×

চট্টগ্রাম

বর্ষবরণ উৎসবে রঙিন পাহাড়ি জনপদ খাগড়াছড়ি

Icon

শংকর চৌধুরী, খাগড়াছড়ি

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২১ পিএম

বর্ষবরণ উৎসবে রঙিন পাহাড়ি জনপদ খাগড়াছড়ি

ছবি: খাগড়াছড়িতে বৈসাবি উৎসবে নদীর তীরে ফুল নিবেদন করছেন চাকমা সম্প্রদায়ের মানুষেরা

নদীর জলে ভাসে ফুল, পাহাড়ে বাজে উৎসবের সুর। পুরনো বছরের ক্লান্তি ঝেড়ে নতুনকে বরণ করতে খাগড়াছড়ির পাহাড়ি জনপদে নেমেছে রঙিন আবহ। আচার, বিশ্বাস আর প্রকৃতির মেলবন্ধনে বৈসাবি যেন শুধু উৎসব নয়, মানুষ আর শিকড়ের এক গভীর সংযোগের গল্প।

পাহাড়ের প্রধান সামাজিক উৎসবের নাম “বৈসাবি”। বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণকে ঘিরে ত্রিপুরা, মারমা ও চাকমা- এই তিন জনগোষ্ঠীর প্রধান সামাজিক এবং ঐতিহ্যবাহী উৎসব ‘বৈসু, সাংগ্রাই ও বিজু’র সম্মিলিত রূপই হচ্ছে “বৈসাবি”। তবে এবার সরকারিভাবে প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব উৎসবের নামেই বর্ষবরণ উদযাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

ফুল বিজুতে উৎসবের সূচনা

“বিজু” ফুল বিজু, মূল বিজু ও গজ্জাপজ্জা- তিন দিনব্যাপী এ উৎসব পালন করে চাকমা সম্প্রদায়। গতকাল রোববার ১২ এপ্রিল নদীর জলে গঙ্গাদেবীর উদ্দেশে ফুল নিবেদন ও প্রার্থনার মধ্য দিয়ে খাগড়াছড়িতে শুরু হয়েছে বাংলা নতুন বর্ষকে বরণের বর্ণিল এ উৎসব। পাহাড়ের ভিন্ন ভাষাভাষী বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রধান সামাজিক এবং ঐতিহ্যবাহী এ প্রাণের উৎসবের সূচনা হয় চাকমা সম্প্রদায়ের ফুল বিজুর মধ্য দিয়ে।

‘ফুল বিজু’। এদিন চেঙ্গী ও মাইনি নদীর পাড় ও আশপাশের ছড়া-খালগুলোতে ভিড় জমায় চাকমা নারী-পুরুষ ও শিশুরা। দলবদ্ধভাবে গঙ্গাদেবীর উদ্দেশে ফুল নিবেদন করে তারা। এ সময় সব সম্প্রদায়ের মানুষের উপস্থিতিতে শহরের খবংপুড়িয়া ও রিভারভিউ পয়েন্ট এলাকা পরিণত হয় মিলনমেলায়।

আয়োজকরা জানান, ফুল বিজু চাকমা সম্প্রদায়ের কেবল একটি আচার নয়, এটি পুরনো বছরের সব দুঃখ-গ্লানি ধুয়ে ফেলে নতুন বছরের জন্য শুভকামনা জানানোর প্রতীক। ফুলের মাধ্যমে প্রকৃতি ও জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর এই ঐতিহ্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসছে। এ ফুল বিজু তাদের শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্কিত, এটি আত্মপরিচয়ের অংশ। তারা বলেন, এই ফুল শুধু ফুল নয়, এটি আমাদের প্রার্থনা। আমরা চাই নতুন বছর শান্তি, সম্প্রীতি আর সমৃদ্ধি বয়ে আনুক।

ছবি: খাগড়াছড়িতে বৈসাবি উৎসবে নদীর তীরে ফুল নিবেদন করছেন চাকমা সম্প্রদায়ের মানুষেরা

