×
Icon এইমাত্র
কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কোটা আন্দোলনকারীরা বাংলাদেশ টেলিভিশনের মূল ভবনে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ। কোটা সংস্কার আন্দোলনে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ১৯ জন নিহত কোটা ইস্যুতে আপিল বিভাগে শুনানি রবিবার: চেম্বার আদালতের আদেশ ছাত্রলীগের ওয়েবসাইট হ্যাক ‘লাশ-রক্ত মাড়িয়ে’ সংলাপে বসতে রাজি নন আন্দোলনকারীরা

সাময়িকী

নজরুলের কবিতার প্রাসঙ্গিক ভাবনা

Icon

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

নজরুলের কবিতার প্রাসঙ্গিক ভাবনা

মহৎ কবিতার একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য এই যে তার কিছুটা নাটকীয় গুণ থাকে। নাটকীয় গুণ এই অর্থে যেসব শ্রেষ্ঠ কবিতাই নিজস্ব জীবন-সম্পদে সমৃদ্ধ। সে কবিতা পাঠে পাঠক নিজেদের বিশ্বাস-অবিশ্বাস, ধ্যান-ধারণাকে সাময়িকভাবে হলেও পরিহার করে পঠিত কবিতার জীবন প্রবাহে আত্মসমর্পণ করেন। সঞ্চারশীল এই জীবন-সম্পদের অভাব কবিতার দুর্বলতা প্রমাণ করে। নজরুলের সব কবিতাতেই এই গুণটি স্পষ্ট, কখনো কখনো মাত্রাতিরিক্তভাবেই বর্তমান। পাঠককে টেনে নেয়ার, টেনে নিয়ে চালিত করার ক্ষমতা তার কবিতায় আছে এবং যথেষ্ট পরিমাণেই আছে। সে কবিতা পাঠে আমাদের পাঠকচিত্ত চঞ্চল হয়, চালিত হয়।

নজরুলের কবিতার এই নাটকীয় গুণটি কবির জীবন থেকেই এসেছে। সংঘাত হচ্ছে নাটকের প্রাণ। এই সংঘাত ঘটে বিপরীত শক্তির মধ্যে- আলোর সঙ্গে অন্ধকারের, ভালোর সঙ্গে মন্দের, স্বার্থত্যাগের সঙ্গে স্বার্থপরতার। সমসাময়িক সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নজরুলের কাব্যসাধনা এই সংঘাতেরই প্রতীক। ভীরুতা ছিল যে সমাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য সেখানে তিনি শক্তি সাধনা করেছিলেন। স্বার্থচেতনা ছিল যে মানসিকতার প্রধান লক্ষণ তাকে তিনি বৃহতের মধ্যে নিজেকে ব্যাপ্ত করার প্রেরণায় উদ্দীপ্ত করেছিলেন। সৃষ্টি যেখানে বৈশিষ্ট্যহীন গতানুগতিকতার নিজের সার্থকতা খুঁজত সেখানে স্পর্ধিত ব্যক্তিত্বের দুর্জয় ঘোষণা তিনি জানিয়েছিলেন। উপকথার কদাকার দৈত্যের মতো অত্যাচারী ক্ষমতার যে বোঝা উপমহাদেশের নিরীহ প্রাণকে অতিষ্ঠ করেছিল তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কণ্ঠকে তিনি স্বরগ্রামের শেষ সীমা পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলেন। প্রবলের বিরুদ্ধে দুর্বলের পক্ষে তার যে সমর্থন তাও প্রচণ্ড। অর্থাৎ সর্বত্র তিনি নাটকের নায়ক- তিনি দ্ব›েদ্বর নেতা। আর এই দ্ব›দ্ব থেকেই তার কবিতার নাটকীয় গুণটি সরাসরি এসেছে।

