×
Icon এইমাত্র
কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কোটা আন্দোলনকারীরা বাংলাদেশ টেলিভিশনের মূল ভবনে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ। কোটা সংস্কার আন্দোলনে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ১৯ জন নিহত কোটা ইস্যুতে আপিল বিভাগে শুনানি রবিবার: চেম্বার আদালতের আদেশ ছাত্রলীগের ওয়েবসাইট হ্যাক ‘লাশ-রক্ত মাড়িয়ে’ সংলাপে বসতে রাজি নন আন্দোলনকারীরা

জাতীয়

ছাগলকাণ্ড

মতিউর রহমানের ঘরে আলাদীনের চেরাগ

Icon

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৪, ০৭:২১ এএম

মতিউর রহমানের ঘরে আলাদীনের চেরাগ

১. মতিউর রহমানের স্ত্রীর নামে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ৭ তলা বাড়ি। ২. নরসিংদীর রায়পুরায় ওয়ান্ডার পার্ক। ৩. মতিউর কন্যা ফারজানা ব্যবহার করেন ৪ কোটি টাকার এই গাড়ি। ৪. টঙ্গীতে এসকে ড্রিম ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড। ৫. নরসিংদীর নাগরিয়াকান্দি ব্রিজ এলাকায় গোল্ডেন স্টার পার্ক। ছবি: ভোরের কাগজ

১৫ লাখ টাকার ছাগলকাণ্ডে খোঁজ পাওয়া গেল রাঘববোয়াল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট ড. মো. মতিউর রহমানের। পুত্র মুশফিকুর রহমান ইফাত কাণ্ডে যেন আকাশ থেকে ভূপাতিত হলেন দেশজুড়ে আলোচিত উচ্চপদস্থ এই সরকারি কর্মকর্তা। ইফাত তার সন্তান নয় বলেও পার পেলেন না। ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী জানিয়েছেন, ইফাত তার মামাতো বোনের সন্তান। আর মতিউর রহমানই তার বাবা। ইফাত এনবিআর সদস্য মতিউর রহমানের দ্বিতীয় স্ত্রী শাম্মী আখতার শিভলী ওরফে শিবুর ছেলে বলে তিনি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন। 

মুশফিকুর রহমান ইফাত ছাড়াও মতিউর রহমানের মেয়ে ফারজানা রহমান ইপসিতার কানাডায় ল্যাম্বারগিনি নামে বিলাসবহুল গাড়ির ব্যবহারের ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। যার দাম প্রায় ৪ লাখ কানাডিয়ান ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ কোটি টাকা। শুধু এই দুই সন্তানের সম্পত্তি দেখে অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন। মতিউর রহমানের প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজ লাকির নামে নরসিংদীর রায়পুরার মরজালে শত বিঘা জমির ওপরে গড়ে তোলা হয়েছে লাকি পার্ক নামে আলিসান রিসোর্ট, যার বর্তমান নাম ওয়ান্ডার পার্ক। এ ছাড়াও নরসিংদীর নাগরিয়াকান্দির গোল্ডেন স্টার পার্কে রয়েছে অংশীদারত্ব। স্ত্রীর নামে মিলছে এমন অসংখ্য অবৈধ সম্পদের বিবরণ। 

গত ১৮ বছরের ব্যবধানে চার দফা উচ্চপদস্থ এই সরকারি কর্মকর্তার অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানে টিম গঠন করা হলেও রহস্যজনকভাবে প্রতিবারই অভিযোগ পরিসমাপ্তি করে তাকে দেওয়া হয় ‘ক্লিনচিট।’ তবে এবার তার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ্যে আসায় নড়েচড়ে বসেছে দুদক। হাইকোর্টও তার বিষয়ে অনুসন্ধান করতে নির্দেশনা দিয়েছেন। এরই মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মতিউর রহমানের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে। এদিকে ভোরের কাগজ অনুসন্ধানী টিম মতিউর রহমানের ঘরে আলাদীনের চেরাগের খোঁজ পেয়েছে। 

কে এই রাজস্ব কর্মকর্তা মতিউর রহমান?

