×

সাময়িকী

ফেরদৌস আরা আলীম

তখনও যায়নি ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ : প্রতিটি গল্পে রয়েছে চিরকিশোর মনের সজীবতা

Icon

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

তখনও যায়নি ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ : প্রতিটি গল্পে রয়েছে  চিরকিশোর মনের সজীবতা

‘সবপথ এসে মিলে গেল শেষে’, ব্যস এইটুকু। মনের মধ্যে গানের এই কটি কথাই ঘুরে ঘুরে বেজে চলেছে। অথচ যে ভাবনায় মন বিষণ্ন হয়ে আছে তার সঙ্গে এ গানের ন্যূনতম কোনো যোগ নেই। মনের মধ্যে ছিল সময়ের দুর্দান্ত দস্যু বেনজীর আহমদের সেই রিসোর্টের ছবি, বাঘের ঘরে ঘোগের বাসার মতো, কোথাও কোনো ভুল যদি না করি, গোপালগঞ্জে, হ্যাঁ, গোপালগঞ্জের বিস্তৃত সবুজ প্রান্তরে যুগল রাজহাঁসের মতো বসে থাকা রিসোর্ট। পেছনে গল্প, সকরুণ। সংখ্যালঘুদের জমি-জিরেত, ভিটেমাটি হাতিয়ে নেয়ার গল্প। পড়ছিলাম দেবব্রত সেনের ছোটগল্পের বই, ‘তখনও যায়নি ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ’। ‘উদ্বাস্তু’ গল্প দিয়ে শুরু। বাপদাদার ভিটেমাটি, জমি-জিরেত পেছনে ফেলে উদ্বাস্তু সুনীল ভিনদেশের মাটিতে উদয়াস্ত ঘুরে মরছে। নিজে উদ্বাস্তু কিন্তু ছেলেমেয়েকে উদ্বাস্তু থাকতে দেবে না। একটা রুটি আর এককাপ চা খেয়ে মেয়ের হাত ধরে সেই ভোরে বেরিয়েছে সুনীল। মেয়েকে কোচিংয়ে রেখে ছোটে রেড বিল্ডিংয়ে। নিজেদের একটা বাড়ি চাই। দিনমান স্বামীর পথ চেয়ে বসে থাকা মলিনার চোখের ওপর জলপাই গাছটার এক টুকরো স্নিগ্ধ ছায়া কেমন আশ্রয় হয়ে বসে আছে। ভাড়া বাড়িতে নিজেকে কেমন শরণার্থী শরণার্থী লাগে। ফেলে আসা রামনগরের ঘরবাড়ি, সীতাকুণ্ডে বাপের বাড়ি, স্বামীর চাকরির সুবাদে এখানে সেখানে ফেলে আসা ঘরদোর আর দিনযাপনের অঢেল কষ্ট, সব মনে পড়ে। ঈদ বুড়োদের অত্যাচার, আতঙ্ক, বিনিদ্র রাতযাপন সবই মনে পড়ে। বাড়ির মামলা নিয়ে সুনীলের ছোটাছুটি, নোয়াখালী গিয়ে গিয়ে হাজিরা দেয়া, তারপর একদিন সব ছেড়েছুড়ে এই বিরাটিতে, অঞ্জনগড়ে। ’৭১ থেকে শরণার্থী হয়ে আসাদের দল ভারি হতে থাকে। ওদের সাহায্য নিয়ে যুদ্ধ করে যাচ্ছে সুনীলও। ‘রাজল²ী’ গল্পে ভোলার লালমোহন উপজেলার লর্ড হার্ডিঞ্জ ইউনিয়নে হিন্দু বসতিজুড়ে হিন্দুরা আজ নেই বললেই চলে। অন্তঃসত্ত্বা রাজল²ী ও শাশুড়ি সুমিতাবালা দাশ গণধর্ষণের শিকার হয়েছিল নির্বাচনের পরদিন রাতে। পুলিশ মামলা নিতে বাধ্য হলেও শেষ পর্যন্ত মামলাটি কেঁচে যায়। বাড়িটার লাল গেটে এখনো বাগানবিলাসের উজ্জ্বলতা দূর থেকে চোখে পড়ে। তবে আকাশে যখন সন্ধ্যাতারাটি জ্বলজ্বল করে জ্বলে ওঠে তখন রাজল²ীর কোমল দুটি হাত আর তুলসীতলায় প্রদীপটি জ্বলে না। সে গাছটিও আর নেই। তবে ওদের স্মৃতি রক্ষার্থে নতুন মালিক গাঁদা গাছগুলো রেখে দিয়েছে। তিনি এখনো চান, ওরা ফিরে আসুক। কিন্তু কী করে আসবে? মেয়ের বিয়ে দিতে হবে না রাজল²ীকে? ‘মাটি’ গল্পে সুবীর গেছে বিশাল কগনিজেন্ট কোম্পানিতে কর্মরত মামাতো বোন স্নিগ্ধার সঙ্গে দেখা করতে। বোনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা সুবীরের বড় মামাকে মনে পড়ে। বাংলাদেশে পিডব্লিউডিতে বড় চাকরিই করতেন মামা। কিন্তু দেশ ছাড়তে হয়েছিল।

