×

সাময়িকী

রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লার কবিতায় প্রেম ও দ্রোহ

Icon

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২০, ০৭:১৫ পিএম

রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লার কবিতায় প্রেম ও দ্রোহ

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির আত্মানুসন্ধান ও আপন ঠিকানার উৎস! ষাট দশকে পাকিস্তানি শাসকচক্রের দমন-পীড়ন, বৈষম্য আচরণের কারণে আন্দোলন সংগ্রাম তীব্র হয়ে ওঠে; একাত্তরের নয় মাসের যুদ্ধ, আত্মোৎসর্গ, হাজারো মানুষের ত্যাগ এবং জীবনদানে রচিত হয় বাংলাদেশ! সঙ্গত কারণে এই সময় কবিকণ্ঠে উচ্চকিত হয় প্রতিবাদ! শিল্পবোধ ও দর্শন কবিতায় প্রযুক্ত হয়! লোকজীবন, যাপিত সময়ের বহুমাত্রিক অনুভূতি, বেদনা তীব্রভাবে আলোড়িত হয় কবিসত্তায়। দেশজ উপাদান, ঐতিহ্য অন্বেষা, সংস্কৃতিচর্চার বিষয় হিসেবে একীভ‚ত হয় কবিতায়। সত্তর দশকের সামাজিক, রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ, ব্যক্তিগত অনুভব বিষয়বৈচিত্র্যে, চেতনাপ্রবাহে কবিতাকে শক্তিময় করে তোলে। পরিশীলিত কবিতা রচনার উৎকৃষ্ট সময় হয়ে ওঠে এ দশক। সম্ভাবনাময় অনুসন্ধানী প্রেমিক, দ্রোহী কবিদের আবির্ভাব বাংলা কবিতাকে ঋদ্ধ করে। রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এক ভিন্ন স্বর নিয়ে মনোযোগের কেন্দ্রে চলে আসেন। ১৯৬৬ থেকে নিয়মিত লেখালেখি শুরু। প্রথম জীবনের অনেক রচনা হারিয়ে গেছে। রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর প্রথম কবিতা ‘আমি ঈশ্বর আমি শয়তান’ দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। কবির নাম ছাপা হয়নি। রুদ্র এই কবিতা গ্রন্থাবদ্ধ করেননি। রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর প্রথম কাব্যগ্রন্থ উপদ্রুত উপক‚ল। চিন্তা, মানসিক অবস্থান ও বানানরীতিতে পরিবর্তন লক্ষণীয়। একাত্তর মুক্তিযুদ্ধ বাঙালিদের জীবনে গৌরবময় অধ্যায়। বহু মৃত্যু, কান্না, আত্মত্যাগ ও আত্মাহুতি দেখে রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর উচ্চারণ;

আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ন নৃত্য দেখি, ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো তন্দ্রার ভেতরে, এ দেশ কি ভুলে গেছে সেই দুঃস্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময়? বাতাসে লাশের গন্ধ ভাসে দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ফিরে চাই স্বর্ণ গ্রাম। এই গ্রন্থে ২৯টি কবিতা সংকলিত হয়েছে। ইতিহাসযাত্রা, বাংলার রূপবৈচিত্র্য, অস্তিত্ব অন্বেষা একীভ‚ত হয়। প্রথম কাব্যগ্রন্থে যে ঠিকানা তার আরাধ্য ছিল তার অন্তর্গত বোধের সম্প্রসারণ প্রত্যক্ষ করা যায়। স্বর্ণ গ্রামে ফিরে যাওয়ার আর্তি কবিতায় প্রকটভাবে উপস্থিত। গৌরবের উত্তরাধিকার, ঐতিহ্যচেতনা ও দেশপ্রেম ঘিরে কবিতার বিষয় ও বক্তব্য আবর্তিত। রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ মানুষের মানচিত্র কাব্যগ্রন্থে ৩২টি কবিতায় সাধারণ মানুষের জীবনবৃত্তান্ত তুলে ধরেছেন। ক্ষুধা, মন্দা ও দারিদ্র্যের সাথে সাধারণ মানুষের সংগ্রাম উপজীব্য। সাধারণ মানুষ ফসল ফলায়। সুবিধাভোগীরা কমমূল্যে ক্রয় করে। সাধারণ মানুষ বস্ত্রহীন। প্রয়োজনীয় সামগ্রীর অভাব, চিকিৎসা-শিক্ষা বঞ্চনা নিয়ে একসময় মৃত্যুর দিকে অগ্রসর হয় এসব মানুষ। ভাগ্যাহত মানুষদের কথা তার কবিতায় বারবার এসেছে। আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার, লোকজীবনের ছবি তার কবিতার প্রধান বিষয়। রুদ্রের কবিতায় বাংলার মাটি ও মানুষের সম্পর্ক উন্মোচিত হয়েছে। সমাজের বৈষম্য দেখে তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তার কবিতায় সমাজ বদলের প্রেরণা ও বক্তব্য ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। কবিতায় আনন্দধ্বনি, আর্তি ও স্বপ্ন জাগরুক হয়ে আছে। তিনি সমকালীন বাংলা কবিতায় সৌন্দর্য আবিষ্কার করেছেন। মানবিক টানাপড়েন, সম্পর্কের বহুমাত্রিক দিক বিশ্লেষণ করে তিনি যেসব কবিতা রচনা করেছেন তা পাঠকপ্রিয় ও গ্রহণীয়। কবির বক্তব্য ও উপমার মাধ্যমে কবিতাকে আধুনিক ও শিল্পোত্তীর্ণ মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছেন। তার কবিতা বহুল পাঠ ও গবেষণার দাবি রাখে। তিনি আধুনিক যুগযন্ত্রণাকেও ধারণ করে কবিতাকে শিল্পসমৃদ্ধ করে তুলেছেন। রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কবিতায় প্রেম এক অনিবার্য বিষয়। সান্নিধ্য আকাক্সক্ষা, ব্যাকুলতা। প্রণয় গাথা। বিরহ কাতরতার মাঝে এক অবিনাশী দ্যোতক প্রেম। দায়বদ্ধতার জন্ম দেয় যে প্রেম তাকে অস্বীকার করা যায় না। যুদ্ধ, হিংসা, দলাদলি, পরশ্রীকাতরতার পদধ্বনি সেখানে একজন কবি স্বাভাবিকভাবে হৃদয়ের মতো শক্তিশালী বাহন সঙ্গী করে রচনায় অগ্রবর্তী থাকবেন এটাই স্বাভাবিক। রুদ্র আনন্দ-বিষাদ, দুঃখ-কষ্ট কবিতায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তার কবিতা অন্তহীন জীববৈচিত্র্য, মানবিক গুণাবলী এবং যাপিত জীবনকে খুঁজে পাওয়া যায়। এই দুঃসময়ে রুদ্রের কবিতা আমাদের স্পর্শ করে- হে আমার বিষণ্ণ সুন্দর/দুচোখে ভাঙন নিয়ে কেন এই রুক্ষ দুঃসময়ে এলে/কেন সমস্ত আরতির শেষে আজ এলো শূন্য দুখানি হাত/কেন এলে, বিষণ্ণ সুন্দর, তুমি কেন এলে /

