×
Icon এইমাত্র
কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কোটা আন্দোলনকারীরা বাংলাদেশ টেলিভিশনের মূল ভবনে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ। কোটা সংস্কার আন্দোলনে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ১৯ জন নিহত কোটা ইস্যুতে আপিল বিভাগে শুনানি রবিবার: চেম্বার আদালতের আদেশ ছাত্রলীগের ওয়েবসাইট হ্যাক ‘লাশ-রক্ত মাড়িয়ে’ সংলাপে বসতে রাজি নন আন্দোলনকারীরা

বিশেষ সংখ্যা

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন

ধর্মীয় চেতনার বিকাশে আওয়ামী লীগ

Icon

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ধর্মীয় চেতনার বিকাশে আওয়ামী লীগ

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরান ঢাকার কে এম দাস লেনের ‘রোজ গার্ডেন’-এ জন্ম নেয়া রাজনীতির চারাগাছটি নানা উত্থান, বিজয়, সংকট, দুঃসময় আর ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে আজ ৭৫ বছরের এক বিশাল মহীরুহের রূপ পরিগ্রহ করে বাঙালির আশা, প্রত্যাশা, উন্নয়ন আর ভরসার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগের ৭৫ বছর পূর্তি তথা ‘প্লাটিনাম জয়ন্তী’ উদযাপন করা হবে। দেশের সর্বপ্রাচীন ও সর্ববৃহৎ এই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সংগঠনের রয়েছে এক অনবদ্য ও গৌরবোজ্জ্বল অতীত এবং ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন দেশপ্রেমের বিপ্লবী উপাখ্যান। বিগত ৭৫ বছরে বাঙালির ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে কখনো মায়ের ভাষার অধিকার সমুন্নত রাখতে, কখনো শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনাচার ও বেইনসাফি প্রতিরোধে, কখনো বা বাঙালির অপ্রতিরোধ্য তেজ ও বিক্রমকে পুঁজি করে গণঅভ্যুত্থানের মতো সংগ্রামী চেতনার স্ফুরণ ঘটিয়ে, কাণ্ডারী হয়ে মহান মুক্তিসংগ্রামের তরীকে সাফল্যের বন্দরে পৌঁছে দিয়ে, অত্যাচার, নিপীড়ন আর খুন ও গুমকে মোকাবিলা করে অসম সাহস নিয়ে, দেশ ও গণমানুষের মিশন আর ভিশনকে ঠিক রেখে এই আওয়ামী লীগ অব্যাহত ও অবিরাম গতিতে এগিয়ে চলেছে তার অভীষ্ট পানে। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে আওয়ামী লীগ অতিবাহিত করছে দলটির ইতিহাসের সেরা সময়; যখন টানা চতুর্থবার বাংলাদেশের শাসনভার পরিচালনা করে চলেছে কীর্তিময়তার স্বত্বাধিকারী এই দলেরই নির্বাচিত সরকার।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৃঢ়চেতা, প্রাজ্ঞ ও সুদক্ষ নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ যেমন করে বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটিয়েছে, ঠিক তেমন করে বঙ্গবন্ধু-তনয়া শেখ হাসিনা এই জাতিরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মর্যাদাগত অবস্থানকে সমগ্র বিশ্বজুড়ে ক্রমাগতভাবে সমুন্নত করে চলেছেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ যুগ-যুগান্তরে এ দেশে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায় নির্বিশেষে এক চমৎকার সহাবস্থানের পরিবেশ নিশ্চিতকরণেও সম্ভাব্য সব প্রয়াস অব্যাহত রেখেছে। বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সামগ্রিক ইতিহাসে আমরা এতদাঞ্চলে ধর্মীয় মূল্যবোধ, অসাম্প্রদায়িক আদর্শ এবং আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির চেতনা বিকাশের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চলমান থাকে- এমনটিই প্রত্যক্ষ করি। এ লেখায় আমরা দেশে ধর্মীয় চেতনার বিকাশে তথা ইসলামি মূল্যবোধ প্রসারে আওয়ামী লীগের ভূমিকা তুলে ধরার প্রয়াস পাব।

