হল খোলার দাবিতে শাবি শিক্ষার্থীদের অবস্থান

আগের সংবাদ

দাওয়াল

পরের সংবাদ

ভাষা-সংস্কৃতির আপদ-বিপদ

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২১ , ৮:৪৪ অপরাহ্ণ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২১ , ১০:০৮ অপরাহ্ণ

আমাদের ভাষা-সংস্কৃতির ওপর বারবার আঘাত-আগ্রাসন এসেছে। অতীতে উর্দুর আগ্রাসন আমরা সফলতার সঙ্গে প্রতিহত করেছিলাম। স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর সে আপদ দূর হয়েছে। কিন্তু স্বাধীন দেশে আমাদের ভাষা-সংস্কৃতি পুনরায় সংকটের মুখে পড়বে- তা আমাদের কল্পনারও বাইরে ছিল। অথচ স্বাধীন দেশে আমাদের ভাষা-সংস্কৃতি এখন আগ্রাসনের মুখে। আপদ দূর হলেও, বিপদ আমাদের পিছু নিয়েছে। এই বিপদ দূর করা কেবল কঠিনই নয়, অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিপদটি এসেছে প্রযুক্তির হাত ধরে। এবং ক্রমেই এর বিস্তার ঘটেছে ব্যাপকভাবে। আমাদের ঘরে ঘরে ঢুকে পড়েছে; সে কারণেই এই বিপদকে বিদায় করা সহজ নয়। বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি এমনকি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এখন হুমকির কবলে। যার মাত্রাতিরিক্ত বিরূপ প্রভাব পড়েছে আমাদের সামগ্রিক জীবনাচারে পর্যন্ত। নেতিবাচক সেই প্রভাবে আমাদের পরিবার, সমাজ এখন চরম সংকটের মুখে। আমাদের রুচিতে, আচার-আচরণে, মানসিকতায় সর্বত্রই অনুপ্রবেশ ঘটেছে হিন্দির বেপরোয়া আগ্রাসন। হিন্দি চলচ্চিত্রের নৃশংস দাঙ্গাবাজি আমাদের সমাজকে ক্রমেই বিপথগামী করে তুলেছে। হিন্দি ছবির সহিংস দাঙ্গাবাজির অনুকরণে ঘটছে নৃশংস নানা ঘটনা। হিন্দি ছবি ভারতীয় সমাজ-জীবনঘনিষ্ঠ মোটেও নয়। হিন্দি সিরিয়ালগুলো পর্যন্ত ভারতীয় সমাজ জীবনের সঙ্গে মোটেও সঙ্গতিপূর্ণও নয়। হিন্দি বাণিজ্যিক উপাদানের স্থ‚ল চলচ্চিত্র কিংবা হিন্দি সিরিয়ালসমূহ সম্পূর্ণরূপে বাস্তব বিবর্জিত। ভারতীয় কিংবা বাংলাদেশের সমাজ জীবনের সঙ্গে এর বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। আফিমের নেশার ন্যায় মানুষের চেতনা এবং নিজ ভাষা-সংস্কৃতি বিকৃতি ও বিনাশে ভ‚মিকা রেখে চলেছে। অপসংস্কৃতির এই চলমানতাকে রুখতে না পারলে সর্বনাশ অনিবার্য। দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদী গণসচেতনতায় এই বিপদ থেকে পরিত্রাণ সম্ভব বলেই মনে করি।
ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের অবসানে খণ্ডিত বাংলার পূর্ববাংলা অংশ আড়াই হাজার মাইল দূরত্বের পাকিস্তান রাষ্ট্রের অধীন হয়ে যায়। একমাত্র ধর্মীয় ঐক্য ব্যতীত আমাদের সঙ্গে অন্য একটি ক্ষেত্রেও পাকিস্তানিদের সঙ্গে ঐক্য-মিল ছিল না। পূর্ববাংলার মানুষ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পক্ষে ভোট দিয়েছিল একমাত্র ধর্মীয় বিবেচনায়। ধর্ম সেই বিবেচনার মাশুল আমরা চরমভাবে দিয়েছিলাম একাত্তরের গণহত্যা এবং মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংসতা নাৎসি বাহিনীর বর্বরতাকে পর্যন্ত হার মানিয়েছিল। পাকিস্তান রাষ্ট্রের সূচনালগ্নেই আক্রান্ত হয়েছিল আমাদের ভাষা-সংস্কৃতি। উর্দু ভাষা এবং ধর্মীয় সংস্কৃতি চাপিয়ে আমাদের ভাষা-সংস্কৃতি বিনাশের নানা চক্রান্ত করেও সফল হতে পারেনি। তীব্র প্রতিরোধ এবং সর্বোচ্চ ত্যাগে আমরা আমাদের ভাষা-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে রক্ষা করেছিলাম। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রের অন্যতম ভাষা রূপে স্বীকারে বাধ্য হয়েছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। সমৃদ্ধ বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতির অধিকতর চর্চায় আমরা উর্দু ও ধর্মীয় সংস্কৃতির আগ্রাসন সফলভাবে রুখে ছিলাম। লাহোর এবং ঢাকায় নির্মিত উর্দু চলচ্চিত্রের আগ্রাসন প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছিল বাংলা চলচ্চিত্রের অগ্রযাত্রার কারণে। মুখ ও মুখোশ সবাক চলচ্চিত্র বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পে নতুন দিগন্তের শুভ সূচনা করেছিল।
বায়ান্নর ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার সফল আন্দোলন পরবর্তী বাংলা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সংযোজন বাংলা চলচ্চিত্রের নির্মাণ পর্ব। মুখ ও মুখোশ চলচ্চিত্রের হাত ধরে বাংলা চলচ্চিত্রের সেই অভিযাত্রা উর্দু চলচ্চিত্রের একচেটিয়া বাজার সৃষ্টির প্রধান অন্তরায় রূপেই প্রকাশ্যে অবস্থান নেয়। ১৯৪৭-এর দেশভাগের পরও কলকাতার বাংলা এবং বোম্বের হিন্দি ছবি পূর্ব পাকিস্তানে অবাধে প্রদর্শিত হত। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেয় পাকিস্তানের সামরিক শাসক। তবে সুযোগের মওকায় লাহোর ও ঢাকায় নির্মিত উর্দু ছবি কিন্তু ভারতীয় চলচ্চিত্রের বিকল্পরূপে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছে, ঢাকায় নির্মিত সুস্থ বিনোদনের বাংলা ছবির দাপটে। উর্দু ছবির প্রসারের ক্ষেত্রে অন্যতম অন্তরায় ছিল ভাষা। বাংলা ছবি আমাদের সমাজ-জীবনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল বলেই বাংলা ছবির দর্শকের অভাব ছিল না। সে সময়কার বাংলা ছবি আমাদের চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের দাবি রাখে। বিরুদ্ধ স্রোতের বিপরীতে বাংলা চলচ্চিত্র নিজ গুণে উর্দু চলচ্চিত্রকে যেমন পরাস্ত করতে পেরেছিল। তেমনি পেরেছিল দর্শক সৃষ্টিতেও। আমাদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-সংগ্রামে বাংলা চলচ্চিত্র-বাংলা সাংস্কৃতিক চর্চা গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করেছিল।
পাকিস্তানি আমলে আমাদের সাংস্কৃতিক বিনোদনের অপরিহার্য অংশ ছিল প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে ছবি দেখা। এছাড়া রেডিও শোনার শ্রোতারও অভাব ছিল না। রেডিওর চারপাশে বসে নাটক, গান শোনার প্রচলন ছিল সর্বাধিক। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিনোদনের মাধ্যম ছিল রেডিও। ঢাকা বেতার, আকাশবাণী, বিবিধ ভারতে স¤প্রচারিত বাংলা নাটক, গান শোনার শ্রোতা ছিল সর্বাধিক। যার প্রধান কারণ রূপে অবশ্যই ছিল ভাষা। ভাষার কারণেই কলকাতার বাংলা চলচ্চিত্র, নাটক, গান আমাদের শ্রোতা-দর্শকদের আকৃষ্ট করতে পেরেছিল। জনপ্রিয় বাংলা গানের কিংবদন্তি শিল্পীদের গান লোকমুখে যত্রতত্র শোনা যেত।
