নানিয়ারচরে গুলি করে চা বিক্রেতাকে খুন

আগের সংবাদ

বেড়েছে চিকিৎসা সুবিধা, কমেছে জনসচেতনতা

পরের সংবাদ

নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষিত

ভ্যাকসিন ট্রায়াল নিয়ে বিতর্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৯, ২০২০ , ৯:২২ পূর্বাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ৯, ২০২০ , ১১:৪৭ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশে চীনে তৈরি করোনার ভ্যাকসিন ট্রায়ালের (পরীক্ষামূলক প্রয়োগ) অনুমোদন দেয়া হলেও এর নিরাপত্তা ইস্যুতে বিতর্ক রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভ্যাকসিন মানুষের জীবন রক্ষা করতে পারে, তেমনি কখনো তা শারীরিক জটিলতা বা মৃত্যুর কারণও হতে পারে। সে কারণে ভ্যাকসিন প্রয়োগের আগে মান, ট্রায়ালে অংশ নেয়াদের ইন্স্যুরেন্স, সম্মানীসহ বিভিন্ন বিষয় নিশ্চিত করতে হয়। কিন্তু দেশে এসবের কিছুই হচ্ছে না।

করোনা মহামারির কারণে গোটা বিশ্বই এখন ভ্যাকসিন পেতে মরিয়া। বাংলাদেশও সে চেষ্টা করছে। সম্প্রতি চীনের সিনোভ্যাক বায়োটেক কোম্পানির তৈরি ভ্যাকসিন দেশের ৪ হাজার ২০০ স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর ফেজ-৩ পর্যায়ের ট্রায়ালের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয় বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসা আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআর,বি। সরকার তা অনুমোদন দেয়। আগামী ১০/১২ দিনের মধ্যে দেশে ১ লাখ ভ্যাকসিন এসে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের ইমুনোলজিস্ট ও স্টাফ সায়েন্টিস্ট ড. মো. শামছুল আলম, ড. জুবায়ের রহমান এবং নেদারল্যান্ডসের ডব্লিউএইচও-ইউট্রেক সেন্টার অব এক্সেলেন্স ফর এফোরডেবল বায়োথেরাপিউকিক্সের ইমুনোলজিস্ট ও প্রজেক্ট লিড ড. রেজাউল করিম ভোরের কাগজকে যৌথভাবে তাদের পর্যবেক্ষণ জানিয়েছেন। তারা বলেন, ভ্যাকসিন অন্যান্য ওষুধের মতো নয়। শুধু নিরাপত্তা ইস্যুতে বিশ্বে ভ্যাকসিন তৈরির অনেক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। অথচ এ জন্য সরকার ও প্রাইভেট ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে থাকে।

প্রবাসী ওই তিন বিশেষজ্ঞ বলেন, ট্রায়ালের সব খরচ চীনা কোম্পানিটি দিবে। এতে লাভবান হবে আইসিডিডিআর,বি। কিন্তু যারা ট্রায়ালে অংশ নেবেন, তাদের নিরাপত্তায় গুরুত্ব দেয়া হয়নি। করোনা সংক্রমণের পর আইসিডিডিআর,বি আইসোলেশন সেন্টার করেনি। কোনো গবেষণা প্রতিবেদনও প্রকাশ করেনি। এখন শুধু একটি কোম্পানি থেকে অর্থ পেয়ে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য উৎসাহী হয়ে উঠলেই হবে না। নিরাপত্তা ইস্যুগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিশ্বে ভ্যাকসিন তৈরির প্রায় ২০০টি উদ্যোগের কথা জানা গেছে। এখন পর্যন্ত যতগুলো করোনা ভ্যাকসিন ফেজ-৩ ট্রায়ালে পৌঁছেছে তার মধ্যে ২টি এমআরএনএ ভ্যাকসিন, ২টি এডিনো ভাইরাস ভেক্টর দিয়ে তৈরি ভ্যাকসিন ও ৩টি নিষ্ক্রিয় করোনা ভাইরাস দিয়ে তৈরি। এগুলোর মধ্যে কোনটি বাংলাদেশ ট্রায়াল করবে তা গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত ছিল। তারা জানান, করোনা ভ্যাকসিন ইমিউন এনহ্যান্সমেন্ট করতে পারে, যা ভ্যাকসিন দেয়া মানুষের মৃত্যুর কারণও হতে পারে। নিষ্ক্রিয় ভাইরাসের ভ্যাকসিনে ননস্পেসিফিক এন্টিবডি বেশি তৈরি হয় বলে ইমিউন এনহ্যান্সমেন্ট হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। ব্রাজিলে গত জুলাই মাসের মাঝামাঝি সিনোভ্যাকের ভ্যাকসিন ট্রায়াল শুরু হয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো তথ্য জানানো হয়নি। তাছাড়া এত অল্প সময়ের মধ্যে ইমিউন এনহ্যান্সমেন্ট বিষয়ে ধারণা করাও বাস্তব সম্মত নয়।

বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, আফ্রিকায় এইচআইভির ও ফিলিপাইনে ডেঙ্গুর ভ্যাকসিন ট্রায়াল করতে গিয়ে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটেছিল। ২০১৮ সালে চীনের চ্যাংসেঙ বায়োটেক কোম্পানি ২ লাখের বেশি শিশুকে মানহীন ডিপিটি (ডিপথেরিয়া, পারটুসিস, টিটেনাস) টিকা প্রয়োগ করে। ওই ঘটনায় চ্যাংসেঙ কোম্পানির চেয়ারম্যানসহ ১৫ জনকে আটকও করেছিল সরকার। তাই ভ্যাকসিন পেলেই তা লুফে নিতে হবে, বিষয়টি যেন এমন না হয়। তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুরসহ অনেক দেশই যাদের ওপর ভ্যাকসিন ট্রায়াল করছে তাদের কয়েক হাজার ডলার সম্মানী দিচ্ছে। সঙ্গে থাকছে ইনস্যুরেন্স। এটা নৈতিকতার প্রশ্নে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি পন্থা। কাউকে ট্রায়ালে অংশ নিতে বাধ্য করা যায় না। স্বেচ্ছায় অংশ নেয়ার পরও কোনো ক্ষতি হলে বা মৃত্যু হলে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রাখা হয়। কিন্তু বহুজাতিক কোম্পানিগুলো অনেক ক্ষেত্রেই গরিব দেশের লোকজনের ক্ষেত্রে তা করে না। কৌশলে শুধু পরীক্ষার ফলাফলটা নিয়ে যায়।

এ প্রসঙ্গে আইসিডিডিআর,বির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. কে জামান জানান, নিরাপত্তার বিষয়টি তারা জোরালোভাবেই দেখছেন। এ জন্য একটা পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। যাদের ওপর ট্রায়াল চালানো হবে, তাদের সঙ্গে টেলিমিডিসিন ইউনিট নিয়মিত যোগাযোগ রাখবে। কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সেবা পাবেন তারা।

কিন্তু এরপরও কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে কী করবেন- এমন প্রশ্নের জবাবে ড. কে জামান বলেন, আসলে সবাই স্বেচ্ছায় ও সব বুঝেই এতে অংশ নেবেন। নির্ধারিত ফরমে স্বাক্ষর করে সম্মতি দিলেই ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হবে। সেখানে সব শর্ত লেখা থাকবে। ইন্স্যুরেন্স ও সম্মানীর বিষয়টি আসলে এখানে রাখা হয়নি।

প্রসঙ্গত, ঢাকার ৭টি কোভিড হাসপাতাল থেকে চিকিৎসক, নার্স ও ওয়ার্ড অ্যাটেনডেন্টসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর ট্রায়ালের পরিকল্পনা রয়েছে আইসিডিডিআর,বির। এছাড়া এ দেশে অবস্থানরত চীনা নাগরিকরাও চাইলে এতে অংশ নিতে পারবেন।

এমআই

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়