দ্ব›েদ্ব যিনি এক পক্ষের নায়ক, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সংগ্রামে তার শক্তির প্রয়োজন। এই প্রয়োজনে নজরুল শক্তির একনিষ্ট সাধক ছিলেন। শক্তির জন্য সাধনাই তাকে সমগ্র জীবন প্রণালিতে উচ্চারিত, উচ্চকিত এই শক্তি-সাধনা কাব্যকে গতিবান করেছে, ঠিক যেমনভাবে গদ্য রচনাকে করেছে নাটকীয়। অর্থাৎ কবিতার সঙ্গে শক্তি-সাধনার মিল ঘটেছে, কেননা কবিতাকে শক্তিমন্ত কথার প্রকাশ-মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যেমন সম্ভব, গদ্যকে তেমন করা সম্ভব নয়। এ হয়তো তাকে কিছুটা আবিষ্টও করেছিল এবং সেজন্যই বুঝি বা তিনি দার্শনিকতার অসামান্য গভীরতায় পৌঁছতে পারেননি। তার কাব্যধারায় কোনো সুস্পষ্ট বিকাশ নেই কোনো নির্দিষ্ট পরিণতির দিকে কবি এগিয়ে যাননি বলে যে অভিযোগ উঠেছে তারও মূল রয়েছে এখানে।

শক্তির সাধনা করতে গিয়ে মাঝে মাঝে আপাত স্ববিরোধিতারও তিনি প্রশ্রয় দিয়েছেন। পুনর্জাগ্রত ইসলামের শক্তিমন্ত রূপের কল্পনা করেছেন কখনো কখনো, আবার কালী মূর্তিতে শক্তির প্রকাশ দেখে তারও বন্দনা গেয়েছেন, এবং শেষ বয়সে আধ্যাত্মিক শক্তিরও আরাধনা করেছেন। কিন্তু সব অবস্থাতেই ভীরুতার দৈন্য-পীড়িত ও হীনম্মন্যতার বিকারে আড়ষ্ট দেশে শক্তির উদ্বোধন তিনি কামনা করেছেন। তার সব আপাত স্ববিরোধিতার ভেতরই শক্তির জন্য সঞ্চারশীল আকুতি অনুরণিত হয়েছে। এবং তার স্ববিরোধিতার কারণও স্পষ্ট।

এই কামনা ও আকুতিটা সামান্য নয়। জীবন প্রবাহ যেখানে গতানুগতিকতার ধারায় নেমে এসেছে সেখানে বন্ধনহীন দুরন্ত যৌবনের মুক্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে সামান্য কথা বলতে পারি না। এইখানে নজরুল বিদ্রোহী। তার এ বিদ্রোহ অত্যাচার অনাচারের বিরুদ্ধে যেমন প্রচণ্ড, রুচির বিরুদ্ধেও তেমনি। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ চিরকাল মানুষের রুচির প্রচলিত ধারাটি পাল্টে দেয়ার সংকল্প নিয়েই আবির্ভূত হয়েছেন। সেই ধারায় কতটা পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছেন তার পরিমাণই বুঝি তাদের মাহাত্ম্য বিচারের নির্ভরতম মাপকাঠি। নজরুলও তেমনি সমকালীন রুচির চেহারায় পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলেন। বৃহত্তর পটভূমিতে বিচার করলে মনে হতে পারে ভীরুতার ছোঁয়ালেগে-বিবর্ণ রুচি পাল্টাবার প্রয়াসে তিনি একক ছিলেন না; যুগ-মানসও সে-প্রচেষ্টায় উত্তেজিত হয়েছিল। তবু সাহিত্যের পরিধিতে তার সাধনা নিঃসন্দেহে অনন্য সাধারণ। তার সমসাময়িক সাহিত্যকর্মীদের অনেকেই সাহিত্যিক বিদ্রোহের নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। রবীন্দ্র-প্রভাবকে অতিক্রম করে যাওয়া বা নৈতিকতাবোধের প্রচলিত মানদণ্ডটি ভেঙে দেয়ার কথা তাদের সাহিত্যকর্মে অহরহ উচ্চারিত থাকত। চেষ্টা করে বোহেমিয়ান সাজার সদিচ্ছাও ছিল। নজরুলের সঙ্গে এদের তফাৎটা শুধু পরিমাণগত নয়, মূলগতও বটে। তার বিদ্রোহ সাহিত্যিক বিদ্রোহ বা মানসিক বিলাস মাত্র নয়, এ বিদ্রোহ একটা জীবন-প্রণালিরই নাম। তাই বুদ্ধদেব বসু বা মোহিতলাল মজুমদারের মতো নির্বন্ধন জীবন যাপনের জন্য বুদ্ধিগ্রাহ্য আকাক্সক্ষা জানিয়েই তিনি ক্ষান্ত থাকেননি, জীবন এবং সাহিত্য উভয়কে একাকার করে বিদ্রোহী হয়েছেন। শুধু সাহিত্যিক চিন্তাতেই যে এই বিদ্রোহের ভঙ্গিটি আবদ্ধ থেকেছে তা নয়, প্রকাশ-রূপেও তার চঞ্চল ও বিচিত্র ছাপ সব সময়েই ভাস্বর হয়ে রয়েছে। এক কথায় বোহেমিয়ান সেজে তিনি বিদ্রোহী নন, বিদ্রোহী বলেই বোহেমিয়ান।

