জাতির পিতার হত্যাকাণ্ড ষড়যন্ত্র দেশে-বিদেশে

আগের সংবাদ

বঙ্গবন্ধুর জন্য বুলেটের মুখে বুক পেতে দিয়েছিলেন যিনি

পরের সংবাদ

‘বঙ্গবন্ধু’কে ঘিরে কিছু স্মৃতি ও ‘বঙ্গবন্ধু’ নামকরণের ইতিহাস

প্রকাশিত: আগস্ট ১৪, ২০২০ , ১১:৩৯ অপরাহ্ণ আপডেট: আগস্ট ১৪, ২০২০ , ৩:০৪ অপরাহ্ণ

অতীতের ইতিহাস থেকে জানা যায় প্রত্যেকটা জাতির একটা মাহেন্দ্রক্ষণ থাকে আর সেই ক্ষণের আগমনী বার্তা পাওয়ার সাথে সাথে প্রত্যেক জাতি গ্রহণ করে স্বাধীনতার সুধা। ঠিক তেমনি বাঙালি জাতি সে মাহেন্দ্রক্ষণটির জন্য অপেক্ষা করছিল।
পৃথিবীকে আলোকিত করার জন্য প্রাকৃতিক নিয়মে পুবাকাশে সূর্য উঠেছিল ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ। সাথে বাঙালি জাতির জন্য সোনালি আভা নিয়ে আরেকটি সূর্য উঠেছিল, সেই সূর্যের নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যে সূর্যের স্বর্ণালি রোদ এসে বাঙালি জাতিকে উপহার দিয়েছিল একটি জাতি রাষ্ট্র, লাল-সবুজের একটি পতাকা ও একটি জাতীয় সংগীত। সাথে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার ঠাঁই করে দিয়েছিল, বাঙালিকে এনে দিয়েছিল আত্মপরিচয়ের নতুন ঠিকানা বাংলাদেশ।
স্বাধীন বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডের স্বপ্নদ্রষ্টা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নৃশংসভাবে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে দুর্বৃত্তরা সেদিন চেয়েছিল বঙ্গবন্ধুর নাম বাংলার মাটি থেকে মুছে ফেলতে! কিন্তু যে নামটি বাঙালির হৃদয়ে গাথা, যে নামটি শুনে ১৯৭১ সালে এদেশের কৃষক, শ্রমিক, ছাত্রজনতা পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে মরণপণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সে নামটি এত সহজে বাঙালির হৃদয় থেকে মুছে ফেলা যে অসম্ভব নরপশুরা সেদিন তা বুঝতে পারেনি।
যে মানুষটি একদিন আমার মতো লাখো ছাত্রজনতার মনে চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছিলেন, দেশপ্রেমের দীক্ষা দিয়েছিলেন, যাঁর ভাষণ শুনে আমরা রাজনীতির পাঠ নিয়েছিলাম, রাজনীতিকে একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান মনে করেছিলাম, স্বাধীন দেশেই মাত্র কয়েক বছরের মাথায় তাঁকে আমাদের হারাতে হয়েছে!
বাঙালি জাতির প্রিয়নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে টুকরো টুকরো অনেক স্মৃতি আজও আমার মানসপঠে ভেসে ওঠে। আমৃত্যু আমি এসব স্মৃতি ধারণ করে যাব। বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল ঢাকা কলেজে আমার বন্ধু হওয়ার পর থেকে আমি প্রায়সময় ধানমন্ডির ৩২নং বাড়িতে যেতাম। কামালের বন্ধু আর ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এই দুই পরিচয়ের কারণে বঙ্গবন্ধু ও বেগম মুজিব আমাকে স্নেহের চোখে দেখতেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি আমার অকৃত্রিম শ্রদ্ধাবোধ আর অদৃশ্য এক মায়ার বন্ধন আমাকে কারণে-অকারণে ধানমন্ডির ৩২নং বাড়িতে টেনে নিত। চোখ বুঝে এখনও আমি অনুভব করি বঙ্গবন্ধুর অস্তিত্ব, আমার পিঠে বুলানো বঙ্গবন্ধুর স্নেহের হাত। আমার সেই সুখস্মৃতি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ, শ্রেষ্ঠ অর্জন।
লালদিঘীর ময়দানে ৬ দফার পক্ষে শেখ মুজিবের প্রথম জনসভা :
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আমি প্রথম দেখি ১৯৬৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানের এক জনসভায়। ঐতিহাসিক ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষণার ওপর এটিই ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রথম জনসভা। আমি তখন চট্টগ্রাম মুসলিম হাইস্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র, একই সাথে স্কুল ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক। লালদিঘীর ময়দান ছিল মুসলিম হাইস্কুলের খেলার মাঠ। তাই স্কুল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো লালদিঘী ময়দানে কর্মসূচি পালন করত। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সেদিন আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনলাম। তাঁর ভাষণ আমাকে বিমোহিত করল, রক্তে আগুনের ঢেউ খেলে গেল। বাঙালি জাতিসত্তার ভবিষ্যৎ নেতাকে এত কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করলাম। মনে মনে দীক্ষা নিলাম, ৬ দফার সক্রিয় কর্মী হিসেবে শুরু হলো আমার নতুন যাত্রা।