একজন কবি একাকী বহন করে বেদনা.., তারও অভিমান থাকে। প্রিয় মানুষকে তিনি কাছে আসতে নিষেধ করেনন। হানাহানি, হিংসা আর পৃিথবীব্যাপী অস্থিরতার চিত্র দেখে কবিচিত্ত বেদনার্ত। চারপাশে দূরত্বের সীমা ঘিরে আছে। মানুষ মানুষের কাছ থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। রুদ্রের কবি ও ব্যক্তিজীবন বেদনায় ভরপুর ছিল। তার কবিতায় স্বপ্ন ও আশার কথা অগ্রাধিকার পেয়েছে ঠিকই। দুঃখবোধ, অপ্রাপ্তিকে তিনি জীবনের অংশ হিসেবে মেনে নিয়েছেন। কবিতা তার ছিল আরাধ্য। শেষে এসে মনে পড়ছে- এতদিন কিছু একা থেকে শুধু খেলেছি একাই/পরাজিত প্রেম তনুর তিমিরে হেনেছে আঘাত/পারিজাতহীন কঠিন পাথরে/প্রাপ্য পাইনি করাল দুপুরে/নির্মম ক্লেদে মাথা রেখে রাত কেটেছে প্রহর বেলা/এই খেলা আর কতোকাল আর কতটা জীবন/কিছুটাতো চাই- হোক ভুল, হোক মিথ্যে ও প্রবোধ/অভিলাষী মন চন্দ্রে না পাক-জ্যোৎস্নায় পাক সামান্য ঠাঁই (অভিমানের খেয়া)। রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ স্বল্পায়ু নিয়ে পৃথিবীতে এসেছিলেন। যতদিন তিনি কবিতা লিখেছেন ততদিন সমাজজীবনের ঘটনাবর্তের বিশ্লেষণ, লড়াই-সংগ্রাম, প্রেম-বিরহ ও বাঁচার ব্যাকুলতায় তার কবিতা আবর্তিত হয়েছে। সত্তরের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ, প্রতিক্রিয়া ও তার ব্যক্তিগত জীবনের দোলাচাল রুদ্রের কবিতার নির্মিতি ও বিষয়বৈভবকে সমৃদ্ধ করেছে। পাকিস্তানি শাসকের দুঃশাসন, ছাত্র-জনতার জাগৃতি, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধ একজন কবিকে দ্রোহের কবিতা রচনায় উদ্বুদ্ধ করে। রুদ্র এর ব্যতিক্রম নন। দেশপ্রেম, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনা তার কবিতার প্রধান উপজীব্য। গ্রামীণ সহজ জীবনাভরণ, গ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বেদনা, আর্তি তার কবিতার বাকবদলে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে। ১৯৯১ সালে ২১ জুন মাত্র ৩৪ বছর বয়সে কবিতার খাতা ফেলে চলে গেছেন মৃত্যুলোকের ওপারে। এই অকাল প্রয়াত কবির জন্য অফুরন্ত প্রার্থনা।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

হজ পালন শেষে দেশে ফিরলেন সেনাপ্রধান

হজ পালন শেষে দেশে ফিরলেন সেনাপ্রধান

এবার মমিনীর ছেলেকে গ্রেপ্তার দেখালো পুলিশ

প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে হত্যাকাণ্ড এবার মমিনীর ছেলেকে গ্রেপ্তার দেখালো পুলিশ

শিশুকে টেনে গেলো খানজাহান আলী দিঘির কুমির

শিশুকে টেনে গেলো খানজাহান আলী দিঘির কুমির

সম্পত্তি বণ্টন দ্বন্দ্বে ভাবি-ভাতিজাকে হত্যা

সম্পত্তি বণ্টন দ্বন্দ্বে ভাবি-ভাতিজাকে হত্যা

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App