ফিলিস্তিনে সংবাদ প্রচারে বাধা দিচ্ছে ফেসবুক
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৯:৩১ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর নৃসংশ হামলার পর, ফিলিস্তিনের সংবাদমাধ্যমগুলোর সংবাদ পৌঁছাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়ছে। বিশেষত, ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে ফিলিস্তিনি সংবাদমাধ্যমগুলোর পোস্টে পাঠক-দর্শকদের সম্পৃক্ততা কমে গেছে, যা বিবিসির একটি গবেষণায় উঠে এসেছে।
বিবিসি তাদের বিশ্লেষণে দেখেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ফিলিস্তিনের গাজা ও পশ্চিম তীরের সংবাদমাধ্যমগুলোর পোস্টে মানুষের সম্পৃক্ততা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। তাদের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ফিলিস্তিনি সংবাদমাধ্যমের কনটেন্টে রিচ ৭৭ শতাংশ কমে গেছে। উদাহরণ হিসেবে, প্যালেস্টাইন টিভির ফেসবুক পেজে ৫৮ লাখ ফলোয়ার থাকা সত্ত্বেও তাদের পোস্টের পৌঁছানো প্রায় ৬০ শতাংশ কমে গেছে। চ্যানেলটির সাংবাদিক তারিক জিয়াদ জানান, ফেসবুক তাদের পোস্টগুলোর ওপর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে এবং মানুষের কাছে তাদের সংবাদ পৌঁছানো বন্ধ হয়ে গেছে।
ফিলিস্তিনি সাংবাদিকরা দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছেন যে, মেটা (ফেসবুকের মূল কোম্পানি) তাদের কনটেন্টে "ছায়া নিষেধাজ্ঞা" আরোপ করেছে। এটি এমন একটি পদক্ষেপ, যার ফলে ফিলিস্তিনি সংবাদমাধ্যমগুলোর কনটেন্টের দেখা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, যদিও মেটা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এদিকে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ফিলিস্তিনির ওপর ইনস্টাগ্রামে মন্তব্যের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। বিবিসি এর মধ্যে কিছু ফাঁস হওয়া নথি বিশ্লেষণ করে দেখতে পেয়েছে যে, হামাসের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার পর মেটার নীতিমালা কঠোর হয়ে গেছে, যা ফিলিস্তিনিদের কণ্ঠরোধের অভিযোগ এনে দিয়েছে।
ফিলিস্তিনিরা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের সংবাদ ও প্রতিবেদন ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও, একদিকে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর প্রবল হামলা ও অপরদিকে ফেসবুকের কড়াকড়ি তাদের কাজ আরও কঠিন করে তুলছে। গাজার সাংবাদিকরা, যেমন ফটো সাংবাদিক ওমর আল কাতা, জানিয়েছেন যে, অনেক ছবি এবং ভিডিও সঠিকভাবে প্রচার করা যাচ্ছে না, কারণ সামাজিক মাধ্যমের বিধিনিষেধ রয়েছে। তারা বলেন, "আমরা জানি, এই চ্যালেঞ্জের মুখেও আমরা ফিলিস্তিনের খবর প্রচার অব্যাহত রাখব।"
এদিকে, ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। বিবিসি তাদের বিশ্লেষণে দেখতে পেয়েছে, ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলোর ফেসবুক পেজে যুদ্ধসংক্রান্ত কনটেন্ট প্রচারের পরেও তাদের পাঠক-দর্শক প্রায় ৩৭ শতাংশ বেড়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ফিলিস্তিনি সংবাদমাধ্যমগুলোর বিপরীতে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের কনটেন্ট সামাজিক মাধ্যমগুলোতে আরও সহজে ছড়িয়ে পড়ছে।
এ বিষয়ে মেটা জানিয়েছে, তারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত রাখতে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। তারা দাবি করেছে, তারা ভুল করে থাকে, তবে ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো কণ্ঠস্বর দমন করার অভিযোগ মিথ্যা। মেটার মতে, তাদের সাময়িক নীতিমালার পরিবর্তন যুদ্ধের পরিস্থিতি এবং নিরাপত্তা কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে ফিলিস্তিনির সংবাদমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপের পরিণতি হিসেবে তাদের কনটেন্টের ব্যাপক সীমাবদ্ধতা দেখা যাচ্ছে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় শুরু হওয়া যুদ্ধের পর, ১৩৭ জন ফিলিস্তিনি সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছেন, এবং এসব সাংবাদিকরা তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে বিপুল চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছেন। সামাজিক মাধ্যমের বিধিনিষেধ এবং অন্যান্য সংকট সত্ত্বেও ফিলিস্তিনি সাংবাদিকরা তাদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে কাজ করে যাচ্ছেন।
এই পরিস্থিতি সারা পৃথিবীতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়ে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা এবং তার মাধ্যমে সংবাদ প্রচারের সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত হচ্ছে।
