চুরি ও চোর
প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
চুরি একটা অনৈতিক কাজ। সোজা কথায়, জঘন্যতম সামাজিক অপরাধ। সব বয়সের মানুষ এটা জানে। আর যারা চুরি করে তারা জেনে, শুনে এবং বুঝে চুরি করে। ছোট-বড় চুরির পরিকল্পনা তাদের থাকে। যারা চুরি করে তাদের চোর বলা হয়। যুগ যুগ ধরে একটা শ্রেণির মানুষ চুরি করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। কেউ কেউ অগাধ ধন-সম্পদের মালিক হচ্ছে, অভিজাত হচ্ছে। হচ্ছে প্রতাপ ও প্রভাবশালী। কেউবা আবার খেয়েপরে বেঁচে যাচ্ছে, থাকছে কোনো রকম। এই শ্রেণির চোরদের ছ্যাঁচড়া চোর বলে। দু-একটা চড়-থাপ্পড় খেয়ে তারা আবার চুরি করে। কিন্তু বড়সড় চোররা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। যা হোক সামাজিক অপরাধ হলেও চুরি সমাজে একটা পেশায় পরিণত হয়েছে। রীতিমতো পরিণত ও প্রতিষ্ঠিত পেশা। এই পেশায় সমাজে অবস্থানরত উঁচু পর্যায়ের শিক্ষিত মানুষজন যেমন থাকে, তেমন থাকে নিচু অবস্থানের অশিক্ষিত ও নিরক্ষর মানুষজন এবং এই পেশায় লিপ্তদের সংখ্যা কিন্তু কম নয়, বরং বেশি। বেশি হওয়ার কারণ হলো, বিভিন্ন তথা অন্য পেশার পেশায় নিয়োজিত মানুষজনও বহুদিন ধরে চুরি পেশাকে সহপেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। সোজা কথায়, যেখানেই তারা কর্মরত থাকুক না কেন, তারা চুরিচামারি করতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, চুরি করে। অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের চেয়ে চুরি কাজে ব্যস্ত থাকে, থাকছে। চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সরকারি আমলা ইত্যাদি নানাবিধ পেশার কতিপয় লোকজনের ভেতর চুরির প্রবণতা দেখা যায়, যেটাকে দুর্নীতি বলা হয়। চোর না বলে তাদের দুর্নীতিবাজ বলা হয়ে থাকে। নীতিবহির্ভূত লোকজনের মধ্যেই সাধারণত চুরির প্রবণতা দেখা যায়।
চুরি হরেক রকম। গরু চুরি, গাছ চুরি, টাকা চুরি, অফিসিয়াল ফাইল চুরি, কথা চুরি, খেতাব চুরি, পদ চুরি, মেধা চুরি ইত্যাদি থেকে শুরু করে কৃতিত্ব চুরি হয়ে থাকে। এসব চুরি হয় নানা কৌশলে ও পদ্ধতিতে। গ্রিল কেটে বাসাবাড়ির গরু চুরি করা থেকে শুরু করে ফাইল কেটে বড় বড় প্রকল্প থেকে অর্থ চুরি, দুর্যোগে বরাদ্দ চুরি, রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কার থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ চুরি, চাকরি পাইয়ে দেয়ার নামে আস্থা ও বিশ্বাস চুরি- কত রকমই না চুরি রয়েছে সমাজে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ভাষণে সম্ভবত আক্ষেপ করে বলেছিলেন, পাকিস্তানিরা সব নিয়ে গেছে, শুধু কিছু চোর রেখে গেছে। তার শ্রমিক ও কৃষকরা কখনোই দুর্নীতিবাজ নয়, সেটাও উল্লেখ করে গেছেন। তিনি বুঝেছিলেন কিছু মানুষের অসততায়, অনৈতিকতার বলি হচ্ছে গোটা সমাজ, গোটা দেশ। ব্যক্তি তার ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণও ব্যক্তির প্রাপ্যের ভেতর কর্তৃপক্ষের চুরির হাত ঢুকিয়ে দেয়া।
তবে চোর সম্প্রদায় দিন দিন যথেষ্ট কৌশল অবলম্বন করে, বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়। গ্রিল কাটার সরঞ্জাম নিয়ে ঘোরাফেরা করে না। করার প্রয়োজন পড়ে না। বড়সড় চোররা বুদ্ধি খাটিয়েই বিভিন্ন ধরনের গ্রিল কেটে চুরি করে, যা অনেক সময় দৃশ্যমান হয়ে ওঠে না। খবর ফাঁস হলে বলা হয়, অনিয়ম বা দুর্নীতি পরিলক্ষিত হয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়, কিন্তু ভুলেও এদের চোর বলা হয় না। সমাজ কাউকে চোর বলতে ভুলে গেছে। কিংবা নারাজ। একটা কথা, সমাজ কিন্তু চোর হতে পারে না, চুরি করে না। সমাজের কতিপয় মানুষ চুরি করে চোর হয়, আর সমাজকে বিভ্রান্ত ও কণ্টকপূর্ণ করে তোলে।