মতিউর রহমানের বাড়ি বরিশালের মুলাদি উপজেলায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন মতিউর রহমান। ১১তম বিসিএসে বাণিজ্য ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন মতিউর রহমান। পরে এই ক্যাডারের সাত কর্মকর্তাকে কাস্টমস ক্যাডারে একীভূত করা হয়। মতিউর রহমানও তাদের মধ্যে একজন। পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনে (পিকেএসএফ) কর্মজীবন শুরু হয় তার। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত কাজ করেন সেখানে। সর্বশেষ উপ-ব্যবস্থাপক পদ থেকেই ১৯৯৩ সালের ১ এপ্রিল যোগ দেন কাস্টমস বিভাগে। ২০১৫ সালে পদোন্নতি পেয়ে কমিশনার হন তিনি। ২০২১ সালের ১২ আগস্ট তাকে কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালে সদস্য (টেকনিক্যাল) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট হিসেবে কর্মরত। তিনি সোনালী ব্যাংকের পরিচালক পদেও রয়েছেন।

মতিউর রহমানের দুই পরিবারে কে কে আছেন?

বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য মতিউর রহমানের ঔরসে দ্বিতীয় স্ত্রী শাম্মী আখতার শিভলীর গর্ভে জন্ম ভাইরাল হওয়া তরুণ মুশফিকুর রহমান ইফাত। মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল থেকে ২০২৩ সালে এসএসসি পাশ করা ইফাত এখন নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী। এই ঘরে আরও দুই সন্তান আছে। মেয়ের নাম ইফতিমা রহমান মাধবী। তিনি বারডেম মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাবিদ্যার ছাত্রী। আর ছেলে ইরফান ৭ বছরের শিশু। প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজ লাকী ছিলেন তিতুমীর কলেজের শিক্ষক। বর্তমানে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। তার গর্ভে জন্ম নেওয়া ছেলে তৌফিকুর রহমান অর্ণব। আমেরিকা থেকে শিক্ষাজীবন শেষে দেশে ফিরে ব্যবসায় যোগ দিয়েছেন তিনি। আর মেয়ে ফারজানা রহমান ইপসিতার বিলাসী জীবনের খোঁজ মিলেছে কানাডায়।

ঢাকা সিটি কলেজের ছাত্রী থাকা অবস্থায় বিবাহিত মতিউরের নজর কাড়েন শাম্মী আখতার শিভলী। এরপর তাকে বিয়ে করে সংসার সাজান লালমাটিয়ার নিজস্ব ফ্ল্যাটে। সেখানেই জন্ম হয় বড় মেয়ে ইফতিমা রহমান মাধবীর। জাতীয় পরিচয়পত্রে তার বাবার নাম মো. মতিউর রহমান। 

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, শুরুর দিকে লালমাটিয়ার একই ফ্ল্যাটে ছিল দুই স্ত্রীর বসবাস। কিন্তু তা সুখের হয়নি। দাম্পত্য কলহ চরমে পৌঁছালে লালমাটিয়া থেকে দ্বিতীয় স্ত্রী চলে আসেন অভিজাত এলাকা ধানমন্ডিতে। ৮ নম্বর রোডের ৪১/২ নম্বরে অবস্থিত ইম্পেরিয়াল সুলতানা ভবনের পাঁচতলায় আবাস গড়েন। পাঁচতলার পুরো ফ্লোর শাম্মী আখতারের নামে কিনে সাজানো হয় নজরকাড়া ইন্টেরিয়রে। প্রায় দুই কোটি টাকার সাজসজ্জার কাজের মধ্যে ৪০ লাখ টাকা ব্যয় করা হয় শুধু রান্নাঘরের সৌন্দর্যবর্ধনে। ইফাতের মামা নোকিবের তত্ত্বাবধানে ২ বছর আগে এসব কাজ করা হয়। এ বাড়িতে থাকতেই জন্ম হয় ইফাত ও ইরফানের। শাম্মীর গ্রামের বাড়ি ফেনীর সোনাগাজীর সোনাপুর গ্রামে। বাবার নাম মঈনদ্দিন হাওলাদার। ছবি ও বুবলি নামে দুই বোন রয়েছে শিভলীর। তার আরেকটি পরিচয় রয়েছে। তিনি ফেনী-২ আসনের সংসদ-সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারীর মামাতো বোন। 

