×

বিশেষ সংখ্যা

এক বাঙালি কন্যার গল্প

Icon

কুমার প্রীতীশ বল

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

এক বাঙালি কন্যার গল্প
পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলা নামে একটি দেশ আছে। সে দেশে এক কন্যা আছেন, নাম শেখ হাসিনা। আপাদমস্তক একজন বাঙালি। নেহরুকন্যা ইন্দিরা যেমন সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছিলেন, ঠিক তেমনটি পারেননি মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা। ইতিহাস বলে, এ সোনার দেশে শেখ হাসিনা সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মাননি। নেহরুকন্যা ইন্দিরাকে ভবিষ্যতের রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তৈরি করার জন্য যথোচিত চেষ্টা চালিয়েছিলেন। তার সব ধরনের প্রস্তুতিও ছিল। ইন্দিরা গান্ধী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মতো প্রধানমন্ত্রীর অধীনে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশাসনিক দক্ষতা অর্জন করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশ্বভারতী ও অক্সফোর্ডের সামার ভিলেজ কলেজে লেখাপড়া করেছেন। ফলে ইন্দিরা আধুনিক ভারতের রূপকার হতে পেরেছিলেন। নেহরুকন্যা ইন্দিরার মতো শেখের বেটি শেখ হাসিনা তেমন সুযোগ-সুবিধা পাননি, নিজেকে গড়ে তুলতে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তেমন সুযোগ-সুবিধা দিতে পারেননি সন্তানদের। অর্থ, পরিবেশ, পরিস্থিতি কোনোটাই অনুকূলে ছিল না। জাতির পিতা কিংবা শেখ হাসিনা কেউ কখনো নেহরুকন্যা ইন্দিরার মতো অনুকূল পরিবেশ পাননি বেড়ে ওঠার জন্য, নিজেকে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য তৈরি করতে। কিন্তু আজ প্রাজ্ঞতা, সততা, বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা বিবেচনা করলে শেখ হাসিনা নেহরুকন্যার সমকক্ষতা অর্জন করেছেন। ক্ষেত্র বিশেষে শেখ হাসিনা তাকে অতিক্রম করে গেছেন। আজকের বাংলাদেশ সে সাক্ষ্য দেবে। আজ এই বাঙালি কন্যা শেখ হাসিনা ‘গেøাবাল সাউথের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর’ হিসেবে নন্দিত হয়েছেন। এই বাঙালি কন্যা শেখ হাসিনা এমন বিচক্ষণ, দূরদর্শী হলেন কী করে? বাংলার মাটি, বাংলার জল, হাওয়া কি তাকে গড়ে তুলেছে? সময় তাকে শক্তি জুগিয়েছে। তিনি ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের মতো ভয়াল কালরাতের মুখোমুখি হয়েছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সর্বাধিনায়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবসহ তাদের পরিবারের সদস্য এবং বঙ্গবন্ধুর নিকটাত্মীয়সহ মোট ২৬ জন সেদিন শহীদ হন। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সে সময় পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করার কারণে তারা প্রাণে বেঁচে যান। তবে সে সময় তাদের বাংলাদেশে ফিরে আসার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এমন অভিজ্ঞতা আপাদমস্তক এই বাঙালি কন্যা ছাড়া তো আর কারো নেই। এ সময়ে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। ভারতে আশ্রয় দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা ২৪ বারের অধিক মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন। ২১ আগস্টের মতো ঘটনার তিনিই সাক্ষী। এই বাঙালি কন্যার মতো আর ক’জন মৃত্যুকে এত কাছে থেকে দেখেছেন, এত বীভৎসতা, ভয়াবহতা তিনি ছাড়া আর ক’জন দেখেছেন। এসব কিছু তাকে সত্য বলতে সাহস জুগিয়েছে। গণমানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য সামগ্রিক উন্নয়নের স্বপ্ন দেখতে সহায়তা করেছে। জাতির পিতা রাজনৈতিকভাবে প্রাজ্ঞ ছিলেন, বিচক্ষণ ছিলেন, দূরদর্শীও ছিলেন। এ সম্পর্কে আজ আর কারো সন্দেহ নেই। তার কন্যাও তাই হবেন। শেখ হাসিনার প্রাজ্ঞতা, সততা, বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতার সুফল বর্তমানে স্বীকার করুক আর না-ই করুক গোটা বাঙালি জাতি ভোগ করছে। উদাহরণ দিতে গেলে