পরিচালকের চেয়ারে নায়ক
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০১৮, ০৩:১২ পিএম
২২ বছর পর আলমগীর পরিচালিত কোনো ছবি মুক্তি পাচ্ছে। আগামী শুক্রবার থেকে দর্শকরা দেখবেন ‘একটি সিনেমার গল্প’। পরিচালনায় নায়করা আগে থেকেই সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন। রাজ্জাক থেকে বাপ্পারাজ, মাসুদ পারভেজ থেকে অনন্ত জলিল, নায়কদের পরিচালনার ইতিহাস সংক্ষিপ্ত নয়। নায়কদের পরিচালক হওয়ার গল্প বলছেন মাহফুজুর রহমান
রাজ্জাক
তুমুল প্রেমের ছবি, প্রচÐ বিতর্কের ছবি ‘অনন্ত প্রেম’। সত্তর দশকে চুম্বনদৃশ্যের জন্য আলোচিত ছবি ‘অনন্ত প্রেম’। নিজের প্রথম পরিচালিত ছবিতেই চলচ্চিত্রাঙ্গনকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন নায়করাজ রাজ্জাক। প্রযোজনায় অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের পর পরিচালনায় এসেও তিনি সফলতার মুখ দেখলেন। ‘বদনাম’, ‘সৎ ভাই’, ‘অভিযান’, ‘চাপা ডাঙার বউ’, ‘ঢাকা ৮৬’, ‘প্রফেসর’, প্রেমশক্তি, ‘বাবা কেন চাকর’, ‘প্রেমের নাম বেদনা’, ‘সন্তান যখন শত্রæ’, ‘আমি বাঁচতে চাই’, ‘আয়নাকাহিনী’Ñ নায়করাজ পরিচালিত কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে সাহিত্যধর্মী ও সামাজিক ছবির ছড়াছড়ি। ব্যাপক ব্যবসা সফল ছবিও বক্স অফিসে দিয়েছেন নায়করাজ, সমালোচকদেরও খুশি করতে পেরেছেন কিছু ছবিতে। নিজের পুত্রদ্বয়কেও পরিচালিত ছবিতেই অভিষেক ঘটিয়েছেন নায়করাজ। দেশসেরা পরিচালকদের মধ্যে নায়করাজের নামটিও তাই নিতে হয় শ্রদ্ধার সঙ্গেই।
আলমগীর
১৯৮৬ সালে ‘নিষ্পাপ’ নির্মাণের মধ্য দিয়ে পরিচালনায় আত্মপ্রকাশ আলমগীরের। এটি তিনি তৈরি করেছিলেন জসীম ও চম্পাকে নিয়ে। জসীম ও রোজিনাকে নিয়ে পরে তিনি পরিচালনা করেছিলেন ‘বউমা’। আলমগীর শেষবার ক্যামেরার পেছনে দাঁড়িয়েছিলেন ১৯৯৬ সালে। তার পরিচালনায় ‘নির্মম’ ছবিতে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন শাবনাজ। দুই দশকের বেশি সময় পর গত বছর বিরতি ভেঙে ক্যামেরা হাতে নেন আলমগীর।
কলকাতার ঋতুপর্ণা ও ঢাকার আরিফিন শুভকে নিয়ে ‘একটি সিনেমার গল্প’ তৈরি করেছেন সর্বাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্করপ্রাপ্ত অভিনেতাটি। নতুন প্রজন্ম আলমগীরের নির্দেশনার হাত কেমন তা জানতে পারবেন ১৩ এপ্রিল। এ দিন দেশব্যাপী মুক্তি পাচ্ছে অসম প্রেমের গল্প ‘একটি সিনেমার গল্প’।
রহমান
নায়কদের মধ্যে রহমানই প্রথম ক্যামেরার পেছনে দাঁড়ানোর দুঃসাহস দেখিয়েছেন। লাহোরে তিনটি উর্দু ছবি পরিচালনা করেছেন তিনি। রহমান উর্দু ছবি নির্মাণ করেছেন ‘কঙ্গন’, ‘দর্শন’, ‘যাহা বাজে শাহনাই’ ইত্যাদি। বাংলা ছবি নির্মাণ করেছেন ‘নিকাহ’।