আমাদের সমাজ-জীবনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বাংলা ছবি পরিবার সমেত প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে দেখার প্রবণতা ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর বিনোদনের এই মাধ্যমটি আর পূর্বাবস্থায় অক্ষুণœ থাকেনি। স্বাধীনতার পর বাংলা চলচ্চিত্রে অশ্লীলতা-স্থূলতা, দাঙ্গাবাজি ঢুকে পড়ে এবং ক্রমেই বাংলা চলচ্চিত্র তার অতীত ঐতিহ্য হারিয়ে বসে। রংবাজ ছবির হাত ধরে আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পে সর্বনাশের যে ধারাটির সূচনা হয়েছিল-পর্যায়ক্রমে সেই অসুস্থ ধারায় আমরা হারিয়েছি চলচ্চিত্র বিনোদন এবং প্রেক্ষাগৃহগুলো হারিয়েছে অগণিত দর্শক। দর্শকরা সেই যে প্রেক্ষাগৃহ বিমুখ হয়েছিল। তা আর পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়নি। হালের দশা আরো করুণ। খোদ ঢাকা শহরে অনেকগুলো প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হয়ে গেছে। গুলিস্তান, নাজ, স্টার, মুন, লায়ন, তাজমহল, শাবিস্তান, রূপমহল, চিত্রামহল, শ্যামলী, বিউটি প্রভৃতি প্রেক্ষাগৃহগুলো এখন মার্কেটে পরিণত। দেশের অন্যান্য জেলা শহরের ক্ষেত্রেও একই দশা দেখা যায়।
বিশ্বের সব দেশেই চলচ্চিত্র শিল্পের দুটি ধারা লক্ষ করা যায়। একটি স্রেফ বাণিজ্যিক। অপরটি সৃজনশীল। স্বাধীনতার পর দেশে সৃজনশীল ছবি নির্মিত হয়নি, এটা সত্য নয়। তবে বাণিজ্যিক ধারার দাপটে সৃজনশীল চলচ্চিত্র দাঁড়াতে পারেনি। বাণিজ্যিক ছবির লাগাতার প্রেক্ষাগৃহ বুকিংয়ের কারণে সৃজনশীল ছবি মুক্তি পর্যন্ত দেয়া সম্ভব হয়নি। এতে আর্থিক ক্ষতির শিকার সৃজনশীল চলচ্চিত্রের আশানুরূপ বিকাশ সম্ভব হয়নি। সৃজনশীল চলচ্চিত্র নির্মাতারা ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবং অঙ্গীকারেই যুক্ত হয়েছেন। পুঁজির লগ্নিকারকরা বাণিজ্যিক ছবিতে বিনিয়োগ করলেও-সৃজনশীল চলচ্চিত্রে বিনিয়োগে মোটেও উৎসাহী হয়নি। লগ্নি করা পুঁজির মুনাফা সমেত ফিরে না পাবার আশঙ্কায় তারা পুঁজি বিনিয়োগ করেনি। রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা যেমন পায়নি, তেমনি নানাবিধ প্রতিক‚লতা-বিড়ম্বনা উপেক্ষা করেই নির্মাতারা সৃজনশীল চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব করেছেন। তাঁরা প্রত্যেকে স্বউদ্যোগ ও অঙ্গীকারেই সৃজনশীল ধারাটিকে বাঁচাতে মরণপণ চেষ্টা করেছেন। চলচ্চিত্রের ন্যায় সৃজনশীল মাধ্যমটি বিনষ্ট হয়েছে মুনাফার লালসার কারণে। হিন্দি ও দক্ষিণ ভারতীয় বাণিজ্যিক ছবির রিমেক ব্যবসায় এখন ভাটির টান পড়েছে। স্যাটেলাইট টিভির কল্যাণে ঘরে বসেই দর্শক আদি রস গ্রহণ করতে পারছে। বাংলা রিমেক অর্থ খরচ করে সঙ্গত কারণেই দর্শদের প্রেক্ষাগৃহে যাবার প্রয়োজনীয়তা এখন ফুরিয়েছে। আমাদের সম্ভাবনাময় চলচ্চিত্র শিল্পের এরূপ করুণ ভাগ্যবরণ নিশ্চয় প্রত্যাশিত ছিল না।