বেনাপোল বন্দর কাস্টমসে মতিউরের ‘অবৈধ আয়ের’ হাতেখড়ি

১৯৯৬ ও ১৯৯৭ এই দুই বছর বেনাপোল বন্দর কাস্টমসের সহকারী কমিশনার ছিলেন মতিউর রহমান। তৎকালীন সময়েই তার বিরুদ্ধে বেপরোয়া ঘুস ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। সেখানকার একজন ব্যবসায়ী জানান, তৎকালীন সময়ে বেনাপোল বন্দর দিয়ে বিপুল পরিমাণে সিগারেট তৈরির কাগজ আমদানি হতো। মোটা অঙ্কের ঘুসের বিনিময়ে কাগজ আমদানিতে ব্যবসায়ীদের অনৈতিক সুবিধা দিতেন মতিউর। এতে প্রতি ট্রাক কাগজ ছাড় করাতে সরকার রাজস্ববঞ্চিত হতো অন্তত অর্ধকোটি টাকা। সুবিধাভোগীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন যশোরের ঝিকরগাছার সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী নাজমুল ইসলাম। কিন্তু এক পর্যায়ে ঘুসের অঙ্ক নিয়ে তার সঙ্গে মতিউরের বিরোধ বাধে। তখন মতিউর রহমান নাজমুলের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনে থানায় মামলাও করেছিলেন। দুই বছর দায়িত্ব পালনকালে বেনাপোল বন্দর থেকেই তিনি অঢেল কামিয়েছিলেন। সেখান থেকেই মূলত তার ‘অবৈধ আয়ের’ হাতেখড়ি বলে জানা গেছে।

যেভাবে মতিউর রহমানের উত্থান

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ক্যাডার পরিবর্তন করে বাণিজ্য ক্যাডারের ১১ ব্যাচ থেকে কাস্টমসের ১৩ ব্যাচের সঙ্গে যোগ দেন ড. মতিউর রহমান। নতুন ক্যাডারে যুক্ত হওয়ার পরই প্রভাব-প্রতিপত্তি ও সম্পদ বাড়তে থাকে তার। ড. মতিউর রহমানের উত্থান মূলত ২০০৯ সালে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের যুগ্ম কমিশনার থাকাকালে। পরে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক জায়গায় পদায়ন হয়েছে তার। সাবেক এক চেয়ারম্যানের আস্থাভাজন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ) ভ্যাটের কমিশনার হিসেবে। সেই সময় বিভিন্ন কোম্পানিতে ভ্যাট ডিমান্ড করে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বর্তমানে তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য হিসেবে কাস্টম ও ভ্যাট অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট পদে দায়িত্ব পালন করছেন। মাঝে ১৫ বছরে নামে-বেনামে গড়ে তুলেছেন অঢেল সম্পদ। এই তালিকায় আছে পুঁজিবাজারের ব্রোকারেজ হাউসের অংশীদারত্ব থেকে শুরু করে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার, জমি ও বিনোদন পার্ক। সন্তানদের নামে রয়েছে ডজনখানেক কোম্পানির মালিকানা।

