বাঙালির অহংকার ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
খুবই উঁচু মানের বিদ্বান ছিলেন তিনি। অসামান্য প্রতিভা ও কীর্তির জন্য অমর হয়ে আছেন। সাধারণ থেকে অসাধারণ হয়ে উঠতে পেরেছিলেন একাগ্র সাধনা, গুণ, অধ্যবসায়, মেধা ও প্রতিভার বলে। পণ্ডিত, সমাজ সংস্কারক হিসেবে তার অবদান যেমন অতুলনীয়, তেমনি মানুষও হিসেবেও ছিলেন অনন্য। অকুণ্ঠ দান-দক্ষিণার জন্য দেশজোড়া খ্যাতি ছিল তার। সমাজের অন্যায় রীতি-প্রথার বিরুদ্ধে লড়ে গেছেন আমৃত্যু। এ ব্যাপারে ছিলেন আপসহীন। একজন মানুষের মধ্যে অনেক ধরনের প্রতিভার সমাবেশ বিশেষ একটা দেখা যায় না। তিনি ছিলেন বিরল ব্যতিক্রমদের অন্যতম। বলছি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কথা।
গরিব এক ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান তিনি। জন্ম ১৮২০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ নভেম্বর। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে। বাবার নাম ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতার এক দোকানের কর্মচারী ছিলেন তিনি। শিশু ঈশ্বরচন্দ্র গাঁয়ের পাঠশালার পাঠ শেষ করলেন। তখন তার বয়স আট বছর। বাবার সঙ্গে পায়ে হেঁটে চলে গেলেন কলকাতায়। সেখানে এক বছর পড়াশোনা করলেন শিবচরণ মল্লিকের বাড়ির পাঠশালায়। মেধাবী এই ছাত্রটি তারপর ভর্তি হলেন কলকাতার সরকারি সংস্কৃত কলেজে। বিচিত্র বিষয়ে আগ্রহ, কৌতূহল ছিল তার। গভীর মনোযোগে পড়াশোনা করলেন নানা বিষয়ে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাকরণ, কাব্য, অলঙ্কার, বেদান্ত, স্মৃতি, ন্যায় ও জ্যোতিষ শাস্ত্র। বারো বছরের পাঠ পর্ব। ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে উল্লিখিত বিষয়সমূহের পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করলেন। মেধা ও প্রতিভার স্বীকৃতি হিসেবে তখন ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি পেলেন ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। শিক্ষক, সমাজ সংস্কারক ছিলেন সাদামাটা জীবনযাপনে অভ্যস্ত এই মানুষটি। বলা হয়, বাংলা গদ্যের মুক্তি সূচিত হয়েছিল ক্ষণজন্মা এই বরেণ্য ব্যক্তিত্বের হাতে। শিল্প গুণে গুণান্বিত বাংলা গদ্যের স্রষ্টা বলা হয় তাকে।
তার লেখা বিখ্যাত কয়েকটি গ্রন্থ হলো : শকুন্তলা, বেতালপঞ্চবিংশতি, সীতার বনবাস, ভ্রান্তিবিলাস (শেকসপিয়রের ‘কমেডি অব এররস’-এর বাংলা অনুবাদ), বর্ণ পরিচয় (১ম ও ২য় ভাগ), কথামালা (ঈশপের গল্পের বাংলা অনুবাদ), হিতোপদেশ, বিষ্ণুপুরাণ, মহাভারত, আখ্যানমঞ্জরী, ভট্টিকাব্য, ঋতুসংহার ও বেণীসংহার থেকে বঙ্গানুবাদ ইত্যাদি। তিনি যুক্ত ছিলেন পত্র-পত্রিকা সম্পাদনা ও পরিচালনার সঙ্গেও। এক্ষেত্রে পালন করেছেন জোরালো ভূমিকা। ‘সর্ব্বশুভকরী পত্রিকা’, ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’, ‘সোমপ্রকাশ’ এবং ইংরেজি ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’-এর মতো পত্রিকা সেইকালে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে নতুন এক জগতের উন্মোচন ঘটায়। এই অধ্যায়ের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন বিদ্যাসাগর। তাকে অভিহিত করা হয় বাংলা গদ্যের প্রথম যথার্থ শিল্পী হিসেবে। তিনিই প্রথম দেখালেন যে গদ্যেরও নিজস্ব ছন্দ লাবণ্য আছে। বাংলা গদ্যে যথাযথ যতিচিহ্নের প্রয়োগ ও ব্যবহারের যে কৃতিত্ব, সেটা তারই।