পুঁজির দৌরাত্ম্যের কাছে আমরা নিয়ত হার মানছি। যথার্থ অর্থে পুঁজিতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ গড়তে পারিনি। এই পুঁজির দৌরাত্ম্যে আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পের সৃজনশীল বিকাশ রুদ্ধ হয়েছে। আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পের ন্যায় অভিন্ন ভাগ্যবরণ করতে হয়েছে কলকাতার বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পকেও। হালের কলকাতার ছবি উদ্ভট-কিম্ভুত। বাঙালি জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কহীন। বিনোদনের উপাদানমাত্রই স্থূল, অশ্লীল এবং সহিংস মারামারি। বম্বে ও দক্ষিণ ভারতের বাণিজ্যিক ছবির বাংলা ভার্সান। ব্রিটিশ ভারতে সর্বপ্রথম চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল কলকাতায়। টালিগঞ্জের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির বহু পরে মুম্বাই ও মাদ্রাজে চলচ্চিত্র শিল্প গড়ে ওঠে। এখন কলকাতার বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পে অতীত ঐতিহ্য ব্যতীত অবশিষ্ট কিছুই নেই। ঢাকার বাণিজ্যিক ছবি আর কলকাতার বাণিজ্যিক ছবি মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ মাত্র। দুই বাংলার ছবি মাত্রই মুম্বাই এবং দক্ষিণ ভারতের সফল বাণিজ্যিক ছবির রিমেক। কলকাতার সৃজনশীল চলচ্চিত্রের ধারাও আমাদের দেশের ন্যায় স্বল্প পরিসরে ঢিমে লয়ে সবল রয়েছে। মুনাফাবাজ পুঁজির লগ্নিকারকদের মুনাফার লিপ্সার কাছে দুই বাংলার চলচ্চিত্র শিল্প মৃত্যুর প্রহর গুনছে। অথচ সত্যজিৎ রায়, ঋত্ত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, তপন সিংহ, রাজেন তরফদার, গৌতম ঘোষ, উৎপলেন্দু চক্রবর্তী, পূর্ণেন্দু পত্রী, ঋতুপর্ণ ঘোষ প্রমুখ বিশ্ববরেণ্য ও সৃজনশীল চলচ্চিত্র নির্মাতারা কলকাতার বাংলা চলচ্চিত্রকে বিশ্ব চলচ্চিত্রের গৌরবজনক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন। বর্তমান বাস্তবতায় তা কেবলই হারানো অতীত স্মৃতি মাত্র।
স্বাধীনতার পর গ্রুপ থিয়েটার নাট্য আন্দোলন এবং এর অগ্রযাত্রা আমাদের আশান্বিত করেছিল। আমাদের সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রায় গ্রুপ থিয়েটার যথার্থ ভ‚মিকাও পালন করেছিল। দেশপ্রেম, মতাদর্শিক অঙ্গীকারে তরুণদের নিরলস প্রচেষ্টায় বাংলা মঞ্চ নাটকের যে শুভ সূচনা হয়েছিল। কালক্রমে তাও এখন স্থবির প্রায়। নাটকের মাধ্যমে গণসচেতনতা সৃষ্টির যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে গ্রুপ থিয়েটার চর্চা শুরু হয়েছিল। তা লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে। মধ্যবিত্তের বিনোদনের মাধ্যমরূপে গ্রুপ থিয়েটার চর্চা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। নাট্যকর্মীদের