আজিম
রহমানের পথ ধরে আজিম পরিচালনায় আসেন। স্বাধীনতার পর তিনি পরিচালকের চেয়ার দখল করেন। ‘গাদ্দার’, ‘টাকার খেলা’, ‘বদলা’, ‘জীবনমরণ’, ‘দেবর ভাবী’ এবং প্রথম রঙিন ছবি ‘প্রতিনিধি’ নির্মাণ করে পরিচালনায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন আজিম।
বুলবুল আহমেদ
১৯৮৭ সালে ‘রাজল²ী শ্রীকান্ত’ পরিচালনা করে নিজের সাফল্যের মুকুটে আরেকটি পালক যোগ করেন বুলবুল আহমেদ। ‘গরম হাওয়া’, ‘কত যে আপন’ ছবিগুলো পরে বানালেও ‘রাজল²ী’র মতো আর সেভাবে আলোচনা তৈরি করতে পারেনি কোনো ছবি।
মাসুদ পারভেজ
যে ছবি ‘ওরা ১১ জন’র প্রযোজক মাসুদ পারভেজকে দিয়েছিল নায়কের অভিধা, সেই ছবির নাম ‘মাসুদ রানা’। এ ছবি থেকেই নায়ক সোহেল রানার যাত্রা শুরু। গোয়েন্দা গল্প থেকে ধীরে ধীরে মাসুদ পারভেজ অ্যাকশন ছবির অপ্রতিদ্ব›দ্বী নির্মাতা হয়ে ওঠেন সত্তর দশকেই। ‘নাগপূর্ণিমা’, ‘গুনাহগার’, শরীফ বদমাশ’, ‘জবাব’, চোখের পানি’, ‘শত্রæ সাবধান’, ‘বাঘের থাবা’, ‘রিটার্ন টিকেট’ মাসুদ পারভেজের কিছু আলোচিত অ্যাকশন ছবি।
‘এপার ওপার’, ‘জীবননৌকা’র মতো সামাজিক-রোমান্টিক কিছু ছবিও নির্মাণ করেছেন এক সময়ের সুপারস্টার সোহেল রানা। মূলত নিজের প্রতিষ্ঠান পারভেজ ফিল্মস থেকেই ছবিগুলো পরিচালনা করেছেন মাসুদ পারভেজ। একই ব্যানার থেকে রুবেলসহ অনেক অভিনয় শিল্পী ও পরিচালককেও হাত ধরে যাত্রা শুরু করিয়েছেন তিনি।
উজ্জল
অ্যাকশন ছবি নির্মাণের মধ্য দিয়ে পরিচালনায় হাতেখড়ি ঘটে মেগাস্টার উজ্জলের। তার পরিচালিত ছবিগুলোতে ছিল যথেষ্ট নায়িকা বৈচিত্র্য। ‘শক্তিপরীক্ষা’য় নায়িকা ছিলেন নূতন। ‘তীব্র প্রতিবাদে’ উজ্জল কলকাতা থেকে নিয়ে এসেছিলেন শতাব্দী রায়কে। ‘পাপের শাস্তি’তে এনেছিলেন ইন্দ্রানী হালদারকে। উজ্জল শেষ পরিচালনা করেন ২০০২ সালে। ‘দুর্ধর্ষ সম্রাট’র পর আর কোনো ছবি নির্দেশনা দেননি।
হেলাল খান
‘প্রিয় তুমি’ (১৯৯৫), ‘বাজিগর’ (১৯৯৬), ‘সাগরিকা’ (১৯৯৮)Ñ এই তিনটি ছবিতে লগ্নি করার পর হেলাল খান নায়ক ও প্রযোজক তকমার পাশে আরো একটি তকমা যোগ করতে উদ্যত হন। ২০০০ সালে ‘আশা আমার আশা’ নির্দেশনা দিয়ে তিনি পরিচালকের তকমা পান। শখ মিটে যাওয়ার পর আর ক্যামেরায় লুক থ্রো করেননি হেলাল খান।
রুবেল
মাসুম পারভেজ রুবেল দেড় দশক অভিনয়ে সময় দেয়ার পর আসেন নির্মাণে। ২০০১ সালের ছবি ‘মায়ের জন্য যুদ্ধ’ থেকেই রুবেলের প্রযোজক-পরিচালক এই দুই পরিচয়ের শুরু। ‘বিচ্ছু বাহিনী’ নির্মাণ করে তিনি খ্যাতি কুড়ান। ‘অন্ধকারে চিতা’, ‘রক্তপিপাসা’, ‘প্রবেশ নিষেধ’, ‘বিষাক্ত চোখ’ ইত্যাদি মসলাদার অ্যাকশন ছবি পরিচালনা করেছেন রুবেল।
