ফখরুল
বিএনপিকে বাদ দিয়ে রাজনীতি করা এত সহজ হবে না
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি: সংগৃহীত
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে বিএনপির অংশগ্রহণ ছিল সর্বাত্মক ও গুরুত্বপূর্ণ। এই দলের শেকড় প্রোতিত রয়েছে জনগণের হৃদয়ের গভীরে। তাই বিএনপিকে বাদ দিয়ে এদেশে রাজনীতি করা এত সহজ হবে না- এমন মন্তব্য বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। গতকাল রবিবার ভোরের কাগজকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রোডম্যাপ, সংস্কার না নির্বাচন কোনটা আগে? সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পর্ক, ভারতের সঙ্গে আগামীর সম্পর্ক কেমন হবে? ৩১ দফা নিয়ে পরিকল্পনা, জাতীয় সরকার কবে এবং কাদের নিয়ে, ছাত্রনেতাদের নতুন দল গঠন, আওয়ামী লীগের ফের রাজনীতিতে ফেরাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে কথা বলেন তিনি। কথোপকথনের বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর আকারে তুলে ধরা হলো। বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান অফিসে বসে মির্জা ফখরুলের সাক্ষাৎকারটি নেন ভোরের কাগজের রিপোর্টার রুমানা জামান।
ভোরের কাগজ : গত কয়েকদিন আগেই তো চিকিৎসা শেষ করে সিঙ্গাপুর থেকে দেশে ফিরেছেন। এখন শারীরিক অবস্থা কেমন?
মির্জা ফখরুল : অসুখ-বিসুখ খুব একটা নেই। আগের চেয়ে ভালো আছি।
ভোরের কাগজ : পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আগের চেয়ে স্বস্তিতে আছেন কিনা?
মির্জা ফখরুল : নিঃসন্দেহে আগের চেয়ে স্বস্তি এবং শান্তিতে আছি। এখন অন্তত রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারি। কেবল আমি একা না, বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ; যারা গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে অবিরাম ত্যাগ স্বীকার করেছেন- তারা সবাই এখন স্বাধীন। সবাই স্বস্তিতে দিন পার করছেন।
ভোরের কাগজ : অন্তর্বর্তী সরকার দেশ চালাচ্ছে। এই সরকার রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কারের পর নির্বাচন দেয়ার কথা বলছে। নির্বাচনের আগে এসব সংস্কার সম্ভব কিনা?
মির্জা ফখরুল : সংস্কার তো অবশ্যই করতে হবে। কারণ, দেশের নির্বাচনী প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে একেবারে ধ্বংস করে ফেলেছে আওয়ামী লীগ সরকার। এগুলো আর কাজই করছে না। ‘নন-ফাংশনাল’ হয়ে গেছে। এগুলোকে ফাংশনাল করতে না পারলে নির্বাচনও করা যাবে না; এমনকি দেশও চালানো যাবে না। বেসিক ফান্ডামেন্টাল ইস্যুগুলোকে সংস্কার করতেই হবে। তবে এই সংস্কারগুলো করার জন্য যেটা খুব জরুরি তা হলো- অবশ্যই রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে করতে হবে। সংবিধান বিশেষজ্ঞ যারা আছেন তাদের পারমর্শ এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া জুডিশিয়ারি, ব্যবসায়িক স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গে পালাক্রমে বসে আলাপ করতে হবে। এসব করতে অবশ্যই সময় লাগবে। আমার মনে হয় যাদের এই সংস্কারকাজের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তারা খুবই যোগ্য মানুষ। আশা করছি খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই তারা সংস্কারকাজ শেষ করতে পারবেন।
ভোরের কাগজ : সংবিধান সংস্কার যে আলোচনা সামনে এসেছে; এই মুহূর্তে সেটা সম্ভব কিনা?
