×

জাতীয়

দেশের কারাগারে কনডেম সেলে কত বন্দি?

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৪, ১২:৩৬ এএম

দেশের কারাগারে কনডেম সেলে কত বন্দি?

ছবি: সংগৃহীত

বিভিন্ন মামলায় সারা দেশের কারাগারে মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে কনডেম সেলে রয়েছেন ২ হাজার ৫৫৬ জন বন্দি। এসব আসামিকে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ হিসেবে পরিচিত নির্জন কনডেম (ডেথ) সেলে বন্দি রাখা হয়েছে। তাদের সবারই আপিল ও ডেথ রেফারেন্স দেশের সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন। কারো কারো আপিল বিচারাধীন হাইকোর্টে। আর কারো আপিল বিচারাধীন আপিল বিভাগে।

এদিকে তাদের বিচার কবে শেষ হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে চূড়ান্ত বিচারের আগে ডেথ সেলে রাখাটা অমানবিক। এতে অনেকেই অবিচারের শিকার হচ্ছেন।

জানা গেছে, বর্তমানে বিচারিক আদালত থেকে ২০১৭ ও ২০১৮ সালে পাঠানো ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর হাইকোর্টে শুনানি চলছে। এসব মামলার আসামি ৬ থেকে ৭ বছর ধরে কনডেম সেলে বন্দি রয়েছেন। এ ছাড়াও রমনা বটমূলে বোমা হামলার ঘটনায় করা হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্সের বিচারসহ ব্যতিক্রম দু-একটি মামলার বিচার ঝুলে আছে আরো দীর্ঘ সময় ধরে। বর্তমানে উচ্চ আদালতে এ ধরনের প্রায় এক হাজার ডেথ রেফারেন্স মামলা বিচারাধীন।

কারা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, হাইকোর্টে বিচারাধীন এসব মামলায় আসামি ১২ শতাধিক। এ ছাড়া ১৩ শতাধিক আসামির আপিল বিচারাধীন আপিল বিভাগে। আপিল বিভাগে বিচারাধীন এসব আসামির বেশিরভাগই এক যুগের বেশি সময় ডেথ সেলে বন্দি রয়েছেন। তার পরও কবে তাদের অপেক্ষার প্রহর শেষ হবে তার নিশ্চয়তা নেই।

এক অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২২ সালে সেপ্টেম্বরে চলা অবকাশে দেড় মাসে ২৯টি ডেথ রেফারেন্স মামলার রায় হয়। এসব মামলায় ৭৭ আসামির মধ্যে ৫০ সজনেরই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অনুমোদন দেয়া হয়নি। শতকরা হিসাবে এটি দাঁড়ায় ৬৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এর আগে ওই বছরের ২০ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত চলা অবকাশে হাইকোর্টের ১১টি বিশেষ বেঞ্চে ৩০টি ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তি হয়। এসব মামলায় ৬৭ আসামির মধ্যে ৫৮ জনের মৃত্যুদণ্ড টেকেনি হাইকোর্টে। শতকরা হিসাবে এটি দাঁড়ায় ৮৬ দশমিক ৫৬ ভাগ। হাইকোর্টে যাদের ফাঁসির আদেশ বহাল থাকে তাদের আবার বড় একটি অংশের সাজা কমে যায় অথবা খালাস পান আপিল বিভাগের রায়ে। 

আইনজীবীদের মতে, বিচারিক আদালতে ফাঁসির আদেশপ্রাপ্তদের মধ্যে চূড়ান্ত ধাপে ফাঁসির আদেশ বহাল থাকে সর্বোচ্চ ৫ থেকে ১০ শতাংশ আসামির। বাকি আসামিরা হয় খালাস পান, তা না হলে সাজা কমে যায়। কিন্তু চূড়ান্ত রায়ের আগেই কনডেম সেলে কাটাতে হয় বছরের পর বছর। বিষয়টি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারের লঙ্ঘন বলছেন আইনজীবীরা।

জানা যায়, বিচারিক আদালতে কারো মৃত্যুদণ্ড হলে কারাবিধি (বাংলাদেশ জেল কোড) ৯৮০ অনুযায়ী তাকে কারাগারের বিশেষ সেলে রাখা হয়, যা কনডেম সেল নামে পরিচিত। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা অনুযায়ী, হাইকোর্টের অনুমোদন ছাড়া ফাঁসির সাজা কার্যকর করা যায় না। এ জন্য বিচারিক আদালতে কারো ফাঁসির আদেশ হলেই দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির রায়সহ যাবতীয় নথি হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় পাঠাতে হয়। এটিকে বলে ডেথ রেফারেন্স। পেপারবুক তৈরি সাপেক্ষে মামলাগুলো পর্যায়ক্রমে শুনানির জন্য কার্যতালিকায় ওঠে। অন্যদিকে বিচারিক আদালতের মৃত্যুদণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আসামিরা আপিল ও জেল আপিলের সুযোগ পান। হাইকোর্টে সর্বোচ্চ সাজা বহাল থাকলে আসামিরা আপিল বিভাগে আপিল ও জেল আপিল করতে পারেন। আপিল বিভাগের রায়েও মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলে সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদ অনুসারে আপিল বিভাগের রায় রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) চেয়ে আবেদন করার সুযোগ আছে। এ ছাড়া সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুসারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারেন। ক্ষমার এই আবেদন রাষ্ট্রপতি যদি না মঞ্জুর করেন অথবা দণ্ডিত আসামি যদি আবেদন না করেন তাহলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে পারে সরকার। তবে আগেই অনেক আসামি খালাস পেয়ে যান। উচ্চ আদালতের রায়ে নির্দোষ প্রমাণিত হলেও এর আগেই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের অনেকেরই কনডেম সেলে বন্দি থাকতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে ড. শাহদীন মালিক বলেন, একজন আসামির চূড়ান্ত বিচার হতে এক থেকে দেড় যুগ লেগে যাচ্ছে। এতদিন কনডেম সেলে রাখার অর্থ আসামির প্রতি নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণ করা যা সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। চূড়ান্ত বিচারের আগেই কাউকে কনডেম সেলে না নেয়াটা হবে মানবিক ও বিবেচনাপ্রসূত। আশা করব হাইকোর্ট এ বিষয়ে যে রায় দিয়েছেন, রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে আপিল করা থেকে বিরত থাকবে। তা না হলে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। অনেকেই অবিচারের শিকার হয়ে যাচ্ছেন।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App