×

আওয়ামী লীগ

নীরবতাই কৌশল জামায়াতের

Icon

ঝর্ণা মনি

প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

নীরবতাই কৌশল জামায়াতের

ছবি: সংগৃহীত

নিষিদ্ধের পর বসে নেই জামায়াত-শিবির। আপাতদৃষ্টিতে চুপ থাকলেও রাজনীতির পাকা খেলোয়াড় জামায়াত টিকে থাকার একটা পথ বের করতে মরিয়া। রাজনৈতিক বিকল্প প্ল্যাটফর্ম তৈরি, জনসমর্থন ও সংগঠনের বিস্তার ঘটানোর কাজ চালিয়ে যাওয়ার সব চেষ্টাই করবে তারা। জামায়াতে ইসলামী নামে রাজনীতি করতে না পারলেও ভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তাদের মতাদর্শের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ রাজনৈতিক দল তৈরি করবে। সুযোগে সরকারের বিরুদ্ধে জনবিক্ষোভকে কাজে লাগাবে। সরকার পতনের আন্দোলনে বিরাট অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করে একাত্তরের পরাজিত হওয়ার প্রতিশোধ নিতে বার বার ছোবল মারবে স্বাধীনতাবিরোধী এই নিষিদ্ধ সংগঠনটি। এমনটাই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

আওয়ামী লীগ সরকার ২০১০ সাল থেকেই জামায়াতকে চাপে রেখেছিল। এক-এগারোর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ২০১৩ সালের ১০ জুন প্রথম রাজধানীতে প্রকাশ্যে সমাবেশ করেছিল জামায়াত। ২০১৩ সালের ১ আগস্ট জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করে হাইকোর্ট। এরপর গত ১০ জুন ২০২৩ এবং দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২৮ অক্টোবর রাজধানীতে সমাবেশ করে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন হারানো দল জামায়াত। বিশ্লেষকরা বলছেন, বড় ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখানোর ফন্দি আঁটছে জামায়াত। এছাড়া এই মুহূর্তে প্রতিক্রিয়া দেখালে সরকার কড়া অ্যাকশনে যাবে এবং নেতাকর্মীরা নিরাপত্তাহীনতায় পড়বে। তাদের অনেক আর্থিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে- যা সমস্যায় পড়বে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে জামায়াত।

এ ব্যাপারে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন অর রশিদ ভোরের কাগজকে বলেন, জামায়াত তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে কর্মপন্থা ঠিক করার কৌশল নিয়েছে। জামায়াতকে আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে; কিন্তু মানুষগুলো তো ঠিকই রয়েছে। এদের কিছু অংশ বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হবে। কিছু অংশ অন্যান্য রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হবে। আর বাকিরা মিলে ভিন্ন নামে সংগঠন করার চেষ্টা করবে। এরা সাধারণ মানুষের আন্দোলনে পেছন থেকে সর্বশক্তি দিয়ে সরকারপতনের ষড়যন্ত্র করবে। তিনি বলেন, সঙ্গে সঙ্গে অ্যাকশনে গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এদের ধরবে। গ্রেপ্তার করবে। ব্যাপক হারে গ্রেপ্তার এড়ানোর কৌশল হিসেবে চুপ করে আছে জামায়াত। তবে এর অর্থ এই নয়- তারা ভয় পেয়েছে কিংবা দুর্বল হয়ে গেছে। বড় ষড়যন্ত্র করবে। হয়তো টার্গেট কিলিংয়ের মতো মিশনে নামবে।

আরো পড়ুন: জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডব: ভস্মীভূত গাড়িগুলো যেন কঙ্কাল

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জামায়াত যখন কোনো সহিংস কর্মকাণ্ড করতে চায়, তখন হঠাৎ করেই চুপ হয়ে যায়। জামায়াতের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে তাই দেখা যায়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াত যখনই কোনো বড় ধরনের অপতৎরতা করেছে, ঠিক তার আগ মুহূর্তে হঠাৎ করেই চুপ হয়ে গেছে। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টা, লেখক ও গবেষক শাহরিয়ার কবির ভোরের কাগজকে বলেন, জামায়াতের সন্ত্রাস-সহিংসতার সক্ষমতাকে কখনোই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। তাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শত শত এনজিও রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগাবে। এখন শিল্পীদের একটি অংশ মাঠে নেমেছেন। তারা যে জামায়াতের ‘পারপাস সার্ভ’ করছেন- শিল্পীরা অনেকে তা জানেনও না। এখন আন্দোলনে ছাত্ররা নেই। জামায়াত এখন খেলছে। বিশাল অংকের টাকা খরচ করছে। জনবিক্ষোভকে কাজে লাগাচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা আশঙ্কা- সরকারের সেবা প্রতিষ্ঠানে জামায়াত আক্রমণ করে ভয়ংকর পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করবে। পাবলিক সার্ভিস সেক্টর যেমন- পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ খাতে আক্রমণ করতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত নতুন কোনো খেলোয়াড় নয়। কৌশলে তাদের আদর্শ ছড়িয়ে রেখেছে পেশাজীবী সমাজ থেকে শুরু করে সব পর্যায়ে। প্রথমে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে সহজ-সরল মানুষের মগজে বীজ ঢুকিয়েছে। পরে কৌশলে রাজনৈতিক মগজ ধোলাই করছে। ২০১০ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু করার পর থেকে দলটির নেতাকর্মীরা এক ধরনের গোপন তৎপরতায় রাজনীতি করে যাচ্ছেন।