কবিতার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে একজন প্রসিদ্ধ ইংরেজ কবি বলেছেন, কবিতা হবে সহজ, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও আবেগপ্রধান। এই সংজ্ঞা সম্পর্কে বিতর্কের হয়তো বা অবকাশ আছে, কিন্তু যে-কবির এটা উক্তি তার কবিতার চরিত্র সম্পর্ক এর চাইতে যথার্থ বর্ণনা বুঝি আর হয় না। কবিতা সম্পর্কে উক্ত কবির এই ধারণার উৎপত্তি তার বিদ্রোহী মানসিকতার গভীরে। সপ্তদশ শতাব্দীর ইংল্যান্ডে গৃহযুদ্ধের রূপ নিয়ে যে বিদ্রোহের ঝড় রয়ে গিয়েছিল তিনি ছিলেন তারই চারণ; ইংরেজি সাহিত্যে তিনি অতি উচ্চকণ্ঠ বিদ্রোহী কবি। সমস্ত অত্যাচারী শক্তি, সে রাজারই হোক কি পুরোহিতেরই হোক, তার অকৃত্রিম ঘৃণা কুড়িয়েছে। তার সম্পর্কে বলা হয়েছে যে বারো ঘণ্টা যদি তিনি সমাজ সম্বন্ধে চিন্তা করতেন তবে কবিতা সম্বন্ধে চিন্তা করতেন এক ঘণ্টা। আর এই মানসিকতার জন্যই কবিতাকে তিনি করতে চেয়েছিলেন সহজ, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও আবেগপ্রধান। নজরুলের পক্ষে এই বিদ্রোহীর ক্ষমতা বা শক্তি লাভ করাটা নিশ্চয়ই সম্ভব ছিল না। প্রসঙ্গত বিদ্রোহের দুজন সাহিত্য পুরোধার কথা উল্লেখ করা চলে। এলিয়ট তার অননুকরণীয় ভঙ্গিতে শেলী ও দান্তের বিদ্রোহের তুলনা করেছেন। সমকালীন অন্যায়ের যে তীব্র নিন্দা দান্তে করেছেন তার সঙ্গে শেলীর রাজা ও পুরোহিতদের ঘৃণার তফাৎটা কোথায়, এ প্রশ্ন তুলে তিনি জবাবে বলেন যে, শেলীর উত্তেজনা যেহেতু মস্তিষ্কের কোষে সীমাবদ্ধ ছিল, অতএব তার বিদ্রোহী কবিতা মস্তিষ্কসৃষ্ট অগভীর ও অবাস্তব শব্দের সমষ্টি মাত্র, অন্যপক্ষে দান্তের অনুভূতিতে মিশ্রিত রয়েছে তার ব্যক্তি জীবনের সমস্ত বেদনা, সুস্পষ্ট দুঃখভোগ ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, সেজন্য তার বিদ্রোহ বাস্তবতার সৌন্দর্যে মণ্ডিত। অর্থাৎ শেলীর বিদ্রোহ বুদ্ধিজাত সিদ্ধান্তের ব্যাপার আর দান্তের বিদ্রোহ তার সমস্ত সত্তার আর্তি। এই সমালোচনার অন্তর্নিহিত মূলনীতিটি হলো এই যে, যে বিদ্রোহে কবির সমগ্র সত্তার অনুরণন প্রতিধ্বনিত, সে বিদ্রোহের আবেদন সমধিক। শেলী যেমন করে তার দীক্ষাগুরু গডউইনের সিদ্ধান্তনিচয়কে বুদ্ধি দ্বারা গ্রহণ করে বিদ্রোহের বদ্ধমুষ্ঠি উদ্যত করেছেন- নজরুলের বিদ্রোহ তেমনটি নয়; এই বিদ্রোহে বুদ্ধি ও অনুভূতি একাকার হয়ে মিশেছে, উভয়ের সংমিশ্রণেই এর উদ্ভব। অপরপক্ষে দান্তের দার্শনিক গভীরতা তার কাছে আমরা নিশ্চয়ই প্রত্যাশা করব না। নজরুলের অগভীরতার একটা কারণ দান্তে যেমন করে সেন্ট টমাস একইনাসের দার্শনিক পটভূমিকার ওপর নিজের ভিত্তি রচনা করেছিলেন নজরুলের দার্শনিক পটভূমি তেমন সুস্পষ্ট ও সুদৃঢ় ছিল না।