মূল বিজু ও ঐতিহ্যবাহী পাজন

মূল বিজু। এদিন ঘরে ঘরে তৈরি হয় নানা ঐতিহ্যবাহী খাবার। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও অপরিহার্য খাবার হলো ‘পাজন’। যে খাবারটি ছাড়া পাহাড়ের উৎসব যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। অতিথি আপ্যায়নের শুরুতেই পরিবেশন করা হয় এ পাজন। পাহাড়ি লোককথা অনুযায়ী, একসময় পাজন রান্নায় প্রায় ১০৭ রকমের সবজি ব্যবহার করা হতো। তবে বর্তমানে সবজির সহজলভ্যতা না থাকায় এতে কাঁচা কাঁঠাল, মিষ্টি কুমড়া, সজনে, জুমের আলু, শিমুল ফুল, গাজর, শসা, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও বিভিন্ন পাহাড়ি সবজির মিশ্রণসহ প্রায় ২৫ থেকে ৪০ ধরনের সবজি দিয়ে এ পাজন রান্না করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন শুঁটকি মাছও ব্যবহার করা হয়, যা এর স্বাদকে করে তোলে ভিন্নধর্মী।

এ পাজন খেলে নাকি শরীর ভালো থাকে এবং নানা রোগ থেকেও মুক্তি পাওয়া যায়। এমনকি এদিন সাতটি পরিবারের পাজন খেলে সারাবছর সুস্থ থাকা যায়- এমন বিশ্বাসও প্রচলিত আছে। ‘পাজন’ শুধু খাবার নয়, এটি এক ধরনের প্রাকৃতিক ঔষধ। পাহাড়ি সম্প্রদায়ের কাছে পাজন কেবল খাবার নয়, বরং এটি তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

গজ্জাপজ্জায় নতুন বছরকে বরণ

শেষ দিন, গজ্জাপজ্জা- মানে পয়লা বৈশাখ। এদিন সবাই বৌদ্ধ বিহারে গিয়ে সব জীবের প্রতি মৈত্রী ও মঙ্গল কামনা করেন। কেউ কেউ ঘরে ধর্মীয় গুরু ডেকে মঙ্গলসূত্র শ্রবণ করেন। এদিন নতুন চালের ভাত ও মাছ-মাংস ভোজন করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এদিন যদি ভোজন ভালো হয়, তাহলে পুরো বছরের ভোজনে কোনো রকম কমতি হবে না। এই তিন দিন সন্ধ্যায় ঘরের মূল খুঁটির সামনে, নদী ও গৃহপালিত পশু-পাখির সামনে মোমবাতি প্রজ্বলনের মাধ্যমে আনন্দ-উল্লাসে পুরনো বর্ষকে বিদায় এবং নতুন বর্ষকে বরণ করা হয়।

ত্রিপুরাদের বৈসু উৎসব

“বৈসু” হারি বৈসু, বৈসুমা ও বিসিকাতাল। সোমবার ১৩ এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছে ত্রিপুরাদের প্রধান সামাজিক উৎসব ‘বৈসু’। প্রথম দিন ত্রিপুরা পঞ্জিকা অনুসারে চৈত্র মাসের ২৯ তারিখে এই উৎসবের আয়োজন করা হয়। রীতি অনুযায়ী এদিন সকালে দেবী গঙ্গার উদ্দেশ্যে নদীতে ফুল ও হাতে বোনা নতুন কাপড় ভাসিয়ে হারি বৈসু উদযাপনের মধ্য দিয়ে পুরনো বছরকে বিদায় এবং নতুন বছরকে বরণের প্রস্তুতি নেয় ত্রিপুরা সম্প্রদায়। ভোরে দেবী গঙ্গার উদ্দেশ্যে ফুল ভাসানোর জন্য নদী বা ছড়ার পাড়ে জড়ো হন ত্রিপুরা নারী-পুরুষ ও শিশু-কিশোররা। স্থানীয় এলাকাবাসী ও সালকাতাল ক্লাব খাগড়াছড়ি শহরের খাগড়াপুর এলাকায় এক বর্ণিল অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক রিনা-রিসাই পরে অংশ নেন তারা। বন থেকে সংগ্রহ করা মাধবীলতা, অলকানন্দ, জবাসহ বিভিন্ন ধরনের ফুল দিয়ে পুরাতন বছরের দুঃখ-গ্লানি মুছে নতুন বছরকে বরণ করতে দেবী গঙ্গার উদ্দেশ্যে পূজা করেন তারা। এ সময় নিজেদের হাতে বোনা ছোট্ট কাপড় ভাসানো হয় জলে।

