লেবাননে গোলাবর্ষণে নিহত ৩ : হামাস হিজবুল্লাহ সিরিয়া ত্রিমুখী সংঘর্ষে ইসরায়েল
প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
কাগজ ডেস্ক : ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের পাশাপাশি এবার লেবাননের হিজবুল্লাহ ও সিরিয়ার সঙ্গে ত্রিমুখী সংঘর্ষে জড়িয়েছে ইসরায়েল। হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে এক সপ্তাহ স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার পর থেকে গাজা উপত্যকায় নতুন করে লড়াই শুরু হয়েছে। ইসরায়েলের গোলাবর্ষণে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে নিহত হয়েছে ৩ জন। এদিকে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের কাছে গভীর রাতে বিমান হামলা চালানো হয়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর (আইডিএফ) অবস্থানে গত শুক্রবার হামলা চালায় লেবাননের ইরান সমর্থিত সশস্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। এর জবাবে ইসরায়েলের গোলাবর্ষণে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ৩ জন নিহত হয়। হামাসের সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার পরপরই এ হামলার ঘটনা ঘটে। হামাসের মিত্র হিজবুল্লাহ জানায়, তারা গাজার ফিলিস্তিনিদের পক্ষ হয়ে সীমান্তে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর অবস্থানগুলোয় হামলা চালায়। ইসরায়েলের হামলায় নিহতদের মধ্যে তাদের এক যোদ্ধা আছে। ইসরায়েলের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা লেবানন থেকে ছোড়া দুটি রকেট প্রতিহত করে। এরপর তারা লেবাননের যেখান থেকে রকেটগুলো ছোড়া হয়েছে সেখানে গোলাবর্ষণ শুরু করে। শুক্রবার ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি শহরে রকেট হামলার সাইরেন বেজে ওঠে, এতে বাসিন্দারা নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য ছোটাছুটি শুরু করে।
লেবাননের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তাসংস্থা জানায়, ইসরায়েলের গোলাবর্ষণে লেবাননের সীমান্ত শহর হাউলায় দুজন এবং জেবেইন গ্রামে একজন নিহত হয়। হাউলা শহরের মেয়র সাকিব কুতায়েক জানান, ইসরায়েলি গোলায় শহরটিতে এক বৃদ্ধা ও তার ৩৫ বছর বয়সি ছেলে নিহত হয়েছেন, তারা দুজনই বেসামরিক। তিনি বলেন, একটি গোলা বাড়ির কাছে গিয়ে পড়ে, এরপর দ্বিতীয় গোলাটি বাড়িতে আঘাত হানে। কিন্তু পরে হিজবুল্লাহ জানায়, হাউলায় তাদের এক সদস্য নিহত হয়েছেন।
গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে লেবাননের দক্ষিণ সীমান্তের
কাছে ইসরায়েলি সামরিক অবস্থানগুলোয় প্রায় প্রতিদিন রকেট হামলা চালিয়ে আসছে হিজবুল্লাহ। ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলা হামলা চালিয়ে এর জবাব দিচ্ছে।
দামেস্কে আবার ইসরায়েলের হামলা : সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের কাছে শুক্রবার গভীর রাতে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, রাত দেড়টার একটু পরে সিরিয়ার অধিকৃত গোলান মালভূমির দিক থেকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বিমান হামলা চালিয়েছে। দামেস্কের কয়েকটি এলাকা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। তবে এতে কেউ হতাহত হয়নি।
সিরিয়ায় ২০১১ সালের শুরু থেকেই শতাধিক বিমান হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। ইরান-সমর্থিত বাহিনী, লেবাননের হিজবুল্লাহ ও সিরীয় সেনাবাহিনীর অবস্থান লক্ষ্য করে এসব হামলা চালায় ইসরায়েল। ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের সঙ্গে ইসরায়েলের সংঘাত শুরুর পর থেকে হামলা আরো বেড়েছে। গত ১২ ও ২২ অক্টোবর ইসরায়েলি হামলার পর দামেস্ক ও আলেপ্পো বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। গত ২৬ নভেম্বরও দামেস্ক বিমানবন্দরে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল।
গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ১৮৪ ফিলিস্তিনি নিহত : হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে এক সপ্তাহ স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার পর শুক্রবার থেকে গাজায় নতুন করে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। মধ্যস্থতাকারীরা জানিয়েছেন, ইসরায়েলের বোমাবর্ষণের কারণে চলমান যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ জটিল হয়ে পড়ছে।
শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার পরপরই গাজার দক্ষিণাংশের খান ইউনিস শহরের পূর্বাংশে তীব্র বোমাবর্ষণ করে ইসরায়েল। ঘটনাস্থল থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডুলি আকাশের দিকে উঠতে শুরু করে। এদিন সন্ধ্যার দিকে গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানান, ইসরায়েলের বোমা হামলায় ১৮৪ জন নিহত হয়েছে, আহত হয়েছে অন্তত ৫৮৯ জন আর ২০টিরও বেশি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এলাকাটির বাসিন্দারা গাড়িতে করে জিনিসপত্র নিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। তারা আশ্রয়ের খোঁজে পশ্চিম দিকে রওনা হয়।
গাজায় নতুন করে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলেও মধ্যস্থতাকারী কাতার যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছিল। কিন্তু পরে আলোচনা ভেস্তে যায়। ২৪ নভেম্বর প্রথম ৪ দিনের যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর দুই বারে তা আরো ৩ দিন বাড়ানো হয়। ইসরায়েল জানায়, হামাস প্রতিদিন ১০ জন করে জিম্মির মুক্তি দিলে তারা যুদ্ধবিরতি অব্যাহত রাখবে। কিন্তু ৭ দিনের যুদ্ধবিরতির মধ্যে হামাসের হাতে বন্দি নারী, শিশু ও বিদেশি জিম্মিদের মুক্তি দেয়ার পর গোল বাঁধে ইসরায়েলি সেনা ও বেসামরিক পুরুষদের নিয়ে। মধ্যস্থতাকারীরা তাদের মুক্তি দেয়ার উপায় খুঁজে পেতে ব্যর্থ হন।
আগের শর্তে তাদের মুক্তি দিতে রাজি হয়নি হামাস। উভয়পক্ষের প্রস্তাবিত শর্ত পরস্পর প্রত্যাখ্যান করে। এরপর আলোচনা আর এগোয়নি। আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার জন্য ইসরায়েল ও হামাস একে অপরকে দায়ী করেছে। এদিকে জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, নতুন করে শুরু হওয়া যুদ্ধ গাজায় বিরাজমান তীব্র মানবিক সংকটকে আরো গভীর করে তুলবে।
ইসরায়েল অভিযোগ করে বলেছে, হামাস তাদের হাতে বন্দি সব নারীকে মুক্তি দিতে রাজি হচ্ছে না। একজন ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইসরায়েলের নারী সেনাদের মুক্তির বিষয়কে কেন্দ্র করেই মূলত আলোচনা ভেঙে যায়।
গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালায় হামাস। ইসরায়েলের ভাষ্যমতে, হামাসের এ হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন। এ ছাড়া দুই শতাধিক ব্যক্তিকে ইসরায়েল থেকে ধরে গাজায় নিয়ে জিম্মি করে হামাস। জবাবে সেদিন থেকেই গাজাকে অবরুদ্ধ করে নির্বিচার বোমা হামলা শুরু করে ইসরায়েল। ২৮ অক্টোবর থেকে শুরু হয় স্থল অভিযান। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, ইসরায়েলের হামলায় প্রায় ১৫ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের বেশির ভাগই বেসামরিক লোকজন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৬ হাজারের বেশি শিশু এবং ৪ হাজারের বেশি নারী রয়েছেন।