কিন্তু বিদ্রোহের নিশান উড়াবার ব্যাপারে তার আন্তরিকতা ছিল নিñিদ্রই। আর সে কারণে ওই তিনটি বিশেষণ নজরুলের কবিতা সম্পর্কেও যথার্থভাবে প্রযোজ্য। কবিতাকে তিনি মৌনমুহূর্তের গুঞ্জন হিসেবে দেখেন না, জনগোষ্ঠীর মুক্তির একটি উপায় হিসেবে বিবেচনা করেন এবং ব্যাপক সামাজিক আবেদন সৃষ্টিকে লক্ষ্য হিসেবে জানেন, তার পক্ষে কবিতাকে সহজ না করে উপায় নেই। আবেদনকে অধিকতর সহজ ও লোকায়ত করার জন্যে তাকে আবার ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য করেও তুলতে হয়। উপমা, চিত্রকল্প, প্রাচীন ঘটনা ও চরিত্রের উল্লেখের মাধ্যমে নজরুল তার কবিতাকে সব সময়েই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতার গুণে বিশিষ্ট করে রেখেছেন। তার কল্পনার চেহারাটা সব সময়েই স্পষ্ট, তা কদাচিৎ অবিমূর্ত। আর বিদ্রোহীর পক্ষে আবেগে উদ্দীপ্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক।

