হিসেবে এই ভূখণ্ডের মানুষরা শুধু উপলব্ধি করেননি, বিভিন্ন সময়ে এর প্রতিবাদ-সংগ্রামে মানুষ হয়েছেন প্রতিবাদী, রক্ত দিয়ে হয়েছেন উচ্চকিত। অবশেষে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ। এই পরিস্থিতির কণ্ঠলগ্ন হয়ে এ দেশের কবিরা মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে কবিতা লেখেন। বেলাল চৌধুরীর কবিতায় এক ধরনের রোমান্টিকতার আবহ থাকলেও তার কবিতার মূল দ্যোতনা হিসেবে স্বদেশচেতনা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের আর্ত-হাহাকার ও জীবন উন্মুখ হতে আমরা দেখি। তার উল্লেখযোগ্য মুক্তিযুদ্ধের কবিতার উদাহরণ তুলে ধরি, ‘একদিন চিরদিন জয়বাংলা’ নামক কবিতায় তিনি বলেন- ‘জয়বাংলা ছিল আছে একদিন চিরদিন দুর্জয় এক সাহসের নাম জয়বাংলা ছিল আছে একদিন চিরদিন দুর্বার এক সংগ্রামের নাম জয়বাংলা ছিল আছে একদিন চিরদিন আট কোটি কোকিলের ঐকতান জয়বাংলা ছিল আছে একদিন চিরদিন কল্লোলিত সমুদ্রের উত্তাল গর্জন’ ... জয়বাংলা জয় বাঙালির একদিন চিরদিন শৌর্যবীর্য’ স্বদেশ চেতনার আর একটি কবিতার উদাহরণ টেনে নিই, ‘স্বদেশ’ নামক কবিতায় তিনি বলেন- ‘আমি আছি ব্যপ্ত হয়ে তোমার রৌদ্র ছায়ায় এই তো তোমার ঘামে গন্ধে তোমার পাশাপাশি তোমার ছায়ার মতো তোমার শরীর জুড়ে তোমার নদীর কুলকুল স্রোতে; তোমার যেমন ইচ্ছে, আমি আছি-’ (স্বদেশভূমি) এই কবির মুক্তিযুদ্ধের অনেক উল্লেখযোগ্য কবিতা রয়েছে, মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে সেইসব কবিতা মুক্তিযুদ্ধের কবিতা হিসেবে শুধু উজ্জ্বল নয়, এইসব কবিতায় একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার আবেগ, স্বপ্ন, সংবেদনা ও অভিনবত্ব ধরা পড়েছে। যেমন- ‘একটি পতাকা হতে পারে কত আনন্দের, স্বাধীনতা শব্দটি কত অনাবিল;- মুক্ত হওয়ার পতপত স্বাধীন পতাকা, স্বাধীন দেশের সার্বভৌম, সুন্দর, দেশজ চেতনার রঙে রাঙা; যারা জেনে যেতে পারে নি সেসব সুবর্ণ দিনের কথা আজ তারাই কি তাদের প্রাণের অধিক প্রিয় স্বাধীন মুক্ত দেশের মৃত্যুঞ্জয়ী বীর নয়? -যারা পাঞ্জা লড়েছিল মৃত্যুর সঙ্গে।’ (মর্মে মর্মে স্বাধীনতা) আর একটি কবিতায় কবি খণ্ড খণ্ড অনুভাবনাকে গভীর ব্যঞ্জনায় অভিষিক্ত করে দেশ-কালের ইতিহাসকে নির্মম সত্যের পাটাতনে টেনে নিয়ে গভীর অভিব্যক্তির ব্যঞ্জনায় তুলে ধরেছেন, যা ভিন্ন মাত্রায় পাঠককে অনুরণিত করে। উদাহরণ : ‘ইতিহাসের বাঁকাচোরা অলিগলি ধরে দেশে দেশে যুগে যুগে ঝরেছে অনেক রক্ত রাজপথে, ফসলের ক্ষেতে, মিছিলে মিছিলে অবিরাম, অনর্গল গড়ায় মানুষের শোণিত প্রবাহ মেহনতি মানুষের শ্রমিক মজুর কৃষকের, প্রতিবাদী মানুষ ঢেলেছে পাঁজরের রক্ত ঢের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে, শ্বেদ ও নুনের সঙ্গে -ইতিহাসের ধূসর পাতার একই পুরাবৃত্তি, রক্তাক্ত অধ্যায় শুধু। (অনিঃশেষ) মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী এই কবির অভিজ্ঞতালব্ধ অনুভব আমরা পেয়ে