×

বিশেষ সংখ্যা

শেখ হাসিনা দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেছেন

Icon

ড. রাজীব চক্রবর্তী

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

শেখ হাসিনা দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেছেন
বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা ৪৩ বছর আগে কথা দিয়ে কথা রেখেছেন। আজ থেকে ৪৩ বছর আগে ১৯৮১ সালের ১৭ মে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের কয়েকদিন আগে ভারতের নয়াদিল্লি থেকে ঢাকা রওনা হওয়ার প্রাক্কালে শেখ হাসিনার মার্কিন পত্রিকা সাপ্তাহিক নিউজউইককে বলা কথা কেমন করে যেন সবই সত্যি হয়ে গেল? একনাগাড়ে দেড় যুগ ধরে সবচেয়ে বেশি ৫ বারের প্রধানমন্ত্রী হয়ে বিশ্বে নজির স্থাপন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাস্তবিকই বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যোগ্য উত্তরাধিকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। পিতার হত্যার বিচার করেছেন। তৎকালীন ’৯০-এর সামরিক সরকারের বাধাকে গণ্য করেননি। প্রায় ১০ বছরের সংগ্রামের ফলে ১৯৯০ সালে স্বৈরতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে শেখ হাসিনা দেশে পুনরায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে দিয়েছেন। এবং অবশ্যই সেই সময়কার মার্কিন সাপ্তাহিকের রিপোর্ট অনুযায়ী শেখ হাসিনা নিহত হওয়ার আশঙ্কায় শঙ্কিত ছিলেন না। ১৯৮১ সালের ১১ মে মার্কিন পত্রিকা সাপ্তাহিক নিউজউইকে প্রকাশিত শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন সম্পর্কিত এক রিপোর্টে বলা হয়, ১৯৭৫ সালে সামরিক চক্র কর্তৃক ক্ষমতা দখলকালে নিহত পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য শেখ হাসিনা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি নিহত হওয়ার আশঙ্কায় শঙ্কিত নন; এমনকি যে সরকারের মোকাবিলা করবেন তার শক্তিকে তিনি বাধা বলে গণ্য করবেন না। বাস্তবেই শেখ হাসিনা নিহত হওয়ার আশঙ্কায় শঙ্কিত ছিলেন না। অনেক আত্মঘাতী হামলার মধ্যে ২০০৪ সালের স্মরণকালের ভয়াবহ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিজের দেহরক্ষীসহ ২৪ জনের মৃত্যু ও অগণিত হতাহতের মধ্যে তৎকালীন বিরোধী দলের প্রধান এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রাণে বেঁচে যাওয়া তারই প্রমাণ। তারও আগে ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি, চট্টগ্রাম লালদীঘির জনসভাস্থল ময়দানে যাওয়ার পথে শেখ হাসিনার ট্রাক মিছিলে নির্বিচারে গুলি ছুড়েছিল এরশাদ সরকার। গুলিতে ২৪ জন নিহত হন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা তার ১৯৮১ সালের ১৭ মে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে লাখো লোকের সমাগমের ভাষণে বলেছিলেন ‘সব হারিয়ে আমি আপনাদের মাঝে এসেছি। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জাতির পিতার হত্যার বিচার করতে আমি জীবন উৎসর্গ করতে চাই। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আজকের জনসভায় লাখো লাখো চেনামুখ আমি দেখছি। শুধু নেই আমার প্রিয় পিতা বঙ্গবন্ধু, মা, আর ভাইয়েরা এবং আরো অনেক প্রিয়জন। পরবর্তীতে দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা সংসদে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যার ও জাতীয় চার নেতার হত্যার বিচারের পথ সুগম করেন। পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে ৩০ বছরের পানি চুক্তি, ১৯৯৭ সালে ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি সম্পাদন করেন। ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি পিতা হত্যার বিচার করে তিনি দীর্ঘ প্রায় ২৯ বছর আগের করা ওয়াদা পূরণ করে আবারো প্রমাণ করেছেন, শেখ হাসিনা কথা দিলে কথা রাখেন। এতদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির জন্য দেয়া নিজের প্রতিশ্রæতি পূরণ করেছেন। এখন প্রধানমন্ত্রী তার পিতার স্বপ্ন পূরণে সোনার বাংলাদেশ গড়ার কাজে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছেন। যাতে করে বাংলাদেশ স্বাবলম্বী হয়ে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। এবং তিনি অনেক দূর এগিয়েও গেছেন। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। পদ্মা সেতু এবং তার রেল সংযোগ ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পশ্চিমের ২১টি জেলার সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করেছে। অর্থনীতিবিদদের ধারণা, পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প দেশের জিডিপির আকার ১ দশমিক ২৩ শতাংশ বাড়াবে এবং ১০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান তৈরি হবে। এছাড়া মেগা প্রজেক্ট ঢাকার মেট্রোরেল এখন যানজটের ঢাকাবাসীর কাছে শান্তি ও স্বস্তির যোগাযোগ ব্যবস্থা। যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ (সিইবিআর) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, আগামী ২০৩৭ সালের মধ্যে ডব্লিউইএলটি তালিকায় আরো ১৪ ধাপ এগিয়ে বিশ্বের ২০তম অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে বাংলাদেশ। ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ মধ্যবর্তী আয়ের দেশে উত্তরণের কাজ অনেক আগেই শুরু হয়েছে। ভারি অবকাঠামোগত বিনিয়োগ ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না। বর্তমান শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন পঞ্চমবারের মতো নির্বাচিত সরকার পদ্মা সেতুর পাশাপাশি অন্যান্য মেগা প্রজেক্টগুলো যেমন মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে নির্মিত বঙ্গবন্ধু টানেল, ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন যেটা এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রেলনির্ভর বিনোদনের যোগাযোগব্যবস্থার সুফল ইতোমধ্যে পাওয়া শুরু করেছে। এসব ভারি অবকাঠামোগত উন্নয়নের মেগা প্রজেক্ট ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের উত্তরণের পথকে ত্বরান্বিত করছে। যদিওবা ’৭৫-পরবর্তী পটপরিবর্তনের ফলে শেখ হাসিনার সেই সময়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পথটি যেমন অতটা সহজ ছিল না, তেমনি ৪৩ বছর আগের করা কমিটমেন্টগুলো অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করার পথও এত মসৃণ ছিল না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যা-পরবর্তী সময় আওয়ামী লীগও ছিল বহুদা বিভক্ত। তবে ১৯৮১ সালের ১৪-১৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত কাউন্সিল অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচন করা ছিল আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। মূলত এই সিদ্ধান্ত যেমন শেখ হাসিনার স্বদেশে প্রত্যাবর্তনকে ত্বরান্বিত করেছিল, তেমনি বাংলাদেশও বঙ্গবন্ধুকন্যাকে পেয়ে পথ হারায়নি। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেয়ার পর গত প্রায় ১৫ বছরের বেশি সময়ে বাংলাদেশের বিদ্যুৎব্যবস্থা, কৃষি খাত, যোগাযোগব্যবস্থা, অর্থনীতি, নারীর ক্ষমতায়ন ও প্রযুক্তি খাতে ব্যাপক উন্নয়ন অর্জিত হয়েছে। মানুষের মাথাপিছু আয়ের দিকে এমনকি ভারতকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ ২০১৫ সালে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সূচকে নিম্ন-মধ্যবর্তী আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। খাদ্য ঘাটতির দেশ থেকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে বিশ্বে এখন তৃতীয়। গত এক যুগ ধরে বাংলাদেশের ধারাবাহিকভাবে জিডিপি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০১৮ সালে ৭ দশমিক ৯ পর্যন্ত ছুঁয়েছে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার সময়ের তলাবিহীন ঝুড়ির বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরিসংখ্যান অনুযায়ী এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে অবস্থান ৩৫তম। জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) পূরণ করে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টর (এসডিজি) অনেক ক্রাইটেরিয়া যেমন জেন্ডার ইক্যুইটি, নারীর ক্ষমতায়ন, শিশু মৃত্যু হার হ্রাসের অঙ্গীকার পূরণ করেছে। চরম দারিদ্র্যের হার ৬ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। জীবনযাত্রার মান বেড়ে মানুষের গড় আয়ু ৭৩ বছরে ঠেকেছে। ২০১৮ সালে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের মর্যাদা দিয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর ভাষায় সংকট এখনো কাটেনি। ভূরাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রভাব বলয়ের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। তার সঙ্গে বাংলাদেশের বিশাল বাজারও দিন দিন তাদের আকৃষ্ট করছে। তাই বর্তমানে এই জটিল ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বলা যায় ৪৩ বছর আগের জননেত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের অঙ্গীকার বাংলাদেশকে পুনর্জন্ম দিয়েছে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App