খাগড়াপুরে হারি বৈসুর মূল আয়োজক চামেলি ত্রিপুরা জানান, নতুন বছরে তাদের নিজস্ব পোশাক রিনা-রিসাই বুননে যাতে দক্ষতা ও নিপুণতা বাড়ে, সে জন্যই ফুলের সঙ্গে ভাসানো হয় হাতের বোনা ছোট্ট কাপড়। এর মধ্য দিয়ে যারা রিনা-রিসাই বুনন করেন, তাদের হাতের কাজে আরও দক্ষতা ও নিপুণতা আসবে। হারি বৈসু উপলক্ষে পারিবারিক ও সারাবিশ্বের মঙ্গল, সুখ ও সমৃদ্ধি কামনা করে ফুল, ধূপ ও মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালিয়ে পূজা করা হয়।

এদিকে, হারি বৈসু উদযাপন উপলক্ষে জেলা সদরের পল্টনজয় পাড়ায় ব্যতিক্রমধর্মী বর্ণিল আয়োজন করে বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদ। সংগঠনের সভাপতি কমল বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, বৈসু সাধারণত এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে তিন দিনব্যাপী পালন করা হয়। প্রথম দিনকে (২৯ চৈত্র) বলা হয় ‘হরি বৈসু’, দ্বিতীয় দিনকে (৩০ চৈত্র) ‘বৈসু’ এবং তৃতীয় দিনকে (১ বৈশাখ) বলা হয় ‘বিজু কাটাল’ বা ‘বিজু তোল্লা’। মূলত আগামী দিনের সুখ ও সমৃদ্ধির জন্য সৃষ্টিকর্তার নিকট প্রার্থনা করা হয়। এটি ত্রিপুরাদের প্রধান সামাজিক উৎসব।

হারি বৈসু দিনটি সামাজিক ও ধর্মীয় দিক থেকে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এ দিনে ত্রিপুরাদের ছেলে-মেয়েরা ফুল সংগ্রহ করে ফুলের একটি অংশ দিয়ে মালা গেঁথে ঘরের দরজায় টাঙায়। ফুলের আরেকটি অংশ দিয়ে নদীর তীরে এবং ছড়ায় দেবী গঙ্গার উদ্দেশ্যে পূজা করা হয়। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে তিন দিন বৈসু উৎসব পালন করা হলেও বর্তমানে বৈসু উপলক্ষে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের আয়োজনে ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাচ-গান ইত্যাদির মাধ্যমে পুরো বৈশাখ মাসজুড়ে এর আনন্দ উপভোগ করা যায়।

এ বিষয়ে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, ‘পাহাড়ের এই উৎসব সম্প্রীতির উৎসব। সব সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে অংশ নেওয়ায় এটি সার্বজনীন রূপ পেয়েছে।’

পুলিশ সুপার মো. মোরতোজা আলী খান বলেন, ‘উৎসব নির্বিঘ্নভাবে উদযাপনে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এ জন্য জেলাজুড়ে প্রায় ৪০০ পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন।’

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

নববর্ষ পালনের গল্পকথা

নববর্ষ পালনের গল্পকথা

চৈত্রসংক্রান্তি ও চড়কপূজা: বাংলার লোকঐতিহ্যের বহুস্রোত ও আত্মপরিচয়ের সন্ধান

চৈত্রসংক্রান্তি ও চড়কপূজা: বাংলার লোকঐতিহ্যের বহুস্রোত ও আত্মপরিচয়ের সন্ধান

নববর্ষ কি একদিন উদযাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ?

নববর্ষ কি একদিন উদযাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ?

আধুনিকতার ছোঁয়ায় বদলে যাওয়া বৈশাখ, নাকি ঐতিহ্যের নতুন রূপ?

আধুনিকতার ছোঁয়ায় বদলে যাওয়া বৈশাখ, নাকি ঐতিহ্যের নতুন রূপ?

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App