বেড়েই চলেছে হামের প্রকোপ, দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর সারি
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:০১ পিএম
ফাইল ছবি
নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি রোগ হঠাৎই যেন নতুন করে ভয় দেখাতে শুরু করেছে। দেশে হামের সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শিশুমৃত্যুও। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকায় উদ্বেগ বাড়ছে অভিভাবক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। এটি নিউমোনিয়া, শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত ও স্নায়বিক জটিলতা, ডায়রিয়া, বধিরতা, অন্ধত্ব এবং মস্তিষ্কে ফোলা (এনসেফালাইটিস)-এর মতো গুরুতর অসুস্থতার কারণ হতে পারে, যা প্রাণঘাতীও হতে পারে।
চলতি বছর ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ১৭ হাজার ২২ জন সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ রোগে এখন পর্যন্ত ১৮৬ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়, মঙ্গলবার হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একটি শিশুর হামে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে, আর বাকি ৮টি শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৬৯৮ শিশু ভর্তি হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে, আর হাম শনাক্ত হয়েছে ১৭৬ জনের।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সুপারিশ করেছে, হাম আক্রান্ত সব শিশুকে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ভিটামিন এ-এর দুটি ডোজ দিতে হবে। চিকিত্সকের মাধ্যমে এই ডোজ দিতে হবে। ভিটামিন এ চোখের ক্ষতি, দৃষ্টিহীনতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি কমায় এবং শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। বিশেষ করে দুই বছরের কম বয়সি শিশু এবং অপুষ্টি বেশি এমন এলাকায় এই ভিটামিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা নাক, গলা ও ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটিয়ে পরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এর উপসর্গের মধ্যে রয়েছে উচ্চ জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং সারা শরীরে ফুসকুড়ি।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম বলেন, ‘বয়সভিত্তিক আক্রান্ত রোগী, ছয় মাসের নিচের বাচ্চারাই বেশি সংক্রমিত হচ্ছে। খুব অদ্ভুত ও আতঙ্কজনক ব্যাপার যে, ছয় মাসের নিচের বাচ্চা আমরা হাম আক্রান্ত পাচ্ছি সবচেয়ে বেশি। এতে বোঝা যাচ্ছে বয়সভিত্তিক হামের যে পরিস্থিতি, সেটা ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে। এটা একটা বড় কারণ।’
এই বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক জানান, ‘যেহেতু হাম আমাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল, সে কারণে এটা নিয়ে আমরা চিন্তিত ছিলাম না। কিন্ত এখন হার্ড ইমিউনিটি কমে যাওয়াতে এক জায়গায় যদি হাম হয়, তাহলে দেখা যাচ্ছে, তা বিশাল এক জনসংখ্যা নিয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে। ঢাকায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হামের রোগী। এর কারণ ঘনবসতি। এছাড়া পাঁচ/সাত বছর টিকার কাভারেজ না থাকার কারণে এই হাম দ্রুত ছড়িয়েছে।’ তিনি বলেন, টিকা দেওয়ার পর কম করে এক মাস পর শরীরে এন্টিবডি তৈরি হয়। কারো কারো ক্ষেত্রে তিন সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
চট্টগ্রামে নেই পরীক্ষার ল্যাব, নমুনা পাঠাতে হচ্ছে ঢাকায়
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ও বাণিজ্যিক রাজধানীখ্যাত চট্টগ্রামে হাম পরীক্ষার কোনো ল্যাব নেই। ফলে রোগীদের নমুনা পাঠাতে হচ্ছে ঢাকায়, এতে ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগী ও স্বজনরা। দুর্ভোগ কমাতে সীতাকুণ্ডে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি)-তে হাম পরীক্ষার সক্ষমতা যাচাই করছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, জ্বর, সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট ও শরীরে লালচে ফুসকুড়িসহ হামের উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিন চট্টগ্রামের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে বিভিন্ন বয়সী শিশু। এখন পর্যন্ত ৩৫ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে এবং একজনের মৃত্যু হয়েছে। এতে অভিভাবকদের উদ্বেগ বাড়ছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান ডা. মুসা মিয়া বলেন, “যেহেতু একটি বড় আউটব্রেক হয়েছে, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি দেখা দিলে আরও ডিসেন্ট্রালাইজেশন প্রয়োজন হতে পারে। হয়তো আরও ল্যাব স্থাপন করা গেলে এ ধরনের ক্ষেত্রে দ্রুত নির্ধারণ করা যাবে- এটি মিজেলস কি না, কিংবা অন্যান্য ভাইরাসজনিত সংক্রমণ কি না। কোনো মহামারি বা দুর্যোগ দেখা দিচ্ছে কি না, তা আগেভাগে শনাক্ত করার পাশাপাশি ভ্যাকসিনেশন নিয়ে কৌশলগত পরিকল্পনা করার জন্যও হাম ভাইরাস শনাক্তকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলা ছাড়াও বিভাগের কুমিল্লা, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর ও ফেনী থেকেও রোগীরা চট্টগ্রামে আসছেন। কিন্তু পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় তারাও ভোগান্তিতে পড়ছেন।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “আইপিএইচ আছে ঢাকায়। সেখান থেকে স্যাম্পল আমরা পাঠিয়ে দিই, দুই থেকে তিনদিনের মধ্যে আমাদের কাছে রিপোর্ট চলে আসে।”
এদিকে, ফৌজদারহাটে অবস্থিত বিআইটিআইডি-তে হাম পরীক্ষার সক্ষমতা যাচাই চলছে। বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. শেখ ফজলে রাব্বি বলেন, “তাদের কাছে পর্যাপ্ত জনবল ও টেকনিক্যাল দক্ষতা রয়েছে। কর্মরত চিকিৎসকরাও এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে সক্ষম। তবে প্রয়োজনীয় কিটস ও রিএজেন্টসহ আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম সরবরাহ না থাকলে এসব কার্যক্রম সম্পাদন করা সম্ভব হয় না।”
বিআইটিআইডি’র ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. ইফতেখার আহমেদ বলেন, “এখানে বিএসএল-২ প্লাস এবং বিএসএল-৩ অর্থাৎ বায়োসেফটি লেভেল-৩ ল্যাবরেটরি রয়েছে, যা আমরা বলতে পারি বাংলাদেশে একমাত্র কার্যকর বায়োসেফটি লেভেল-৩ ল্যাবরেটরি। বর্তমানে চলমান হাম বা মিজেলস রোগ নির্ণয়ের জন্য আমাদের যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে।”
