ঈশ্বরী পাটনি কি জানতেন?
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৩, ১২:৪৯ এএম
ঈশ্বরী পাটনি লোকদেবীর কাছে বর চেয়েছিলেন এই বলে, তার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে। দেবীর কাছে বর চাওয়ার এই যে কালচারাল পরিপ্রেক্ষিত, তা কয়েক শতাব্দীর। কিন্তু আজো আমাদের লোক দেবতা ও দেবীর কাছে আমাদের সন্তানদের জন্য দুধে-ভাতে থাকার আবেদন মঞ্জুর হয়নি। আর তাই বর্তমান কালের দেবতা-দেবীদের কাছে সেই দাবি জানাতে হয়। ঈশ্বরী পাটনির সেই আবেদন লোকদেবী কবুল করেছিলেন কিনা, আমরা জানি না। করলে তো আজকে আমাদের দেশে দুধের ঘাটতি হতো না। আর আমরাও আমাদের রাজনৈতিক দেবতা ও দেবীর কাছে দুধে-ভাতে থাকার আবেদন জানাতাম না। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমাদের গণজীবন যে দারিদ্র্য আর ক্ষুধা নিয়েই বেঁচে আছে, সেটা কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না। আজকে এই একবিংশ শতাব্দীর প্রথম কোয়ার্টারে এসেও আমাদের কেবল খাদ্য ঘাটতি মোকাবিলা করতে হয়। আনতে হয় সুদূর ইউক্রেন থেকে আটার জন্য গম, কানাডা থেকে আনতে হয় পরোটা বানাবার শাদা গম। এছাড়া কোটি কোটি টাকার গুঁড়া দুধ আমদানি করতে হয় নিউজিল্যান্ডসহ পশ্চিমা দেশ ডেনমার্ক থেকে। আমদানির তালিকা দেখলেও আমরা বুঝতে পারি পুষ্টির নানা উপকরণেও বেশ ঘাটতি আছে আমাদের। সে-কালে জনসংখ্যা কম ছিল, তারপরও খাদ্য ঘাটতি ছিল। অভাব-অনটন লেগেই থাকত। সেটা ঈশ্বরী পাটনির সন্তানদের দুধ-ভাতে থাকার আবেদন থেকেই টের পাওয়া যায়। এখন জনসংখ্যা অনেক বেড়েছে, পাল্লা দিয়ে বেড়েছে খাদ্যশস্যের উৎপাদনও। কিন্তু তারপরও প্রতি বছর লাখ লাখ টন শস্য আমদানি করতে হয়। এটাই হচ্ছে সত্য-বাস্তব। দুই. ১৫ মে ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের সংগঠন এফবিসিসিআই ও আরটিভির আয়োজনে গোটা দেশের ব্যবসায়ীদের নিয়ে প্রাক-বাজেট আলোচনার যে গোলটেবিল বৈঠক হলো, সেখানে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান ও কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক এবং গণ্যমান্যজন। সেখানে ড. আবদুর রাজ্জাক বললেন, যদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করা যায় তাহলে আগামী ৩ বছরের মধ্যে দেশে দুধ উৎপাদন করে ভাসিয়ে দেবেন তিনি। তার কথা শুনে এতটাই খুশি হলাম যে, ভুলে গেলাম তিনি এর আগেও কৃষিমন্ত্রী ছিলেন এবং খাদ্যমন্ত্রীও ছিলেন। আমাদের টাঙ্গাইলের লোকজন সাধারণত বাকোয়াজ করেন না। প্রথম যে বার তিনি খাদ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন, তিনি নীরবে কাজ করেছেন। রাজনৈতিক বক্তৃতায় গলাবাজি করেননি। খাদ্য সেক্টরে উৎপাদনও বেড়েছে, কিন্তু সবক্ষেত্রে সাফল্য আয় সহজ হয়নি। এটা আমরা মানি, এই বিপুল ক্ষুধার গ্রাসে পরিপূর্ণতা অর্জন এত সহজ নয়, যত সহজে এটা বলা যায় আমরা খাদ্যে স্বয়ম্ভর হয়েছি। শুধু তিনি নন, নেতাদের রাজনৈতিক বক্তৃতায় ওই দাবিটা প্রায়ই শুনতে পেতাম। এই কয়েক মাস আগে যেমন শুনেছি, আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে শতভাগ মানুষকে আলোকিত করেছি। আমরা ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে চলেছি। আমরা এখন বিদ্যুৎ রপ্তানি করতে পারি ইত্যাদি। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্যাপাসিটি আর উৎপাদন এক জিনিস নয়, এটা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবে না। সেই সুযোগটাই রাজনীতিকরা নিয়েছেন। বিদ্যুৎ রপ্তানি করার সেই সুযোগ আসার আগেই বিদ্যুতের ডেউটি নিভে গেছে। বলা হলো গ্যাস নেই, তাই উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। তারপর আমদানি করা তরল গ্যাস পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে খরচ বেশি পড়ছে, তাই দামও বাড়াতে হলো। বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে, তাই সেখানেও আর ভর্তুকি দেবে না সরকার। এভাবে একটার পর একটা দাম বাড়ানোর অজুহাত তৈরি করে দাম বাড়ানোর পরও দেখা যাচ্ছে, দেশের সামাজিক জীবনে প্রচণ্ড অস্থিরতা। কেননা খোলাবাজারে সয়াবিন তেল থেকে সব রকম আমদানিকৃত পণ্য ও দেশি পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। সরকার পণ্যের দাম বাড়িয়েও তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। সেটা সরকার মানতে রাজি নয়। সরকার বলে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের ফলে সবকিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। সেটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু সেই স্বাভাবিকতার একটি মাত্রা থাকতে হবে। ১৫ মে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি নতুন করে দাম বেঁধে দিলেন চিনির। খোলাবাজারে চিনির কেজি ১৪০ টাকা। এবার তিনি দাম বাড়িয়ে ১২০ ও ১২৫ টাকা করলেন। এর আগেও তিনি বেঁধে দিয়েছিলেন দাম। ১১০ টাকা খোলা চিনি, আর প্যাকেটজাত চিনি ১১৫ টাকা। কিন্তু যারা চিনির আমদানিকারক, তারা যে চিনি লুকিয়ে রেখে বাজারে দাম বাড়াচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে একটি পদক্ষেপও নিচ্ছেন না। কারণ কী? কারণ এটাই কি যে, তারা ক্ষমতাবানদের অংশীজন। তারাই সিন্ডিকেটের উকিল-মোক্তার, মহাজন। তাদের স্বার্থই দাম বেঁধে দেনেওয়ালাদের স্বার্থ এক। তাই ট্যারিফ কমিশন আর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের লোকেরা সিন্ডিকেটের অংশীজন। এটা সরকার জানে। জনগণও বোঝে। তিন. এই বয়ানকে বলা যেতে পারে ধান বানতে গিয়ে শিবের গীত গাওয়া। মনে হবে ওই দুটি বিষয়ের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু রিলেশন আছে। যেমন পুষ্টির উপাদান দুধের ঘাটতি মেটায় আমদানি করা গুঁড়া দুধ। আর যারা সিন্ডিকেট করে ব্যবসা চালান, তারা তো ওই গুঁড়া দুধের দামও ধাপে ধাপে বাড়িয়েছেন। পুষ্টি ঘাটতি এভাবে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এর সঙ্গে পুষ্টিহীনতার বা পুষ্টি সহযোগিতার কি যোগ আছে? এ রকম প্রশ্ন মনে জাগতেই পারে। খাদ্যশস্য যেমন পুষ্টির অন্যতম উপাদান উপকরণ, তার উৎপাদকরাও সেই রকম অনিবার্য উপাদান। তারা ভোট দিতে না পারলে কেবল তাদের অধিকারই হরণ করা হয় না, রাজনৈতিক-পুষ্টিও হরণ করা হয়। এটা বুঝতে হলে রাজনীতির সঙ্গে পুষ্টি আর ক্ষুধার কি সম্পর্ক তা উপলব্ধি করতে হবে। আর সেটা উপলব্ধি করার মতো রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বোধসত্তা