শেয়ার মার্কেটে ‘গেমলার’ হিসাবে পরিচিত মতিউর

দুদক সূত্রে জানা গেছে, মতিউর রহমান শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রকদের মধ্যে অন্যতম একজন। বাজারসংশ্লিষ্টদের কাছে তার পরিচয় ‘গেমলার’ হিসাবে। তার সঙ্গে দুদকের অনেক কর্মকর্তার ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকায় তিনি পার পেয়ে যান। মতিউর রহমানের দাবি, তার বিপুল সম্পদের মূল উৎস পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ। তবে সেখানেও বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার নিয়ে রয়েছে কারসাজির অভিযোগ। তিনি সরকারি কর্মকর্তা হলেও শেয়ারবাজারে প্লেসমেন্ট শেয়ারের বড় ব্যবসায়ী। তিনি নিজেও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এনটিভিতে (১৯ জুন প্রচারিত) এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি বিভিন্ন কোম্পানির প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) ওই কোম্পানির মালিকদের কাছ থেকে কম দামে কিনে নিয়ে পরে বাজারে বেশি দামে বিক্রি করে অনেক মুনাফা করেছেন।

চার দফা বাঁচলেও এবার কি ফেঁসে যাচ্ছেন মতিউর রহমান?

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য মো. মতিউর রহমান যেন জাদুর বংশীবাদক। তার বাঁশির সুরে বারবার বশ মেনেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সম্প্রতি ১৫ লাখ টাকার ছাগলকাণ্ডে দেশজুড়ে আলোচিত উচ্চপদস্থ এই সরকারি কর্মকর্তার অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানে গত ১৮ বছরের ব্যবধানে চার দফা টিম গঠন করা হয়। রহস্যজনকভাবে প্রতিবারই অভিযোগ পরিসমাপ্তি করে তাকে দেওয়া হয় ‘ক্লিনচিট।’ এ নিয়ে সংস্থার ভেতরে-বাইরে নানা গুঞ্জন রয়েছে। তবে এবার মতিউরের বিরুদ্ধে সম্পদের অনুসন্ধানের জন্য টিম গঠনের শক্ত সুপারিশ করে কমিশনে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে সংস্থাটির যাচাই-বাছাই কমিটি (যাবাক)। 

জানা গেছে, সবশেষ গত ৪ জুন যাবাকের আহ্বায়ক দুদক মহাপরিচালক মো. মোকাম্মেল হক সভায় উপস্থাপন করেন, এনবিআর সদস্য মো. মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সভায় আরও জানানো হয় যে, একই ধরনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অনুসন্ধানপূর্বক চারবার পরিসমাপ্ত করা হয়। সভায় বিস্তারিত আলোচনা শেষে মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ একটি টিম গঠনপূর্বক প্রকাশ্যে অনুসন্ধান করার বিষয়ে কমিশন একমত পোষণ করে। সভায় একটি টিম গঠন করে প্রকাশ্যে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত হয়, পরিসমাপ্তিকৃত চারটি অনুসন্ধান প্রতিবেদন ও তৎসংশ্লিষ্ট নথি খুঁজে বের করতে হবে। নথি খুঁজে না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার দায়ে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

এক জাদুর বংশীবাদকের নাম মতিউর

অভিযোগ আছে, কাস্টমসের সহকারী কমিশনার থেকে বর্তমানে এনবিআর সদস্য হয়েছেন তিনি। আর এর মধ্যেই তিনি নামে-বেনামে, দেশে-বিদেশে অন্তত কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদ করেছেন। এসব সম্পদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়ার পর দুদক তার বিরুদ্ধে প্রথম অনুসন্ধান টিম গঠন করে ২০০০ সালের দিকে। তখন দীর্ঘ সময় অনুসন্ধান ঝুলিয়ে রেখে ২০০৪ সালে অভিযোগ পরিসমাপ্তি করা হয়। এরপর একই কায়দায় ২০০৮, ২০১৩ ও ২০২১ সালে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পরিসমাপ্তি করে তাকে ‘ক্লিনচিট’ দেওয়া হয়। ফলে দুদকের ভেতরেই গুঞ্জন ওঠে মতিউর এক জাদুর বংশীবাদক। তার পাগল করা বাঁশির সুরে সব অনুসন্ধান টিমের সদস্যই বশ মেনেছেন।

মতিউরের দুই সন্তানের নামে ১২টি কোম্পানির অংশীদারত্ব! 

