×

মতামত

‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র দিবস’ এক অনন্য মহিমার দিন

Icon

ফেরদৌস আরেফীন

প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:০৮ পিএম

‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র দিবস’ এক অনন্য মহিমার দিন

ছবি: সংগৃহীত

বাংলার মাটিতে যখন বঙ্গবন্ধুর ডাকে মুক্তিকামী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ ও সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে উঠছিল, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন নিরস্ত্র বাঙালির ঘাড়ে নৃশংস সন্ত্রাস চালাচ্ছিল, তখন ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দিন ছিল ১০ এপ্রিল। এই দিনটি বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র দিবস’ হিসেবে চিরস্মরণীয়।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে নিরীহ বাঙালির ওপর গণহত্যা শুরু করে। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তৎক্ষণাৎ তাকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু স্বাধীনতার সেই ঘোষণা বাতাসে ভেসে পড়ে। ক্রমেই দেশজুড়ে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। এ অবস্থায় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে স্বাধীনতার পক্ষে আইনানুগ ও কূটনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলা জরুরি হয়ে পড়ে।

১০ এপ্রিলের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত

গ্রেফতারের আগে বঙ্গবন্ধু একটি সীমিত পরিসরের অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের নির্দেশনা দিয়ে গিয়েছিলেন। সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নে ১৭ এপ্রিল, ১৯৭১ মুজিবনগর (বর্তমান মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলা) নামে পরিচিত স্থানে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার (মুজিবনগর সরকার) আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয়। এই সরকার গঠনের পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি ছিল ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ প্রণয়ন করা।

এই ঘোষণাপত্রে স্পষ্ট করে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র বলে ঘোষিত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপ-রাষ্ট্রপতি (এবং রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি), তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী, এবং অন্যান্যদের মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

১০ এপ্রিল এই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি করা হয়, যা পরের দিন ১১ এপ্রিল গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়।

ঘোষণাপত্রের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

আইনগত ভিত্তি এই ঘোষণাপত্র মুক্তিযুদ্ধকে একটি আইনানুগ ও ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পক্ষে দাবি তুলে ধরার ভিত্তি তৈরি করে দেয়।

সরকারের বৈধতা মুজিবনগর সরকার গঠিত হওয়ায় বিদেশে অবস্থানরত কূটনীতিকরা, প্রবাসী বাঙালিরা এবং বিশ্বের গণমাধ্যম বাংলাদেশের পক্ষে সোচ্চার হতে পারে। এই সরকার মুক্তিবাহিনীকে নির্দেশনা দেয়, যুদ্ধ পরিচালনা করে, এবং ত্রাণ ও আশ্রয়শিবির ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা রাখে।

অভ্যুত্থান থেকে সংগঠিত যুদ্ধ গ্রাম-গঞ্জে ছড়িয়ে থাকা প্রতিরোধ যুদ্ধকে একটি সুসংহত ও নির্দেশনামূলক কাঠামো দেয় এই সরকার। ফলে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ একটি জাতীয় মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়।

বিশ্ব দরবারে বার্তা ঘোষণাপত্রে বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক আদর্শ স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। এটি প্রমাণ করে যে, বাঙালি কোনো বিদ্রোহী গোষ্ঠী নয়, বরং একটি জাতি হিসেবে তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে।

১০ এপ্রিল তাই শুধু একটি তারিখ নয়; এটি বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক রূপরেখা তৈরির দিন। এই দিনে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের জন্মের সুস্পষ্ট ইস্তাহার দেওয়া হয়। মুজিবনগর সরকার এবং এই ঘোষণাপত্রের কারণেই মুক্তিযুদ্ধ একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও দিকনির্দেশনা পায়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের পেছনে ১০ এপ্রিলের সেই ঐতিহাসিক দলিল অনস্বীকার্য এক অনুপ্রেরণা ও কৌশলগত ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

আজ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উত্তীর্ণ দেশে দাঁড়িয়ে ১০ এপ্রিলের এই ঘোষণাপত্রের মহিমা স্মরণ করা আমাদের জন্য গৌরবের ও কর্তব্যের। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কীভাবে আইন ও ন্যায়ের ভিত্তিতে স্বাধীনতার সংগ্রাম সংগঠিত করে শত্রুমুক্ত পৃথিবী গড়া সম্ভব।

লেখক: সাংবাদিক, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আজীবন সদস্য

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

টাঙ্গাইল মহাসড়কে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাস খাদে, আহত ১৫

টাঙ্গাইল মহাসড়কে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাস খাদে, আহত ১৫

শহীদ জিয়ার বিখ্যাত বেতার ভাষণ জনগণকে উদ্দীপ্ত করেছিল

ভারতীয় হাইকমিশন শহীদ জিয়ার বিখ্যাত বেতার ভাষণ জনগণকে উদ্দীপ্ত করেছিল

কেউ ফিরছেন ঢাকায়, কেউ আজও বাড়ি যাচ্ছেন

কেউ ফিরছেন ঢাকায়, কেউ আজও বাড়ি যাচ্ছেন

রেমাক্রীতে ডায়রিয়ার প্রকোপ, ওষুধ-স্যালাইনের তীব্র সংকট

রেমাক্রীতে ডায়রিয়ার প্রকোপ, ওষুধ-স্যালাইনের তীব্র সংকট

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App