বস্তুত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কোনো ধর্মীয় সংগঠন নয় কিংবা এ দলের কর্ণধার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ইসলামি ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা বা ধর্মীয় নেতার পরিচয়ে মহিমাময় কোনো আসনে বসানো আমার এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। মূলত বঙ্গবন্ধু প্রচলিত অর্থে কোনো ইসলামি ব্যক্তিত্ব ছিলেন না, ধর্মীয় নেতৃত্বের গতানুগতিক কোনো পরিচয়ও কখনো তাঁর জীবন-বৈশিষ্ট্যে স্পর্শ করেনি। তবে ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ধর্মকর্ম পালন করেছেন, ধর্মের শান্তি-সফলতার অমীয় বাণীসমূহ তাঁর প্রাত্যহিক জীবনমানে রেখাপাত করেছে এবং ধর্মীয় বিধিবিধান ও আচার-অনুষ্ঠানের বিষয়াবলি তাঁর সম্ভ্রান্ত পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে তাঁকে প্রভাবিত করেছে। বঙ্গবন্ধু তাঁর ব্যক্তিজীবনকে কখনোই ধর্মীয় অনুশাসনের বাইরের বিষয় বলে ভাবেননি, বরং যতটুকু পেরেছেন প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ডে ধর্মীয় নীতিবিধানের ফরমাবরদারি করেছেন; যা তাঁর ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও আওয়ামী লীগের অভিভাবক হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের নানা ঘটনাপ্রবাহে প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশমান সেসব বিষয়ের আলোকে একজন সত্যনিষ্ঠ ধার্মিক মানুষ হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে মূল্যায়ন করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।

অবশ্য বঙ্গবন্ধুকে একজন ধার্মিক মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করাটাও তাঁর কীর্তিময় জীবনের জন্য খুব জরুরি বলে আমরা মনে করি না। তবে কেনই বা আমাদের বর্তমান এই প্রয়াস? এখানে তার দীর্ঘ জবাবের অবকাশ নেই, শুধু এটুকু বলি- পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের বেদনাদায়ক ও নারকীয় হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর বিয়োগান্ত ঘটনার পর থেকে এ দেশে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে তাঁর নানা বিষয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষদগার, ভিত্তিহীন অপপ্রচার ও জঘন্য কুৎসা রটানো হয়েছে। এটি অপ্রত্যাশিত হলেও আমাদের সমাজ-বাস্তবতার দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ভয়াল রূপ। বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে যেসব বিষয়ে অপপ্রচার হয়েছে, তার অন্যতম হলো ধর্মীয় অঙ্গন; স্বার্থান্বেষী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী নিজেদের ষোলো আনা ফায়দা হাসিলের মানসিকতায় ধর্মীয় নানা বিষয়ে তাঁর বিরুদ্ধে অপবাদ আরোপ করেছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশের ধর্মীয় নেতৃত্বের কিছু জায়গা থেকেই বহুকাল ধরে লাগাতার এসব অপপ্রচার চলেছে। অপপ্রচারের পরিমাণ বর্তমানে কিছুটা হ্রাস পেলেও তা যে একবারেই বন্ধ হয়ে গেছে, সেটি ভাবা সত্যের অপলাপ বৈকি। সময়, সুযোগ, পরিবেশ আর পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তা আবারো পূর্বাপেক্ষা অধিক পরিমাণে যে চালু হবে না, তা বলা মুশকিল।