লম্বা একটা তালিকা করা যাবে। মোবাইল, ইন্টারনেট, অ্যান্ড্রয়েড থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু টানেলে, এলিভেটেট এক্সপ্রেসওয়ে পর্যন্ত- সবকিছুই তো এই বাঙালি কন্যার চিন্তাপ্রসূত ফসল। তারই নেতৃত্বে এ জনপদের মানুষের হাতের নাগালের মধ্যে এসেছে আজকের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। গ্রামের সঙ্গে শহরের কানেক্টিভিটি তৈরির পথ সুগম করেছেন। যারা একদা তলাবিহীন ঝুড়ি বলে উপহাস করেছিল ওরাই এখন বাংলাদেশ নিয়ে নানান হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত। আজ শেখ হাসিনার কারণে দুর্যোগ প্রশমনে রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। ধনী দেশ না হওয়ার পরও তিনি সাহস করেছেন গোটা জাতিকে বিনা পয়সায় করোনার টিকা প্রদান করতে। আজ বাংলাদেশ ইলিশ উৎপাদনে বিশ্বের প্রথম। আম উৎপাদনে বিশ্বের চতুর্থ। এমআরপি ও ই-পাসপোর্ট আজ আর কোনো স্বপ্ন নয়। পদ্মা সেতু নিজেদের টাকায় করার সাহস দেখিয়েছেন। তিনি একের পর এক দুঃসাহসিক কাজ করে বিশ্বকে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন আমরাও পারি। আজকের ভূরাজনৈতিক সমীকরণে বাংলাদেশ যে অনিবার্য হয়ে উঠেছে, তা সম্ভব হয়েছে একমাত্র শেখ হাসিনার কৌশলী পদক্ষেপে কারণে। আজ দক্ষিণ এশিয়ার অনিবার্য সাহসী কণ্ঠস্বর এই বাঙালি কন্যা শেখ হাসিনা, যার শেকড় বাঙালির প্রাণের গভীরে প্রথিত। বাংলার মাটি-বাংলার বায়ু-বাংলার জল-হাওয়ার সঙ্গে বাঙালি কন্যা শেখ হাসিনার একটি নিবিড় প্রাণের সম্পর্ক রয়েছে। এ বাংলার সোঁদা মাটির গন্ধ, রূপ রস বীর হিসেবে তৈরি করেছে। স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে। এ প্রসঙ্গে তার লেখা ‘ওরা টোকাই কেন’ গ্রন্থ থেকে সেই অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করতে চাই। তিনি লিখেছেন, ‘গ্রাম জীবনের অসংখ্য চরিত্র আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। আমাদের গ্রামে আক্কেলের মায়ের কথা খুব মনে পড়ে। বুড়ি হয়ে গেছে এখন। তিন ছেলে তার। অল্প বয়সে বিধবা হয়েছিল। গ্রামের সব পাড়ায়, ঘরে ঘরে তার অবাধ যাতায়াত। ...সে যেন গ্রামের গেজেট। ...ধান কাটার মৌসুমে দক্ষিণ দিক থেকে অনেক লোক আসত। পরবাসী নামে তারা পরিচিত। ধান কাটা, মাড়াই প্রভৃতি কাজ তারা করত। ছোট্ট খুপরি ঘর তুলে পুরো মৌসুমটা থাকত।’ (পৃষ্ঠা : ১৬)। বাংলার গ্রামীণ জীবনের এমন অভিজ্ঞতা আর কোনো রাষ্ট্রনায়কের কি আছে? এমন পর্যবেক্ষণের চোখইবা কার আছে? এর নেপথ্য কারণও আছে। এ বাঙালি কন্যার জন্ম, বেড়ে ওঠা গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে। তিনি অকপটে লিখেছেন- ‘আমার জন্ম হয়েছে গ্রামে, শৈশবের রঙিন দিনগুলো উপভোগ করেছি গ্রামে। গ্রামীণ স্বভাব, চালচলন, জীবনযাত্রা ও মানসিকতার সঙ্গে আমার গভীর সম্পর্ক।’ (পৃষ্ঠা : ১৭)। কী অসাধারণ সরল স্বীকারোক্তি! বাঙালির বৈশিষ্ট্যময় জীবনের তাৎপর্য এ কারণে বাঙালি কন্যা শেখ হাসিনা অনুধাবণ করতে পারেন। এ কারণেই তিনি গ্রামীণ সামষ্টিক উন্নয়নের কথা বলেন। সামষ্টিক উন্নয়নের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করেছেন। একটা সময় তো ছিল, গ্রামীণ জনপদে বিদ্যুৎ মাঝে-মধ্যে আসত। তিনি ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশজুড়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছেন। বিদ্যুতায়ন সেই সামষ্টিক বা ‘সামগ্রিক’ উন্নয়নের চাবিকাঠি। তিনি ‘ওরা টোকাই কেন’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘গ্রামের উন্নয়ন প্রক্রিয়া বলতে আমি কোনো ছিটেফোঁটা বা সাময়িক ব্যবস্থায় বিশ্বাসী নই। যুগ যুগ ধরে অন্ধকারে পড়ে থাকা পশ্চাৎপদ জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত প্রাচীন কৃষি-ব্যবস্থার প্রচলিত ধ্যান-ধারণার সামগ্রিক সংস্কার করে আধুনিক গ্রাম গড়ে তুলতে হবে। আমি কোনো অনুদানমূলক বা প্রতিশ্রæতিপূর্ণ উন্নয়ন নয়, ‘টোটাল’ বা ‘সামগ্রিক’ উন্নয়ন চাই। এজন্য প্রয়োজনবোধে দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে এবং শিক্ষিত সচেতন তরুণ সমাজকে কাজে নামতে হবে।’ (পৃষ্ঠা : ১৬)। এখানে এসে মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের গ্রামোন্নয়ন ভাবনার কথা। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ১৯০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে যে ‘পল্লী-সমাজ’ গঠনের পরিকল্পনা করেছিলেন এবং গ্রামোন্নয়নের জন্য যে প্রস্তাবনা প্রণয়ন করেছিলেন, তার ছাপ বাঙালি কন্যা শেখ হাসিনার মনোজগতে নিশ্চিতভাবে পড়েছে। বাংলাদেশের উন্নয়নে এ বাঙালি কন্যার উদ্যোগ ও সাফল্য রবীন্দ্রনাথের অসাধারণ ও বৈপ্লবিক ভাবনার অন্য উন্মোচন। বলা যায়, জাতির পিতার দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচির বাস্তবায়নের পথে অগ্রযাত্রা। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘পল্লী-সমাজ কার্যে প্রবৃত্ত হইলে অর্থের অভাব হইবে না।’ শেখ হাসিনার বড় বড় মেগা প্রকল্প, পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ইত্যাদির ব্যয় বিবেচনায় নিলে রবীন্দ্রনাথের কথার সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়। জাতির পিতার মতো শেখ হাসিনার বাঙালির প্রতি বিশ্বাস আর ভালোবাসা অন্তরের কত গভীরে প্রথিত, তার ১৯৮৯ সালের (১৯৮৯ সালে শেখ হাসিনার ‘ওরা টোকাই কেন’ গ্রন্থটি প্রকাশিত) উন্নয়ন ভাবনা এবং ২০২৩ সালের উদ্যোগ তার নিদর্শন। শেখ হাসিনা তার স্বপ্নগুলো নির্মাণ করেছেন, লালন করেছেন দশকের পর দশক রাষ্ট্রক্ষমতা লাভের আগেই। বঙ্গবন্ধু অসমাপ্ত কর্মসূচিও বাঙালি কন্যা শেখ হাসিনার স্বপ্ন নির্মাণে সহায়তা করেছে। ফলে ক্ষমতা লাভের পর একের পর এক বাস্তবায়নে ভাবতে হয়নি। এখানে তিনি অনেকাংশেই সফল। তার এই সফলতার মূলে জাতির পিতার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক জীবনাচারও বিশেষভাবে কাজ করেছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো এই বাঙালি কন্যা শেখ হাসিনাও প্রত্যক্ষ করেছেন, ‘দেশের মানুষ আর্থিক দৈন্যের কারণে একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। যৌথ ও একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবারে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। জমি-জমা ইত্যাদিও বংশবৃদ্ধি ও ধনিকসমাজ অশিক্ষা-কুশিক্ষার কারণে স্বার্থবুদ্ধি সম্পন্ন হয়ে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে।’ (রবীন্দ্রনাথ : গ্রামোন্নয়ন ভাবনা : আনোয়ারুল করীম, পৃষ্ঠা : ৩৫) এসবের প্রতিকারে তিনি গৃহায়ণ কর্মসূচি, একটি বাড়ি একটি খামার, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ইত্যাদি নানান সব উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। গ্রামীণ জীবনের প্রতি এমন মমত্ববোধ আমি কম রাষ্ট্রনায়কদের মধ্যে প্রত্যক্ষ করেছি। তিনি অকপটে লিখেছেন- “জীবনানন্দের ‘রূপসী বাংলা’ যেন আমার গ্রাম-ঘন সবুজ প্রকৃতি ও ফসলের প্রান্তর দেখে দু’চোখ জুড়িয়ে যায়।” কী চমৎকার সরল স্বীকারোক্তি! এমনি করেই এই বাঙালি কন্যা শেখ হাসিনা পৌঁছে যান সাধারণ মানুষের কাছে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় তাকে তখন বলতে ইচ্ছে করে- ‘সঙ্গী হয়ে আছ যেথায় সঙ্গীহীনের ঘরে/ সেথায় আমার হৃদয় নামে না যে/ সবার পিছে, সবার নিচে, সবহারাদের মাঝে।’ বাঙালি জাতি হিসেবে সত্যি ভাগ্যবান যে, এমন একজন রাষ্ট্রনায়ক পেয়েছে, যিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর মতো জনমানুষের কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছিলেন। বাঙালি কন্যা শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের সংগ্রাম আর বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের দিকে যতই ফিরে ফিরে দেখি, বারে বারে বলতে ইচ্ছা করে, হে বাঙালি কন্যা শেখ হাসিনা ‘তোমার প্রতি চাহিয়া আমাদের বিস্ময়ের সীমা নাই।’

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App