ইরান যুদ্ধের ধাক্কা সামলাতে আবারো আইএমএফের দ্বারস্থ বাংলাদেশ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ মে ২০২৬, ০৩:১০ এএম
ছবি: সংগৃহীত
ইরান-মার্কিন
যুদ্ধে কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট আর তৈরি পোষাক খাতে ধ্বস নামার ফলে, চাপে চড়া অর্থর্নীতিকে
চাঙ্গা করতে বাংলাদেশ আবারো আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর কছে ঋণ চেয়েছে।
বৃহস্পতিবার
(২৮ মে) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানা গেছে।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে
বলা হয়ে, ‘যুদ্ধক্ষেত্র থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে থাকা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে
ইরান যুদ্ধের প্রভাব এতটাই গভীর যে দেশটি আবারও আইএমএফের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হয়েছে।’
আন্তর্জাতিক
মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর বরাত দিয়ে আলজজিরা জানায়, যুদ্ধের অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দিতে
বাংলাদেশ একটি নতুন সহায়তা কর্মসূচির জন্য আইএমএফকে অনুরোধ করেছে। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি
ও সরবরাহ শৃঙ্খলে অস্থিরতা তৈরি করেছে, যার ঝাপটা পড়েছে বাংলাদেশের মূল অর্থনৈতিক
খাতগুলোতে।
বাংলাদেশ
ইতিমধ্যে ২০২৩ সালে শুরু হওয়া ৫.৭ বিলিয়ন ডলারের একটি আইএমএফ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে,
যার মেয়াদ চার বছর। এই অবস্থায় নতুন করে আরও তহবিল চাওয়ার বিষয়টি বাংলদেশের ওপর
বিদেশি ঋণের বোঝা আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।
আইএমএফের
বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনার মঙ্গলবার (২৬ মে) এক বিবৃতিতে বলেছেন, সংস্থাটি বাংলাদেশের
অর্থনৈতিক সংস্কার ও নীতি নির্ধারণের বিষয়ে আলোচনা করছে। তবে আপাতত নতুন এই কর্মসূচির
আকার ও শর্ত সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানায়নি আইএমএফ।
গত
মার্চে বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছিল, ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট মোকাবিলায়
তারা বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার ঋণ চাইছে। এছাড়া গত সপ্তাহে
বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ অনুমোদন করেছে, যা জ্বালানি তেল আমদানির
ক্রমবর্ধমান চাপ মোকাবিলা ও জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে সহায়তা করবে।
আলজাজিরার
প্রতিবেদনে বলা হয়- ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে জ্বালানি খাতে। গত ৮ এপ্রিল
অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি হলেও স্থায়ী শান্তি এখনো দূরের স্বপ্ন। হরমুজ প্রণালি, যা
দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হতো- সেটিপএখন
ইরানের নিয়ন্ত্রণে। অন্যদিকে ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধ জারি রয়েছে। ফলে
তেল সরবরাহে নজিরবিহীন বিঘ্ন ঘটেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে যেখানে অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল
ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৬৬ ডলার, সেখানে এটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০০ ডলারে। ১৭ কোটি
জনসংখ্যার বাংলাদেশ তার মোট জ্বালানি চাহিদার ৯৫ শতাংশই আমদানি করে থাকে, যার অধিকাংশই
মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। তাই স্বাভাবিকভাবেই এই সংকটের ঝাপটা সরাসরি দেশের ওপরেই পড়েছে।
আলজাজিরার
ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ওপর অর্থনৈতিক চাপ হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে তৈরি পোশাক
খাতে নিম্নমূখী রপ্তানি-আদেশের বিষয়টিও উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়- বাংলাদেশের অর্থনীতির
মেরুদণ্ড তৈরি পোশাক শিল্প (আরএমজি) ইরান যুদ্ধের দ্বিতীয় বড় শিকার। এই খাতটিই দেশের
মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি যোগান দেয়, যা গত বছর ৪৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল
এবং এতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) বাংলাদেশের পোশাক