মতিউর রহমান এই তরুণকে ছেলে হিসেবে অস্বীকার করলেও ইফাতের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া দুটি গাড়ির রেজিস্ট্রেশন তার পারিবারিক মালিকানাধীন কোম্পানি এসকে ট্রিমস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও গ্লোবাল ম্যাক্স প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজের নামে। আর এই দুটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় রয়েছেন মতিউর রহমানের দুই সন্তান তৌফিকুর রহমান অর্ণব ও ফারজানা রহমান ইপসিতা। ইফাত মতিউর রহমানের সন্তান না হলে তার পরিবারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের গাড়ি কীভাবে পেল—এমন প্রশ্ন উঠেছে। সেইসঙ্গে একজন সরকারি কর্মকর্তা কীভাবে এত টাকার মালিক হলেন—সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

মতিউর রহমানের দাবি, তার সব সম্পদ বৈধ এবং পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ থেকে আসা মুনাফার মাধ্যমে অর্জিত। তবে অনুসন্ধানে তার দুই সন্তান অর্ণব ও ইপসিতার নামে পুঁজিবাজার এবং এর বাইরের প্রায় ডজনখানেক কোম্পানির অংশীদারত্বের নথিপত্র এসেছে। এসব নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গাজীপুরের গ্লোবাল সু ও গ্লোবাল ম্যাক্স প্যাকেজিং কোম্পানিতে তার দুই সন্তান অর্ণব ও ইপসিতার মালিকানা রয়েছে। আর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বেশ কয়েকটি কোম্পানিতে এই দুই প্রতিষ্ঠানের নামে কৌশলে প্লেসমেন্ট শেয়ার নেন মতিউর রহমান। আর গ্লোবাল ম্যাক্সের মালিকানা রয়েছে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানি এসকে ট্রিমস ইন্ডাস্ট্রিজে। ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান শাহজালাল ইক্যুইটিতেও মালিকানা রয়েছে তার। শুধু ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি নয়, অ্যাসোসিয়েট অক্সিজেন নামে পুঁজিবাজারের আরেক কোম্পানিতে ২৭ লাখ ৪৫ হাজার ৫০০ শেয়ার রয়েছে।

জানা গেছে, মতিউর রহমান বসুন্ধরার আবাসিক এলাকায় থাকেন। তার পারিবারিক মালিকানাধীন বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের হেড অফিসও ওই এলাকায়। এ ছাড়া মতিউর রহমানের ছেলে অর্ণবের নামে অর্ণব ট্রেডিং নামেও একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ ছাড়া তার মেয়ের ল্যাম্বারগিনি নামে বিলাসবহুল গাড়ির ব্যবহারের ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। যার দাম প্রায় ৪ লাখ কানাডিয়ান ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ কোটি টাকা।

মতিউরের প্রথম স্ত্রী নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার চেয়ারম্যান

জানা গেছ, শুধু রাজধানী ঢাকা বা গাজীপুরে নয়, মতিউর রহমান অঢেল সম্পত্তি কিনেছেন শ্বশুরবাড়ি নরসিংদীতেও। তার স্ত্রী লায়লা কানিজ আগে সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ছিলেন। এখন চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দিয়েছেন। আর প্রভাবশালী স্বামীর প্রভাবে ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও দুর্যোগবিষয়ক সম্পাদকের পদ বাগিয়ে নেন।

মতিউরের প্রথম স্ত্রীর নামে এত সম্পদ! 

