ফলাফল ৩ অক্টোবর: গদি রক্ষার নির্বাচনে জয়ের আশা মমতার

আগের সংবাদ

শর্ত ভঙ্গ করায় প্রিমিয়ার ও এক্সিম ব্যাংককে জরিমানা

পরের সংবাদ

সন্ত্রাসে অশান্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্প

প্রকাশিত: অক্টোবর ১, ২০২১ , ৮:৪৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ১, ২০২১ , ৮:৫১ পূর্বাহ্ণ

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে ১০-১৫টি সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ। দিনে দুপুরে খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, ধর্ষণ, মাদক সরবরাহ, মানবপাচার ও অস্ত্রের ঝনঝনাতিতে মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে উঠেছে তারা। মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে কেউ কেউ গ্রেপ্তার বা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলেও পাহাড়ের নির্জন এলাকায় আস্তানা গড়ে তোলায় ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে বেশির ভাগ অপরাধী। সর্বশেষ রোহিঙ্গাদের শীর্ষ নেতা মুহিবুল্লাহকে হত্যার ঘটনায় আবারো আলোচনায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সশস্ত্র গ্রুপগুলো।

ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পের মধ্যে মুহিবুল্লাহকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও। পুলিশের পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্ন বলা হলেও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিরোধী কোনো সন্ত্রাসী গ্রুপ এ ঘটনা ঘটিয়েছে। শুধু সন্ত্রাসী গ্রুপ নয়; দেশীয় জঙ্গিবাদীদের বিচরণেও উদ্বেগের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র দাবি করছে, দেশের অভ্যন্তরীণ শীর্ষ জঙ্গি সংগঠনগুলোর অন্যতম টার্গেট এই রোহিঙ্গা ক্যাম্প। সদস্য রিক্রুট করার জন্য শীর্ষ জঙ্গি নেতারা নিয়মিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বৈঠক করছেন। জঙ্গি নেতাদের ইন্ধন দিচ্ছেন রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্যরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে নিরাপত্তার বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে রোহিঙ্গা ক্যাম্প। বিশেষ করে, রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের কাছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুদ থাকায় বিষয়টি মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানা গেছে।

গোয়েন্দা তথ্য বলছে, পাহাড়ে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী আদ্দু বাহিনী, গিয়াস বাহিনী ও সালমান শাহ বাহিনী। সালমান শাহ বাহিনীর সালমান শাহ কারাগারে থাকলেও সক্রিয় রয়েছে বাহিনীর কার্যক্রম। এ ছাড়া আছে জোকি বাহিনী, পুতিয়া বাহিনী, খালেক বাহিনী, জাকারিয়া গ্রুপ ও মুন্না গ্রুপ। জোকি বাহিনীর জোকি ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হলে এই বাহিনীর হাল ধরে তার বড় ভাই দিল মোহাম্মাদ আর জামিল। শালবন পাহাড়কেন্দ্রিক নয়াপাড়া ক্যাম্পে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলে সবচেয়ে বেশি। সেখানে অস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুত করা হয়েছে বলেও তথ্য রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। স্বার্থে টান পড়লেই যে কাউকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয় নির্জন পাহাড়ে। অর্ধ শতাধিক লোককে সেখানে গুলি করে হত্যাও করা হয়েছে। সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে প্রতিহত করতে গিয়ে প্রায়ই ঘটছে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাও। এখন পর্যন্ত ৩০টির মতো বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে বলেও র‌্যাব ও পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এরমধ্যে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে ১৮ জন রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারি।

এ ছাড়াও প্রত্যেক ক্যাম্পজুড়ে রয়েছে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) সশস্ত্র বিচরণ। ওই সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোরই কেউ মুহিবুল্লাহকে হত্যা করেছে বলে ধারণা পুলিশের। ইতোমধ্যে এ হত্যাকাণ্টের ঘটনায় জড়িতদের কয়েকজনের নামসহ ঘটনার বর্ণনা দিয়ে নিহত মুহিবুল্লাহর ছোট ভাই হাবিবুল্লাহ বলেছেন, আমার ভাইকে যারা হত্যা করেছে, তাদের মধ্যে আমি যাদের দেখেছি তারা হলেন- মাস্টার আব্দুর রহিম, মোরশেদ, নাগো, আরেকজন কালো করে মাথায় লম্বা চুল। সর্বমোট ২০ থেকে ২১ জন লোক এসেছিল। সবার হাতে অস্ত্র ছিল। মুহিবুল্লাহর ভাইয়ের বর্ণনা থেকেও বোঝা যায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কতটা বেপারোয়া হয়ে উঠেছে সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্যরা।