সমাজবিজ্ঞানী ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম ভোরের কাগজকে বলেন, স্বাধীনতার পর ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর জামায়াতকে রাজনীতিতে পুনর্বাসন করে জিয়াউর রহমানের সরকার। ২০০৯ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর জামায়াত নিষিদ্ধের যে দাবি ওঠেছিল, তা অ্যাড্রেস করা যায়নি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ১৪ দলের বৈঠক থেকে জামায়াত নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত হয় এবং তা কার্যকর করা হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- জামায়াত নিষিদ্ধ হলেই কি তাদের কার্যক্রম থেমে থাকবে? মোটেই তা নয়। আমরা রাজনৈতিকভাবে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করেছি; কিন্তু তাদের যে দর্শন, তা ইসলামকে ব্যবহার করে চলে। তারা নিজেদের লালিত পালিত করেছে ওই দর্শন দ্বারা। পাঠ্যক্রমসহ শিশুদের মধ্যে যে দর্শন ঢুকিয়ে দিয়েছে এ থেকে মুক্ত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য তারা সিস্টেমের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে। এজন্য মূলধারার রাজনীতি দায়ী। তারা প্রয়োজনে জামায়াতকে সঙ্গ দিয়েছে। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়েছে দলটি। কৌশলে নিজেদের আদর্শ ঢুকিয়ে দিয়েছে। তারা খুব সংঘবদ্ধ। সব শ্রেণিপেশায় তাদের আদর্শের মানুষ রয়েছে।

আরো পড়ুন: ভুল হয়ে থাকলে ক্ষমা করবেন: পলক

এদিকে নিষিদ্ধের পর দলটির পক্ষ থেকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বিবৃতি দেয়া হয়েছে। গণমাধ্যমে পাঠানো ওই বিবৃতিতে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান দাবি করেছেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ‘ভিন্নখাতে’ প্রবাহিত করতেই সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নিষিদ্ধ ঘোষণা হলেও জামায়াত গোপন দলের মত কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারে বলে যে শঙ্কা প্রকাশ করছেন অনেকে, শফিকুর রহমানের বিবৃতিতেও সেই ইঙ্গিত মিলছে। শফিকুর রহমান বলেন, ‘সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেই জামায়াতে ইসলামীর মূল কাজ ইসলামের দাওয়াত, মানুষের চরিত্র সংশোধন ও ইসলামের সুমহান আদর্শ প্রতিষ্ঠার কাজ কখনো বন্ধ হবে না। আমি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সব স্তরের জনশক্তিকে ধৈর্য ও সহনশীলতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার আহ্বান জানাচ্ছি।’

জঙ্গি হিসেবেই বিচার হবে : সাবেক তথ্যমন্ত্রী, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু ভোরের কাগজকে বলেন, জামায়াত জঙ্গি এবং সন্ত্রাসী সংগঠন। এদের অপকর্ম দেশের মানুষ দেখছেন। এদের আগুন সন্ত্রাসী রূপ দেখেছেন মানুষ। নিষিদ্ধ এই সংগঠনটি থেমে থাকবে না। তবে নিষিদ্ধ সংগঠন যদি কোনো ষড়যন্ত্র করে জঙ্গি সংগঠন হিসেবেই বিচার করা হবে।

অধ্যাপক ড. হারুন অর রশিদ বলেন, এখন উচিত এই অপশক্তির বিরুদ্ধে দেশপ্রেমিক সব নাগরিকের বৃহত্তর ঐক্য ও শক্তি গড়ে তোলা। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন বাতিলের পরও এরা চুপ ছিল না। এদের বিরুদ্ধে কাউন্টার রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলতে হবে।

শাহরিয়ার কবির বলেন, সরকারকে সাবধান হতে হবে। সরকারের ভেতরে, প্রশাসনের ভেতরে, দলের ভেতরে যে জামায়াত ঢুকে গেছে এসব শনাক্ত করে জামায়াত মুক্ত করা। নতুবা পরিস্থিতি খারাপ করার চেষ্টা করবে। ১৯৭২ থেকে ’৭৫ পর্যন্ত যখন নিষিদ্ধ ছিল, তখনো তাদের নেটওয়ার্ক সক্রিয় ছিল। করোনার আগে-পরে জামায়াতকে মাঠে নামতে দেয়া হয়নি। কিন্তু তাদের নারীরা উঠান বৈঠকসহ ইসলামের দাওয়াত দিয়েছে। তসবিহ, বোরখা, কুরআন উপহার দিয়েছে। মানুষও ধর্মের কথা শুনতে চায়। এখানে তো কোনো নজরদারি নেই। মৌলবাদ উৎখাত না করে শুধু জামায়াত নিষিদ্ধ করলে ফল আসবে না। এটি অনেক বড় লড়াই। এই লড়াই একা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। নাগরিক সমাজকে সঙ্গে নিয়ে লড়াই করতে হবে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সাবেক দুই সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ

তনু হত্যা মামলা সাবেক দুই সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ

‘রূপায়ণ সিটি উত্তরা’ যেন ঢাকার ‘ক্যাসিনো সিটি’

‘রূপায়ণ সিটি উত্তরা’ যেন ঢাকার ‘ক্যাসিনো সিটি’ পরিচালনায় সম্রাটের ক্যাসিনো পার্টনার কাশেম

এক তরুণের কোমরে ৩ পিস্তল, গ্রেপ্তার করল পুলিশ

এক তরুণের কোমরে ৩ পিস্তল, গ্রেপ্তার করল পুলিশ

অনুমোদনহীন খাদ্য উৎপাদন, দুই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

অনুমোদনহীন খাদ্য উৎপাদন, দুই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App