অথচ বঙ্গবন্ধুর জীবনের সঙ্গে ধর্মের বিশেষত শান্তি ও মানবতার ধর্ম ইসলামের যে কোনো বিভেদ বা সংঘাত নেই- তা আজ দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট। দুঃখজনক সত্য, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনার সময় আমরা মাঝেমধ্যে শুনতাম, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে দেশ ভারত হয়ে যাবে, মসজিদে আজানের আওয়াজ ধ্বনিত হবে না; উলুধ্বনি শোনা যাবে। কিন্তু এখন দেখা গেল বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকার কয়েকবার ক্ষমতায় এলেও দেশ ভারত হয়ে যায়নি আর মসজিদেও উলুধ্বনি শোনা যায়নি। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বিরোধিতার খাতিরে কিছু মানুষ বলতেন, বেটা আওয়ামী লীগও করে আবার নামাজও পড়ে। মানে, আওয়ামী লীগ করলে নামাজ পড়া যাবে না। কিছু মানুষ তো আরো অনেকটু অগ্রগামী হয়ে বলতেন, বেটা মুসলমান আবার করে আওয়ামী লীগ। অর্থাৎ তাদের দৃষ্টিতে মুসলমান আর আওয়ামী লীগ পরস্পর বিপরীতধর্মী দুটি বিষয়; যেন কোনো মুসলমান আওয়ামী লীগ করলে সেটি তাদের কাছে রীতিমতো বিস্ময়ের ও নিন্দনীয় বিষয়। কিন্তু সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অকুতোভয় নেতৃত্বে ত্রিশ লাখ মানুষের আত্মাহুতি আর দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের সমাজ চিত্র ও বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। আর সেটি হলো- গোটা দেশের সর্বত্রই দেখা যায়, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা শুধু মুসলমান বলে দাবি করে বসে থাকেন না; তারা নামাজ আদায় করতে মসজিদে যান, সামনের কাতারেও বসেন, মসজিদ কমিটির সভাপতিসহ নানা দায়িত্বও পালন করেন। মসজিদের ইমামের ভরণপোষণের চিন্তায় তারাও সময় ব্যয় করেন, মসজিদ পরিচালনায় নানাভাবে সহযোগিতার হাতও প্রসারিত করেন। তারা বিভিন্ন ক্যাটাগরির ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা মাদ্রাসাও প্রতিষ্ঠা করেন। মাদ্রাসায় যেন ভালোভাবে শিক্ষা কার্যক্রম চলে, সে জন্য সাধ্যমতো সব ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষজনের ইসলাম-সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড এমন হওয়া ঐতিহাসিক কারণেই স্বাভাবিক। কেননা, ঐতিহ্যবাহী এ দলটির মহান নেতা, বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শান্তির ধর্ম ইসলাম ও এর মূল্যবোধ প্রচার-প্রসারে যে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন, তা ইতিহাসে বিরল।

বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে এ দেশে মদ, জুয়া ও হাউজির লাইসেন্স বাতিল করেছিলেন, ঘোড়দৌড় নিষিদ্ধ করেছিলেন, তাবলিগ জামাতের নিরবচ্ছিন্ন ইসলাম প্রচারের স্বার্থে কাকরাইল মসজিদের জমি বরাদ্দ, পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম জমায়েত টঙ্গির বিশ্ব ইজতেমা ময়দানের জায়গা নির্ধারণ, মাদ্রাসা বোর্ডের সংস্কার ও আধুনিকায়ন, বেতার-টিভিতে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের ব্যবস্থা, জাতীয় পর্যায়ে সিরাত মজলিস ও ঈদে মিলাদুন্নবি (সা.) উদযাপন, শবেকদরের মহিমান্বিত রজনীতে সংবিধান পাস, হজযাত্রীদের ভ্রমণ কর রহিতকরণ, রাশিয়ায় তাবলিগ জামাতের প্রতিনিধি প্রেরণ এবং একেকজন সদস্যকে স্বদেশের পক্ষে কূটনীতিকের ভূমিকা পালনের আহ্বান, আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখদের সঙ্গে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন, ছারছীনা ও ফুরফুরাসহ বিশুদ্ধ আকিদার অন্যান্য দরবার ও খানকার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা, অহংকারমুক্ত বিশাল হৃদয় নিয়ে সত্যনিষ্ঠ অবস্থান গ্রহণ করা, মেহনতি মানুষের জন্য কাজ করা ও মানবতার খেদমতে আত্মনিয়োগ, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান রচনা ও প্রণয়নে ঐতিহাসিক মদিনার সনদের বিভিন্ন ধারার সঙ্গে সাযুজ্য রক্ষা ও তার প্রভাব প্রতিবিম্বিত করা, ‘কুনু মাআস্ সাদেকিন’ পবিত্র কুরআনের এ নির্দেশনা অনুযায়ী সত্যনিষ্ঠ, বিবেকবান ও দেশপ্রেমিক মানুষদের সাহচর্য ও বন্ধুত্ব গ্রহণ, ছাত্রজীবন থেকেই ধর্মপ্রাণ ও নামাজি শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষ নজর দান ও নানাবিধ কাজে তাদের অগ্রাধিকার প্রদান, ধর্মীয় সভা-সমিতি, ওয়াজনসিহত বা মাহফিল অনুষ্ঠানে বিঘœ বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে দায়িত্ব নিয়ে সেই সভা বা মাহফিল অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করে দেয়া, অধ্যয়নকালীন অবস্থায়ও প্রিয়তমা স্ত্রীকে লেখা চিঠি-পত্রাবলিতে মহান আল্লাহর ওপর অকৃত্রিম বিশ্বাসের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে ইসলামের জন্য জীবন উৎসর্গ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা, আল্লাহ যা করেন তা মঙ্গলের জন্যই করেন মর্মে সবকিছু তাকদিরের অংশ হিসেবে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়া, জীবনের প্রথমবারের মতো জেলে যাওয়ার কারণটিকে ধর্মীয় চেতনার অংশ হিসেবে স্মরণীয় করে রাখা, জীবনের সমগ্র ভাষণে উদারতা, কল্যাণকামিতা আর সীমাহীন আন্তরিকতার স্বাক্ষর রেখে আদম সন্তানদের ‘ভায়েরা আমার’ বলে সম্বোধন করা, যাবতীয় জুলুম ও অনিয়ম-অনাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার অসীম সাহসিকতা প্রদর্শন, বৈষম্য ও নিপীড়নের দিক থেকে বাঙালি সমাজকে মক্কার সমাজের প্রতিচ্ছবি করা, তমদ্দুন মজলিশসহ অন্যদের সঙ্গে ভাষা আন্দোলনের প্রেরণা হিসেবে ইসলামি চেতনাবোধের প্রতি সহমত পোষণ করা, সত্য ও ন্যায়ের প্রতি নিষ্ঠাবান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার হয়েও অন্যায় আদেশের সামনে মাথা নত না করা, মুচলেকা ও জরিমানা না দেয়া ও আত্মসম্মান আর আত্মমর্যাদাবোধের ওপর অবিচল থাকা, সত্তরের নির্বাচনের প্রাক্কালে দেয়া বিশেষ ভাষণে ও অন্যান্য সময়ে ‘কুরআনবিরোধী কোনো আইন করা হবে না’ মর্মে ঘোষণা দেয়া, কথায়-বার্তায় ও বক্তৃতা-ভাষণে অনুপম ভঙ্গিতে ‘ইন্শাআল্লাহ’ বলে ইসমে আজমের অসীম ক্ষমতার প্রতি আস্থা জ্ঞাপন, যাত্রাবাড়ী মাদ্রাসাসহ কওমি ঘরানার আলেমদের নিয়ে ভারতের ‘দারুল উলুম দেওবন্দ’ প্রকৃতির ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পৃষ্ঠপোষকতা এবং মুসলিম মিল্লাতের বৃহত্তর স্বার্থ সংরক্ষণের তাগিদে ওআইসির সম্মেলনে অংশগ্রহণসহ নানাবিধ কর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু তাঁর ইসলামবিষয়ক কীর্তি ও ধর্মীয় চেতনার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তবে বাংলাদেশে ইসলামের তরে চিরস্মরণীয় ও নজিরবিহীন যে কাজটি তিনি করেছেন সেটি হলো, ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা। সমগ্র বিশ্বে ইসলামের প্রচার-প্রসার ও গবেষণা আর প্রকাশনার ক্ষেত্রে এটি সর্ববৃহৎ এক অনন্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত।

এ বিষয়ে কারো দ্বিমত নেই, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান ও এর জনগণের ওপর কোনো ক্ষেত্রেই আদল ও ইনসাফ তথা সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেনি। বরং তারা এতদাঞ্চলের মানুষের ওপর রীতিমতো অবিচার তথা জুলুমের রাজত্ব কায়েম করেছিল। তারা সর্বক্ষেত্রে খারাপ কাজের নজির স্থাপন করেছিল।

ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসুল হজরত মোহাম্মদ (সা.) ঘোষণা করেছেন- ‘মান রাআ মিনকুম মুনকারান ফালয়ুগাইয়িরহু বিয়াদিহি ফাইল্লাম য়াসতাতি ফাবিলিসানিহি ফাইল্লাম য়াসতাতি ফাবিকালবিহি ওয়া যালিকা আজআফুল ইমান’ অর্থাৎ তোমাদের মধ্যে যে কেউ যখনই কোনো খারাপ বা মন্দ কাজ প্রত্যক্ষ করবে তাৎক্ষণিক সেটি প্রতিহত করার জন্য শক্তি প্রয়োগ করো। আর শক্তি প্রয়োগে যদি তুমি সামর্থ্য না হও তবে তোমার ভাষণে-বক্তব্যে বা কথায় সেটির প্রতিবাদ করো। তাও যদি না পারো। তবে সেই কুকর্ম বন্ধকরণে তুমি তোমার অন্তঃকরণের দ্বারা কোনো একটি পরিকল্পনা বের করো, যাতে করে সেটি বন্ধ হতে পারে। আর এটি হলো ইমানের একেবারে সর্বনিম্ন স্তর। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের জালেম ও স্বেচ্ছাচারী শাসকগোষ্ঠীর সকল প্রকার অপকর্মের দাঁতভাঙা জবাব দিয়ে ইমানের প্রথম স্তরের পরিচয়ই পেশ করেছিলেন। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের ভাষণেও তিনি তাঁর মূল শক্তি ও সম্পদ হিসেবে যা বিবৃত করেছিলেন, তার অন্যতম ছিল সেই ইমান ও ইমানি তেজোদীপ্ততা। অন্যদিকে বাঙালিরা ছিল মজলুম তথা নির্যাতিত। মহানবী (সা.)-এর অপর একটি নির্দেশনা হচ্ছে- তোমরা মজলুমের পক্ষ সমর্থন করে তাদের নিপীড়িত আত্মার অভিশাপ থেকে নিজেদের রক্ষা করো। মানবতাবাদী চেতনায় উজ্জীবিত লৌহমানব বঙ্গবন্ধু সত্যিকার অর্থেই সারাটি জীবন অত্যাচারিত মানবতার ভাগ্যোন্নয়নে অতিবাহিত করেছেন, যা উল্লিখিত বাণীরও এক সফল বাস্তবায়ন। বঙ্গবন্ধু ছিলেন অসাম্প্রদায়িক, উদার ও মহানুভব একজন বিশ্ব নেতা। সব ধর্মের সমান অধিকার তিনি নিশ্চিত করেছিলেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকেও তিনি সেই আদর্শেই পরিচালনা করেছেন। প্রত্যেকেই যেন তার নিজস্ব ধর্ম বিশ্বাস অনুযায়ী স্বাধীনভাবে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে পারেন, তিনি প্রকৃত অর্থে সেই ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমি সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্মীয় অধিকার সুরক্ষার ব্যবস্থা করেছি। প্রকৃতপক্ষে সব ধর্মমতের মানুষের সহাবস্থান ইসলামেরই মহান শিক্ষা; বঙ্গবন্ধু মদিনা সনদের আলোকে সেই শিক্ষারই বাস্তবায়ন ঘটিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর মাতৃভূমি প্রিয় বাংলাদেশকে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ হিসেবে ঘোষণা করে বলেছিলেন- ‘আমি এ দেশে ইসলামের অবমাননা চাই না।’ স্বাধীনতা-উত্তর বঙ্গবন্ধু মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের প্রভূত উন্নতি বিধান করেন। কেননা, মুক্তিযুদ্ধকালীন মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ছিল নেতিবাচক। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তাঁর গতিশীল নেতৃত্ব আর প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব দিয়ে অল্পকালের ব্যবধানে সে সম্পর্ক এমন এক জায়গায় উপনীত করেন, তাদের অনেকেই তখন বাস্তবতা উপলব্ধি করেন এবং পুরো বিষয়ে তারা যে অন্ধকারে ছিলেন ও তাদের ভাবনা যে সঠিক ছিল না- তা তারা স্বীকার করেন। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে ১৯৭৪ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামি সম্মেলন সংস্থার শীর্ষ সম্মেলনে তিনি যে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন, তাতে বিশ্ব মুসলিমের মধ্যে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বলতর হয় এবং মুসলিম দেশসমূহের সঙ্গেও সম্পর্কের আরো উন্নতি ঘটে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা যদি মহানবী (সা.) প্রচারিত মানবপ্রেম ও মানুষের মর্যাদার শাশ্বত মূল্যবোধ মানবসমাজে সঞ্চারিত করতে পারি, তাহলে তা থেকে চলমান সমস্যাদির যথোপযুক্ত সমাধানে মুসলিম জনসাধারণ সুস্পষ্ট অবদান রাখতে পারবে। এসব মূল্যবোধে উদ্দীপ্ত হয়ে শান্তি ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে আমরা একটি নতুন আন্তর্জাতিক ঐতিহ্য গড়ে তুলতে পারি।’