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে ১৮৪১ খ্রিস্টাব্দে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগে হেড পণ্ডিত পদে নিযুক্ত করা হয়। এখানে শিক্ষকতা করেন পাঁচ বছরেরও বেশি। তারপর চলে যান সংস্কৃত কলেজে। সেই প্রতিষ্ঠানে সহকারী সম্পাদক পদে যোগ দেন। সেখানে বেশি দিন থাকেননি। কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতবিরোধ হয়। সংস্কৃত শিক্ষার ব্যাপারে তিনি সংস্কার করতে প্রয়াসী হয়েছিলেন। তার প্রস্তাব সংস্কৃত কলেজের কর্তাব্যক্তিরা প্রত্যাখ্যান করেন। ক্ষুব্ধ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর পদত্যাগ করেন। আবার ফিরে যান ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে। এবারের পদ সাহিত্যের অধ্যাপক। সংস্কৃত কলেজের শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার ও পুনর্গঠনের ব্যাপারে তাকে অবাধ সুযোগ দিতে হবে, এই শর্ত দিয়েছিলেন তিনি। সেই শর্ত পূরণ করা হয়। ফলত, সংস্কৃত কলেজের শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কার করা হয়। অবশ্য শিক্ষণীয় একটি বিষয় হিসেবে ইংরেজিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরের বছর ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন তিনি।
জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চায় ভীষণ পিছিয়ে থাকা স্বদেশে জনশিক্ষা বিস্তার ছিল তার সর্বক্ষণের ধ্যান জ্ঞান, স্বপ্ন। গভীর আগ্রহ, উৎসাহ এবং অঙ্গীকার ছিল এই বিষয়ে। সেটা লক্ষ্য করে ভারতের তৎকালীন ছোট লাট ফ্রেডারিক হ্যালিডে তাকে দক্ষিণাঞ্চলের স্কুলসমূহের বিশেষ পরিদর্শক হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করেন। বিদ্যাসাগর এই দায়িত্ব লাভের পর ২০টি মডেল স্কুল ও ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। অসম্ভব স্বাধীনচেতা ও আত্মমর্যাদা জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ ছিলেন তিনি। আবার তার মতবিরোধ দেখা দেয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। স্বেচ্ছায় অবসর নিলেন। সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ ও অন্যসব সরকারি দায়িত্ব থেকে। তখন অধ্যক্ষের বেতন ছিল মাসিক ৫০০ টাকা।
অবসর নিলে কী? নিষ্কর্মা নিশ্চুপ থাকবার মতো লোক নন তিনি। ক্যালকাটা ট্রেনিং স্কুল স্থাপনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করলেন। নেতৃত্ব দেন বিধবা বিবাহ আন্দোলনে। সেই কালে হিন্দু বিধবাদের বিয়ে হতো না। নিষিদ্ধ ছিল রীতিমতো। সমাজ ছিল কুসংস্কারে আচ্ছন্ন, অত্যন্ত গোঁড়া ও রক্ষণশীল। বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহের পক্ষে শাস্ত্রের প্রমাণাদি উপস্থাপন করে একটি পুস্তিকা লেখেন। সেটির নাম দেন ‘বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব’। তখন চলছে ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দ। হিন্দু রক্ষণশীল সমাজ তীব্র বিরোধিতা করল এই আন্দোলনের। প্রতি উত্তরে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর দ্বিতীয় পুস্তক প্রকাশ করেন। বিধবা বিবাহ আইন পাসের জন্য ব্রিটিশ সরকারের কাছে আবেদন করেন তিনি। এই আবেদনপত্রের সঙ্গে যুক্ত করে দেয়া হয়েছিল আইনের একটি খসড়াও। সৌভাগ্যক্রমে গভর্নর জেনারেলের সম্মতিক্রমে বিধবা বিবাহের পক্ষে আইন পাস হলো। প্রথম বিধবা বিবাহ করেন সংস্কৃত কলেজের সাহিত্যের অধ্যাপক শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারতœ। বিদ্যাসাগর নিজে এই বিবাহের তত্ত্বাবধান