হতাশার বিষয় হলো, এই শ্রেণির মানুষই বেশি করে বড় বড় নীতির কথা বলে, রচনা করে। তাদের চালচলন, জীবনযাপন অন্যকে সম্মোহিত করে, আস্থা জাগায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের লোভনীয় সুযোগ-সুবিধা অবৈধ পন্থায় ভোগ করে আরেক ধরনের চোরে রূপান্তরিত হয়। সেটা কেমন? জবাব হলো, যেটা তার প্রাপ্য নয়, সেটাই সে নিল এবং জোর করে। এখানে রাজনৈতিক চুরিবোধ কাজ করে। এ দেশে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ধর্ষণ, হত্যা থেকে শুরু করে নিরাপদে সব সুবিধাভোগ করার, চুরি করার একটা অলিখিত সংস্কৃতি চালু রয়েছে। রাজনীতি করার সৎ উদ্দেশ্য খুবই কম রাজনীতিকদের মধ্যে। ক্ষমতা কি চুরি হয়? হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার মধ্য দিয়ে ক্ষমতা চুরির সংস্কৃতি চালু হয়েছিল। যা হোক, একটা শ্রেণির মানুষ সবকিছুর ভেতরই চুরি করার পাঁয়তারা করে। ফলে সামাজিক অবক্ষয়ের সীমা দিন দিন দীর্ঘতর হচ্ছে। যারা সমাজে ও রাষ্ট্রে স্বস্তি ও নিরাপত্তার কথা ভাবছে, তারা সম্ভবত বুকিশ চিন্তায় মগ্ন। অবক্ষয়ের শেকড়ের সন্ধানে নেই। এরা রেফারেন্স বুক বগলদাবা করে আতলামী করে বলে অনেকেরই ধারণা।
একজন অভিমান করে বলছিল, সে একটা কাজ করেছে। কিন্তু সেটা আরেকজন তার নামে প্রচার করেছে। যে প্রচার করেছে সে তার বয়োজ্যেষ্ঠ ও প্রতিষ্ঠানের বড় মাথা। ইদানীং কৃতিত্ব চুরির প্রবণতা বেড়েছে। অন্যের কৃতিত্বের জায়গায় নিজের নাম খোদাই করে রাখার চলটাও চরম চুরি বৈকি। অভিমানী বলছিল, লোকটার কি চক্ষুলজ্জা নেই। সাধারণত চোরদের কোনো ধরনের চক্ষুলজ্জা নেই। চক্ষুলজ্জা থাকে না। এমনকি এদের শরীরের চামড়া মোটা ও প্রশ্বস্ত। সহজেই কোনো কিছু গায়ে লাগে না। তথ্য গোপন আরেক ধরনের চুরি, যেটা রাষ্ট্র ও সমাজের বড় ক্ষতিসাধন করে। অনেকে মনে করে, তার চেয়েও বড় চুরি হলো ব্যক্তির তথ্য প্রকাশের ক্ষমতা হরণ করার অধিকার কেড়ে নেয়া।
জমি চোররা কম যায় না। নিরীহ মানুষের জমি চুরি করে এরা মস্তবড় ডেভেলপার হয়ে ওঠে। যত রিয়েল এস্টেট রয়েছে, তার অধিকাংশেরই রয়েছে অনৈতিক ও অবৈধভাবে জমি দখল বা চুরির ইতিহাস। এছাড়া বিত্তবানদের ইতিহাস নেড়েচেড়ে দেখলে ভয়ংকর চুরির ধারাবাহিক ইতিহাস থলে থেকে বেরিয়ে আসবে। চোরদের সিন্ডিকেট আছে। এরা রাজনীতিকেও নিয়ন্ত্রিত করে। রাজনীতির খোরাক ‘মানি’ জোগান দিতে হয় বলে শুনেছি। যা হোক, এতসব চোরের মাঝে দেশ কীভাবে শুদ্ধ হবে? বুলিসর্বস্ব সমাজে পরিবর্তন আনা কঠিন। ব্যক্তির ভেতর সততা না জাগলে তার দ্বারা সৎ কর্ম আশা করা ঠিক নয়। তবে অধিকাংশ ব্যক্তিই মনে করে যে, পেট ও মনের ক্ষুধাকে বেশি দিন রাখতে নেই। ক্ষুধা নিবারণ ব্যক্তির এক ধরনের মৌলিক আচরণ। ব্যক্তি যে কোনো উপায়ে তার ক্ষুধা নিবারণ করবেই। সে ন্যায্য মজুরি না পেলেও করবে। প্রয়োজনে সে বিপদগামী হয়ে বাড়তি আয় করবে। অবশ্য যেসব হচ্ছে তা এমন চাহিদা পূরণে যতটুকু তার অধিক হলো, বাড়তি ধনসম্পদের মালিক হওয়ার বাসনা। দেশে প্রতি বছর যে পরিমাণ কোটিপতির সংখ্যা পয়দা হচ্ছে, তার সুষ্ঠু পর্যবেক্ষণ করা হলে চুরির কৌশল ও চোর সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেত। সেই সম্ভাবনা তাদের আছে কিনা, তা বলা সহজ নয়। কারণ অনেক ঘটনা ঘটলেও তার কারণ সবাই জানতে পারে না।
পরিশেষে বলব, কথায় ও কাজে, চিন্তা-চেতনায় চুরিবাদকে পরিহার করতে হবে। চুরির যে সংস্কৃতি সমাজের প্রতিটি স্তরে, তা নির্মূল করা না গেলে বর্তমান ও আগামী প্রজন্ম সুস্থ মানসিকতায় বেড়ে উঠবে না। কোনো সশস্ত্র বাহিনী দিয়ে এদের নির্মূল করা সম্ভব নয়। চুরিবাদকে নির্মূল করতে বিবেক ও নৈতিকতার প্রয়োজন। একজন কৌতূহল নিয়ে জানতে চাইল, এই দুটি জিনিস কোথায় পাওয়া যায়? জবাব হলো, ব্যক্তির ভেতরই থাকে। তাদের জাগতে দিতে হয়। দিনশেষে প্রশ্ন জাগে, আমিও একজন চোর কিনা?
স্বপ্না রেজা : কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক।
swapna.reza@gmail.com