যাই কোনো কোনো কবিতায়, আর সে কারণে মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টার অভিব্যঞ্জনা নিয়ে এই কবিতাটি মূর্ত হয়ে ওঠে- ‘মার্চে যে-বীজ ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল সারা দেশের মাটিতে দশ মাস দশ দিনেরও কম, মাত্র ন’মাসেই ডিসেম্বরে এসে সে-ফসল গোলাজাত করা হল ঘরে ঘরে, মুক্ত আকাশে উড়ল বাংলা ও বাঙালির জয়পতাকা; উদয়ের পথ রাঙা হল লক্ষ সূর্যের চোখ ধাঁধানো আলোয় -সেই থেকে ডিসেম্বর মানে মুক্তির মাস, বিজয়ের মাস!’ (মুক্তির মাস, বিজয়ের মাস ডিসেম্বর) কবি বেলাল চৌধুরীর লিখিত ‘বত্রিশ নম্বর’ নামের কবিতাটি, একটি দীর্ঘ গদ্য-কবিতা, এই কবিতাটি কবি খুব সচেতনভাবে নির্মাণ করেছেন। কবিতাটিতে ইতিহাস চেতনার বিভিন্ন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন তিনি, বিবেকতাড়িত জিজ্ঞাসাকেও মূর্ত করেছেন- ‘বাঙালি ও বাংলাদেশের ইতিহাস খুঁজতে গেলে যেতে হবে বত্রিশ নম্বর বাংলাদেশ ও বাঙালির গৌরব গাঁথা দেখতে হলে যেতে হবে বত্রিশ নম্বর বাঙালি ও বাংলাদেশের স্থাপত্য-ইতিহাস জানতে হলে পাতা উল্টে দেখতে হবে বত্রিশ নম্বর বাংলাদেশ ও বাঙালির কলংকচিহ্ন দেখতেও যেতে হবে সেই বত্রিশ নম্বর . . . এ বাড়িটির প্রতিটি ইটে গাঁথা রয়েছে বাঙালি জাতির গৌরব গাঁথা, শৌর্যের কথা মুক্তিযুদ্ধে বিজয় ও অর্জনের কথা বিশ্ব মানচিত্রে একটি নতুন দেশের রক্তসিন্ধু অভ্যুদয়ের কথা।’ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আর একটি কবিতায় তিনি স্পষ্ট উচ্চারণ উচ্চকিত করে বলেন- রক্তের জাগরণ শেখ মুজিবুর রহমান লক্ষ সূর্যের দীপ্তিতে ভাস্বর এক সূর্য শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির প্রতিটি নিশ্বাসে ফোটে একটি অবিনশ্বর রক্তকমল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। (আবহমান বাংলা ও বাঙালির) কবি বেলাল চৌধুরীর দেশলগ্ন ও কাল সচেতন কবিতা এতটা জায়গা জুড়ে রয়েছে- তার কাব্যভূমিতে, একত্রে তার বেশির ভাগ কবিতা পড়লে তা আমরা আবিষ্কার করতে পারি। বর্তমান সমাজ ও সময়ের নিরিখে আমাদের অবস্থানকে কবি কী এক গভীর দ্যোতনায় টেনে এনেছেন-- ‘বহু মানুষ এখন বহুভাবে মরে যাচ্ছে আর যারা এখনো জীবিত তারাও যে নানাভাবে নিরন্তর বেঁচে থাকছে, না থাকার মতো।’ (বেঁচে থাকার মানে, সেলাই করা ছায়া) মৃত্যু বিষয়ে তার ভাবনা তার কবিতায় আমরা পেয়ে পাঠক হিসেবে সচকিত হই, তারই কবিতার পঙ্ক্তি : ‘ফেরারী আমি অনেক স্বপ্ন ও নষ্ট স্মৃতির জটিল করিডর পার হয়ে এখন কেবল একফালি সরু বারান্দায়’। আসলে কবিকেও জীবনের করিডর পার হয়ে যেন মৃত্যুরই এক সরু বারান্দায় অবশেষে উপস্থিত হতে হয়। কবি বেলাল চৌধুরী, আমাদের বেলাল ভাই, ‘আত্মপ্রতিকৃতি, স্থিরজীবন ও নিসর্গচিত্র’ নামক এই কবিতায় উল্লিখিত কথা তেমনভাবে বলেছেন। কবি বেলাল চৌধুরী শেষ জীবনের দীর্ঘ সময়ে ঢাকার পল্টনের যে বাসায় বসবাস করেছেন, সে বাসায় আমরা অনেকে কমবেশি গিয়েছি, কেউ বা