করেন। নিজের ছেলে নারায়ণচন্দ্র এক বালবিধবাকে বিয়ে করলে পিতা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ব্রত সার্থকতা ও সাফল্য পায়। বহুবিবাহ রোধের জন্যও তিনি অকুতোভয় আন্দোলন করেন। দান দাক্ষিণ্যের জন্য তার খ্যাতি ছিল কিংবদন্তিতুল্য। সব সময় দাঁড়াতেন দুঃখী-নিপীড়িত মানুষের পাশে। কবি, লেখক, শিল্পীদের বিপদ-আপদে ব্যাকুল হয়ে উঠতেন। তাদের সমস্যা সমাধানের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তেন। বাংলা সাহিত্যের আরেক ক্ষণজন্মা প্রতিভা ছিলেন কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। প্রবাসে থাকাকালে দুঃসহ গরিবিতে জর্জরিত হয়ে পড়েছিলেন এই কবি। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাকে অকাতরে অকৃপণভাবে অর্থসহায়তা দিয়েছেন। চরম দারিদ্র্য থেকে উদ্ধার করেছেন মাইকেলকে। মনীষী ঈশ্বরচন্দ্র সম্পর্কে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘দয়া নহে, বিদ্যা নহে, ঈশ্বরচন্দ্রের চরিত্রের প্রধান গৌরব ছিল তাঁহার অজেয় পৌরুষ, তাঁহার আশ্চর্য মনুষ্যত্ব।’ মাইকেল মধুসূদন দত্ত বলেছেন তার সম্পর্কে, ‘প্রতিভা ও বৈদগ্ধ্যে তিনি ছিলেন প্রাচীন ঋষিদের মতো, কর্মোদ্যমে ইংরেজের মতো এবং হৃদয়বত্তায় বাঙালি জননীর মতো।’ আমরা জানি, দানশীলতার কারণে তাকে লোকে বলত ‘দয়ার সাগর’।
বিদ্যাসাগরকে বাংলার গভর্নর কর্তৃক সম্মাননালিপি প্রদান করা হয় ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে। ভারত সরকার তাকে সিআইই উপাধিতে ভূষিত করে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মৃত্যু হয় ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দের ২৯ জুলাই। তার অসামান্য কীর্তি আমাদের ঐতিহ্য ও সম্পদ। বাঙালি জাতি তার জন্য গর্বিত।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের উক্তি
ফলবতী বৃক্ষ নত হয়, নত হয় গুণীজন, নত হয় না শুধু শুষ্ক বৃক্ষ আর মূর্খরা।
মাতা পিতার সেবাই শ্রেষ্ঠ পূজা এবং সন্তানের সর্বপ্রধান ও পবিত্রতম কর্তব্য।
পরের উপকার করতে গেলে মাঝে মধ্যে ঠকতে হয়। ঠকানোর চেয়ে ঠকা ভালো।
সেই সাহিত্যকে আমরা সঠিক সাহিত্য বলব, যা মানুষের মধ্যে শুভবোধ জাগ্রত করবে।
পরের মন্দচেষ্টায় ফাঁদ পাতিলে, আপনাকেই সেই ফাঁদে পড়িতে হয়।
নারী জাতি কখনো দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ হিসাবে বিবেচিত, এমন হলে সমাজের সার্বিক উন্নতি কখনো সম্ভব নয়।
দরিদ্র ব্যক্তিদের অভুক্ত রেখে মাটির প্রতিমাকে ষোড়শোপচারে পূজা করাকে আমি যথার্থ মনে করি না।
পরিশ্রম না করিলে স্বাস্থ্যরক্ষা ও সুখলাভ হয় না। যে ব্যক্তি শ্রম করে, সে কখনো কষ্ট পায় না।
যে ব্যক্তি অন্যের কাজে আসে না, সে আসলে মানুষ নয়।
কাহারও উপর দয়া প্রকাশ করিলে, তাহা প্রায় নিষ্ফল হয় না।
আমাদের সমাজ নানা ধরনের কুসংস্কারে পরিপূর্ণ। কুসংস্কারমুক্ত সমাজ গঠনের জন্য সকল বুদ্ধিজীবীর কায়িক এবং মানসিক পরিশ্রম করা উচিত। যাহার যে অবস্থা, সে যদি তাহাতেই সন্তুষ্ট থাকে, তাহা হইলে তাহাকে কাহারও নিকট অপদস্থ ও অপমানিত হইতে হয় না।
মনের ঐক্যই প্রণয়ের মূল।
চোখের সামনে মানুষ অনাহারে মরবে, মহামারিতে উজাড় হয়ে যাবে, আর দেশের মানুষ চোখ বুজে ভগবান ভগবান করবে- এমন ভগবৎ প্রেম আমার নেই, আমার ভগবান আছে মাটির পৃথিবীতে, স্বর্গ চাই না, মোক্ষ চাই না, বারে বারে ফিরে আসি তাই বাংলায়।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর : ২৬ সেপ্টেম্বর, ১৮২০-২৯ জুলাই, ১৮৯১