রপ্তানি জানুয়ারি ২০২৬ মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ দশমিক ২৫ শতাংশ কমে
১ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা এই খাতের জন্য এক বড় ধাক্কা।
প্রতিবেদনে
তৈরি পোশাক খাতে অস্থিরতার কারণ হিসেবে একদিকে জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুতের লোডশেডিং
বেড়ে যাওয়ায় পোশাক কারখানাগুলো সময়মতো সামগ্রী প্রস্তুত করতে না পারায় অনেকগুলো রপ্তানি-আদেশ
বাতিল হয়ে যাওয়া, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ব্যাহত
হওয়ায় চীন থেকে আমদানি করা কাঁচামালের দাম ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়া -এই দুটো
বিষয়কে দায়ী করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে
বলা হয়- শুধু পোশাক শিল্প নয়, প্লাস্টিক খাতও এই সংকটের বাইরে নয়। প্লাস্টিকের প্রধান
কাঁচামাল রেজিনের দাম যুদ্ধ শুরুর আগে যেখানে ছিল প্রায় ৯০০-৯৫০ ডলার, সেখানে তা বেড়ে
দাঁড়িয়েছে ১,৫০০-১,৮০০ ডলারে প্রায় দ্বিগুণ। কাঁচামালের দাম প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে
যাওয়ায় উৎপাদন খরচ আকাশছোঁয়া।
পাঁচ
মাসের ব্যবধানে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ ১১২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১১৩ দশমিক
৫ বিলিয়ন ডলারে বেড়ে যাওয়ায়, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ বাংলাদেশকে যে ‘কম ঝুঁকিপূর্ণ ঋণগ্রস্ত
দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলো, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে সেটা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ পর্যায়ে পরিবর্তন
হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হয় আলজাজিরার ওই প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে
বলা হয়- শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো বিশ্বের জন্যই এই যুদ্ধ এক ভয়াবহ ঋণ সংকটের ইঙ্গিত
দিচ্ছে। গত এপ্রিলে আইএমএফ তাদের ফিসকাল মনিটর প্রতিবেদনে এই বলে সতর্ক করেছে যে, ইরান
যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী সরকারি ঋণ ২০২৯ সালের মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০০
শতাংশে পৌঁছতে পারে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বেশি এবং ২০২৫ সালে এই ঋণ
জিডিপির প্রায় ৯৪ শতাংশ ছিলো।
ইরান-মার্কিন
যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতি একপ্রকার চাপের মুখে পড়ে গিয়েছে। বাংলাদেশের পাশাপাশি
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বের অনেক দেশই ঋণের চাপে রয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারি, জলবায়ু
দুর্যোগ ও খাদ্য ও জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির কারণে আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা, ক্যারিবিয়ান
ও মধ্য ইউরোপের অনেক দেশ ইতিমধ্যেই উচ্চ ঋণের বোঝায় জর্জরিত। উদাহরণস্বরূপ, ২০২২ সালে
আর্থিকভাবে পতন হওয়া শ্রীলঙ্কা একটি চার বছরের কর্মসূচির আওতায় আইএমএফের কাছ থেকে
প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার সহায়তা পেয়েছে। চীন, ভারত ও জাপানের মতো দেশগুলোর সঙ্গে একটি
ঋণ পুনর্গঠন চুক্তিও করেছে দেশটি। ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শ্রীলঙ্কার
বিদেশি ঋণ তাদের জিএনআইয়ের প্রায় ৫৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল।
আইএমএফ
বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ৭-৮ শতাংশ জিডিপি ঘাটতি নিয়ে চলছে এবং এর কোনো নির্দিষ্ট ঋণ একীভূতকরণ
পরিকল্পনা নেই, ফলে তাদের সরকারি ঋণ ২০৩১ সালের মধ্যে জিডিপির ১৪২ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছাতে
পারে। অন্যদিকে চীন স্বল্পমেয়াদে অভ্যন্তরীণ চাহিদা সমর্থনে ঋণ নিচ্ছে, যার ফলে ২০৩১
সালের মধ্যে তাদের ঋণ জিডিপির ১২৬ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়াবে।
আইএমএফ
সতর্ক করে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বৈশ্বিক সুদের হার, মার্কিন ডলারের শক্তি এবং
জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর ওপর চাপ
সৃষ্টি করছে। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের পরিস্থিতিতে ঝুঁকিপূর্ণ বৈশ্বিক ঋণ আরও ৪ শতাংশ
পয়েন্ট বাড়তে পারে।