থাকতে হবে। সেই সত্তা অর্জন করতে হলে সম্পর্কের অতিসূ² উপাদানের বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ ও জ্ঞান থাকতে হবে। চার. এবার ড. রাজ্জাকের কথায় আসা যাক। তিনি ওই সভায় অসাধারণ সব বাণী দিয়েছেন, যা সত্যিই আশাজাগানিয়া। কিন্তু সন্দেহ জাগে তখনই তিনি যখন বলেন ৩ বছরে দেশে দুধে ভাসিয়ে দিতে পারেন বা দিতে কাজ করবেন। লোকদেবীর আশীর্বাদ না পেয়েই তো আমরা শতাব্দীর পর শতাব্দী দুধে-ভাতে বাঁচিনি। আমরা সংগ্রাম করে নুন আর পান্তাভাতে বেঁচে আছি। সে কারণেই তো পহেলা বৈশাখে লোকসংস্কারের পান্তা ইলিশের উৎসব আয়োজন হচ্ছে ঢাকা মহানগরে। ঢাকা মহানগরে, রমনার বটমূলের বর্ষবরণ উৎসবের আয়োজনের সঙ্গে কিছু ভাসমান দোকান বসত। তার পরিমাণ ২০-২৫টির বেশি হতো না। সেই উৎসবে আমি এবং আমার কয়েক সহকর্মী বন্ধু পান্তা ইলিশের আয়োজন করি। এটা চলে পরপর কয়েক বছর। যারা আমার সঙ্গে দ্বিমত করবেন, তাদের অনুরোধ করব সেই সময়কার পত্রিকার পাতাগুলোতে চোখ রাখতে, রিপোর্টগুলো পড়ুন, বিটিভির আর্কাইভেও কিছু উপাত্ত পাবেন। মূল কথায় আসি। দুধে-ভাতে থাকার জন্য দেবীর কাছে প্রার্থনা আর আজকে রাজনৈতিক দেবতাদের দুধে ভাসিয়ে দেয়ার চেষ্টার মধ্যে বৈপরীত্যই আছে, মিল নেই। মিলটা এখানেই যে কৃষিমন্ত্রী থাকার পরও ড. রাজ্জাকের মনে পড়েনি যে মাত্র ৩ বছরেই তিনি দেশটিকে দুধে ভাসিয়ে দিতে পারেন। তাহলে তো আমাদের পানির অভাব অনেকটাই দুধেই মেটাতে পারি। সেখানে পুষ্টির উপকরণ যেমন থাকবে, তেমনি পানিও আছে দুধে। দুধের পানিতে কি তৃষ্ণা মিটবে? কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। তিনি বা তার মনে এই শেষ সময়ে টেনুরের শেষে এসে মনে পড়ল কেন? কেন বাজেটের সব ঠিকঠাক হওয়ার পর তিনি বাজেটকে এভাবে স্বপ্ন উপহার দিলেন? তার মানে তিনি বাজেটের ওপর চাপ দিতে এ কথা বলেননি। এটা বলেছেন ৩ বছরে দুধে দেশ ভাসিয়ে দেয়া যায়। এই স্বপ্ন তিনি দেখিয়ে দিচ্ছেন জনগণকে। জনগণ তো বোকা ও গাধা টাইপের প্রাণী, তারা রাজনৈতিক ঈশ্বরদের কথাকে বাণীর মতোই বিশ্বাস করেন। এর আগে যেমনটা বিশ্বাস করেছিলেন যে ক্ষমতায় যেতে পারলে ১০ টাকা কেজি দরে চাল খাওয়াবেন গরিবদের। আর কৃষকদের উদ্দেশে বলেছিলেন খাদ্যশস্য উৎপাদনের প্রয়োজনীয় সার মাগনা দেবেন। সেই ভর্তুকি সরকার দেবে। কিন্তু সেই বাণী ফলেনি। ঈশ্বরী পাটনির আবেদন যেমন লোকদেবী পূরণ করেননি, তেমনি আজকের দেবতা/দেবীও জনগণের প্রয়োজনের পুষ্টির আয়োজন করবেন না। কথার কথা বলবেন তারা। বলবেন আমরা তো আশার কথা বলিনি। স্বপ্ন রচনা করেছি। জনগণ সেই স্বপ্ন বাস্তব করে নেবেন। আমরা তো তাদের জন্য ব্যাংকের দরজা হাট করে খুলেই রেখেছি। জনগণ তো জানে না যে ব্যাংকের তারল্য খুবই কম, সেখান থেকে আধুনিক যান্ত্রিক দুগ্ধখামার তৈরির অর্থ জোগান দেয়ার সামর্থ্য তাদের নেই। নেই, তাই বলে তো স্বপ্ন ভেঙে যাবে না আমাদের রাজনৈতিক দেবী-দেবতাদের। তারা ঘোরতর স্বপ্নের বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন গায়ে হাওয়া লাগিয়ে। ড. রাজ্জাকও সেই দলে আছেন। জ্ঞানীর জন্য ইশারাই কাফি!
ড. মাহবুব হাসান : সাংবাদিক ও কলাম লেখক। mahboobh868@gmail.com
