×
Icon এইমাত্র
কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কোটা আন্দোলনকারীরা বাংলাদেশ টেলিভিশনের মূল ভবনে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ। কোটা সংস্কার আন্দোলনে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ১৯ জন নিহত কোটা ইস্যুতে আপিল বিভাগে শুনানি রবিবার: চেম্বার আদালতের আদেশ ছাত্রলীগের ওয়েবসাইট হ্যাক ‘লাশ-রক্ত মাড়িয়ে’ সংলাপে বসতে রাজি নন আন্দোলনকারীরা

সাময়িকী

জোবায়ের মিলন

জলপাই রঙা দিন : জীবনঘানি কিংবা উদয়বীণার আওয়াজ

Icon

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

জলপাই রঙা দিন : জীবনঘানি কিংবা উদয়বীণার আওয়াজ

অনিলা, ‘ডাক্তারি বাদ দিয়ে কি ইদানীং কবিতার চর্চা করছ নাকি?’ অজয় অনিলার চোখের দিকে বিমুগ্ধভাবে তাকিয়ে বলল, ‘করতে পারলে ভালো হতো। অন্তত এমন সকালগুলো প্রতিদিন দেখতে পেতাম। কমলা রঙের রোদের সঙ্গে কমলা রঙের শাড়ি কীভাবে কুয়াশা সকালে মিলেমিশে একাকার হয়, কপালের টিপ লাল অরুণ হয়ে ওঠে; কিংবা সদ্য ¯œান সেরে আসা পিঠময় ছড়ানো কড়ির মতো আঙুলের ভাঁজ, সেখানে কুয়োর মতো গহিন নাভিতে আটকে পড়া রোদ দেখতে পেতাম। যদি কবি হয়ে ওঠার এমন সুযোগ ঘটত, তাহলে হার্টের করোনারি আর্টারিতে কী থাকে অথবা নাইট্রোগিøসারিন ট্যাবলেট কী কাজে লাগে- এসব রোগীদের না বুঝিয়ে তোর জন্য অপেক্ষা করে বা তোর হাত ধরে এক জনম পার করে দিতাম...’।

এখানেই হোঁচটটি। ঔপন্যাসিক বাঁক নির্মাণের চতুর খেলা খেলে দিয়েছেন উপন্যাসটির ফ্ল্যাপে। উপর্যুক্ত বাক্যগুলো পড়ে কে না বলবে এটি একটি নিখাঁদ প্রেমের উপন্যাস না?

কিন্তু যখন মূল টেক্সট পড়তে শুরু করি, তখন আমাদের সামনে উপস্থিত হয় অন্য আরেক জলধি- ‘এখানে মাকুর খটখট শব্দে শিশুর ঘুম ভাঙে। বয়স্করা সূর্য ওঠার আগেই জেগে যায়। কর্মচাঞ্চল্য শুরু হয়ে যায় ছায়া অন্ধকার থাকতে থাকতে। ঘরে ঘরে কলরবও তত বাড়তে থাকে। আবার রাত ৮টা বাজলে গ্রাম নিস্তব্ধপুরী। নিশুতি রাত তাঁতী বউদের চোখে আনে প্রগাঢ় ঘুম আর শক্ত জোয়ান পুরুষদের চোখে আনে নতুন দিনের স্বপ্ন। শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা, চাদর বাজারে কেমন বিক্রি হবে, সংসারে কেমন অর্থকড়ি আসবে...।’ স্বপ্নঘুমে তারা দেখে দক্ষিণদুয়ারি ঘর; কুমারখালির গঞ্জে বিক্রির পাইকারি মোকাম, বাড়িতে একশ পাওয়ারলুম তাঁত মেশিন, দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন এসে ভিড় করছে, পাইকারি রেটে কিনে নিচ্ছে তাঁতপণ্য। আরো ভেতরে হাঁটতে থাকলে দেখতে পাই, যখন এ দেশে তাঁতশিল্পের পতন প্রায় সূচিত হয়ে আছে, তখন সে শিল্পের এক দরিদ্রক্লিষ্ট জনপদ; যেখানে চূড়া থেকে পড়তে পড়তে খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে একদল মানুষ স্বপ্ন দেখছে তাদের অতীত দিন ফিরিয়ে আনার। তাদেরই উত্তর প্রজন্ম আবার মাকুর খটখট শব্দে স্বপ্ন দেখছে দিন বদলের।