স্নিগ্ধার সঙ্গে দুপুরের লাঞ্চ, গল্প, গল্প। ভারি সুন্দর ক্যাম্পাস, ক্যান্টিন, স্নিগ্ধার উজ্জ্বল উপস্থিতি। বিদায়বেলায় বোনকে বলা হলো, ভালো থাকিস। পেছনে ফেলে আসা দিনগুলো বুকের মধ্যে তোলপাড় করলেও সেসব কথা মুখে আনেনি কেউ। যাই-যাব করে করেও যাদের যাওয়া হয়নি তাদেরই একজনকে নিয়ে লেখা নাম গল্পটির ‘তখনও যায়নি ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ’। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হিমাংশু সরকারের বদান্যতায় ভিটেবাড়ি ফিরে পেয়েছে। চাকরিও পেয়েছে তবে চাকরি চলে গেছে। পেনশনটা পাচ্ছে। জমি-জিরেত গেছে অনেক, আছে সামান্য। টাকা জমাচ্ছে। খুকুর বিয়ে দিতে হবে। ঠাকুরদার আমলের ঘর। ঝাঁজরা টিনের চালটার ফুটো সারাইতে আর কাজ হয় না। বৃষ্টি হলে রাতভর জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকতে হয়। যাওয়ার চিন্তা মনে আসে। জমিজমা নিজেদের ভোগদখলে আর কোথায়? তবু মায়া। চলছে নির্বাচন। খবর আসে কার গোয়ালের গরু গেল ভোজ উৎসবে। কার মিষ্টির দোকান উজাড় হলো। এমনকি সোনার দোকানও লুট হয়ে গেছে। থানা মামলা নেয় না। আসে রাতজাগা আতঙ্ক। নীরব নিথর নিস্তব্ধ হয়ে যায় গ্রাম। নিজেদের ঘরকে গুহা মনে হয়। গুহায় ঘুমাতে যায় সবাই। দেশ ছেড়ে যাওয়ার কথা এখনো এরা ভাবছে না। আপাতত এইটুকু। ঝরা বকুলের মতো ১৭টি ছোটগল্পের বই এটি। চিরকিশোর মনের সজীবতা নিয়ে লেখা প্রতিটি গল্প। কিন্তু সব পথ এসে যেখানে মেলে সেখানে শিকড় ওপড়ানো বৃক্ষের দুঃখটা খুব বাজে। আকমল হোসেন নিপুর ফ্ল্যাপে গল্পগুলো প্রসঙ্গে লেখা সুন্দর এবং যথার্থ। অমর একুশে বইমেলা ২০২০ উপলক্ষে লেখা এ বইটির প্রকাশক, কোরাস, চৌমোহনা, মৌলভীবাজার। প্রচ্ছদ রুদ্র ভাস্কর। মূল্য : ১৫০ টাকা।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App