শক্তিধর পুরুষ যিনি, যথার্থ শিক্ষায় যার চেতনা মার্জিত ও সংস্কৃত, আবেগ তার পক্ষে একটা বিরাট মূলধন। পূর্বে উল্লেখিত ইংরেজ কবি আবেগকে এই মূলধন হিসেবেই ব্যবহার করেছেন। বাংলা সাহিত্যে মাইকেল মধুসূদন দত্তের রচনাতেও এই মূলধনের যথাযোগ্য ব্যবহার লক্ষ্য করি। কিন্তু নজরুলে এর ব্যবহার ততটা সুচারু নয়। এর প্রথম কারণ তার ব্যক্তিগত মনীষার চরিত্র; দ্বিতীয় কারণ সুনিয়ন্ত্রিত শিক্ষার অভাব। এমনকি বিস্ময়কর প্রতিভাসম্পন্ন সাহিত্য স্রষ্টার পক্ষেও সুনিয়ন্ত্রিত শিক্ষার অভাবটা ক্ষতিকর। আবেগকে তা সুসংস্কৃত ও সুমার্জিত হতে দেয় না; কিছুটা অপরিশুদ্ধতা ও অগভীরতা প্রায় অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ায়। এ কথা চার্লস ডিকেন্স সম্পর্কে যেমন সত্য, নজরুল সম্পর্কেও তেমনি। যে মাটির ওপর তিনি দাঁড়িয়েছিলেন সে মাটি অভিজ্ঞতা দিয়ে গঠিত হয়েছিল সন্দেহ নেই; কিন্তু দৃঢ়তার অভাব ছিল তার দাঁড়ানোতে।

সহজ, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও আবেগপ্রধান কবিতা রচনা করে নজরুল আদি কবিদের সামাজিক দায়িত্বই পালন করেছেন। আদি মানুষের যুথবদ্ধ সমষ্টি-অনুভূতি থেকেই কবিতার জন্ম। শত্রæর বিরুদ্ধে সংগ্রামে, খাদ্যের সম্ভাবনায় বৃষ্টি বা ভূমিকম্পের আশঙ্কায় সমবেত ভাবে তারা যে গান গেয়েছে তা হতো একই সঙ্গে সহজ, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও আবেগপ্রধান। কবি হিসেবে নজরুলের ভূমিকা আদিকালের কবিদের সামাজিক ভূমিকারই অনুরূপ। আধুনিক কবিতায় মনের সঙ্গে মনের কথোপকথনের যে ভঙ্গি বর্তমান, নজরুলের কবিতায় (গানের কথা এখানে উঠছে না) তা নেই। জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বা অমিয় চক্রবর্তী, সময়ের দিক থেকে এরা সকলেই নজরুলের সমসাময়িক ছিলেন; অথচ কবি-চরিত্রে নজরুল এদের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। ভাষাকে সযতœ প্রচেষ্টায় মার্জিত করা, মনোঃসমীক্ষণে উৎসাহ প্রদর্শন বা চেতনার অন্তর্লীন ধারা বিশ্লেষণ সম্পর্কে পরবর্তী কালের কবিতার কোনো লক্ষণও তার মধ্যে দেখি না। বক্তার মতো সহজ ও উদ্দীপনাময় ভাষায় তার কবি-কণ্ঠ উদ্দীপ্ত। উচ্ছল নদী প্রবাহের বিপুল স্রোতধারাকে নজরুল যে তার বহু কবিতায় চিত্রকল্প হিসেবে ব্যবহার করেছেন সেটা আকস্মিক ঘটনা নয়, নজরুলের কবি-জীবনের সঙ্গে নদীর স্রোতের সাদৃশ্য আছে। আরো স্পষ্ট করে বলতে হয়, তিনি পাহাড়ি নদীর মতো- উচ্ছলতা উদ্দামতা যার বেশি এবং গভীরতাটা সে-কারণেই কিছুটা কম।