 

আগরতলা মামলার সামরিক ট্রাইব্যুনালে শেখ মুজিবকে দেখতে যাওয়া :
বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। মামলার প্রধান আসামি বিকাশমান বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতা শেখ মুজিব। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে বিশেষ সামরিক আদালতে তখন মামলার ট্রায়াল চলছিল। আমি তখন ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। প্রচণ্ড ইচ্ছা হয়েছিল প্রিয় নেতাকে একবার দেখতে যাওয়ার। কিন্তু এতে ঝুঁকি যেমন আছে, তেমনি দেখতে যাওয়ার প্রক্রিয়াটাও ছিল বেশ জটিল। চিন্তা করতে থাকলাম কিছু একটা উপায় বের করতে, কয়েকদিনের মধ্যে একটি উপায়ও বের হয়ে গেল। আগরতলা মামলার অন্যতম কৌঁসুলি এডভোকেট মশিউর রহমান (তিনি ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ন্যাশনাল এসেম্বলির এমএনএ নির্বাচিত হয়েছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলীয় মন্ত্রিসভার সদস্যও ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যশোরে তাঁকে আটক করে এবং অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে।) হলেন ঢাকা কলেজের আমার সহপাঠী মাহমুদুর রহমানের বাবা। মশিউর চাচার কাছে শেখ মুজিবকে দেখতে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলাম, আমার কথা শুনে তিনি আর্শ্চয হলেন! আমাকে নানা প্রকার ভয়ভীতি ও শঙ্কার কথা বলে নিভৃত করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু আমি তো নাছোড়বান্দা, আমার প্রচণ্ড আগ্রহ ও আবদার মেনে নিয়ে অবশেষে তিনি রাজি হলেন। সামরিক আদালতে যাওয়ার জন্য তিনি আমাকে একটি পাস সংগ্রহ করে দিলেন। ঐতিহাসিক সেদিনটি ছিল ৮ আগস্ট ১৯৬৮।
আমার মাঝে সে কি উত্তেজনা, বাঙালির মুক্তিকামী জনতার প্রিয়নেতা শেখ মুজিবকে দেখতে যাওয়ার অধীর আগ্রহের অপেক্ষা যেন শেষ হতে চায় না! অনেকটা নির্ঘুম রাত কাটালাম, পরের দিন সকাল ৭.০০ টার মধ্যে আমাকে মশিউর চাচা তাঁর ধানমন্ডির বাসায় উপস্থিত থাকতে বললেন। যথারীতি পরের দিন সকালে আমি এডভোকেট মশিউর চাচার ধানমন্ডি বাসায় উপস্থিত হলাম। মশিউর চাচার ছেলে আমার বন্ধু মাহমুদুরসহ তাদের বাসায় সকালের নাস্তা করলাম। চাচা জিজ্ঞেস করলেন ‘তুমি ক্যান্টনমেন্টে যাবে কিভাবে?’ আমি বললাম ‘রিকসা করে যাব’। তিনি মুচকি হেসে বললেন ‘রিকসা করে তুমি বেশী দূর যেতে পারবে না’। শেষে তিনি বললেন ‘চল আমার সাথে’। তিনি গাড়িতে করে আমাকে নিয়ে গেলেন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে বিশেষ সামরিক আদালতে। শুনেছি বর্তমানে এটি একটি জাদুঘর। ট্রাইব্যুনাল কক্ষে আত্মীয়-স্বজন ও দর্শকদের জন্য বসার ব্যবস্থা ছিল। সেখানে গিয়ে বসলাম, অপেক্ষা করছিলাম সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য।
অতঃপর তিনি আসলেন, কাছে থেকে দেখলাম ভবিষ্যৎ বাঙালি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে। যাকে দেখার জন্য আমার এত ব্যাকুলতা, তিনিই মশিউর চাচার কাছে আমার পরিচয় জানতে চাইলেন। মশিউর চাচা বললেন, রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাক ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক, শেখ কামালের সহপাঠী। বঙ্গবন্ধু তাকে বললেন, ‘এত ঝুঁকির মধ্যে তার এখানে আসা ঠিক হয়নি’। বুলেটের সামনে দাঁড়িয়েও ছেলের সহপাঠীর নিরাপত্তা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর উদ্বিগ্নতা দেখে আমি সেদিন বিস্মিত হয়েছিলাম। কেবলমাত্র একজন মহান মানুষ হলেই এরকম একটি হৃদয় থাকতে পারে, তা আমি উপলব্ধি করলাম।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সে সামরিক আদালতে বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান শেখ মুজিবুর রহমানকে দেখতে যাওয়াটা তখনকার সময়ের প্রেক্ষিতে কতবড় ঝুঁকিপূর্ণ কাজ ছিল, তা এখন ভাবতেই আমার গা শিউরে উঠে। কারণ পাকিস্তানি শাসকদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করা তখন অনেক বাঙালির পক্ষে সম্ভব ছিল না। আমি সৌভাগ্যবান এডভোকেট মশিউর চাচার বদান্যতায় একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত প্রত্যক্ষ করার সুযোগ আমার হয়েছিল। সামরিক আদালতের সেদিনের পাসটি আমার কাছে কালের সাক্ষী হিসেবে এখনো সংরক্ষিত আছে।

