নৌপুলিশের অভিযান : ৩৫ লাখ মিটার জাল জব্দ

আগের সংবাদ

পঞ্চম দফায়ও সারাদেশে ব্যাপক সহিংসতা > ভোটে ঝরল আরো ১১ প্রাণ : পুলিশের গাড়িতে আগুন, আহত শতাধিক, আটক অর্ধশত

পরের সংবাদ

নিতুর গ্রাম দেখা

প্রকাশিত: জানুয়ারি ৫, ২০২২ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ৫, ২০২২ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

– মা, তুমি যে বলেছিলে নিতু আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এলে খুব মজা হবে? নিতু তো কথাই বলছে না।
– সে তো এ বাড়িতে এবারই প্রথম এলো মামনি। নতুন জায়গা, তারওপর সে শহরে থাকে। আজকের দিনটা কাটুক, দেখবে কাল থেকে ঠিক কথা বলবে।
নিতু এই প্রথমবার গ্রামে এলো বেড়াতে। ঠিক প্রথমবার হয়তো নয়। মা-বাবার কাছে শুনেছে, ছবিতেও দেখেছে ওর জন্মের পর দাদা-দাদিকে দেখানোর জন্য ওকে একবার নিয়ে এসেছিল গ্রামে। দাদা-দাদি বেঁচে থাকতে আরো এক দুবার এসেছিল, তবে নিতুর সেসব কিছুই মনে নেই। অর্থাৎ জ্ঞান হওয়ার পর এটাই তার প্রথম গ্রামে আসা। শীতকালে গ্রাম দেখতে কেমন লাগে সেটা দেখাতেই বাবা-মা এবার তাকে গ্রামে নিয়ে এসেছে। নিতু ঢাকায় একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ক্লাস ফাইভে পড়ে। স্কুলে শীতকালীন ছুটি চলছে। নিতুর ইচ্ছে ছিল কক্সবাজার যাওয়ার। কিন্তু বাবা রাজি হলেন না। তার বদলে গ্রামে নিয়ে এলেন। নিতুর এমনিতেই গ্রাম পছন্দ নয়। সে সবসময় শহরে থেকেছে। খুবই আরাম আয়েশে জীবন কাটায় সে। দিনের মধ্যে আট-নয় ঘণ্টা ইন্টারনেটেই থাকে। গ্রামে তো নেটওয়ার্কই ঠিকমতো থাকে না। এবার ছুটিটা নষ্ট হবে ভেবে বেড়াতে এসেও নিতুর মন খারাপ লাগছে।
গ্রামের বাড়িটা ইটের তৈরি একতলা দালান হলেও উপরে টিনের ছাউনি দেয়া। আগে বাড়িটা পুরোটাই টিনের ছিল। এখানে বিদ্যুৎ সংযোগ আছে তবে সেটা নিরবচ্ছিন্ন নয়। প্রায়ই সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ চলে যায় দু-তিন ঘণ্টার জন্য। গ্রামের মানুষ তখন হারিকেন বা কুপি জ্বালায়। নিতুর মা একটা চার্জার লাইট নিয়ে এসেছে। নিতু গরম পানি ছাড়া গোসল করতে পারে না। গ্রামের মানুষ এই শীতেও গোসল করে পুকুরে অথবা টিউবওয়েলে। নিতু নরম বিছানায় মোটা কম্বল গায়ে দিয়ে ঘুমিয়ে অভ্যস্ত। এ বাড়িতে শুধু লেপ আছে, কোনো কম্বল নেই। নিতুর মা নিতুর জন্য অনেক গরম কাপড় এনেছে। একেবারে মাথার টুপি থেকে শুরু করে পায়ের মোজা পর্যন্ত সব। এ বাড়িতে নিতুর ছোট চাচা-চাচি আর প্রায় সমবয়সি একজন চাচাত বোন থাকে। চাচাত ভাই সিলেটের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। তাই তাকে হলেই থাকতে হয়। চাচাত বোনটির নাম রিমঝিম। সে খুব হাসিখুশি আর মিশুকও। তবুও নিতুর কিছুতেই এখানে মন বসছে না।