কবি হিসেবে নজরুলের সঙ্গে শেলী-বায়রণের বিদ্রোহের তুলনা সচরাচর করা হয়ে থাকে। কিন্তু সুইনবর্ণের সঙ্গে তার বিদ্রোহী প্রকৃতিটির সাদৃশ্যটিই বোধ করি অধিক স্পষ্ট। সুইনবর্ণও ঝড়ের অশান্ত বিদ্রোহী শিশু ছিলেন। কবি হিসেবে সুইনবর্ণের মতোই নজরুলের চেতনাও পরিণতির পথে সুস্পষ্ট রেখা ধরে বিকশিত হয়নি। কিন্তু এই দুইজন কবির ভেতর বড় সাদৃশ্য যা তা এদের উভয়ের প্রকৃতিতে স্ববিরোধিতা। সুইনবর্ণ বিদ্রোহের অশান্ত হাত উত্তোলন করেছেন, আবার অন্যত্র তিনি বাত্যা-পরিশ্রান্ত নদীর মতো ঝিমিয়ে এসেছেন আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে। নজরুলেও তাই। খোদার আরশ ভেদ করে ওঠার অপরিসীম দম্ভোক্তি সহকারে যিনি আপনাকে ছাড়া অন্য কাউকে কুর্ণিশ জানাতে অস্বীকার করেছেন, তিনিই আবার ভক্তিনিষ্ঠ আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে সর্বশক্তিমানের প্রেম ও করুণা কামনা করেছেন। সব বিদ্রোহীর ভেতরই বুঝি এমন স্ববিরোধিতা থাকে। বায়রণ সম্পর্কে গ্যেটে বলেছেন, চিন্তা করতে গেলেই সে বিদ্রোহী শিশু হয়ে পড়তেন। শেলী তো আগাগোড়াই ছিলেন ঝড়ের মতো। অর্থাৎ কোমল-কঠিনের সংমিশ্রণে এই বিদ্রোহীরা গঠিত। এবং এ কথাও তো সত্য যে, শক্তিমান পুরুষের ভেতরের কোমলতাটাই সুস্থ; দুর্বলের কোমলতার নাম ভীরুতা। আর শক্তিমান যে সেই বেশি করে কোমল হতেও জানে; যে ফলটির ওপরের আবরণ শুষ্ক-কঠিন তার ভেতরের কোমলতাটা অধিকতর সুস্বাদু। কবিতা রচনার সময় সুইনবর্ণ অনেক ক্ষেত্রেই ছন্দের গতিতে উদ্বেলিত চিত্তে এগিয়ে চলতেন, শুরুর মতো সে কবিতা শেষও হতো আপনার নিয়মেই, ছন্দের গতি যখন থেমে আসতো তখনই। অর্থাৎ ছন্দের লঘু পাখায় ভর করে যাত্রা করতে কবি অনেক সময় অভ্যস্ত ছিলেন। নজরুলকেও অনেক সময় দেখি চলার আবেগেই এগিয়ে চলেছেন, আর থেমেছেন আবেগের ক্লান্তিতে। এজন্যই তার ছন্দের প্রবাহ আমাদের এত আকৃষ্ট করে, আমাদের পাঠকচিত্তকে চলার তালে তালে নিজের সঙ্গে টেনে নিয়ে যায়। সত্যেন দত্তের কবিতাতেও এই গুণটি আছে, কিন্তু নজরুল সত্যেন দত্ত থেকে পৃথক। পার্থক্য নজরুলের আবেগের গভীরতায় ও আন্তরিকতায়। প্রচলিতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ধ্বনি যারা তোলেন তাদের কণ্ঠে

