অন্তর্বর্তী আমলে বিএনপি কেন রাষ্ট্রপতিকে রক্ষায় অনড় ছিল
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:০৮ পিএম
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ছবি : সংগৃহীত
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যখন প্রশাসন থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত ব্যাপক পরিবর্তন আসে, তখন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন কীভাবে তার পদে টিকে থাকলেন, এটি অনেকের কাছেই কৌতূহলের বিষয় হয়ে ওঠে।
ওই সময় দেশের তৎকালীন প্রধান বিচারপতিকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল এবং সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী অজ্ঞাত অবস্থানে থেকেই পরে পদত্যাগ করেছিলেন বলে সংবাদ মাধ্যমে খবর আসে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কমপক্ষে দুই দফায় রাষ্ট্রপতির অপসারণ কিংবা পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাও এবং বড় ধরনের চাপ তৈরি করা হলেও মো. সাহাবুদ্দিন থেকে যান বঙ্গভবনেই। তিনিই গত ১২ই ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের পর ১৭ই ফেব্রুয়ারি নতুন নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রীকে শপথ পড়ান।
মো. সাহাবুদ্দিন নিজেই তার টিকে থাকার বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন এক সাক্ষাৎকারে। সেখানে তিনি বলেন, আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতর থেকেও তাকে অপসারণের চেষ্টার অভিযোগ করে তিনি দাবি করেন, বিএনপি জোট ও সশস্ত্র বাহিনী তখন তাকে আশ্বস্ত করে এবং সমর্থন যুগিয়েছে।
রাষ্ট্রপতি ওই সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতির প্রেস উইং বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ তোলেন। একই সঙ্গে বিদেশ সফরের পর নিয়মানুযায়ী রাষ্ট্রপতিকে সফর বা চুক্তির বিষয়ে অবহিত না করার অভিযোগও করেন বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টার বিরুদ্ধে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলো থেকে তাকে অবহিত না করেই রাষ্ট্রপতির ছবি নামানো নিয়েও।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের এসব বক্তব্যের বিষয়ে সাবেক প্রধান উপদেষ্টার তৎকালীন প্রেস উইংয়ের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাবেক সদস্য বলেন যে, এ বিষয়ে তারা কোনো মন্তব্য করতে চান না।
এর আগে তখনকার ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ওই বছরের ১৩ই ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন তিনি। রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে তিনি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন।
আরো পড়ুন : দেশে জরুরি অবস্থা জারির চাপ ছিল: রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন
এখন প্রশ্ন হলো—বিএনপি কেন অন্তর্বর্তী সরকারের ওই সময়কালে রাষ্ট্রপতি পদে মো. সাহাবুদ্দিনের জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল, কিংবা কেন রাষ্ট্রপতি পদে তাকে বহাল রাখতে অনড় ছিল?
রাষ্ট্রপতি পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনের অপসারণের দাবি যখন উঠছিল, তখন বিএনপির সিনিয়র নেতারা প্রকাশ্যে তার অপসারণের বিরোধিতা করেছিলেন। তারা যুক্তি দিয়েছিলেন, ‘রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে’, ‘সাংবিধানিক সংকট তৈরি হতে পারে’ কিংবা ‘নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হতে পারে’—এমন পরিস্থিতি এড়াতেই তারা এই অবস্থান নিয়েছেন।
কিন্তু বর্তমানে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি নন দলটির সিনিয়র নেতারা। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, এ নিয়ে কী আলোচনা হয়েছে সেটি তার জানা নেই।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দলের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে বলেন, রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে তাদের অবস্থান ছিল এমন, যাতে এটিকে কেন্দ্র করে দেশের স্থিতিশীলতায় কোনো সংকট না হয়, যা সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরো বিপন্ন করে তুলতে পারতো।
তার মতে, বিএনপি তখন সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখা এবং দ্রুত নির্বাচন আদায়ের নীতি নিয়েছিল। শেখ হাসিনার পতনের পর যখন সব কিছু সংবিধান অনুসরণ করেই হচ্ছিল, তখন অসাংবিধানিক পন্থায় রাষ্ট্রপতিকে সরানো হলে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটতে পারতো, এমন আশঙ্কা থেকেই তারা ওই অবস্থান নিয়েছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, শেখ হাসিনার পতনের পর শুরু থেকেই বিএনপি নির্বাচন চেয়ে আসছিল এবং নির্বাচন ঝুঁকিতে পড়বে, এমন কোনো পদক্ষেপে দলটি সায় দিতে রাজি ছিল না।
তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, রাষ্ট্রপতিকে কেন্দ্র করে নির্বাচন অনিশ্চিত হোক, সেটি তারা চায়নি। কারণ তারা জানতো যে যত দ্রুত নির্বাচন হবে তত তারা ভালো করবে। এজন্যই রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের বিপক্ষে তারা অবস্থান নিয়েছিল বলে আমার মনে হয়।
বিএনপি নেতারা তখন যা বলেছিলেন