মির্জা ফখরুল : সংবিধান সংস্কার বা পরিবর্তনের প্রস্তাব আসতে পারে। তবে সংবিধান পরিবর্তনের ক্ষমতা একমাত্র জনগণের। সংসদে এটা পাস হতে পারে। সেই সংসদেই এই প্রথমে প্রস্তাব উঠবে; এর পক্ষে-বিপক্ষে মতামত তৈরি হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মতের ভিত্তিতেই সংবিধান পরিবর্তনের পেক্ষাপট তৈরি হতে পারে। সবচেয়ে বড় হলো- সংস্কার প্রশ্নে জনগণের মতামত সবচেয়ে জরুরি।
ভোরের কাগজ : আপনারা বরারবই বলছেন রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কারের জন্য ‘যৌক্তিক সময়’ দেবেন। এই সময়ের পরিধি কেমন হবে?
মির্জা ফখরুল : এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়ের পরিধি আমি বলতে চাই না। এটা একেবারেই ‘হাইপথেটিক্যাল’ হয়ে যায়। এখানে আলোচনা হবে, ভিন্ন মতামত আসবে এবং সব পক্ষকে এক করে নিয়ে আসতে হবে। সুতারাং সময় তো লাগবেই। ঠিক কতোটুকু লাগবে এটা বলা মুশকিল। তবে সংস্কারগুলোকে শেষ করে নির্বাচন যত দ্রুত করে ফেলা যায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারসহ দেশের জনগণ ও ভবিষ্যতের জন্য ততই মঙ্গল।
ভোরের কাগজ : গত ২৯ আগস্ট সবশেষ প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে আপনারা নির্বাচনকালীন রোডম্যাপ দেয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এখনো রোডম্যাপ আসেনি। এ ব্যাপারে আপনাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কি?
মির্জা ফখরুল : আমরা একটি
রোডম্যাপ চেয়েছিলাম সেটা এখনো পুরোপুরি না দিলেও সরকার কিছুটা দিয়েছে। সংস্কারের কমিটি করে দিয়েছে। ফলে সংস্কারের ব্যাপারে তাদের তাড়া আছে সেটা কিছুটা হলেও পরিষ্কার হয়েছে। তাছাড়া দেশের মানুষ কিন্তু মন থেকে একটা সংস্কার চায়। এটা এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি। কারণ আগের মতো একেবারে তথাকথিতভাবে কাজ হবে সেটা কেউই চায় না। সেক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে আমরা মনে করি, একটা নূন্যতম সময়ের মধ্যে নির্বাচন করে যারা সরকার গঠন করে পার্লামেন্টে আসবেন; তাদের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেয়াটাই সবচেয়ে মঙ্গলজনক। কারণ গণতন্ত্র হচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ব্যবস্থা। সেটাকে অবশ্যই স্বীকৃতি দিতে হবে।
ভোরের কাগজ : জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এই মুহূর্তে বিএনপির সম্পর্ক কেমন?
মির্জা ফখরুল : এই বিষয়ে একটা কথা পরিষ্কার করে বলতে চাই; জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি সম্পূর্ণ দুইটি আলাদা সত্ত্বা। দুটি আলাদা দল। তাদের সঙ্গে এখন বিএনপির জোটও নেই। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী বৃটিশ আমলের দল। পাকিস্তান আমালে ছিল এবং এখনো আছে। আর বিএনপির বয়স ৪৬ বছর। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দল তৈরি করে ১৯ দফা কর্মসূচি দিয়েছেন, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ- এই দর্শনগুলো সামনে নিয়ে এসেছিলেন। আমরা সেখানেই রাজনীতি করছি।
আন্দোলন কিংবা নির্বাচনের জন্য বিভিন্ন দলের সঙ্গে ‘অ্যালায়েন্স’ হয়; এটা সব দেশেই হয়। জামায়াতের সঙ্গেও হয়েছিল। তাই বলে জামায়াত আর বিএনপি এক ‘ব্রাকেট’ করে ফেলাকে আমার ভীষণ উদ্দেশ্য প্রণোদিত মনে হয়। তিনি বলেন, আমি জামায়াত প্রসঙ্গে এর বেশি কিছু বলতে চাই না; কারণ আমি ঐক্যে বিশ্বাস করি। আমি মনে করি বিরেধী দলগুলো ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম করেছে। এ কারণে তাদের সকলের ঐক্যবদ্ধ থাকা উচিত। সেক্ষেত্রে জামায়াত তাদের রাজনৈতিক পলিসি মোতাবেক কীভাবে দল চালাবে, কী ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য দেবে সেটা তাদের বিবেচনা।
ভোরের কাগজ: এই মুহূর্তে বিএনপির সামনে মূল চ্যালেঞ্জ কী?