মূলত বঙ্গবন্ধুর পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাঁরই সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে বাংলাদেশকে একটি অসাম্প্রদায়িক, মানবতাবাদী ও আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির মডেল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে সচেষ্ট রয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক ৬ আগস্ট ২০১৪ তারিখে বাংলাদেশ গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা-২০১৪। সরকার অনুমোদিত এ নীতিমালার কোনো কোনো ধারা-উপধারা বিষয়ে কারো কারো মতবিরোধ ও আপত্তি থাকলেও ধর্মীয় সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়ে নীতিমালায় বিধৃত ধারা-উপধারা বিষয়ে কোনো মহলেরই মতপার্থক্য ছিল না এবং কোনো ধরনের আপত্তিও উত্থাপিত হয়নি। এতে বাংলাদেশের সম্প্রচার মাধ্যমগুলোর জন্য অনুসৃত নীতিমালা হিসেবে এ দেশে সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা, ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখার লক্ষ্যে যে বিজ্ঞজনোচিত নির্দেশনা প্রদত্ত হয়েছে, তাতে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রাগ্রসর চিন্তা ও দূরদর্শিতা প্রকাশ পেয়েছে, যা বর্তমান সমাজের জন্য পথনির্দেশক।

সরকার ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের উদ্ধৃতি এবং আইন ও সংবিধান প্রণয়নসহ যেসব বিষয় উল্লেখ করা হলো সেসবের সারনির্যাস এমন হবে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ছায়াতলে, বঙ্গবন্ধু ও বর্তমানে শেখ হাসিনার সুযোগ্য ও গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশকে সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের জন্য নিরাপদ এক আবাসস্থল হিসেবে গড়ে তোলা; সকল প্রকার সাম্প্রদায়িকতাকে নির্বাসনে পাঠানো এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি সুদৃঢ় করা। তাই আমরা বলতে পারি, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু ধর্মীয় চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধের যে অনুপম সৌধ নির্মাণ করে গেছেন, শেখ হাসিনা তার নিরন্তর নির্মোহ প্রচেষ্টার আলোকে সেই সৌধটির একাডেমিক ডিসকোর্স প্রণয়নে নিত্যদিন পারঙ্গমতা দেখিয়ে চলেছেন। তাই বলি, মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশকে যদি বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক চেতনার আলোকে ধর্মীয় সম্প্রীতির এক নিরাপদ ও শান্তিময় জনপদ হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তাহলে শেখ হাসিনার এতদসংশ্লিষ্ট সব প্রয়াসকে দৃঢ়ভাবে অবলম্বন ও কার্যকর করতে হবে। তার সময়োচিত ও কল্যাণধর্মী নির্দেশনার আলোকে আমাদের জাতীয় জীবনে দেশমাতৃকার বৃহত্তর স্বার্থ সুরক্ষায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণে আত্মনিবেদিত হতে হবে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App