মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চা
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০১৯, ০৮:১৭ পিএম
আমাদের দেশে বিজ্ঞানশিক্ষার ক্ষেত্রে মূল সমস্যা হলো, আমাদের জ্ঞানার্জন ভাসাভাসা, এর শিকড় মনের গভীরে প্রবেশ করেনি, কারণ বিজ্ঞানশিক্ষাটা মূলত বিদেশি ভাষা ইংরেজিতে। স্কুলে মাতৃভাষায় যে শিক্ষাটুকু দেয়া হয় তাতে বিজ্ঞানের জগতের সঙ্গে বর্ণমালা পরিচয় হয়। বিজ্ঞানের বিপুল জগৎটার দেখা মেলে উচ্চশিক্ষার পর্যায়ে। অথচ এই জগতের ভাষা বিদেশি। একজন শিক্ষার্থী বিজ্ঞানের এই বৃহৎ জগতে প্রবেশ করেই এক বদ্ধ দরজার মুখোমুখি হয় যার চাবি ইংরেজি ভাষা। তার মনের ভাষা এখানে অচল। অর্থাৎ সে এখানে প্রবাসী। নিজ দেশে প্রবাসী হয়ে যে জ্ঞান সে অর্জন করে তা কখনো নিজের হয়ে ওঠে না। তা বিদেশি পণ্যের মতোই তার আলমারিতে শোভা পায়। যতক্ষণ না মাতৃভাষায় অর্থাৎ বাংলায় বিজ্ঞানশিক্ষা হচ্ছে, ততক্ষণ এ জ্ঞান অন্তরের হয়ে উঠবে না। বিজ্ঞানও অল্প কিছু লোকের মেধাচর্চার বিষয় হয়ে থাকবে, ব্যাপক মানুষের কাছে আসতে পারবে না। বিজ্ঞানকে জনচর্চার বিষয়ে পরিণত করতে হলে, সমাজে বৈজ্ঞানিক ধারণার প্রসার ঘটাতে হলে বিজ্ঞানের শিক্ষাটা ইংরেজিতে হলে চলবে না, তা অবশ্যই বাংলায় হতে হবে। স্পষ্টতই আমাদের বিজ্ঞানশিক্ষার একটা বড় দুর্বলতা হলো, যারা পেশাগত ও অন্যান্য কারণে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানচর্চার সঙ্গে জড়িত তাদের মাতৃভাষায় তা প্রকাশের অক্ষমতা। এর মানে হলো তারা এ জ্ঞান আত্মস্থ করতে পারেননি, একে অন্তর দিয়ে বোঝেননি, শুধু পরীক্ষা পাসের জন্য ও পরবর্তী সময়ে পেশাগত আর্থিক সাফল্যের জন্য তাদের এ চর্চা। বিজ্ঞানের প্রতি এরূপ অবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির ফলে আমাদের শিক্ষাটা কয়েকটি গোষ্ঠীর হাতের মুঠোয় রয়ে গেছে, তা জনগণের মাঝে ছড়িয়ে পড়েনি। এ রকম জ্ঞান শুধু জীবিকানির্বাহই নিশ্চিত করে, কোনো আবিষ্কার বা উদ্ভাবনের সহায়ক হয় না। এ দুরবস্থা থেকে উত্তরণের একটাই পথ- উচ্চতর শিক্ষায়ও মাতৃভাষাই শিক্ষার মাধ্যম হতে হবে। চিকিৎসাশাস্ত্র, প্রকৌশলবিদ্যাসহ সব বিজ্ঞানের বই-ই বাংলায় লিখতে হবে। কাজটা কঠিন, তবে অসম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে প্রধান সংকট ইচ্ছার অভাব। ব্যাপারটা এমন নয় যে, কাল থেকেই সব পড়ালেখা বাংলায় হতে হবে। উচ্চতর শিক্ষায় তা সম্ভব নয়। কিন্তু ধীরে ধীরে এগোলে তা সহজেই সম্ভব। যতদিন সব বই বাংলায় না হচ্ছে, ততদিন অবশ্যই ইংরেজিতে কিছু বিষয় পড়ানো অব্যাহত রাখতে হবে। কিন্তু উচ্চতর বিজ্ঞানশিক্ষাও একদিন পুরোপুরি বাংলায় করার জাতীয় লক্ষ্য থাকতে হবে। কেবল মাতৃভাষায় শিক্ষার মাধ্যমেই বিজ্ঞান হতে পারে জনমুখী ও জনবান্ধব।
আলমগীর খান : নির্বাহী সম্পাদক, শিক্ষালোক।