মির্জা ফখরুল : এই মুহূর্তে আমাদের মূল চ্যালেঞ্জ হলো- একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আদায় করে নেয়া। এ লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে চাই। কারণ, তারা রাষ্ট্রের সংস্কার শেষে একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের দিকে যাবেন এটাই আমাদের একান্ত চাওয়া। পতিত স্বৈরাচার বাংলাদেশের সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এটা আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না। যে কারণে আন্তর্বর্তী সরকারকে সহযোগিতা করা আমাদের মূল দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের টিকিয়ে রাখা এই মুহূর্তে আমাদের প্রধান কাজ। না হলে সংকট আরো বাড়বে। আর যারা পতিত ফ্যাসিবাদ তারা যেন কোনোভাবেই ফিরে আসতে না পারে- এ জন্য আমরা সর্বদা সজাগ থেকে তাদের প্রতিহত করব।
ভোরের কাগজ : বিএনপি ফের রাজপথে ফেরার কথা বলছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্প্রতি তার বক্তব্যে বলেছেন, জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। এই আন্দোলনের ধরন কেমন হবে? কার বিরুদ্ধে হবে এই আন্দোলন?
মির্জা ফখরুল : আন্দোলন কি কেবল বিরুদ্ধেই হয়? আমাদের এবারের আন্দোলন গণতন্ত্রের পক্ষের আন্দোলন। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতেই আমরা আন্দোলন শুরু করেছিলাম। এ কারণে আওয়ামী লীগের বিরেুদ্ধে অজ¯্র লড়াই-সংগ্রাম করতে হয়েছে। এখন পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গণতন্ত্রের পক্ষে দেশে জনমত তৈরি আছে, সেটাকে বাস্তবায়িত করতে আমরা আন্দোলনে রাজপথে সরব থাকব।
ভোরের কাগজ: বিএনপি জাতীয় সরকারের কথা বলছে। এই সরকার কবে এবং কাদের নিয়ে হবে?
মির্জা ফখরুল : আগামীতে যে নির্বাচন হবে, সেখানে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যারা লড়াই করেছে; তাদের মধ্যে যারা পার্লামেন্টে আসবে তাদের সবাইকে নিয়েই জাতীয় সরকার গঠন করা হবে।
ভোরের কাগজ : ৩১ দফা নিয়ে কী পরিকল্পনা? দফায় কোনো সংযোজন-বিয়োজন হবে কিনা?
মির্জা ফখরুল : জিয়াউর রহমানের স্বপ্নের ১৯ দফা এবং খালেদা জিয়ার ভিশন ২০৩০ থেকেই বিএনপির আজকের রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা। এই নিয়ে আমরা সাধারণ মানুষের দ্বারে যাব। হ্যাঁ, অবশ্যই ৩১ দফায় পরিবর্তন আসতে পারে। এটা এক কথায় ‘ওপেন ডোর’। কারো একার মতামত নয়; সবার মতামতের ভিত্তিতে সবাই মিলেই এই রাষ্ট্র পরিবর্তনের ৩১ দফা বাস্তবায়ন করতে চাই।
ভোরের কাগজ : বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক আগামীতে কেমন হবে?