অনাবৃত শ্রম, ত্যাগ কাঁধে নিয়ে উঠতে উঠতে তারা সোজা হয়ে ওঠার প্রান্তর চেষ্টায় পূর্বসূরিদের অশিক্ষা, কুসংস্কার, পুরনোর অন্ধ-আঁধার মাড়িয়ে বদল করে নিচ্ছে তাদের ভবিষ্যৎ ভাবনা। দারিদ্র্যের কষাঘাত থেকে মুক্তির লক্ষ্যে তারা নির্মিত হচ্ছে অর্থনৈতিক, সামাজিক মুক্তির বিনির্মাাণে; যা কাহিনির মুনশিয়ানায়, ঔপন্যাসিকের কর্মদক্ষতায়, বলার বিচক্ষণতায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ‘জলপাই রঙা দিন’ উপন্যাসটিতে।

কাহিনিকে জীবন্ত করার প্রয়োজনে চরিত্ররা এখানে ধাপে ধাপে এসেছে মার্জিত অবয়ব নিয়ে। আবার কর্ম কৃত করে প্রস্থান নিয়েছে একই মার্জিনে। এসেছে জৈবজীবনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, বারোয়ারি জীবন, সমাজ, দ্বেষ-বিদ্বেষ, অনৈতিক তান্ত্রিকতা, পুরুষ, নারী। এসেছে পেশা, পরিবর্তন, অনবদ্য প্রেমের চিরন্তন আখ্যান-উপাদান, যাপনের আরো আবছায়া।

কিন্তু আসল ইঙ্গিত বাদ দিয়ে কোনো ইঙ্গিতই প্রধান হয়ে ওঠেনি; প্রধান বক্তব্যকে উজানী করতে ভূমিকা রেখেছে যে যার মতো। ফলশ্রæতিতে একটি জনপদের জীবনঘানি কিংবা উদয়বীণার আওয়াজ অপার আকৃষ্ট করে তুলেছে আমাদের । লেখকের বলার ভঙ্গি, এগিয়ে যাওয়ার মিউজিক, উপমা, প্রেক্ষিত-সম্পর্ক শিল্পাশ্রীত ও মনোগ্রাহী। তবে বারবার প্রেমাষ্পদ এসে তাঁত অধ্যুষিত জনপদের প্রকৃত চিত্রের অবয়ব আঁকতে কোনো বাধা তৈরি করল কিনা, তা প্রশ্ন রেখে বলা যায়, উপন্যাসটিতে অনুন্নত অঞ্চলের আগামীর চোখে ভাগ্যপীড়নের বিপরীতে আত্মউন্নয়নের চেষ্টায় শিক্ষার প্রদীপে প্রজ্জ্বল হয়ে ওঠার যে সংগ্রাম, তা নির্মেদ ফুটে ওঠায় উপন্যাসটিকে প্রকৃতই উপন্যাস বলে অবহিত করতে দ্বিধা হয় না। ঔপন্যাসিক ফজলুর রহমান এখানেই যেন স্বার্থক; ‘জলপাই রঙা দিন’ যেন পরিপাটি উপন্যাস।

জলপাই রঙা দিন (উপন্যাস)। লেখক : ফজলুর রহমান। প্রচ্ছদ : আইয়ুব আল আমিন। প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি-২০২৪ইং। প্রকাশনী : দুয়ার। মূল্য : ৫২০ টাকা।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App