শিক্ষক থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া লায়লার নামে পার্ক-রিসোর্ট থেকে শুরু করে রয়েছে বাণিজ্যিক এলাকায় কোটি কোটি টাকার জমি-প্লট। এ ছাড়া রাজধানীর বসুন্ধরার ডি ব্লকের ৭/এ রোডের ৩৮৪ নম্বর বাড়িতে স্ত্রী লায়লা কানিজের নামে রয়েছে একটি ফ্ল্যাট। বসুন্ধরার ডি ব্লকে রয়েছে ৫ কাঠায় ৭ তলা বাড়ি, যার দোতলায় মতিউর রহমান পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। এ ছাড়াও গাজীপুর সদর, খিলগাঁও মৌজায় এসএ ১৭১ আরএস ২৮০ দাগে ১০ দশমিক ৫০ শতক; এসএ ১৭২ আরএস ২০১ দাগে ৩ দশমিক ৯০ শতক; এসএ ১৬৩ আরএস ২৭৫ দাগে ৭ দশমিক ৫০ শতক, এসএ ১৬৩ আরএস ২৭৬ দাগে ৬ শতক; এসএ ১৭০ আরএস ২৭৯ দাগে ৬ শতক; এসএ ১৬৩ আরএস ২৭৬ দাগে ৭ শতক; এসএ ১৭০ আরএস ২৭৯ দাগে ৬ শতক; গাজীপুর থানার খিলগাঁও মৌজায় ৩৫৫৭ জোতে ৪৮ দশমিক ১৬ শতাংশ, জোত ৩৪৫০-এ ১৪ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং জোত ৩৬৫২-এ ছেলে আহমেদ তৌফিকুর রহমান অর্ণব, স্ত্রী লায়লা কানিজের নামে শূন্য দশমিক ৪৫১৬২৫ একর জমি রয়েছে। গ্লোবাল সুজ লিমিটেড কোম্পানির নামে জোত ১২৫-এ ৩৪৩৪৫ শতক, জোত ৭০-এ ২৮০০ শতক, জোত ৯০-এ শূন্য দশমিক ০৩৩০ শতক জমি রয়েছে। এই ৭টি খতিয়ান মিলিয়ে মোট জমির পরিমাণ ৬০ শতাংশ। এ ছাড়াও সাভার থানার বিলামালিয়া মৌজায় খতিয়ান ১৩০৩৫ দাগ ১৭৬৩ ও ১৭৬২-এ ১২ দশমিক ৫৮ শতক জমি রয়েছে। লায়লা কানিজের নামে সাভার থানার বিলামালিয়া মৌজায় খতিয়ান ১৩৬৯৬-এ ১৪ দশমিক ০৩ শতাংশ জমি রয়েছে।

মতিউর রহমানের প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজ লাকির নামে নরসিংদীর রায়পুরার মরজালে শত বিঘা জমির ওপরে গড়ে তোলা হয়েছে লাকি পার্ক নামে আলিসান রিসোর্ট, যার বর্তমান নাম ওয়ান্ডার পার্ক। এ ছাড়াও নরসিংদীর নাগরিয়াকান্দির গোল্ডেন স্টার পার্কে রয়েছে অংশীদারত্ব। এসব পার্ক করতে গিয়ে জায়গা দখলেরও অভিযোগ রয়েছে।

যা বলছেন টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান 

এ ব্যাপারে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘আগে পরিসমাপ্তি হলে যে নতুন করে ফের অনুসন্ধান করা যাবে না তার বিধান নেই। কাজেই এখন নতুন করে যেহেতু বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে সেহেতু আমরা আশা করব দুদক তো বটেই, সরকারের অন্যান্য সংস্থাও বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেবে। তিনি সম্পদ আড়াল করার জন্য বিষয়টি হয়েছে কি না—তাও খতিয়ে দেখা দরকার। মতিউর রহমান শেয়ারবাজারে ব্যবসা করে অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন, এটা তার যুক্তি। এই যুক্তি তার আয়ের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ তা খতিয়ে দেখতে হবে।’

টাইমলাইন: ছাগলকাণ্ডে বিপাকে মতিউর

আরো পড়ুন

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App