মির্জা ফখরুল : ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কোনো কালেই শত্রæতামূলক বৈরী সম্পর্ক ছিল না। আমরা সব সময় ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব চেয়েছি। তাদের সঙ্গে কাজ করতে চেয়েছি। তবে সমস্যাটা তো তৈরি করেছে ভারত নিজেরাই। তারা একটি ঝুড়ির মধ্যে সব ডিমগুলো রেখে দিয়েছে। ফলে এদেশে একমাত্র আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো বন্ধু আছে বলে দৃশ্যমান হয় না। এখন নতুন করে উদ্যোগ ভারতকেই নিতে হবে। অন্য দলগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক সৃষ্টি করা, বাংলাদেশের জনগণের আস্থা অর্জন করার দায়িত্ব তাদের ওপরই বর্তায়। ভারত আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী; তাদের অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, এটাই বাস্তবতা। এ কারণেই আমরা ভারতের সঙ্গে অত্যন্ত সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক চাই। তবে অবশ্যই নিজের স্বার্থকে অক্ষুণ্ন রেখে, পারস্পরিক মর্যাদার ভিত্তিতে।
ভোরের কাগজ : শেখ হাসিনা ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এমন একটি প্রশ্নবোধক জায়গায় এসে পৌঁছেছে কিনা? শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে দেয়ার বিষয়েও তাদের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত?
মির্জা ফখরুল : শেখ হাসিনা হত্যা মামলায় অভিযুক্ত। এটা দিবালোকের মতো সত্যি, শুধু হত্যা না তাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলায় অভিযুক্ত হতে হবে। কারণ ‘সি ডেস্ট্রয়েড বাংলাদেশ’। দেশের সমস্ত ভ্যালুজ নষ্ট করে ফেলেছে। প্রত্যেকটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে তার নিজের ব্যক্তিগত ও দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। যে জায়গাগুলোকে ঠিক করতে অনেক সময় লাগবে। সে কারণে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো দেয়া হয়েছে তা যথেষ্ট নয়; তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা হওয়া উচিত। সেভাবেই তার বিচার হওয়া উচিত। এই বিচারের মুখোমুখি তাকে হতেই হবে। সেজন্য ভারতে থেকে তিনি যদি মনে করেন তিনি বেঁচে যাবেন; এটা হবে না।
এক্ষেত্রে ভারত যদি মনে করে শেখ হাসিনা তাদের পুরনো বন্ধু এ কারণে তাকে শেল্টার দিয়েছে; সেটা দিতেই পারে। তবে এই সরকারকে চেষ্টা করতে হবে তাকে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করানো। ভারতের উচিত হবে এ ব্যাপারে সহায়তা করা।
ভোরের কাগজ : ক্ষমতায় গেলে বিএনপির সামগ্রিক পররাষ্ট্রনীতি কেমন হবে?
মির্জা ফখরুল : আমাদের পররাষ্ট্রনীতি ঘোষণা করাই আছে। সাবই আমাদের বন্ধু হবে; কেউ আমাদের শত্রæ নয়। যাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে সেটা আরো দৃঢ় হবে। পাশাপাশি আমরা নতুন করে আরো বন্ধু তৈরির চেষ্টা করব।
ভোরের কাগজ : সম্প্রতি শেখ হাসিনার কিছু কল রেকর্ড ফাঁস হয়েছে। সেখানে তিনি দেশে ফেরার কথা বলেছেন, এমনকি দাবি করেছেন তিনি পদত্যাগ করেননি; এখনো দেশের প্রধানমন্ত্রী। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?
মির্জা ফখরুল : আমি এগুলোকে একদমই গুরুত্ব দেই না। এই সোস্যাল মিডিয়া যে কত সত্যকে মিথ্যা, আর মিথ্যাকে সত্য করে তার হিসাব নেই। একেবারেই অপ্রয়োজনীয় ইস্যুগুলোকে সামনে নিয়ে আসে। তবে সবচেয়ে ভালো কাজ হয়েছে ছাত্র আন্দোলনের সময় অত্যন্ত ভালো ভূমিকা পালন করেছে। আমি আশা করব যারা সোস্যাল মিডিয়াতে কাজ করেন; তারা ভালো জিনিসগুলো নিয়ে কাজ করবেন। আর শেখ হাসিনা যদি দেশে ফিরে আসতে চান; তো ভালো কথা। তার আসা উচিত এবং পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া উচিত।
ভোরের কাগজ : ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া কয়েকজন ছাত্রনেতা সম্প্রতি বলেছেন, পুরনো রাজনৈতিক দলের বাইরে মানুষ ভিন্ন একটি রাজনৈতিক দল তরুণদের নেতৃত্বে দেখতে চায়। এখন তারা নতুন দল গঠনের আভাস দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি কি নতুনের সঙ্গে নিজেদের সমন্বয় ঘটাতে পারবে?