মধ্যেও পূর্বের ন্যায় অঙ্গীকার-একাগ্রতা লক্ষ করা যায় না। মঞ্চ নাটক হয়ে পড়েছে ব্যক্তিগত প্রচার-প্রতিষ্ঠার সিঁড়িস্বরূপ। মঞ্চে অভিনয়ের কারণে অভিনেতা-অভিনেত্রীর পরিচিতি তারা পেয়ে যায় এবং সহসা ঢুকে যায় টিভি মিডিয়ায়। দ্রুত তারকা খ্যাতিতে মঞ্চ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। পূর্বে রাষ্ট্রীয় মাত্র একটি টিভি চ্যানেল ছিল। কিন্তু বর্তমানে দেশে বেসরকারি টিভি চ্যানেলের ছড়াছড়ি। সব টিভি চ্যানেলের নামও তাৎক্ষণিকভাবে বলা কারো পক্ষে সম্ভব হবে না। আমাদের ক্ষমতার রাজনীতির দ্বিদলীয় ব্যবস্থায় যে দল যখন ক্ষমতায় থাকে সে দলের লোকদের ঢালাও স্যাটেলাইট টিভির লাইসেন্স প্রদানের হিড়িক চলে। বেসরকারি চ্যানেলসমূহে নাটক, সিরিজ নাটক নিয়মিত স¤প্রচার হয়ে থাকে। মঞ্চ নাটকের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের জন্য এতে বিশাল সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। মঞ্চ নাটকে পারিশ্রমিক নেই। নেই রাতারাতি তারকা খ্যাতির সম্ভাবনাও। কিন্তু স্যাটেলাইট টিভিতে পারিশ্রমিক রয়েছে। তাৎক্ষণিক তারকা খ্যাতির অপার সম্ভাবনা তো রয়েছেই। কাজেই সেটা তো আকৃষ্ট করবেই। বেসরকারি টিভিগুলোর নাটক এবং সিরিজ নাটকে ভাষার বিকৃতি লক্ষ করা যায়। কতিপয় নাট্যকার কাম পরিচালকের নাটকের ভাষা এতটাই বিকৃত যে-বাংলা ভাষা পর্যন্ত ভাবার উপায় থাকে না। বিভিন্ন অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষার মিশ্রণে অদ্ভুত ভাষায় কুশীলবেরা সংলাপ বলে থাকে। ভাষার এই বিকৃতি আমাদের ভাষার জন্য নতুন বিপদ নিয়ে এসেছে। যার প্রভাব আমাদের সমাজ-জীবনে লক্ষ করা যায়। বাংলা ভাষার এই বিকৃতি আমাদের জন্য নতুন সংকট সৃষ্টি করেছে। প্রতিটি নাটকের পুঁজি বিনিয়োগে অর্থাৎ স্পন্সর রূপে করপোরেট পুঁজির আধিক্য লক্ষ করা যায়। এই সমস্ত নাটকগুলো চলচ্চিত্রের ন্যায় অশ্লীল-স্থূল নয় কিন্তু চলচ্চিত্রের নব্য সংস্করণ বললে ভুল হবে না। দেশপ্রেম, মানবমুক্তি কিংবা মানবপ্রেমের বিপরীতে প্রায় নাটকে ব্যক্তির সুখ, দুঃখ, বিরহ, হতাশা, বেদনার প্রাধান্য দেখা যায়। আমাদের সমাজ জীবনের সংকট-অসঙ্গতি নাটকে দেখা যায় না। ভারতীয় হিন্দি সিরিয়াল থেকেও অনেক নাটক ধার-কর্জ করে নির্মিত হয়ে থাকে। তবে লক্ষণীয় একটি নাটক-সিরিয়াল শুরু থেকে শেষ অবধি কারো পক্ষে দেখা সম্ভব হয় না। কেননা সাত-আট মিনিট নাটক স¤প্রচারের পর পাঁচ মিনিটের নিয়মিত বিজ্ঞাপন বিরতির ধকল সয়ে কারো পক্ষে সম্পূর্ণ নাটক দেখা অসম্ভব। দর্শক হাতের রিমোট চেপে শত চ্যানেলের অন্যটিতে নিমিষে চলে যায়।