বেদনার একটা সুর চিরকালই লক্ষ্য করা গেছে।

কালের সংজ্ঞায় বর্তমানের হলেও মনের দিক থেকে তারা বর্তমানের নন। সাধারণ্যে নিয়ম বলে যা প্রচলিত তারা তাকে গ্রহণ করতে পারেন না, সমর্থন তো নয়ই। আর ভবিষ্যৎকেও তারা সব সময় ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হিসেবে বিচার করতে সক্ষম হন না। তাদের অবস্থান বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যবর্তী স্থানে। এই অস্বস্তিকর অবস্থার বেদনাটা সব সময়েই তাদের কণ্ঠে ধ্বনি-প্রতিধ্বনির সৃষ্টি করে। নজরুলও সে নিয়মের ব্যতিক্রম নন। তার সব আক্ষেপ, সব অস্থিরতা, সব উচ্ছ¡সিত অতিকথন, সব বিদ্রোহের ভেতরই বেদনার সুর কখনো উচ্চারিত, কখনো বা অন্তর্লীন ধারায় প্রবহমান। কিন্তু সুখের কথা এই যে, জীবনের প্রচলিত রূপটিতে বিরক্তিকর অসম্পূর্ণতা তিনি দেখেছেন, বীভৎসতা হয়তো দেখেছেন তার চেয়েও বেশি, কিন্তু সমস্ত হতাশার ভেতরও জীবনের যে একটি অনির্বাণ গৌরব-শিখা আছে তাকে তিনি ভোলেননি। তা না করে তিনি যদি ক্রোধ ও দীর্ঘশ্বাসের সীমিত বন্ধনে আবদ্ধ থেকে একই চিন্তার কণ্ডুয়ন-সর্বস্ব হয়ে পড়তেন, এমনকি ম্যাথু আর্ণল্ডের মতো প্রতিভাবান ও প্রাজ্ঞ কবিও যাকে এড়াতে পারেননি, তাহলে সেটা নিশ্চয়ই ক্ষোভের কারণ হতো। অসম্পূর্ণ বর্তমান ও অসমর্থনীয় প্রচলিতের বিরুদ্ধে নজরুল যেমন বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন, জীবনের দুই কূলে পুঞ্জীভূত আবর্জনার স্তূপ দেখে যেমন বিক্ষুব্ধ হয়েছেন; আবার তেমনি সব অসুন্দরের ভেতরও আদর্শ সৌন্দর্যের চর্চায় তাকে নিবিষ্ট দেখেছি। কখনো প্রকৃতির সৌন্দর্য তাকে মোহিত করেছে আবার কখনো প্রিয়ার সৌন্দর্যের রহস্য উদ্ঘাটনে তিনি তন্ময় হয়েছেন। তার রচিত গানে সুন্দরের ধ্যান-বিমুগ্ধ কবির যে চেহারাটি ধরা পড়েছে তাও বিস্ময়কর। ষোড়শ শতাব্দীর ইংল্যান্ডের রেনেসাঁন্সের দিগন্ত-জয়ের বল্গাহীন বাসনা যেমন মার্লোর বেগশালী ব্ল্যাঙ্কভর্সের ভেতর দিয়ে উপচে পড়েছিল, নজরুলের কবিতার মধ্যেও সমকালীন অশান্ত মানসিকতা তেমনি টগবগ করে ফুটেছে। যে মার্লো প্রকাণ্ড শব্দের সংস্থাপনে দীর্ঘ লাইনে ব্ল্যাঙ্কভর্স রচনা করেছেন, সৌন্দর্যের বর্ণনায়, প্রেমিকের উক্তিতে তিনিই আবার অসাধারণ রকম আবেগ-উদ্দীপ্ত। এর পেছনে যে নিটোল সৌন্দর্যবোধ ও শক্তিমন্ত সুস্থ চেতনার ছাপ ছিল, নজরুলের কবিতাতেও তার নিদর্শন পাই। বিদ্রোহ ও প্রেম-উভয় ক্ষেত্রেই একটি স্বাস্থ্য-ধন্য মানুষের কণ্ঠস্বর ধ্বনিত।

