মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরানের অস্ত্রভাণ্ডারে যা আছে
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ মার্চ ২০২৬, ০৯:১৩ এএম
ছবি : সংগৃহীত
শনিবার ( ২৮ ফেব্রুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর দ্রুত পাল্টা জবাব দিতে শুরু করেছে ইরান। তেহরান জানিয়েছে, তাদের প্রতিশোধমূলক হামলা ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন ঘাঁটি-সংযুক্ত স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করেই চালানো হয়েছে।
এই প্রথম দফার পাল্টাপাল্টি আঘাতের পর আন্তর্জাতিক মহলে বড় প্রশ্ন, এটি কি সীমিত প্রতিশোধের চক্রেই থামবে, নাকি ইরানের দীর্ঘপাল্লার আঘাতক্ষমতা, মিত্রগোষ্ঠী ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর চাপকে কেন্দ্র করে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে রূপ নেবে?
কেন পরিস্থিতি এবার ভিন্ন?
২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনের সংঘাতের তুলনায় এবারের প্রেক্ষাপট আলাদা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। খামেনি নিহত হওয়ায় তেহরান এটিকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, খামেনেই ও অন্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া দেশের দায়িত্ব ও বৈধ অধিকার।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কৌশল
ইরানের সামরিক কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে তার বিস্তৃত ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এটি মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় ও বৈচিত্র্যময় ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ উভয় ধরনের অস্ত্রই রয়েছে এতে। আধুনিক যুদ্ধবিমান স্বল্পতার কারণে তেহরান ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকেই তাদের প্রতিরোধের মেরুদণ্ড হিসেবে মনে করে।
ইরানের দীর্ঘপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ২,০০০ থেকে ২,৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত যেতে সক্ষম। এর ফলে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত বহু মার্কিন ঘাঁটি এর আওতায় পড়ে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড এ পরিসরের বাইরে।
স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র
১৫০ থেকে ৮০০ কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কাছাকাছি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে দ্রুত হামলার জন্য ব্যবহৃত হয়। ফাতেহ সিরিজ, জুলফিকার, কিয়াম-১ ও শাহাব-১/২ নামের এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এই শ্রেণিতে পড়ে। ২০২০ সালে কাসেম সোলাইমানি হত্যার জবাবে ইরাকের আইন আল-আসাদ ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় এ কৌশল দেখা গিয়েছিল।
মধ্যপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র
১,৫০০ থেকে ২,০০০ কিলোমিটার পাল্লার শাহাব-৩, ইমাদ, গদর-১, খোররামশাহর, সেজ্জিল, খেইবার শেকান ও হাজ কাসেম ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলসহ কাতার, বাহরিন, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির বিভিন্ন মার্কিন-সংযুক্ত স্থাপনাকে আওতায় আনে। সেজ্জিলের মতো কঠিন জ্বালানিভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র দ্রুত উৎক্ষেপণ করা যায়।
ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন
সৌমার, হোভেইজেহ, পাভেহ ও রা’দ এর মতো ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিম্নউড়ানে লক্ষ্যভেদ করতে পারে। পাশাপাশি একমুখী আক্রমণাত্মক ড্রোন একাধিক তরঙ্গে পাঠিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্লান্ত করে দেওয়ার কৌশলও ব্যবহার করা হতে পারে।
ভূগর্ভস্থ ‘মিসাইল সিটি’
ইরান বহু বছর ধরে ভূগর্ভস্থ টানেল ও সুরক্ষিত উৎক্ষেপণকেন্দ্র গড়ে তুলেছে। ফলে প্রথম দফার হামলার পরও আঘাত চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে তারা।
হরমুজ প্রণালী
বিশ্বের বড় অংশের জ্বালানি এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। অ্যান্টিশিপ ক্ষেপণাস্ত্র, নৌ-মাইন, ড্রোন ও দ্রুতগতির নৌযান দিয়ে ইরান বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) হরমুজের কাছে মার্কিন ও যুক্তরাজ্য-সংযুক্ত তেলবাহী জাহাজে হামলার দাবি করেছে। ডেনমার্কের শিপিং কোম্পানি মার্স্ক প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল সাময়িক স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরে নৌ ও বিমান শক্তি জোরদার করেছে। এতে প্রতিরক্ষা ও পাল্টা হামলার সক্ষমতা বাড়লেও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকাও দীর্ঘ হয়েছে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরেই বলছে, তাদের ভূখণ্ডে হামলা মানেই বৃহত্তর যুদ্ধ। খামেনি নিহত হওয়ার পর সে বার্তা আরো কঠোর হয়েছে। পাশাপাশি লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুথিদের মতো ইরান-ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোও তেহরানের পাশে থাকার ইঙ্গিত দিয়েছে।
সব মিলিয়ে, ইরানের হাতে রয়েছে বহুমাত্রিক আঘাতক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, নৌ-চাপ ও মিত্রগোষ্ঠীর নেটওয়ার্ক। সংঘাত এখন সীমিত পাল্টাঘাতে থামবে, নাকি দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে, তা নির্ভর করছে পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।