বঙ্গবন্ধুর নামকরণ :
বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের ইতিহাসে একাত্ম হয়ে আছেন। এরই ধারাবাহিকতায় শেখ মুজিব কিভাবে বঙ্গবন্ধু অভিধায় অভিষিক্ত হলেন সেটিও একটি ইতিহাস। বাংলায় বঙ্গবন্ধু নামটি তাৎপর্যবহ। বাংলা ভাষাগত জাতীয়তার মাধ্যমে যে একটি জাতি একত্রিত হচ্ছে তার একটি প্রমাণ এবং এর কেন্দ্রীয় চরিত্রকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেওয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বটে। ১৯৬৭ সালে চট্টগ্রাম মুসলিম হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করার পর আমি ঢাকা কলেজে ভর্তি হই। এখানে আমার সাথে পরিচয় হয় বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ সন্তান ছাত্রলীগ নেতা শেখ কামালের সাথে। আমরা দু’জন একই ক্লাসে পড়ি, সহপাঠী। কিন্তু সহপাঠীর পরিচয় ছাপিয়ে আমরা দু’জনে পরিণত হই অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে। আমাদের বন্ধুত্বের এই সূত্রপাত ঘটিয়ে দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা জননেতা এম এ আজিজ। ঢাকা কলেজে ভর্তি হওয়ার কথা শুনে এম এ আজিজ আমাকে বললেন, ঐখানে মুজিব ভাইয়ের ছেলে শেখ কামাল পড়ে, তোমাকে পেলে ও খুব খুশি হবে, তোমাকে ওর দরকার’। এ কথা বলে এম এ আজিজ একটি চিরকুট লিখে দিলেন শেখ কামালের কাছে। চিরকুটটি পেয়ে শেখ কামাল আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন যেন কতদিনের পুরানো বন্ধুকে তিনি খুঁজে পেলেন। আমাদের দু’জনের মধ্যে তৎকালীন ছাত্র রাজনীতির নানা বিষয়ে কথা হতো বিশেষত ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগকে কিভাবে সংগঠিত করা যায়। একপর্যায়ে আমাকে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকও করা হয়। ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচনকে সামনে রেখে তৎকালীন ছাত্র আন্দোলনের খবরাখবর প্রকাশ, বিকাশমান বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে আমি শেখ কামালকে একটি বুলেটিন প্রকাশ করার প্রস্তাব করি। আমার প্রস্তাব মতে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, ঢাকা কলেজ শাখার মুখপাত্র হিসেবে ১৯৬৮ সালের নভেম্বর মাসে বুলেটিন ‘প্রতিধ্বনি’ প্রকাশিত হয়। তখনও শেখ মুজিবের নামের সাথে সুনির্দিষ্ট কোনো বিশেষণ যুক্ত হয়নি। বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন নামকরণ হলেও কোনোটি তেমন স্বীকৃতি লাভ করেনি। শেখ মুজিবুর রহমান তখনও বঙ্গবন্ধু নামে পরিচিত হননি, দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা তাঁকে মুজিব ভাই নামে সম্বোধন করতেন। ১৯৬৬ সাল থেকে তরুণ সমাজ তাঁর নামের আগে সিংহশার্দুল, বঙ্গশার্দুল ইত্যাদি খেতাব জুড়ে দিত। এই প্রেক্ষাপটে শেখ মুজিবের নামের সাথে একটি যথাযথ বিশেষণ যুক্ত করার চিন্তা আমার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে দীর্ঘদিন ধরে। দ্বিজাতিতত্তে¡র ভিত্তিতে গঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের অসারতা উল্লেখ করে ৩ নভেম্বর ১৯৬৮ পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, ঢাকা কলেজ শাখার প্যাডে সারথী ছদ্ম নামে ‘আজব দেশ’ শিরোনামে আমি একটি নিবন্ধ রচনা করি।