কক্সবাজার জেলা পুলিশের তথ্যমতে, গত চার বছরে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ১২ ধরনের অপরাধে ১ হাজার ২৯৮টি মামলা হয়েছে। এতে আসামি হয়েছেন ২ হাজার ৮৫০ রোহিঙ্গা। এসব অপরাধের মধ্যে রয়েছে- ডাকাতি, হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, অস্ত্র ও মাদক পাচার, মানব পাচার, পুলিশের ওপর হামলার মতো ঘটনা। এ সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৭১টি খুন, ৭৬২টি মাদক, ২৮টি মানব পাচার, ৮৭টি অস্ত্র, ৬৫টি ধর্ষণ ও ১০টি ডাকাতির ঘটনায় মামলা হয়েছে। ৩৪টি মামলা হয়েছে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের অপরাধে। অন্যান্য অপরাধে হয়েছে ৮৯টি মামলা।

২০১৭ সালে নানা অপরাধে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা ছিল ৭৬টি। আসামি ছিল ১৫৯ জন। ২০১৮ সালে ২০৮ মামলায় আসামি ৪১৪ জন। ২০১৯ সালে মামলার সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২৬৩টি। যার আসামি ৬৪৯ জন। ২০২০ সালে ১৮৪ মামলায় হয়েছে ৪৪৯ আসামি। চলতি বছরের ৮ মাসে ৫৭০ মামলায় আসামির সংখ্যা ১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

শুধু আসামি গ্রেপ্তার ও মামলার সংখ্যাই নয়- আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিয়মিত অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের ঘটনাও। বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশ বলছে, গত এক বছরে এসব এলাকা থেকে দেড় শতাধিক আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, রোহিঙ্গাদের পাহাড়ি ক্যাম্পে এত অস্ত্র-গোলাবারুদের উৎস কী? আর্মড পুলিশের পদস্থ এক কর্মকর্তা বলেন, রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের মূল উৎস মিয়ানমার। সে দেশ থেকে মাদকের সঙ্গে আসছে অস্ত্র। বান্দরবানের চাকঢালা, আশারতলী, তুমব্রু, ঘুমধুম সীমান্ত দিয়ে আসছে এসব অস্ত্র। পাহাড়ে সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের গুদামও রয়েছে। এসব অস্ত্রের বেশির ভাগ পাইপগান।
র‌্যাব ও বিজিবির তথ্যমতে, রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় গত বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে ১৫১টি গোলাবারুদ, ৩৩টি দেশীয় বন্দুক, দুটি নাইন এমএম পিস্তল, তিনটি রিভলবার, দুটি থ্রি কোয়ার্টার গান, তিনটি এলজি, পাঁচটি এসবিবিএল, একটি রাইফেল উদ্ধার করা হয়। ক্যাম্পে একাধিক বাসিন্দা বলেন, নয়াপাড়া ক্যাম্পের পেছনের পাহাড়ে রোহিঙ্গা ডাকাতদের আস্তানা। দিনে পাহাড় আর রাতে ক্যাম্প চষে বেড়ায় তারা। আমরা নিজেরাও অনিরাপদ বোধ করছি।

র‌্যাব-পুলিশের তথ্য বলছে, এসব বাহিনীর অর্থের বড় একটি উৎস ইয়াবা, মানব পাচার ও স্বর্ণ চোরাচালান। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের যেসব সিন্ডিকেট ইয়াবা, মানব পাচার ও স্বর্ণ চোরাচালান করছে, তাদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা নেয় তারা। এমনকি সাগরপথে পাচারের শিকার ব্যক্তিদের শুরুতে এই পাহাড়ে রাখা হয়।

