১১ এপ্রিল বিশ্ব পারকিনসন্স দিবস
যে রোগে আজীবন চিকিৎসা নিতে হয়
অধ্যাপক ডাঃ আহসান হাবীব (হেলাল), পারকিনসন্স ডিজিজ ও মুভমেন্ট ডিজঅর্ডার বিশেষজ্ঞ
প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:০১ পিএম
১১ এপ্রিল বিশ্ব পারকিনসন্স দিবস: যে রোগে আজীবন চিকিৎসা নিতে হয়
প্রতি বছর ১১ এপ্রিল বিশ্বজুড়ে 'বিশ্ব পারকিনসন্স দিবস' পালন করা হয়। এই রোগটি সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং রোগীদের প্রতি সমর্থন প্রদর্শনের লক্ষ্যেই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
পারকিনসন্স ডিজিস কি?
এটি মস্তিষ্কের ক্ষয়জনিত রোগ। মস্তিষ্কের সাবস্ট্যানশিয়া নাইগ্রা নামক অংশের স্নায়ু কোষ (নিউরোন) শুকিয়ে যাওয়ার কারনে ডোপামিন নামক নিউরোট্রান্সমিটার (এক ধরণের রাসায়নিক পদার্থ) এর ঘাটতি দেখা দেয়। স্বাভাবিক অবস্থায় মস্তিষ্কে ব্যাজাল গ্যাংলিয়া নামক অংশ শরীরের চলাফেরা বা গতি বা নড়াচড়া করার সমন্বয় করে থাকে। ডোপামিনের অভাবে এই সমন্বয় নষ্ট হয়ে যায়।
এ রোগ কেন হয়?
শতকরা সত্তর ভাগ ক্ষেত্রে পারকিনসন্স রোগের কারণ অজানা। শতকরা দশ ভাগ ক্ষেত্রে জেনেটিক কারণে হয়। অবশিষ্ট বিশ ভাগ বিভিন্ন কারণে হয়। যেমন: স্ট্রোক, টিউমার, বার বার মস্তিষ্কের আঘাত, মস্তিষ্কের ইনফেকশন, উইলসন ডিজিজ সহ মস্তিষ্কের অন্যান্য রোগ- যে গুলোকে বলা হয় পারকিনসনিজম।
কারা আক্রান্ত হতে পারে?
পুরুষ-মহিলা সমানভাবে আক্রান্ত হয়। সাধারণত ষাট বছরের পরে পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত হয়। জেনেটিক ক্ষেত্রে কম বয়সে যেমন ১৫ থেকে ২০ বছরের মধ্যে এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
এ রোগের লক্ষণ কি?
এ রোগের প্রধান উপসর্গ/লক্ষণ তিনটি।
১। হাত/ পা কাঁপুনি
২। হাত/ পা স্বাভাবিকের চেয়ে শক্ত হয়ে যাওয়া
৩। চলাফেরার গতি ধীর হয়ে যাওয়া
এ ছাড়া নিম্নোক্ত লক্ষণগুলো থাকতে পারে সেগুলো হলো- সামনের দিকে ঝুঁকে হাটা, কথার স্বর কমে যাওয়া, কম কথা বলা, চোখের পাতার নড়াচড়া কমে যাওয়া, বার বার পড়ে যাওয়া, কোষ্ঠ কাঠিন্য
উপরোক্ত লক্ষণ গুলোকে বলা হয় মটর উপসর্গ
এছাড়া নন-মটর উপসর্গ রয়েছে। সেগুলো হল- হতাশাগ্রস্থতা, উদ্বিগ্নতা, উদাসীনতা, কোষ্ঠ কাঠিন্য, ঘুম কম হওয়া, বার বার প্রশ্রাবে চাপ অনুভব করা বা প্রশ্রাব আটকে যাওয়া, যৌন ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া
চিকিৎসা আছে কি? কতদিন চিকিৎসা নিতে হয়?
এ রোগের চিকিৎসা রয়েছে। সঠিক সময়ে এবং সঠিকভাবে চিকিৎসা গ্রহন করলে রোগী দীর্ঘদিন ভালো থাকেন। এ রোগে আক্রান্ত রোগীকে আজীবন ঔষধ খেতে হয়।
সম্পূর্ণ আরোগ্য হওয়া সম্ভব কি?
পারকিনসন্স রোগ সম্পূর্ন নিরাময়যোগ্য রোগ নয়। নিয়মিত ঔষধ সেবনে রোগী অনেকদিন পর্যন্ত স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেন
এ রোগ প্রতিরোধের উপায় আছে?
এ রোগ প্রতিরোধের উপায় এখনও আবিষ্কার হয়নি।
অপারেশন বা অন্য কোন চিকিৎসা আছে কি?
অপারেশনের কোন ভূমিকা নেই। ডিবিএস পদ্ধতিতে অতি ক্ষুদ্র ইলেকট্রোড মস্তিষ্কের গভীরে স্থাপন করা হয়। এতে ঔষধ অনেক কম লাগে। উপসর্গগুলো ৯০ ভাগ কমে যায়, রোগী দীর্ঘদিন ভালো থাকেন। কিন্তু এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এ পদ্ধতি আমাদের দেশে সীমিত পরিসরে চালু হয়েছে।
এডভান্সড পারকিনসন্স ডিজিজ রোগীর ক্ষেত্রে লিভোডোপা প্যাচ, অ্যাপোমরফিন ইনফিউশন পাম্প এবং লিভোডোপা-কারভিডোপা ইনটেস্টিনাল জেল রয়েছে। এগুলো ব্যয়বহুল। আমাদের দেশে এখনও শুরু হয়নি।
এ রোগের হার কেমন?
আমাদের দেশে সঠিক তথ্য উপাত্ত নেই। আন্তর্জাতিক এবং পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে তুলনা করলে শতকরা ০.৩ ভাগ লোক পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত হয়।
ব্যায়াম বা ফিজিওথেরাপির কোন ভূমিকা আছে কি?
ঔষধের পাশাপাশি ব্যায়াম বা ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে পারকিনসন্স রোগের উন্নতি হয়।
চিকিৎসা কোথায় পাওয়া যায়
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোলজি বর্হিবিভাগ এবং অন্ত:বিভাগে, ন্যাশনাল ইনিষ্টিউট অফ নিওরোসায়েন্স মেডিকেল কলেজ সমূহের নিউরোলজি বিভাগে। এছাড়া যেসমস্ত বেসরকারী হাসপাতালে স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন, সেখানে এ রোগের চিকিৎসা দেয়া হয়।
আমাদের করণীয় কি?
গড় আয় বৃদ্ধি পাওয়ার কারনে নিউরোডিজেনারেটিভ অসুখের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। পারকিনসন্স রোগ এগুলোর মধ্যে অন্যতম। রোগী এবং পরিবারের লোকজন সচেতন করতে পারলে রোগীকে সচল রাখা সম্ভব।
লেখক: অধ্যাপক ডাঃ আহসান হাবীব (হেলাল), অধ্যাপক, নিউরোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সাবেক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়)
