যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ চুক্তি, সুবিধার পাশাপাশি শর্ত পালনের বাধ্যবাধকতা
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:১৪ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
দীর্ঘ নয় মাসেরও বেশি সময় ধরে দরকষাকষির পর এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র। এ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের জন্য শুল্ক সুবিধার পূর্বশর্ত হিসেবে বেশকিছু ধারা যুক্ত করেছে মার্কিন পক্ষ।
দেশটি থেকে কৃষি ও জ্বালানি পণ্য আমদানির থেকে শুরু করে সংবেদনশীল প্রযুক্তির সরবরাহ চেইনে ব্যবহৃত সফটওয়্যার ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়সংক্রান্তসহ নানা খাতে শর্ত জুড়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি সংস্থার (ইউএসটিআর) ওয়েবসাইটে এ চুক্তির যাবতীয় শর্ত ইতোমধ্যে প্রকাশ করা হয়েছে।
চুক্তির নথিতে দেখা যায়, এতে মোট ছয়টি সেকশন বা ধারার আওতায় বিভিন্ন অনুচ্ছেদে নানামুখী শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে। প্রথম ধারায় ট্যারিফ ও কোটাসংক্রান্ত বিষয়, দ্বিতীয় ধারায় নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার্স বা অশুল্ক বাধা, তৃতীয় ধারায় ডিজিটাল বাণিজ্য ও প্রযুক্তি, চতুর্থ ধারায় অর্থনীতি ও জাতীয় অর্থনীতিবিষয়ক শর্তাবলি, পঞ্চম ধারায় বাণিজ্যিক বিবেচনা ও সম্ভাবনা এবং ষষ্ঠ ধারায় চুক্তির বাস্তবায়ন, প্রয়োগ ও চূড়ান্ত বিধি তুলে ধরা হয়েছে।
চুক্তির প্রথম ধারা বা শুল্ক ও বাজার প্রবেশাধিকার অংশে বলা হয়েছে, চুক্তি কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার শ্রেণির পণ্য আমদানিতে আরোপিত শুল্কের হার শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে বাংলাদেশকে। পাশাপাশি ধাপে ধাপে ২ হাজার ২১০ শ্রেণির পণ্যে শুল্ক প্রত্যাহার করতে হবে।
এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের ১ হাজার ৬৩৮ শ্রেণির পণ্য রফতানিতে ১৯ শতাংশ পাল্টা শুল্ক দিতে হবে না, যা মোট রফতানির প্রায় ৮৫–৮৬ শতাংশ। বাকি ১৪–১৫ শতাংশ পণ্যের ওপর ১৯ শতাংশ রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ আরোপ করা হবে। তবে উভয় ক্ষেত্রেই বিদ্যমান স্বাভাবিক আমদানি শুল্ক বহাল থাকবে।
চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা বাড়ানোর পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে তা কেনা কমিয়ে আনার শর্ত দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা বাণিজ্য বাড়ানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কাজ করবে বলে উল্লেখ রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত উড়োজাহাজ, যন্ত্রাংশ ও সেবা ক্রয় বাড়ানোর বিষয়টিও চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বিমান ইতোমধ্যে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং অতিরিক্ত কেনার সুযোগও রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
চুক্তির চতুর্থ ধারায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি অর্থনৈতিক বা জাতীয় নিরাপত্তার বিবেচনায় কোনো নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নেয়, বাংলাদেশকেও তার সমর্থনে পরিপূরক ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর সঙ্গে সহযোগিতা ও সামঞ্জস্য বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
ডিজিটাল বাণিজ্যসংক্রান্ত ধারায় ইলেকট্রনিক লেনদেন বা কনটেন্টের ওপর কোনো শুল্ক আরোপ করা হয়নি। বিনিময়ে ডিজিটাল বাণিজ্য সহজীকরণ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সুযোগের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতার কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
চুক্তিতে জ্বালানি বাণিজ্যকে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি আমদানি বাড়াতে হবে অথবা সে ব্যবস্থা সহজ করতে হবে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি আমদানির দীর্ঘমেয়াদি অফটেক চুক্তির সম্ভাব্য মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলার।
কৃষিপণ্য আমদানির ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম, সয়াবিন, সয়াজাত পণ্য ও তুলা কেনার উদ্যোগ নিতে হবে। পাঁচ বছর ধরে প্রতি বছর অন্তত সাত লাখ টন গম এবং বছরে কমপক্ষে ১২৫ কোটি ডলার বা ২৬ লাখ টন সয়াবিন ও সয়াজাত পণ্য আমদানির বাধ্যবাধকতার কথা বলা হয়েছে। কৃষিজাত পণ্যের মোট মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলার।
ডিজিটাল বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মার্কিন কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক ডিজিটাল সার্ভিসেস ট্যাক্স আরোপ না করার শর্তও রয়েছে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি বাতিল করে পুনরায় পারস্পরিক শুল্ক আরোপ করতে পারবে। শ্রম ও পরিবেশসংক্রান্ত ধারায় শ্রম আইন সংস্কার, ইপিজেডে শ্রম অধিকার নিশ্চিতকরণ, পরিবেশ আইন প্রয়োগ জোরদার এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে।
