×

মুক্তচিন্তা

মহান বিপ্লবী ফিদেল ক্যাস্ট্রো

Icon

কাগজ অনলাইন প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০১৮, ০৭:৫৪ পিএম

বিংশ শতাব্দীতে যে সব সমাজতান্ত্রিক নেতা বিশ্ব রাজনীতিতে প্রবলভাবে আলোচিত ছিলেন, ফিদেল ক্যাস্ট্রো তাদের অগ্রগণ্য। ১৯৫৯ সালে ৩২ বছর বয়সী জি ফিদেল ক্যাস্ট্রোর নেতৃত্বে ক্ষুদ্র একটি বিদ্রোহী দল কিউবার জনসমর্থনহীন একনায়ক ফুল গেন্সিও বাতিস্তাকে উৎখাত করে রাজধানীর রাস্তায় রাস্তায় তাদের জিপ ও ট্যাংক বহর চালিয়ে যায়। ফুল গেন্সিও বাতিস্তার নির্মম একনায়কতন্ত্রে অতিষ্ঠ হাজার হাজার কিউবান এ সময় ক্যাস্ট্রোর নেতৃত্বাধীন বিপ্লবীদের অভিনন্দন জানান। ক্যাস্ট্রোকে কিউবার প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করা হয়। কিউবায় ৪৯ বছর ক্ষমতায় ছিলেন তিনি। জনগণের প্রতি অকৃত্রিম মমত্ববোধ থেকে কিউবাকে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করেন ক্যাস্ট্রো। কিউবান বিল্পবের এই মহান নেতা ১৯২৬ সালের ১৩ আগস্ট এক স্প্যানিশ অভিবাসী ভ‚মি মালিক ও এক কিউবার মায়ের পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

কিউবার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়ে সফল হওয়ার পর ফিদেল ক্যাস্ট্রো দেশটির ক্ষমতা গ্রহণ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সমাজতান্ত্রিক কিউবা প্রতিষ্ঠাকারী ফিদেল ক্যাস্ট্রো সারা বিশ্বের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকারীদের চোখে বীর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। যুক্তরাষ্ট্রের নাকের ডগায় বসে প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে সমাজতান্ত্রিক শাসন ধরে রাখেন ক্যাস্ট্রো। তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য অনেক চেষ্টা হয়েছে। প্রাণহানির চেষ্টাও হয়েছে। তাঁর ৪৯ বছরের ক্ষমতায় ১১ মার্কিন প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউসে শপথ নিয়েছেন। ফিদেল ক্যাস্ট্রোকে সরাতে পারেননি কেউ। ক্যাস্ট্রোর অবসরের পরও কিউবা শাসন করেছেন তাঁর প্রতিষ্ঠিত কমিউনিস্ট পার্টি। বাংলাদেশসহ স্বাধীনতাকামী বহু দেশের পক্ষে দাঁড়িয়ে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকারীদের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন ক্যাস্ট্রো। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে তিনি আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থন এবং সহযোগিতা করেছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে তাঁকে “মুক্তিযুদ্ধে মৈত্রী সম্মাননায়” ভ‚ষিত করে।

ক্যাস্ট্রো তরুণ বয়সে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত ফুল গেন্সিও বাতিস্তার সরকারের বিরুদ্ধে গেরিলা বাহিনী গঠন করেন। এ কারণে ক্যাস্ট্রোর ২ বছর কারাদণ্ড হয়। এরপর তিনি স্বেচ্ছা নির্বাসনে যান। ১৯৫৬ সালের ২ ডিসেম্বর ক্যাস্ট্রো তাঁর দল নিয়ে গ্রানমা জাহাজে করে কিউবার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবতরণ করে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সূচনা করেন। কিউবার জনগণ ক্যাস্ট্রোর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও বাতিস্তা সরকারের নির্যাতনের অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতির ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেন। ২৫ মাস অজস্র প্রতিকূলতার মুখে তারা গেরিলা যুদ্ধ করে বাতিস্তাকে উৎখাত করেন। এভাবে ১৯৫৯ সালে ক্যাস্ট্রোর গেরিলা বাহিনী যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত বাতিস্তার দুর্নীতিগস্ত একনায়কতন্ত্রের স্থলে কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠা করে। কিউবা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৬০ সালের ৮ মে ক‚টনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কিউবার সম্পর্কের আরো অবনতি ঘটে।

