প্রশাসন, পুলিশ ও শিক্ষা খাতে ব্যাপক রদবদল আসছে
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:৫১ এএম
ছবি : সংগৃহীত
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দ্রুত পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জনপ্রশাসন, পুলিশ ও শিক্ষা প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদল শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবং পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) পদে নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে থাকা ৯ জন সচিব ও জ্যেষ্ঠ সচিবের চুক্তি বাতিল, কয়েকজন সচিবকে সংযুক্ত করা এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য হয়ে পড়ায় প্রশাসনে বড় পরিসরে পুনর্বিন্যাস প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি পরিবর্তনের প্রথম ধাপ, আগামী দিনে আরো সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
সচিবালয়ের একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের ফলে বর্তমানে অন্তত ১২টি সচিব ও সমপর্যায়ের পদ ফাঁকা রয়েছে। এসব পদে দ্রুত নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। জেলা প্রশাসক (ডিসি) পর্যায়েও পরিবর্তনের আভাস মিলছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতেও ধাপে ধাপে রদবদল আসতে পারে।
এরই মধ্যে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সচিব মো. আবদুর রহমান তরফদারকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে বদলি করা হয়েছে। অন্যদিকে শ্রমসচিব মো. সানোয়ার জাহান ভূঁইয়াকে পিএসসির সচিব পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া অবসরপ্রাপ্ত সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব হিসেবে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার পরিবর্তনের পর কিছু রদবদল স্বাভাবিক। তবে নিয়োগ ও পদায়নে মেধা ও যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। কেউ যেন অযৌক্তিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেটিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নানা আলোচনা চলছে। পদায়ন ও বদলি নিয়ে তদবির বাড়ার কথাও শোনা যাচ্ছে।
আরো পড়ুন : তারেক রহমানের সভাপতিত্বে নতুন একনেক গঠন
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যাপক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিষয়টিও এখন আলোচনায় এসেছে। অনেকের মতে, তখন নিয়োগ পাওয়া কিছু কর্মকর্তার দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে একান্ত প্রয়োজন ছাড়া নতুন করে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ না দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন অনেকে।
সরকার গঠনের এক সপ্তাহের মধ্যেই জনপ্রশাসনে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পৃথক প্রজ্ঞাপনে তিন সচিবকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। তাঁরা হলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. সাইফুল্লাহ পান্না, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীন এবং ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামাল উদ্দিন।
একই সঙ্গে চুক্তিতে থাকা নয়জন সচিব ও জ্যেষ্ঠ সচিবের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করা হয়েছে। এর আগে মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আবদুর রশীদ ও প্রধান উপদেষ্টার মুখ্যসচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব নাসিমুল গনিকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার সাবেক তিন অতিরিক্ত সচিবকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে পদোন্নতির মাধ্যমে দায়িত্ব দিয়েছিল।
নতুন সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব অবসরপ্রাপ্ত সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার।
প্রশাসনের পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীতেও পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। নতুন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন আলী হোসেন ফকির। আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক পদ থেকে পদোন্নতি দিয়ে তাঁকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পুলিশের আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আসতে পারে। ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার পদ নিয়েও আলোচনা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও বাহিনীর প্রতি জনআস্থা পুনর্গঠনের লক্ষ্য সামনে রেখেই এসব পরিবর্তন হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের (সিআইসি) মহাপরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মোহাম্মদ আবদুর রকিবকে। তিনি এত দিন এনবিআরের আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিটে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
উচ্চশিক্ষা প্রশাসনেও পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়াজ আহমদ খান অব্যাহতির আবেদন জমা দিয়েছেন। নতুন উপাচার্য নিয়োগের প্রস্তুতি চলছে। বিএনপিপন্থী কয়েকজন শিক্ষকের মধ্যে পদ পাওয়ার তৎপরতা বেড়েছে বলে জানা গেছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া প্রায় অর্ধশত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের মধ্যে বেশ কিছু পদে পরিবর্তন আসতে পারে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে গত বছরের ১৫ অক্টোবর থেকে মহাপরিচালকের পদ শূন্য রয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডেও চেয়ারম্যান নেই। এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে দ্রুত নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষা প্রশাসনে স্থিতিশীল নেতৃত্ব ছাড়া কোনো সংস্কার দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তাই নিয়োগে পেশাগত দক্ষতা ও যোগ্যতাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন সরকার প্রশাসনে পরিবর্তন আনবে, এটি অস্বাভাবিক নয়। তবে অতীতের মতো দলীয়করণের অভিযোগ যেন না ওঠে, সেটিই এখন বড় প্রত্যাশা। ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে নিয়োগ–বদলি ও পদোন্নতিতে মেধা, সততা ও দক্ষতাকে একমাত্র মানদণ্ড করার কথা বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান বলেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে প্রশাসন গুছিয়ে নেওয়ার প্রবণতা থাকেই। তবে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কেউ যেন রাজনৈতিক বিবেচনায় বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব বজায় থাকলে প্রশাসনে স্থিতিশীলতা ফিরবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