মির্জা ফখরুল : আমি একটি রাজনৈতিক দল করি। ‘লিবারেল ডেমোক্র্যাসিতে’ আমার পূর্ণ বিশ্বাস রয়েছে। আমি কোনো বিপ্লবী দল নই। বিপ্লবের রাজনীতিকে আমি আগে বিশ্বাস করেছি; এখন করি না। কারণ আমি এখন গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করি। সুতরাং যে কোনো দলের বা ব্যক্তির সংগঠন গড়ার অধিকার আছে, রাজনীতি করার অধিকার আছে। ছাত্ররা যদি আসতে চায়; তো ওয়েলকাম। তারা আসবেন, এসে রাজনীতি করবেন, জনগণের কাছে যাবেন। জনগণ যদি মনে করেন- হ্যাঁ, তারা যোগ্য; তাদের ভোট দেবেন। তারা নির্বাচিত হবেন। তবে জোর করে কারো ওপর চাপিয়ে দেয়া বা পুরনো-নতুন বলা তো উচিত না। আমরা পুরনো দল বলে আমাদের কেউ বাতিল করে দেবে এটা এত সহজ না।
আমরা জনগণের কাছে যাব; আমাদের জনপ্রিয়তার ওপর ভিত্তি করেই জণগণ আমাদের তাদের প্রতিনিধি হিসেবে গ্রহণ করবে বলে বিশ্বাস। একইভাবে যারা নতুন এসেছে তাদের আমন্ত্রণ জানাব। তবে আমরা আশা করব- জণগণের যে পালস সেটা বুঝেই তারা রাজনীতি করবেন। বাংলাদেশের মানুষ কখানো ভুল করে না। নতুনদের সঙ্গে আমাদের খুব ভালো যোগাযোগ রয়েছে। সেখানে কোনো গ্যাপ নেই। তাছাড়া যখন ছাত্র আন্দোলন হয়; আমরাও তো তাদের সঙ্গে কাজ করেছি। আমরাও রাজপথে ছিলাম, প্রোগ্রাম দিয়েছি। আমরা যথাসম্ভব তাদের সহযোগিতা করেছি। আমাদেরও অনেক লোক মারা গেছে। সেখানে কোনো গ্যাপ নেই।
ভোরের কাগজ : ছাত্রনেতারা আন্দোলনে বিএনপি কিংবা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ভূমিকা নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন তুলছেন। এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী?
মির্জা ফখরুল : এটা একেবারেই অবান্তর। এটা কোনোভাবেই ঠিক না। এই আন্দোলনে রাজনৈতিক দল, ছাত্র-জনতা সবার সমান অংশগ্রহণ ছিল। যারা এই গণঅভ্যুত্থানের কৃতিত্ব নিজেদের ভেতরে ধরে রাখতে চান তারাও সঠিক কথাটা বলেন না। আমরা দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে লড়াই-সংগ্রাম করেছি। আমাদের ত্যাগ তিতিক্ষা কারো চেয়ে কোনো অংশেই কম নেই। আমাদের দেশনেত্রী ৬ বছর জেলে, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ১৮ বছর ধরে দেশের বাইরে। বিএনপির এমন কোনো স্তরের নেতা নেই যার বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা নেই। সে মামলাগুলো এখনো ওঠেনি। কোনো ডেমোক্র্যাটিক দলের ৬০ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা, গায়েবি মামলা হয়? সারাবিশ্বে দেখাতে পারবে কেউ? ক্রমাগতভাবে বিএনপির লোক গুম, খুন হত্যা হয়েছে। এমনকি শেষ দিন গত ৫ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে কারা ছিল? সব বিএনপির নেতাকর্মীরা ছিল। সেখানে সবচেয়ে বেশি উচ্চরিত ছিল- ‘জিয়ার সৈনিক এক হও’। সুতরাং জিয়াউর রহমানের দল বিএনপিকে বাদ দিয়ে, জাতীয়তাবাদীর রাজনীতিকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশে রাজনীতি এত সহজ হবে না।
ভোরের কাগজ : পরবর্তী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যদি অংশ নিতে চায় সেটা আপনি কীভাবে দেখবেন?