সমুদ্রবন্দর, বন্দর টার্মিনাল, লজিস্টিকস ট্র্যাকিং নেটওয়ার্ক এবং বাণিজ্যিক নৌবহরে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এমন ডিজিটাল লজিস্টিকস প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের শর্তও রয়েছে। পাশাপাশি এসব তথ্যের অননুমোদিত বিদেশি প্রবেশ ঠেকাতে ব্যবস্থা নিতে হবে।
মার্কিন এক্সপোর্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন রেগুলেশনসের আওতায় পণ্যের অননুমোদিত রফতানি, পুনঃরফতানি বা অভ্যন্তরীণ হস্তান্তর সীমিত করতে বাংলাদেশকে পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে ব্যুরো অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড সিকিউরিটির অনুমোদনপত্র উপস্থাপন করতে হবে।
চুক্তিতে সংবেদনশীল প্রযুক্তির সরবরাহ চেইনে জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগের উৎস হিসেবে চিহ্নিত দেশগুলোর সম্পৃক্ততা কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ চুক্তি একদিকে বাজার প্রবেশাধিকার, জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সুযোগ সৃষ্টি করলেও অন্যদিকে নীতিগত সমন্বয়, বাণিজ্যিক ক্রয়, রফতানি নিয়ন্ত্রণ এবং আইন সংস্কারসহ একাধিক বাধ্যবাধকতা তৈরি করেছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, চুক্তির বিষয়গুলো গভীরভাবে যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। প্রাথমিক মূল্যায়নে যা মনে হচ্ছে, চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ অনেকগুলো বাধ্যবাধকতার মধ্যে পড়েছে। পাল্টা শুল্ক ১ শতাংশ কমেছে এটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখানে অন্যান্য বিষয়ও আছে। অন্যান্য দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কেমন হবে, সেগুলোও প্রভাবিত হওয়ার শঙ্কা আছে। এমন একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যার প্রভাব ব্যাপক পড়বে, সেটা এত তাড়াহুড়া করে—বড় কোনো আলাপ-আলোচনা না করে; সে বিষয়ে চুক্তি করে ফেলাটা কতটা যৌক্তিক হলো এ প্রসঙ্গও রয়ে গেল।
তিনি বলেন, নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্টের নামে পরামর্শ করার প্রক্রিয়াটি এড়িয়ে যাওয়া মনে হয় সমীচীন হয়নি। এটি আমাদের জন্য ধারাবাহিক কিছু প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে। চুক্তিটি সাতদিনের মধ্যে প্রয়োগযোগ্য করতে হবে এমন একটি বিষয় আছে। কিন্তু মার্কিনদের সঙ্গে চুক্তি সই হয়ে যাওয়ার পর এর বাইরে কিছু করার শক্তি বাংলাদেশের সরকারের হবে বা সরকার তেমন চিন্তা করবে, সেটি আমার মনে হয় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বলেন, এ চুক্তি বিশ্ব বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একটা অস্বাভাবিক সময়ে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ ধরনের চুক্তি বাংলাদেশসহ আরো অনেক দেশের সঙ্গেই সই করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বিমান এরই মধ্যে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে ও এর অতিরিক্ত কেনারও সুযোগ রয়েছে। পরিষ্কারভাবে বলা যায় যে এটি এক ধরনের বৈষম্যমূলক চুক্তি।
তিনি বলেন, একই ধরনের চুক্তি শুধু বাংলাদেশ না, আরো অনেক দেশের সঙ্গে সই হয়েছে। ওইসব দেশেও এ চুক্তি নিয়ে এক ধরনের সমালোচনা আছে। কারণ গত বছর এপ্রিলে ডোনাল্ড ট্রাম্প রেসিপ্রোকাল ট্যারিফের নামে যে ধরনের একতরফা ট্যারিফ ঘোষণা করেছেন, সেটি সারা বিশ্বের বাণিজ্য ব্যবস্থাকে বড় ধরনের সংকটের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এ ট্যারিফের কারণে, তাদের পক্ষে ডব্লিউটিওতে যাওয়াটাও খুব কঠিন। ফলে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রফতানিকে ধরে রাখার জন্য যেসব বিষয়ে একমত হয়েছে, সেগুলো দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ এবং ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে অনেকটাই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।
তিনি আরো বলেন, আমি মনে করি যে সাময়িকভাবে এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য হয়তো এ ধরনের একটি চুক্তি হয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যতে আমি নিশ্চিত যে এ চুক্তি নিয়ে নতুন সরকার নিশ্চয়ই আরো চিন্তাভাবনা করবে। চুক্তির আওতায় বাণিজ্য বা অর্থনীতির বাইরে ভূরাজনৈতিক যেসব বিষয় যুক্ত রয়েছে, সেগুলো একটা দেশের স্বাধীন অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আমার মনে হয় যে এটা কোনো টেকসই চুক্তি না। আমার দৃষ্টিতে ভবিষ্যতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে কোনো পরিবর্তন ঘটলে তারাও সেটি পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