রাতে নিতু রিমঝিমের সঙ্গেই ঘুমিয়েছে। অন্যদিন সে একটু বেলা পর্যন্ত ঘুমায়। আজ চোখে নরম রোদ পড়তেই ঘুম ভেঙে গেল তার। ঘড়ি হাতে নিয়ে দেখল ৭টা বাজে। রিমঝিম পাশে নেই দেখে নিতু খাট থেকে নেমে জানালার কাছে এসে দাঁড়াল। দূরের অংশটুকু এখনো কুয়াশায় ঢেকে আছে। কিছু দেখা যাচ্ছে না। তবে রোদ উঠাতে কুয়াশা কাটতে শুরু করেছে। এখান থেকে গ্রামের পথটা দেখা যায়। দুপাশে বড় বড় গাছ আর তার নিচ দিয়ে একটা লাল রঙের পথ চলে গেছে বহুদূর পর্যন্ত। এমন দৃশ্যে নিতুর মনটা খুব ভালো হয়ে গেল। নিতুর রুমের পর্দা সরালে সে পাশের বাড়ির জানালা ছাড়া কিছু দেখতে পায় না।
ঠিক অমলের দেখা গ্রামটার মতো লাগছে না তাই না? গলাটা শুনে পিছন ফিরে তাকাতেই নিতু দেখল রিমঝিম পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। নিতু জিজ্ঞেস করল- অমল কে?
-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ডাকঘর নাটকটা পড়নি? নিতু মাথা নেড়ে না বলল।
– আমার কাছে বইটা আছে। তোমাকে পড়তে দেব।
– আমি বাংলা বই ভালো পড়তে পারি না।
– ঠিক আছে আমি তোমাকে পড়ে শোনাব। এখন চল, মা কুমড়ো ফুল আর ফুলকপির বড়া ভেজেছে। খেতে ডাকছে তোমাকে। ঘি ভাতের সাথে গরম গরম খেতে ভীষণ মজা।
নিতু উঠানে গিয়ে দেখে রান্নাঘরের সামনে মাটির চুলায় ছোট চাচি বড়া ভাজছে। বাবা-মা, ছোট চাচা সবাই একটা করে মোড়া পেতে বসে গরম গরম বড়া আর মুড়ি খাচ্ছে। নিতুকে দেখে তার মা বলল- এটা তোমার দাদির তৈরি চুলা। এখন তো সবাই সিলিন্ডার গ্যাসে রাঁধে। আজ আমাদের জন্য তোমার চাচি মাটির চুলায় রান্না করছে যাতে আমাদের মনে হয় আমরা পিকনিক করতে এসেছি।
ফুলকপি নিতুর খুব প্রিয়। বড়াগুলো খেতে সত্যিই খুব মজা হয়েছে। কাল পর্যন্ত গ্রামে আসার জন্য নিতু মনে মনে খুব বিরক্ত ছিল। এখন আস্তে আস্তে তার মনটা খুব ভালো লাগছে। এ এক অন্যরকমের অভিজ্ঞতা। এর স্বাদ সে আগে কখনো পায়নি। ছোট চাচা বলল- একটু পর নদীতে মাছ ধরতে যাব। তুমি মাছভাজা খাও তো নিতুমা?
নিতু মাছ পছন্দ করে না। আঁশটে গন্ধ লাগে। সে বলল- শুধু চিংড়ি মাছ খাই।
ছোট চাচা হাসতে হাসতে বলল- ঠিক আছে তোমার জন্য চিংড়ি মাছই ধরব আজ।
মাছ ধরতে যাওয়ার সময় ছোট চাচা রিমঝিম আর নিতুকেও নিয়ে গেল তার সাথে। যাবার সময় ছোট চাচি একটা কাপড়ের ব্যাগে কি যেন ভরে নিতুর হাতে দিয়ে দিল। আজ শীত অনেক বেশি। রোদ উঠলেও কুয়াশা পুরোপুরি কাটেনি। তারা হেঁটে যাচ্ছে লাল রঙের পথ ধরে নদীর দিকে। নিতু কথা বলছে আর তার মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে। রিমঝিম বলল- দাঁড়াও নিতু, একটা মজার জিনিস দেখাই তোমাকে।
এরপর রিমঝিম একটা গাছ থেকে বড় সাইজের পাতা ছিঁড়ে সেটাকে সিগারেটের মতো মুড়িয়ে মুখের কাছে নিয়ে সিগারেট টানার মতো করে ধোঁয়া ছাড়ল। নিতুর সেটা দেখে মজা লাগলেও সে বলল- সিগারেট ভালো জিনিস নয়। ওটা খেলে অসুখ হয়।