মির্জা ফখরুল : আওয়ামী লীগ একটি পুরনো রাজনৈতিক দল। সবচেয়ে পুরনো দল। তারা যদি রাজনীতি করে, করবে। এতে তো অসুবিধা নেই। নির্বাচনে অংশ নেয়াটাও অমূলক কিছু নয়।
ভোরের কাগজ : আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আওয়াজ উঠেছে। আপনি এটা সমর্থন করেন কিনা?
মির্জা ফখরুল : আমি এটা বিশ্বাস এবং সমর্থন করি না। আমি মনে করি এটা ঠিক হবে না। সবচেয়ে বড় জিনিস হলো- আওয়ামী লীগের রাজনীতি নেই। তারা দেউলিয়া হয়ে গেছে। তারা ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছে, অর্থ-বিত্ত বানাতে চেয়েছে, সম্পদের পাহাড় গড়েছে। তারা শুধু ক্ষমতায়ই থাকতে চেয়েছে; জনগণকে নিয়ে তাদের রাজনীতি ছিল না। ফলে আজকে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কখন এমন একটা অবস্থা হতে পারে; যখন একটি দলের সবচেয়ে বড় নেতাকে পালাতে হয়। তার গণভবন জনগণ দখল করে নেয়। এটা তখন হয়; যখন সে ধিকৃত মানুষ হয়। তারপরও যদি কেউ মনে করে আওয়ামী লীগ তাদের বর্তমান অবস্থা থেকে ফিরে আসতে পারে; এটা কেবলই ভাবনা ছাড়া কিছুই নয়।
ভোরের কাগজ : বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিদেশ যাত্রা এবং তারেক রহমানের দেশে ফেরার বিষয়ে সর্বশেষ অবস্থা কী?
মির্জা ফখরুল : দেশনেত্রী তো চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাবেনই। তিনি ডাক্তারদের পরামর্শের জন্য অপেক্ষা করছেন। কারণ তার মেডিকেল বোর্ড মনে করছে; বর্তমানে তার শারীরিক যে কন্ডিশন তাতে তিনি এয়ার ফ্লাইট নিতে পারবেন কিনা? আর তারেক রহমানের বিরুদ্ধে বেশ কিছু মামলা আছে; সেগুলো ক্লিয়ার হলেই তিনি দেশে চলে আসবেন। মামলার অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মামলা নিষ্পত্তি হতে সময় লাগে। মামলাগুলোর ওপরে কাজ হচ্ছে।
ভোরের কাগজ : এই মুহূর্তে নির্বাচনের জন্য বিএনপি পুরোপুরি প্রস্তুত কিনা?
মির্জা ফখরুল : বিএনপি সব সময়ই নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত থাকে। আপনার মনে আছে নিশ্চয়ই ২০১৮ সালে যখন নির্বাচন এলো; আমাদের বলা হলো, আপনারা কি নির্বাচনের জন্য প্রস্তত? আমরা কিন্তু বলেছি হ্যাঁ অবশ্যই প্রস্তুত। সেই মুহূর্তে আমরা প্রতি আসনে ৩ থেকে ৪ জন করে প্রার্থী দিয়েছি। যদিও সেই নির্বাচন তারা আগের রাতেই জোর করে নিয়ে গেছে। তবে সেই নির্বোচনে আমাদের পুরো পার্টিসিপেশন ছিল; এবং পুরোটাই ছিল।
ভোরের কাগজ : আমাগীতে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন?
মির্জা ফখরুল : কেন? আমাদের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া যদি সুস্থ থাকেন তবে তিনিই হবেন প্রধানমন্ত্রী। তার শারীরিক পরিস্থিতি আরো খারাপ হলে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হবেন। এ ব্যাপারে তো সন্দেহের কোনো কারণ নেই।
আরো পড়ুন: শাহরিয়ার কবির গ্রেপ্তার