আমাদের দেশীয় বেসরকারি চ্যানেলগুলো ভারতীয় হিন্দি চ্যানেলগুলোর ন্যায় দর্শক টানতে পারেনি। সে কারণে বিনে পয়সায় দর্শকেরা বেসরকারি চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠান দেখতে পারছে। দেশের একটি চ্যানেলও পে-চ্যানেল নয়। অপরদিকে ভারতের প্রায় সব চ্যানেলই পে-চ্যানেল। সেসব চ্যানেল দেখাতে ক্যাবল অপারেটরগণ স্থানীয় এজেন্টদের মাসিক অর্থ প্রদান করে থাকে। মাসের টাকা প্রদানে বিলম্ব হওয়ামাত্র চ্যানেল সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়। ক্যাবল অপারেটররা প্রতিটি টিভির বিপরীতে মাসিক তিন থেকে পাঁচশ টাকা আদায় করে থাকে। একেকজন অপারেটর এলাকা ভাগ-বাটোয়ারা করে ব্যবসা করছে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও পেশিশক্তির দৌরাত্ম্যপনাও লক্ষ করা যায়। যে কেউ এই ব্যবসায় যুক্ত হতে পারবে না। সে উপায়ও নেই। পে-চ্যানেলগুলোর মাসোহারা প্রদান এবং প্রাতিষ্ঠানিক খরচ মিটিয়ে প্রত্যেক ক্যাবল অপারেটর মাসে প্রায় লাখ টাকা উপার্জন করে থাকে। এছাড়া দেশীয় চ্যানেলগুলো যাতে অপারেটররা তাদের ক্যাবল সংযোগে সম্প্রচার চালু রাখে, সেজন্য চ্যানেল কর্তৃপক্ষ অপারেটরদের উল্টো মাসোহারা দিয়ে থাকে।আমাদের দেশে হিন্দি-চ্যানেলগুলোর চাহিদা সর্বাধিক। জি-টিভি, জি-সিনেমা, জি-এ্যাকশন, জি-ক্লাসিক, স্টার প্লাস, স্টার গোল্ড, সনি টিভি, সেট ম্যাক্স ইত্যাদি হিন্দি চ্যানেলগুলোই দর্শকদের পছন্দের চ্যানেল। স্যাটেলাইট টিভির বদৌলতে হিন্দি ভাষা সংস্কৃতি এখন ঘরে ঘরে ঢুকে গেছে। মহিলারা গৃহের কাজ ফেলে পর্যন্ত হিন্দি সিরিয়াল দেখতে ব্যস্ত হয়ে যায়। নেশার ন্যায় হিন্দি সিরিয়াল আমাদের মহিলা দর্শকদের নেশাগ্রস্ত করে তুলেছে। যত কাজই থাক না কেন একটি এপিসোডও অদেখা রাখতে তারা চায় না। আমাদের পারিবারিক ও সামাজিকতার ক্ষেত্রে হিন্দি সিরিয়ালগুলো দর্শকদের ক্রমেই অসামাজিক করে তুলেছে। পাড়া-পড়শি, আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে সামাজিকতা এসব সিরিয়াল দখল করে নিয়েছে।
পূর্বে আত্মীয় বাড়ি, প্রতিবেশীদের বাড়িতে যাওয়া-আসার যে সামাজিকতা ছিল, এখন সবই লুপ্ত প্রায়। বিচ্ছিন্নতায় আক্রান্ত প্রায় প্রতিটি পরিবার। হিন্দি ছবি-সিরিয়াল মানুষকে ক্রমেই গৃহবন্দি করে ফেলেছে। জীবন-জীবিকার বাইরে অবসরে সবাই টিভিতে মত্ত। কেবল শহরে নয়। গ্রাম-মফস্বলে পর্যন্ত একই অবস্থা বিরাজ করছে। কখন কোন সিরিয়াল তা-প্রায় সবার মুখস্ত। সিরিয়াল দেখার সময়ে তারা অন্য জগতের বাসিন্দা হয়ে যায়। দিন-রাত্রি ২৪ ঘণ্টা চ্যানেলগুলো অনুষ্ঠান-ছবি স¤প্র্রচার করে। এতে মানুষ সব সামাজিকতা পরিহার করে টিভির সম্মুখে সময় অতিবাহিত করে। অতীতে পাকিস্তানি শাসকেরা শত চেষ্টা করেও উর্দু ভাষা চাপাতে পারেনি। পারেনি উর্দু সাংস্কৃতিক বিনোদনে আকৃষ্ট করতেও। অথচ আমরা এখন হিন্দি ভাষা ও সংস্কৃতিতে অধিক মাত্রায় আসক্ত হয়ে পড়েছি।
আমাদের সামগ্রিক সংস্কৃতিতে হিন্দির মাত্রাতিরিক্ত প্রভাব লক্ষ করা যায়। কথায়, আচার-আচরণে, দৈনন্দিন জীবনের নানা ক্ষেত্রে হিন্দির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। যা আমাদের ভাষা-সংস্কৃতিতে বিকৃতি-অপসংস্কৃতির প্রভাব ফেলেছে। এর থেকে বের হবার একমাত্র উপায়টি হয়ে নিজেদের সাংস্কৃতিক চর্চাকে ব্যাপকভাবে বেগবান করা।

এসএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়