৬ দফার আলোকে লিখিত এই নিবন্ধে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অসারতার যুক্তি তুলে ধরার পাশাপাশি গণমানুষের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবের নামের সাথে প্রচলিত বিভিন্ন বিশেষণের সাথে সর্বপ্রথম লিখিত আকারে ‘বঙ্গবন্ধু’ বিশেষণটি ব্যবহার করি। আমার ইচ্ছা ছিল এই নিবন্ধটি আমাদের বুলেটিন প্রতিধ্বনিতে প্রকাশ করতে। কিন্তু সিরাজুল আলম খানসহ ছাত্রলীগের তৎকালীন কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ আমাকে ওই মুহূর্তে নিবন্ধটি না ছাপানোর পরামর্শ দেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, এই নিবন্ধ প্রকাশিত হলে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের ধারাবাহিক কার্যক্রম পুলিশী রোষানলে পড়বে একই সাথে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমার কার্যক্রম পরিচালনাও ব্যাহত হবে।
‘আজব দেশ’ নামে এই লেখায় ‘বঙ্গবন্ধু’ বিশেষণটি আমার কাছে খুব যুৎসই এবং যথার্থ মনে হওয়ায় ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি অন্য কোথাও ছাপার চিন্তা করলাম। ১৯৬৮ সালের নভেম্বরে প্রতিধ্বনি বুলেটিনে ঐতিহাসিক ৬ দফা পুনর্মুদ্রণের সময় সর্বপ্রথম ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি আনুষ্ঠানিকভাবে ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয়। এরপর থেকে ছাত্রলীগের বিভিন্ন প্রচারপত্রে ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে থাকে।
১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আগরতলা মামলা থেকে মুক্তি পেয়ে শেখ মুজিব বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতারূপে আত্মপ্রকাশ করেন। ৬৯-এর ২৩ ফেব্রæয়ারি রেসকোর্স ময়দানের গণসংবর্ধনায় তোফায়েল আহমদ কর্তৃক বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই শেখ মুজিবের নামের সাথে এতদিনের প্রচলিত মুজিব ভাই, বঙ্গশার্দুল, সিংহশার্দুল ইত্যাদি বিশেষণকে রীতিমতো চিরবিদায় দিয়ে বঙ্গবন্ধু নামটিই সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধু নামটি পরবর্তীকালে তাঁর নামের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ে। এখন বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ করলে আর শেখ মুজিব বলতে হয় না। একইভাবে শেখ মুজিব নাম উচ্চারিত হলেই বঙ্গবন্ধু উপাধিটিও চলে আসে অনিবার্যভাবে। তাই আজ বঙ্গবন্ধু মানে ‘শেখ মুজিবুর রহমান’, শেখ মুজিবুর রহমান মানেই ‘বঙ্গবন্ধু’।
বঙ্গবন্ধুর প্রথম জীবনীগ্রন্থ প্রকাশ :
গত শতাব্দীতে পূর্ব বাংলার উপর শাসন-শোষণ-বঞ্চনা যত দ্রুত প্রকট হতে থাকে শেখ মুজিবও তত দ্রুত বদলে গিয়ে সক্রিয়তাবাদী নেতা থেকে পরিণত হন বিশাল বাঙালি জনগোষ্ঠীর জাতীয় নেতায়। বিশেষত ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি হয়ে উঠেন বাংলার জনগণের অধিনায়ক- বঙ্গবন্ধু।