রিমঝিম বলল- আমি তো জানি সিগারেট খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ। আমি তো শুধু অভিনয় করলাম। নাটক সিনেমায় নায়করা যেমন করে অভিনয় করে তেমন।
একথা শুনে নিতু হেসে ফেলল। ওর দেখাদেখি রিমঝিমও হাসতে শুরু করল। কাল পর্যন্ত নিতুকে তার খুব অহংকারী মনে হচ্ছিল। আজ সত্যি সত্যি বোন বোন মনে হচ্ছে।
যেতে যেতে নিতু দেখল, রিমঝিম একবার ভ্যানওয়ালাকে, একবার খেজুরের রস বিক্রেতাকে দেখে বলছে, চাচা ভালো আছেন? আরেকবার গোবর দিয়ে ঘুটে দিচ্ছে এমন একজন মহিলাকে দেখে জিজ্ঞেস করছে, চাচি কেমন আছো? তারাও এমনভাবে উত্তর দিচ্ছে যেন রিমঝিম তাদের আত্মীয়।
নিতু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল- গ্রামের সবাই তোমাকে চেনে নাকি?
রিমঝিম বলল- কেন চিনবে না। গ্রামটা তো অনেক ছোট। আর আমাকে তো সবাই ছোটবেলা থেকেই দেখছে। বেশিরভাগ মানুষই চেনে।
রিমঝিম একটা টং দোকানের সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেল। একজন জীর্ণকায় শরীরের মহিলা এই শীতের মধ্যেও একটা সামান্য সুতি শাড়ি পেঁচিয়ে বসে আছে। পাশে তাদেরই বয়সি একটা মেয়ে একটা চাদর গায়ে দিয়ে বসা। মহিলাটি রিমঝিমকে দেখে বলল- কেমন আছ মা?
রিমঝিম বলল- ভালো আছি চাচি। তারপর ছোট চাচির দেয়া কাপড়ের প্যাকেটটা তার হাতে দিয়ে বলল- এটা হাসিকে পরিয়ে দাও। আর হাসির গায়ের চাদরটা নিজে পরো। ঠাণ্ডা লেগে যাবে যে।
ওখান থেকে সরে আসতেই নিতু জিজ্ঞেস করল, হাসি নামের মেয়েটির গায়ের সোয়েটারটা তোমার না?
রিমঝিম বলল- হ্যাঁ। মা প্রতি বছর আমাকে দুটো করে নতুন সোয়েটার কিনে দেয়। আর পুরনো সোয়েটার দুটো যাদের একেবারেই শীতবস্ত্র নেই আমি তাদের দেই। শীত তো মাত্র দুমাস থাকে। দুটো সোয়েটারেই আমার হয়ে যায়।
দুপুরে নদী থেকে ধরা বড় বড় গলদা চিংড়ি আর ছোট মাছ ভাজা হলো। নিতু কোনদিন ছোট মাছ খায়নি। সে কড়কড়ে মাছভাজাগুলো কাঁটাসহ চিবিয়ে খেলো। রাতে ছোট চাচি ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা আরো কতরকম পিঠা বানিয়ে খাওয়াল যে নিতু ভাতই খেতে পারল না। আরো রাতে আগুন পোহাতে পোহাতে রিমঝিম তাকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ডাকঘর নাটকটা পড়ে শোনাল। নিতু হঠাৎ খেয়াল করল এই একটা দিন তার সারাদিনে ইন্টারনেট ব্যবহার করার কথা একবারও মনে পড়ল না। নিতু তার মাকে গিয়ে বলল আরো ক’টা দিন সে এখানে থাকতে চায়। নিতু আরেকটা বিষয় মনে মনে ভেবে রেখেছে। এটা সে ঢাকায় ফিরে বলবে। তার প্রায় এক আলমারি ভর্তি শীতের কাপড় আছে, যার অনেকগুলোই সে এখন আর পরে না। এই শীতবস্ত্রগুলো কয়েকজন শীতার্ত শিশুর অন্তত কাজে লাগুক।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়