ঢাকায় ২২শে অক্টোবর রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাওয়ের পরদিন ২৩শে অক্টোবর প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে রাষ্ট্রপতি বিষয়ে আলোচনা করেন বিএনপির তিনজন সিনিয়র নেতা। সেখান থেকে বেরিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের বলেন, দেশে যাতে নতুন করে সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি না হয়, সে জন্য তাঁরা অন্তর্বর্তী সরকারকে খেয়াল রাখতে বলেছেন।
ওইদিনই বিএনপি চেয়ারপার্সনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হবে এবং এতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিলম্বিত হবে। তাই এই মুহূর্তে রাষ্ট্রপতির অপসারণ চায় না বিএনপি।
তিনি বলেন, এই পদটা একটা সাংবিধানিক পদ, একটা প্রতিষ্ঠান। সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ। এই পদে হঠাৎ করে পদত্যাগের মাধ্যমে শূন্যতা সৃষ্টি হলে সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হবে। রাষ্ট্রীয় সংকটের সৃষ্টি হবে।
অপসারণ বা পদত্যাগের দাবি কখন উঠেছিল
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই আন্দোলনকারীদের দিক থেকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি ওঠে। যদিও তার কাছেই শপথ নিয়েছিল অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।
ড. ইউনূস শপথ নেওয়ার পর আর কখনো বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি। এমনকি সরকার প্রধানের বিদেশ সফর শেষে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সফরের বিস্তারিত জানানো কিংবা কোনো চুক্তি হলে তা রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করার যে রাষ্ট্রাচারের প্রচলন ছিল, সেটিও অনুসরণ করা হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের দুই মাসেরও বেশি সময় পর ১৯শে অক্টোবর রাষ্ট্রপতির একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। এতে তিনি দাবি করেন, তিনি শুনেছেন, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন, কিন্তু তাঁর কাছে কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই।
এ ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল মন্তব্য করেন, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ নিয়ে রাষ্ট্রপতি মিথ্যাচার করেছেন।
২০২৪ সালের ২২শে অক্টোবর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ ও ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধের দাবিতে গণজমায়েত কর্মসূচি পালন করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। একইদিন বঙ্গভবনের সামনে অবস্থান নেয় একদল বিক্ষোভকারী। ইনকিলাব মঞ্চ, রক্তিম জুলাই’২৪, ৩৬ জুলাই পরিষদ, জিয়াউর রহমান সমাজকল্যাণ পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন পৃথকভাবে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে।
এক পর্যায়ে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবনের সামনের সড়ক অবরোধ করা হয় এবং রাতে ব্যারিকেড ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা চালানো হয়। পরে পুলিশ ও সেনা সদস্যদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
তখনকার তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকার রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি সাক্ষাৎকারে বলেন, রাত ১২টার সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা তখনকার তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ফোন করে বললেন, ‘এ রকম একটা খবর পাওয়া গেছে, ওরা আমাদের লোক না। আমি এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলেছি। এগুলো সব আমরা ডিসপার্স করার চেষ্টা করছি।’
বিএনপির ভূমিকা
সাক্ষাৎকারে মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতর থেকে তাকে অপসারণের চেষ্টা হয়েছিল গণ-অভ্যুত্থানের কিছু নেতার চাপে। তখন রাজনৈতিক দলগুলো ও অন্তর্বর্তী সরকার একটি সিদ্ধান্তে আসে—রাজনৈতিক দলগুলো চাইলে তবেই তিনি অপসারিত হবেন। তিনি বলেন, বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গীরা একটি গ্রুপ হয়ে যায়। আর আরেকটি গ্রুপ হয়ে যায়—তাদের আপনারা সবাই চেনেন। তবে তারা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। উদ্যোগটা ব্যর্থ হলো বিএনপি ও তাদের জোটের কারণে। একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক দল যে স্ট্যান্ড নিয়েছে, সেটাকে সরকার তখন সমর্থন করতে বাধ্য হলো।
রাষ্ট্রপতির দাবি, বিএনপির ‘উচ্চপদে আসীন’ নেতারা তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখতে তারা বদ্ধপরিকর এবং কোনো অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের পক্ষে তারা নন।
তিনি আরো বলেন, তিন বাহিনীর পক্ষ থেকেও তিনি সমর্থন পেয়েছেন। তারা শুধু একটি কথাই বলেছে, ‘মহামান্য, আপনি হচ্ছেন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান। আপনার পরাজিত হওয়া মানে পুরো সশস্ত্র বাহিনীর পরাজয়। এটা আমরা যেকোনো মূল্যে রোধ করব।’
কঠিন সময় হিসেবে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ওই সময়েও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব তার পাশে ছিলেন এবং সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষার বিষয়টি স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন।বিশেষ করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্পর্কে তিনি বলেন, তাকে ঘিরে আমার মনে অনেক কৌতূহল ছিল। কিন্তু পর্যায়ক্রমে বুঝেছি, তিনি খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ মানুষ। হি ওয়াজ সো কর্ডিয়াল! আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল।
