দ্য টাইমসের প্রতিবেদন
দেশের অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করাই তারেক রহমানের বড় চ্যালেঞ্জ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:৪৫ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
গত ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের পর এটি ছিল প্রথম জাতীয় নির্বাচন। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।
নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামপন্থি দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিই পালাক্রমে ক্ষমতায় থাকলেও জামায়াত কখনও এককভাবে সরকার গঠন করেনি। তবে এবারের নির্বাচনে তারা বিশেষ করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তবর্তী এলাকায় উল্লেখযোগ্য সমর্থন পায়।
সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিএনপি সরকার শুরুতে আইন প্রণয়নে স্বাধীনতা পেলেও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা দেখা দিতে পারে। একদিকে জামায়াতে ইসলামী এবং অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সুপ্ত জনসমর্থনের চাপের মুখে পড়তে পারে। তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান ও দুর্নীতিবিরোধী প্রত্যাশা দ্রুত পূরণ করা না গেলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া তারেক রহমানের রাজনৈতিক সাফল্য মূলত অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে।
বিএনপি ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের নামমাত্র জিডিপি ৪৬০ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রায় ৯ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, যেখানে বর্তমানে প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪ শতাংশ। দলটি শিক্ষা খাতে জিডিপির ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য খাতে ০.৭৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ বরাদ্দের অঙ্গীকার করেছে। তবে রাজস্ব আহরণের টেকসই পরিকল্পনা এখনো স্পষ্ট নয়। প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশে উন্নীত করা জরুরি।
উচ্চ সুদহার ও খাদ্যমূল্য বৃদ্ধিও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু মুদ্রানীতি নয়, সরবরাহ ব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যাই মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ। কৃষি খাত জিডিপির ১২ শতাংশ জোগান দেয় এবং প্রায় ৫ কোটি মানুষ এ খাতে যুক্ত। কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত ও শহরে খাদ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানো এবং ফসল-পরবর্তী লজিস্টিক খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
আরো পড়ুন : মাতৃভাষা দিবসের স্মারক ডাকটিকিট অবমুক্ত করলেন প্রধানমন্ত্রী
রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনা সরকারে জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। প্রায় ১ কোটি প্রবাসী বাংলাদেশি বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। গত তিন মাসে তারা প্রায় ৭.৫ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক সহায়তার সমপরিমাণ। অবৈধ হুন্ডি চ্যানেল থেকে বৈধ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঝোঁক বাড়ায় রেমিট্যান্স ২০২৩ সালের ২১ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৫ সালে ৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে নিয়ন্ত্রণ শিথিল হলে এ প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
শ্রম রপ্তানি খাতে দুর্নীতি ও নির্ভরতার ঝুঁকিও রয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ মানুষ বিদেশে কাজের জন্য যান, যদিও নতুন শ্রমবাজার সঙ্কুচিত হচ্ছে এবং সৌদি আরবের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের বিষয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ খান আহমেদ সাঈদ মুরশিদ বাস্তববাদী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, বড় পরিকল্পনার পাশাপাশি উচ্চ-প্রভাবশালী ছোট প্রকল্প বাস্তবায়ন জরুরি। শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ ও দুর্বল আর্থিক খাত সংস্কার এখন সময়ের দাবি। ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে উত্তরণও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে, কারণ এতে রফতানি সুবিধা কমে যেতে পারে।
পররাষ্ট্রনীতিতেও ভারসাম্য রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি নির্বাচনি ইশতেহারে আসিয়ানে যোগদানের ইচ্ছা প্রকাশ করলেও প্রথম বক্তব্যে তারেক রহমান সার্ককে গুরুত্ব দেন, যা তার পিতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে সার্ক বর্তমানে কার্যত নিষ্ক্রিয়।
মিয়ানমার সীমান্ত ও রোহিঙ্গা সংকট, ভারতের সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রতিযোগিতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা নতুন সরকারের জন্য জটিল সমীকরণ তৈরি করেছে। চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে বড় বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পোশাক রফতানির প্রধান বাজার। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন নতুন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার ইঙ্গিত দিয়েছেন, তবে চীনের সম্পৃক্ততার ঝুঁকি নিয়েও সতর্ক করেছেন।
সব মিলিয়ে, তারেক রহমানের সামনে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ, দুটিই বিশাল। অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা, এই তিন ক্ষেত্রেই তার নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা হবে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