তৌকীর আহমেদ
টিভি অভিনেতাদের মধ্যে খুব বেশি চিত্রপরিচালকের নজির নেই। তৌকীর আহমেদ সেখানে ২০০৫ সালে প্রথম ছবি ‘জয়যাত্রা’ নির্মাণ করে প্রশংসা জুটিয়ে নিয়েছিলেন। ‘অজ্ঞাতনামা’, ‘হালদা’ তাকে আরো বেশি পোক্ত করেছে। নাট্যাঙ্গনে সমসাময়িকদের মধ্যেও তৌকীর আহমেদই একমাত্র চিত্রপরিচালনায় এসেছেন এবং পেশদারিত্বের সঙ্গেই পরিচালনা
করছেন।
ইলিয়ান কাঞ্চন
ইলিয়াস কাঞ্চন তার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে বেশকিছু ছবি নির্মাণ করেছেন। যেগুলো কাঞ্চনের ক্যারিয়ারের সুসময়ে ইতিবাচক ভ‚মিকা রেখেছে। অভিনয় থেকে অনেকটা দূরে সরে যাওয়ার পর তিনি পরিচালনায় আসেন। মাত্র দুটি ছবি তৈরি করেই পরিচালক পরিচয়ের ইতি ঘটান কাঞ্চন। ‘বাবা আমার বাবা’ এবং ‘আমার স্বপ্ন’ ২০০৮ সালে মুক্তি পেয়েছিল।
অনন্ত জলিল
তার ব্যানার থেকে ছবি করেছেন ইফতেখার চৌধুরী, সোহানুর রহমান সোহান, গাজী মাজহারুল আনোয়ার ও অনন্য মামুন। কিন্তু পঞ্চম ছবিতে গিয়েই অনন্ত জলিল পরিচালকের চেয়ারে বসে যান। ‘নিঃস্বার্থ ভালোবাসা’ শেষ করে ষষ্ঠ ছবি ‘মোস্ট ওয়েলকামে’ও তিনিই পরিচালক। এরপর অবশ্য পরিচালনা ও অভিনয় থেকেই অব্যাহতি নিয়েছেন অনন্ত।
বাপ্পারাজ
চলচ্চিত্রে আসার পর বাবা নায়করাজ রাজ্জাক যতগুলো ছবি পরিচালনা করেছেন, প্রায় সবগুলোতেই অভিনয় করেছিলেন বাপ্পারাজ। সফল পরিচালকের সন্তান হয়েও তিনি পরিচালনায় আসেন প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়সে। যখন তার ক্যারিয়ারের বয়স প্রায় ৩০ বছর। ২০১৫ সালে ‘কার্তুজ’ নামে একটি অ্যাকশন ছবি পরিচালনা করে পরিচালকের খাতায় নাম লেখান
বাপ্পারাজ।
ইয়ুল রায়হান
বাবা খ্যাতিমান পরিচালক মাসুদ পারভেজের পথ ধরে ছেলে ইয়ুল রায়হানও পরিচালনায় এসেছেন। গত বছর ইয়ুল রায়হানের প্রথম ছবি
‘রাইয়ান’ মুক্তি পায়। পরিচালক হিসেবে বাবার মতোই ভিন্ন নাম বেছে নিয়েছেন ইয়ুল রায়হান। মাশরুর পারভেজ নামে পরিচালনা করেছেন ছবিটি। কিন্তু বাবার মতো অভিষেক ছবিতে সফল হতে
পারেননি।
শাহরিয়ার নাজিম জয়
টিভি অভিনেতা শাহরিয়ার নাজিম জয় নায়ক হয়েছিলেন মামা গাজী মাজহারুল আনোয়ারের দুটি ছবিতে। যদিও তার প্রথম ছবি ছিল আজাদী হাসনাত ফিরোজের পরিচালনায়। নাজিম জয় বছর দুয়েক আগে ‘প্রার্থনা’ নামে একটি ছবি পরিচালনা করেছেন। সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন দ্বিতীয় ছবিটি তৈরিরও।
