প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিবের আক্রোশের শিকার হয় বঙ্গভবনের প্রেস উইং
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:১২ এএম
সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেসসচিব শফিকুল। ছবি : সংগৃহীত
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাংবাদিকদের একটি সৌজন্য সাক্ষাৎকে কেন্দ্র করে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেসসচিব শফিকুল আলমের আক্রোশের জেরে বঙ্গভবনের প্রেস উইং কার্যত ভেঙে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। বর্তমানে বঙ্গভবনে কোনো কার্যকর প্রেস উইং নেই বলেও জানান তিনি।
গত শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রাতে বঙ্গভবনে নিজ কার্যালয়ে এক সংবাদমাধ্যম দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এ অভিযোগ করেন রাষ্ট্রপতি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, তাঁকে অপমান ও একঘরে করে রাখার ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই প্রেস উইং অচল করে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নির্বাচনে বিজয়ের পর নবনির্বাচিত কমিটির সদস্যরা সৌজন্য সাক্ষাতে বঙ্গভবনে আসেন। সাংবাদিকবান্ধব মনোভাব থেকে তিনি তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেটি ছিল একটি সাধারণ ও সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ, কিছু কথাবার্তা ও একটি ফটোসেশনের মধ্যেই তা শেষ হয়।
তবে পরদিন কয়েকটি পত্রিকায় ওই সাক্ষাতের খবর ছবিসহ প্রকাশিত হলে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে নেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। এরপর বঙ্গভবনের প্রেস উইংয়ের কে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত তা খুঁজতে চাপ প্রয়োগ করা হয়। রাষ্ট্রপতি দাবি করেন, বাস্তবে প্রেস উইংয়ের কেউ এতে জড়িত ছিলেন না, তিনি নিজেই সাংবাদিকদের চিঠি পেয়ে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
আরো পড়ুন : নতুন চাকরি পেলেন সদ্যসাবেক প্রেস সচিব শফিকুল
এরপরও প্রেস সেক্রেটারি, ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি ও অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রেস সেক্রেটারিসহ তিনজনকে একযোগে প্রত্যাহার করা হয় বলে অভিযোগ করেন রাষ্ট্রপতি। পাশাপাশি দীর্ঘ ৩০ বছর দায়িত্ব পালন করা দুইজন ফটোগ্রাফারকেও সরিয়ে নেওয়া হয়। ফলে পুরো প্রেস উইং কার্যত ভেঙে পড়ে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বর্তমানে বঙ্গভবনে কার্যকর কোনো প্রেস উইং নেই। এর ফলে রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে কোনো প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারি করা সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি জাতীয় ক্রিকেট দল আন্তর্জাতিক ম্যাচ জিতলেও রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে অভিনন্দনবার্তা জানিয়ে একটি সাধারণ প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার সুযোগও থাকছে না। পরিস্থিতিকে তিনি পুরোপুরি প্রতিবন্ধী করে দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন।
রাষ্ট্রপতি জানান, প্রেস উইং পুনরায় সচল করতে তিনি একাধিকবার ক্যাবিনেট সেক্রেটারি, প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি ও এস্টাবলিশমেন্ট সেক্রেটারির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তবে এ বিষয়ে কোনো সাড়া মেলেনি।
রাষ্ট্রপতির দাবি, জনগণের কাছে তাঁর উপস্থিতি বা এক্সপোজার সীমিত করার উদ্দেশ্যেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত রাষ্ট্রীয় ক্রোড়পত্রে তাঁর ছবি ও বাণী প্রকাশ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হলেও সেখানে রাষ্ট্রপতির কোনো বাণী রাখা হয়নি। গত দেড় বছরে তাঁর কোনো বাণী রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রকাশিত হয়েছে কি না, তা খোঁজ নিলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান এবং রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানিক পদ। রাষ্ট্রপতির দপ্তর বা বঙ্গভবন কেবল আনুষ্ঠানিক বাসভবন নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। সে কারণে প্রেস উইং রাষ্ট্র পরিচালনার যোগাযোগ কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত।
রাষ্ট্রীয় প্রোটোকল অনুসারে প্রেস উইংয়ের দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রপতির কর্মকাণ্ড, বক্তব্য, বাণী, শুভেচ্ছা ও রাষ্ট্রীয় অবস্থান জনগণ ও গণমাধ্যমের কাছে পৌঁছে দেওয়া। বিশ্বের অধিকাংশ গণতান্ত্রিক দেশে রাষ্ট্রপ্রধানের প্রেস উইং স্বাধীনভাবে কাজ করে এবং সরকারপ্রধানের দপ্তর থেকে পৃথক প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হয়।
প্রোটোকল অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ছবি, বাণী ও বক্তব্য জাতীয় দিবসের প্রকাশনা, রাষ্ট্রীয় ক্রোড়পত্র ও সরকারি যোগাযোগে অন্তর্ভুক্ত থাকা দীর্ঘদিনের রেওয়াজ। এটি রাষ্ট্রপ্রধানের ব্যক্তিগত বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতা ও সাংবিধানিক শিষ্টাচারের অংশ হিসেবে বিবেচিত।