১৯৬১ সালের মে দিবসের প্যারেডে ফিদেল ক্যাস্ট্রো এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। তার ভাষণের অংশবিশেষ পাঠ করা যাক। “আজ আমরা শোষণের সেই দিনগুলো পেছনে ফেলে এসেছি। যখন শাসনব্যবস্থা দারিদ্র্যের জন্য ছিল না। ছিল না শ্রমিক, চাষি অথবা সেসব অবহেলিত মানুষের জন্য যারা আমাদেরই অংশ। সেসব শোষকরা কিছুই করেনি স্বদেশের নিরন্ন দরিদ্র, বঞ্চিত মানুষগুলোর জন্য যারা এই কিউবার সন্তান। আজ আর শ্রমজীবী মানুষকে কিছু বোবা নির্বাহী বিচারব্যবস্থার সামনে হাঁটু গেড়ে করুণা ভিক্ষা করতে হয় না। শ্রমজীবী মানুষ আজ বিশ্বাস করে এটি সেই রাষ্ট্র যা একটি আদর্শ সামনে রেখে পরিচালিত হয়। সেই লক্ষ্যটি হলো শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের কল্যাণ। আজ স্বদেশের মানুষ তাদের জীবন ও কর্মের অর্থ খুঁজে পেয়েছে।...ক্ষমতাবান সাম্রাজ্যবাদের কাছে আত্মাবিকিয়ে দেয়া শোষকের রক্ত নয়। গতকালের শোষিতের দেয়া রক্ত আজ তাকে দিয়েছে স্বাধীনতা। এই রক্ত সেসব মানুষের যারা বিপ্লবের বেদিতে জীবন উৎসর্গ করতে এসেছিল হৃদয়ে আদর্শ নিয়ে। এ রক্ত শহীদের, যার প্রতিটা বিন্দু পবিত্র।”

কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হিমালয়ের সঙ্গে তুলনা করে তাঁর ঐতিহাসিক মন্তব্যের জন্য বাংলাদেশে স্মরণীয় হয়ে আছেন। ১৯৭৩ সালে ফিদেল ক্যাস্ট্রো বলেন, “আমি হিমালয় দেখিনি, তবে আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসিকতায় তিনি হিমালয়তুল্য। আমি তার মধ্যে হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ করেছি।” আল জিরিয়ার রাজধানী আল জিয়ার্সে ১৯৭৩ সালে জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে (ন্যাম) বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলিঙ্গন করে ফিদেল ক্যাস্ট্রো এই ঐতিহাসিক মন্তব্য করেন। কিউবার এই কিংবদন্তি নেতা ২০১৬ সালের ২৫ নভেম্বর শুক্রবার রাজধানী হাভানায় ৯০ বছরে বয়সে মারা যান। ক্যাস্ট্রোর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁকে দাহ করা হয়। বাংলাদেশের জনগণ কিউবার বিপ্লবী নেতা প্রয়াত ফিদেল ক্যাস্ট্রোকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রোর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছিলেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শোকবার্তায় বলেন, ফিদেল ক্যাস্ট্রোর মৃত্যুতে বিশ্ব রাজনীতিতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হবে তা কখনোই পূরণ হবে না। শোষিত মানুষের অধিকার পুনরুদ্ধারে তাঁর সংগ্রামী অবদান বিশ্বের মানুষ চিরকাল স্মরণ রাখবে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিউবায় পাঠানো শোকবার্তায় বাংলাদেশের স্বাধীনতায় ক্যাস্ট্রোর অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ফিদেল ক্যাস্টো এবং তাঁর দলের অকুণ্ঠ সমর্থনের কথা বাংলাদেশের জনগণ চিরদিন কৃতজ্ঞতায় ও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের মুক্তির সংগ্রামে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়ে ফিদেল ক্যাস্ট্রো বাঙালির হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। ফিদেল ক্যাস্ট্রো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একান্ত অনুরাগী ছিলেন। বঞ্চিত-লাঞ্ছিত দলিত নিপীড়িত মানুষের মুক্তির স্বপ্ন, সংগ্রাম ও আকাক্সক্ষায় ফিদেল ক্যাস্ট্রো হতে পারেন চিরসবুজ এক মহা প্রেরণা।”

রোকন উদ্দীন আহমদ : লেখক ও সাংবাদিক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

দেশব্যাপী হামের টিকাদান শুরু রবিবার

দেশব্যাপী হামের টিকাদান শুরু রবিবার

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শীর্ষ ব্যবসায়ীদের বৈঠক আজ

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শীর্ষ ব্যবসায়ীদের বৈঠক আজ

সিলেটে ঝড়-বৃষ্টি, অন্য অঞ্চলে তাপপ্রবাহের আভাস

সিলেটে ঝড়-বৃষ্টি, অন্য অঞ্চলে তাপপ্রবাহের আভাস

ইরানের হামলায় আরেক মার্কিন যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত

ইরানের হামলায় আরেক মার্কিন যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App