জ্বালানি-সংকটের আশঙ্কা
পেট্রোল পাম্পে লম্বা লাইন
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২৬, ০১:২৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি-সংকটের আশঙ্কায় সারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি তেল (অকটেন, পেট্রোল ও ডিজেল) কিনতে গ্রাহকদের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। গ্রাহকরা নিজ নিজ গাড়ি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন গাড়ির তেল কিনতে। একই অবস্থা দেখা গেছে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও। অনেকেই আবার সংকটের আশঙ্কায় বাড়তি জ্বালানি তেল কিনতে ভিড় করেছেন পেট্রোল পাম্পে। ইতোমধ্যে পাম্প মালিকদের ড্রাম বা কনটেইনারে জ্বালানি বিক্রি বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে সরকার।
আজ শুক্রবার (৬ মার্চ) দেশের বিভিন্ন স্থানে এ চিত্র দেখা গেছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে জ্বালানি সংকট। বাংলাদেশেও প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়ায় ঢাকাকে জ্বালানি ও গ্যাস রেশনিং শুরু করতে বাধ্য করেছে। একই সঙ্গে যুদ্ধের প্রভাবে অস্থির স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি ও পরিশোধিত তেল জোগাড়ে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থার কারণে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় রমজান মাসে সব ধরনের আলোকসজ্জা পরিহার এবং ব্যক্তিগত যানবাহন ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহন ব্যবহারের অনুরোধ জানিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে অনুরোধ জানিয়ে সবার সহযোগিতা কামনা করেছে মন্ত্রণালয়।
তবে বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে অনেকেই ভাবছেন এখনই তেলের সংকট হবে। আসলে এখনই তেলের সংকট হবে না। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আগামী মাসে সংকট হতে পারে। এখন ক্রেতারা যেভাবে কিনছেন, এটি প্যানিক বায়িং। কারণ, বর্তমানে যে পরিমাণ মজুত রয়েছে, তাতে ডিজেল ১৪ দিন, অকটেন ২৮ দিন, পেট্রোল ১৫ দিন, ফার্নেস ৯৩ দিন ও জেট ফুয়েল ৫৫ দিন চলবে।
তবে জানা গেছে, ১৫ দিনের জ্বালানি মজুদের মধ্যে এক সপ্তাহ অতিবাহিত হয়েছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ না হলে ভয়াবহ সংকটে পরবে বাংলাদেশ।
এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে দেখা গেছে, সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ও সিএনজি স্টেশনে গাড়ির জ্বালানি কিনতে লম্বা লাইনে অপেক্ষা করছেন ক্রেতারা। একাধিক ক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জ্বালানি তেলের সংকট হতে পারে—এমন খবর শুনে তারা তেল নিতে এসেছেন।
বিজয় সরণির ট্রাস্ট পেট্রোল পাম্পে তেল নিতে আসা সাজিম মাহমুদ এই জানান, ‘আমি শুনেছি ইরান যুদ্ধের কারণে সামনে তেল পাওয়া যাবে না। তাই ফুল ট্যাংকি তেল নিতে এসেছি।’
সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আমি সাধারণত প্রতিবার সর্বোচ্চ ৫শ টাকার তেল নিই। কিন্তু পেট্রোল পাম্পে এসে দেখি অন্যান্য দিনের তুলনায় অনেক বড় লম্বা লাইন। পরে দু-একজন ক্রেতার সঙ্গে কথা বলার পর তারা তেলের সংকট হওয়ার কথা জানান। এ অবস্থায় আমিও ১৩শ টাকার তেল কিনি।’
একাধিক পাম্পের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাম্পগুলোয় ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের কোনো সংকট নেই। সরবরাহ ঠিক আছে। কিন্তু ক্রেতারা বেশি বেশি তেল কেনার কারণে পাম্পের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, ডিজেল আমদানি করা হলেও অকটেন ও পেট্রোল বাংলাদেশেই উৎপাদন হয়। এটি আমদানি করতে হয় না। ফলে পেট্রোল বা অকটেনের কোনো সংকট হবে না।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠকে, সরকার পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি বরাদ্দ ১০ শতাংশ কমানোর নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাস সরবরাহ ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) কমানো হচ্ছে। সিলেটের শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি ছাড়া বাকি সব সার কারখানা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মজুতদারি ও চোরাচালান ঠেকাতে নজরদারি দল (ভিজিল্যান্স টিম) মোতায়েন করা হয়েছে। একই সঙ্গে পাম্প মালিকদের ড্রাম বা কনটেইনারে জ্বালানি বিক্রি বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি জরুরি আমদানির জন্য সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, চীন এবং আফ্রিকার সরবরাহকারীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে আরামকো সৌদি আরবের বাইরে থেকে পরিশোধিত তেল সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, মার্চ মাসে ৭ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা ছিল। এরমধ্যে কাতার থেকে ৬ কার্গো ও এঙ্গোলা থেকে এক কার্গো আসার কথা ছিল। কাতার দুটি কার্গো দিতে পারবে না বলে জানিয়েছে। সেই দুই কার্গো এখন স্পট মার্কেট থেকে সিঙ্গাপুরভিত্তিক কোম্পানি গানভোর ও ভিটোল এশিয়ার মাধ্যমে সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এদিকে জ্বালানি তেল সাশ্রয়ে দেশের মানুষকে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত পরিহার করার পাশাপাশি ব্যক্তিগত যানবাহন ব্যবহার না করে গণপরিবহন ব্যবহার করা এবং সম্ভব হলে শেয়ারিং বা কার-পুলিং ব্যবস্থা অবলম্বনের অনুরোধ করেছে সরকার। এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।
বিজ্ঞপ্তিতে সব সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক স্থাপনা ও দেশের সকল সচেতন নাগরিককে জ্বালানি সাশ্রয়মূলক ব্যবস্থা অবিলম্বে গ্রহণের অনুরোধ করছে সরকার।
প্রাকৃতিক গ্যাস সাশ্রয়ের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় বলেছে, রান্না ও অন্যান্য কাজে গ্যাস ব্যবহারে সর্বোচ্চ সাশ্রয়ের জন্য উপযুক্ত পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। গ্যাসচালিত যন্ত্রপাতির অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার পরিহার করতে হবে। গ্যাস পাইপলাইন ও বার্নার নিয়মিত পরীক্ষা করে গ্যাসের লিকেজজনিত অপচয় রোধ করতে হবে, এবং অবৈধভাবে গ্যাস ব্যবহার থেকে সকলকে বিরত থাকতে হবে।
দেশের সব প্রতিষ্ঠানকে অনুরোধ করে মন্ত্রণালয় বলেছে, সব সরকারি দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানে অফিস চলাকালীন ও অফিস-পরবর্তী সময়ে জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে এবং অতিরিক্ত জ্বালানির ব্যবহার পরিহার করতে হবে।
নিজেই উদাহরণ তৈরি করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার দপ্তরে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উদ্যোগের অংশ হিসেবে কক্ষের ৫০ শতাংশ বাতি বন্ধ রাখার পাশাপাশি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সেট করেছেন।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেন, দেশে বর্তমানে ১ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে। বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ মজুত রয়েছে, তা নিয়ে এখনই শঙ্কার কিছু নেই। নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ৭টি জাহাজের এলসি সম্পন্ন হয়েছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ডিজেল ১৪ দিন, অকটেন ২৮ দিন, পেট্রোল ১৫ দিন, ফার্নেস ৯৩ দিন ও জেট ফুয়েল ৫৫ দিনের মজুত রয়েছে।