এক বা দুবার। ‘হাওয়ামহল’ নামক এই কবিতাটি পড়লে এক ধরনের আর্ত-হাহাকার পাওয়া যায়, মনে হয় সেই বাসাটি থাকবে, কিন্তু সেই বাসায় গিয়ে বেলাল ভাইকে আর পাওয়া যাবে না, তবে কবিতার মধ্যে দিয়ে তাকে আমরা খুঁজে নেব। ‘হাওয়ামহল’ কবিতার অংশ- ‘ও-বাড়িটার কেউ থাকে না শুধু হাওয়ার কুহক জড়িয়ে আছে পাকে পাকে আইভি-লতার আলিঙ্গন লালচে ইটে পড়ন্ত রোদ আর হাহাকার- কেউ থাকে না ও-বাড়িটায় শুধু হাওয়ার কুহক’। চার. কবি ও কবিতা সম্পর্কে কবি বেলাল চৌধুরীর অভিমত, যা আমাদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ, তা উল্লেখ করি- ‘কবিতা বাঙালির মাতৃভাষা। কবিতা বাংলা সাহিত্যের জননী। বাঙালির কাব্যচর্চার শুরু কমবেশি হাজার বছর যাবৎ। আর সে জায়গায় গদ্যের বয়স বড়জোর দুশো আড়াইশ বছর। ব্যাকরণ, গণিত, বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র, ইতিহাস, ভূগোল, জ্যোতিষশাস্ত্র থেকে শুরু করে সমসাময়িক যুদ্ধবিগ্রহ, রাষ্ট্রবিপ্লব, ব্যবসা-শিল্প, বাণিজ্য, ধর্মকর্ম যা পদ্যে বিবৃত করেছেন বাঙালি পদ্যকারেরা, কবিরা। কবিতা আজকাল আর তেমন জনপ্রিয় মাধ্যম না হলেও মানব জীবনের জন্য কিন্তু অবশ্য প্রয়োজনীয়। কবিতা একটি জাতির ভাষার স্মৃতি। কবিতা না থাকলে মানুষ ভালো করে কথাই বলতে পারতো না। কবিকে অবশ্যই সমাজের সমালোচক হতে হবে। আমরা একা হয়ে জন্মাই কিন্তু আমাদের প্রধান কর্তব্য একে অন্যের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়া। একাত্মতার এই আকুতি অন্যদেরও জানাতে হবে। ভাষা জনগণের সম্পদ আর এই কবি এই সম্পদের অভিভাবক।’ পাঁচ. বাংলাদেশের কবিতার মূলধারায় রয়েছে- স্বদেশ-চেতনা, গণআন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ আর মানবতার বিভিন্ন অনুষঙ্গ। এসবের কণ্ঠলগ্ন হয়ে এক গভীর চৈতন্যের ঐতিহ্যে নিয়ে বাংলা কবিতা প্রবহমান, এরই পরস্পরা নিয়ে এ দেশের কবিরা কবিতা নির্মাণ করে থাকেন। কবিতা উল্লল্ফলাফের জায়গা নিয়ে দাঁড়ায় না। বাংলা কবিতার যে বিস্ময় ও চমৎকারিত্ব তা সম্মিলিত কবিদের ভূমিকায় উজ্জ্বল, কেননা একক কবির যুগ এখন নেই- সম্মিলিত কবির যুগ এখন। সেই সম্মিলিত মূলধারায় বিভিন্ন রকমের বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিভিন্ন কবির সৃজনশীলতা দেদীপ্যমান হয়ে আছে। কবি বেলাল চৌধুরী সেই মূলধারার একজন বিশিষ্ট কবি। বেলাল চৌধুরী : ১২ নভেম্বর, ১৯৩৮-২৪ এপ্রিল, ২০১৮

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

মিরপুরের পর চট্টগ্রামে ৩ বছরের শিশুকে ধর্ষণ

মিরপুরের পর চট্টগ্রামে ৩ বছরের শিশুকে ধর্ষণ

লালবাগে রাফি হত্যা, প্রধান আসামি ইমন গ্রেপ্তার

লালবাগে রাফি হত্যা, প্রধান আসামি ইমন গ্রেপ্তার

১৬ মাসে ৫৮০ শিশুকে ধর্ষণ, নিহত ৪৮৩

এইচআরএসএস ১৬ মাসে ৫৮০ শিশুকে ধর্ষণ, নিহত ৪৮৩

রামিসার বাসায় প্রধানমন্ত্রী

রামিসার বাসায় প্রধানমন্ত্রী

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App