নকল সনদেই আসল চাকরি!
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:১২ পিএম
নগদ টাকা নিয়ে হাত বাড়ালেই মিলছে নকল সনদ। প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি থেকে শুরু করে যেকোনো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের সনদ পাওয়া যাচ্ছে নগদ টাকায়। এজন্য খুব বেশি কাঠখড় পোড়াতে হয় না, সিন্ডিকেটের কাছে গেলেই পাওয়া যাচ্ছে যে কোনো ডিগ্রির সার্টিফিকেট।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের জাল সনদ তিন হাজার টাকা, ডামি সনদ এক হাজার টাকা, নকল সনদ দেড় হাজার টাকায় মিলছে। বোর্ডের প্রতিটি সনদ দেড় হাজার টাকা, ডিজিটাল ড্রাইভিং লাইসেন্স ১২০০ টাকা, এনআইডি ৮০০ টাকা, স্মার্ট এনআইডি ১২০০ টাকা, ট্রেড লাইসেন্স ৮০০ টাকা, ম্যারেজ সার্টিফিকেট ৩০০ টাকা, নাগরিকত্ব সনদ ৩০০ টাকা, ব্যাংক স্টেটমেন্ট ৫০০ টাকা ও মার্কশিট ১ হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।
গত কয়েক বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ ধরনের শত শত ভুয়া সনদ শনাক্ত করেছে। ব্যাংকার, সরকারি চাকরিজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক, বিদেশে চাকরিজীবী ও আইনজীবী, কে নেই এ তালিকায়! আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানেও আটক হয়েছে চক্রের একাধিক সদস্য। তবুও কমছে না এ চক্রের দৌরাত্ম্য। রাজধানীর নীলক্ষেতের একাধিক মার্কেটে ছড়িয়ে রয়েছে এই ভয়ঙ্কর চক্রের জাল।
র্যাব ও পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জাল সনদ দিয়ে চাকরির অভিযোগে এর আগে একাধিক ব্যক্তি চাকরিচ্যুত হয়েছেন। অনেকের সনদ যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, স্বল্প শিক্ষিত বিদেশমুখী যুবকরাই জাল শিক্ষা সনদের ওপর বেশি নির্ভরশীল। অনেকেই সনদ হারিয়ে ফেলেছেন এবং অনেকে সনদের ফটোকপি দিয়ে নতুন সনদ বানিয়ে নেন। অনেক কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের চাকরিতে যোগদানের শর্ত থাকে সনদ জমা দেয়া। এক্ষেত্রে নকল সনদ প্রস্তুত করেন এক শ্রেণির জালিয়াত। পাত্র বা পাত্রীপক্ষকে শিক্ষাগত যোগ্যতা বেশি দেখানোর জন্যও ভুয়া সনদ বানানো হয়। দেশের শিক্ষাগত যোগ্যতার সব সনদ অনলাইনে না থাকার কারণে এই নকল সনদ তৈরির প্রবণতা বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
দেশে ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়ে চাকরি করছেন সরকারি কর্মকর্তা, ডাক্তার, সাংবাদিক, শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশার লোক। জাল পরিচয়পত্র তৈরি করে টিউশনির সুযোগ নিচ্ছেন এক শ্রেণির ছাত্র। শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকলেও বাড়তি সুবিধার আশায় এখান থেকে নকল শিক্ষাগত সনদ সংগ্রহ করছেন বহু মানুষ। স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহদ্দিতে কখনো পা না দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে ‘একাডেমিক সার্টিফিকেট’। এজন্য কষ্ট করে দিনরাত পড়াশোনা বা নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। লাগবে শুধু টাকা আর যোগাযোগ। নীলক্ষেতের সিটি করপোরেশন মার্কেট, বাকুশাহ মার্কেট ও শাহ সাহেব বাড়ি মরিয়ম বিবি শাহি মসজিদ মার্কেটে মূলত এসব নকল সনদ প্রস্তুত করা হয়।
তিন ধাপে কাজ : জাল ও নকল সনদের জন্য দোকানিরা সরাসরি গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলেন না। যোগাযোগ স্থাপনের জন্য রয়েছে দালাল চক্র। চক্রগুলো তিন ধাপে কাজ করে থাকে। প্রথম গ্রুপের কাজ হচ্ছে গ্রাহক সংগ্রহ করা। দ্বিতীয় গ্রুপের কাজ আসল সার্টিফিকেটের ফরম্যাট ও বিশেষ ধরনের কাগজ সংগ্রহ করা এবং তৃতীয় গ্রুপটির কাজ কম্পিউটারে অবিকল আসলের মতো সনদ তৈরি করা। সনদ তৈরির জন্য আছে বিশেষ সফটওয়্যার। ওই সফটওয়্যার ব্যবহার করলে সনদের ওপর কোনো সিল ও স্বাক্ষর থাকলে সেটি নকল না আসল তা বোঝার সুযোগ নেই। বোর্ড বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সনদ তৈরিতে ‘এমবুস’ কাগজ ব্যবহার হয়। কাগজের রঙের সঙ্গে মিল রাখা হয়। একইভাবে তৈরি করা হয় জাল মার্কশিট।