বঙ্গবন্ধু নামকরণ করার পাশাপাশি আমার উদ্যোগে ছাত্রলীগের ধীমান কর্মী রায়হান ফিরদাউস মধু এবং বদিউল আলমের সহযোগিতায় ১৯৭০ সালে ৭ জুন বঙ্গবন্ধুর জীবনীভিত্তিক দেড় ফর্মার একটি ছোট পুস্তিকা প্রকাশ করেছিলাম, যার শিরোনাম ছিল ‘এই দেশেতে জন্ম আমার’। বইটির প্রচ্ছদ শিল্পী ছিলেন প্রয়াত অঙ্কন শিল্পী কালাম মাহমুদ। মূল নিবন্ধটি নিয়মিত বিরতিতে দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকায় ফজলে লোহানী লিখেছিলেন।
তৎকালীন মতিঝিলের ইসলাম চেম্বারের সামনে কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি প্রেস থেকে পুস্তিকাটি ছাপা হয়েছিল। বর্তমানে দুষ্প্রাপ্য এই পুস্তিকাটিই বঙ্গবন্ধুর জীবনী বিষয়ক সর্বপ্রথম ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত পুস্তিকা। এই পুস্তিকাটি ধানমন্ডির ৩২ নাম্বারের বাড়িতে গিয়ে যখন বঙ্গবন্ধুর হাতে দিলাম তখন তিনি খুশিতে আমাকে জড়িয়ে ধরেন। আমাকে অনেকক্ষণ আদর করলেন। বঙ্গবন্ধু আবেগ আপ্লুত হয়ে আমাকে বললেন, ছাত্রলীগের ছেলেরা এত সুন্দর প্রকাশনা বের করতে পারে আমার ধারণাই ছিল না। তিনি আরো বললেন, এটা প্রকাশ করতে তোর তো অনেক টাকা খরচ হয়েছে। তখন আমি ছিলাম নিরুত্তর। এরপর বঙ্গবন্ধু পাঁচশত টাকার একটি নোট বের করে আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘এটি তোর কাছে রাখ’।
আমার মতো ছাত্রলীগের অনেক নেতাকর্মী যাদের বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল, তারা জানেন বঙ্গবন্ধু কতো বড় হৃদয়ের মানুষ ছিলেন। ছাত্রলীগের ছেলেদের তিনি কিভাবে ভালোবাসতেন। দেশপ্রেমের বীজ তিনি ছাত্রজনতার হৃদয়ে কিভাবে বুনে দিয়েছিলেন, সেই ছাত্রজনতাই বঙ্গবন্ধুর সম্মোহনী আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। দীর্ঘ নয় মাস এদেশের কৃষক, শ্রমিক, ছাত্রজনতা মরণপণ যুদ্ধ করে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন করে, পৃথিবীর মানচিত্রে উদিত হয় সবুজের মানচিত্র। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম ইতিহাস আমরা কেমন দুর্ভাগা জাতি স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছরের মাথায় স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, বাঙালি জাতির জনক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নৃশংসভাবে সপরিবারে হত্যা করা হয়। পাকিস্তানি সামরিক জান্তারা নানা ষড়যন্ত্র করেও বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার সাহস করতে পারেনি, অথচ স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলাদেশের স্থপতিকে এদেশের দুর্বৃত্তরা হত্যা করে ইতিহাসের কলঙ্কজনক অধ্যায়ের অবতারণা করেছিল। সেদিন দুর্বৃত্তরা মনে করেছিল জাতির জনককে হত্যা করে, তাঁর নাম নিশানা মুছে ফেলে, ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে, বাংলাদেশকে অকার্যকর দেশে পরিণত করে তারা পার পেয়ে যাবে। কিন্তু মহান সৃষ্টিকর্তা তাদের মনোবাসনা পূরণ করেনি। জীবিত বঙ্গবন্ধুর চেয়ে মৃত বঙ্গবন্ধু আজ অনেক বেশি শক্তিশালী। সবার হৃদয়ের মণিকোটায় আজ স্থান করে নিয়েছেন বঙ্গবন্ধু, তা থাকবে আবহমান কাল ধরে।

ডিসি

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়