এ বিষয়ে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আনোয়ার হোসেন ভোরের কাগজকে বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সুনির্দিষ্ট কোনো সন্ত্রাসী সংগঠন আছে বলে আমাদের জানা নেই। তবে, মাঝেমধ্যে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছে। সেখানে পুলিশ, এপিবিএনসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছে। কোনো সন্ত্রাসী সংগঠনের বিষয়ে তথ্য পেলে সঙ্গে সঙ্গে অভিযান পরিচালনা করে সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, রোহিঙ্গা নেতা মহিবুল্লাকে কে বা কারা হত্যা করেছে তা তদন্ত শেষ না হলে বলা সম্ভব নয়। আর জঙ্গি তৎপরতা যাতে না হয় সে বিষয়েও আমাদের কঠোর নজরদারি রয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (মিডিয়া) হায়দার আলী খান ভোরের কাগজকে বলেন, রোহিঙ্গারা বাস্তুচ্যুত নাগরিক। তাদের আমাদের মতো ভাবলে হবে না। সেখানে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন এনজিও সংস্থাসহ দেশীয় অনেক এনজিও কাজ করছে। ফলে সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া কোনো বিষয়েই ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব নয়। এক জায়গায় কয়েক লাখ মানুষ থাকলে মুষ্টিমেয় কয়েকজন অপরাধ কার্যক্রমে লিপ্ত হবেই। সেখানেও বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটছে। পুলিশের পক্ষ থেকে সেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। এপিবিএন আলাদাভাবে শুধু রোহিঙ্গা ক্যাম্প নিয়েই কাজ করছে। সুতরাং, রোহিঙ্গারা নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে, এ কথা এখনই বলাটা ঠিক হবে না।

কাউন্টার টেররিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) প্রধান মো. আসাদুজ্জামান ভোরের কাগজকে বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো জঙ্গিবাদ মাথাচারা দেয়ার জন্য অতি ঝুকিপূর্ণ। কারণ আমাদের দেশের জঙ্গি সংগঠনগুলোর প্রধান টার্গেট হয়ে উঠেছে রোহিঙ্গারা। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। তবে, রোহিঙ্গারা যেহেতু বাস্তুচ্যুত, সেহেতু তাদের সবার মধ্যে মিয়ানমারের সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার একটি মনোভাব রয়েছে। এই মনোভাব কাজে লাগিয়ে দেশীয় শীর্ষ জঙ্গি সংগঠনগুলো সদস্য রিক্রুট করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ইতিপূর্বে গ্রেপ্তার কয়েকজন শীর্ষ জঙ্গি নেতা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বৈঠকের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। বিশেষ করে নব্য জেএমবির সামরিক শাখার প্রধান জাহিদ হাসান রাজু ওরফে ইসমাঈল হাসান ওরফে ফোরকান গ্রেপ্তারের পর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একাধিক বৈঠক করার কথা স্বীকার করেছে। তবে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যাতে জঙ্গিরা তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে না পারে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাই নজর রাখছে।

কক্সবাজারের এপিবিএন-১৬ এর অধিনায়ক পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম ভোরের কাগজকে বলেন, টেকনাফ থানার অন্তর্গত রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর মধ্যে বেশকিছু ডাকাত গ্রুপ রয়েছে। এরা পাহাড়ের গভীর অরণ্যে ক্যাম্প স্থাপন করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। ইতোমধ্যে গত ১ বছরে বিভিন্ন গ্রুপের কাছ থেকে ২০টি পাইপগান উদ্ধার করা হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিত এই গ্রুপগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

কক্সবাজারের এপিবিএন-১৪ এর অধিনায়ক পুলিশ সুপার মো. নাইমুল ভোরের কাগজকে বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন সংগঠনের নাম শোনা গেলেও তেমন সক্রিয় গ্রুপ নেই। দেশীয় অস্ত্র ব্যবহার করে যে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো নিজেদের জানান দেয়ার চেষ্টা করছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

ডি-এফবি

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়