ব্যদিতমুখ দারিদ্র্যের যে স্বস্তিহীন পরিবেশে নজরুলের জন্ম ও বিকাশ তাতে হতাশা ও হীনচেতনাই তার পক্ষে স্বাভাবিক ছিল। তার পরিবেশের আর পাঁচটি মানুষ জীবনের দুর্বিষহ বোঝার ভারে হতশ্বাস, হীনবীর্য। কবি হিসেবে পলাতক মনোবৃত্তির অধিকারী তিনি যদি হতেন সেটা বিস্ময়ের কারণ হতো না। কিন্তু প্রচণ্ড আশাবাদ ছিল তার কাব্য-চেতনার একটি প্রধান লক্ষণ। এই আশাবাদ সন্ত্রাসবাদীদের আশাবাদের সমধর্মী-প্রবালের মতো নিজেদের বিনষ্ট করে দ্বীপ গড়ার মধ্যে যারা জীবনের সার্থকতা দেখতেন, নিñিদ্র রাত্রির আত্মঘাতি তপস্যায় যারা নতুন প্রভাতের ছায়া দেখতেন, নজরুলের আশাও সে-প্রকৃতির। সেখানে ভবিষ্যতের চাইতেও বর্তমানটাই বেশি করে সত্য, কেননা বর্তমানই হচ্ছে ভবিষ্যতের ধারক। তাই ভবিষ্যতের জন্য তিনি ততটা ব্যগ্র ছিলেন না, যতটা ব্যস্ত ছিলেন বর্তমানকে নিয়ে। এই জন্যেই নিজের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী তিনি বর্তমানের কবি। যে-অর্থে মধুসূদন তার যুগের কবি ছিলেন, নজরুলও প্রায় সেই অর্থেই তার কালের কবি।

সব বিচারকার্যেই দৃষ্টির নিরাসক্তি ও নিরপেক্ষতার প্রয়োজন সর্বাগ্রে। শিল্প বিচারে এ প্রয়োজন অপরিহার্য। একটা আশঙ্কার কথাও হয়তো এখানে বলা চলে। আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই যেসব সাহিত্য প্রতিভার ভাগ্যে প্রচুর হাততালি জোটে, জীবিতকালে তাদের মূল্যায়নে অতিকথন ও অতিউচ্ছ¡াসের প্রাবল্য দেখি। আবার ঠিক সেই যুগটা পেরিয়ে গেলেই এর প্রতিক্রিয়াস্বরূপ হুজুগের বিপরীত ব্যাপারটাই ঘটে, অর্থাৎ ঠিক পরবর্তী যে যুগ সেটা ব্যস্ত থাকে সেই প্রতিভার ছিদ্রানুসন্ধানে। ভিক্টোরীয় যুগের সাহিত্যের উৎকর্ষ নিয়ে সমকালীন মানুষের উৎসাহের অন্ত ছিল না। সে যুগ কেটে গেলে ভিক্টোরীয় যুগের দোষানুসন্ধানটাই হয়ে দাঁড়ায় রেওয়াজ, আজ পর্যন্ত আমরা ভিক্টোরীয় যুগ মানে অগভীর ভাবাবেগ, এমন মত শুনতে অভ্যস্ত রয়েছি। সে যাই হোক, নজরুলের কাব্যবিচারের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাসক্তি ও নিরপেক্ষতা লাভের সময় এখনো আসেনি। তার কাব্যধারার সঙ্গে আমাদের চেতনার সম্পর্কটা এখনো ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের। সে ধারা থেকে এখনো আমরা এমন দূরত্বে দাঁড়িয়ে নেই যাতে করে বৃহত্তর বা সমগ্রতর পরিপ্রেক্ষিতে নজরুলের কাব্যবিচার সম্ভবপর হবে। কিন্তু এ কথা আমরা বলতে পারি যে, তার কবিতা আমাদের সহানুভূতিকে বিস্তৃত, চেতনাকে তীক্ষè এবং মনকে উদার করেছে। কবিতার মূল্যবিচারে এদের যদি কোনো মূল্য থাকে তবে নজরুলের কবিতা নিশ্চয়ই মূল্যবান। আমাদের রুচিগঠন এবং চেতনার বিকাশেও তার কবিতার ভূমিকা আছে।

বাংলা সাহিত্যের স্বতন্ত্র-চরিত্রে যারা আস্থাবান তাদের কাছে অন্য একটি দিক দিয়ে নজরুলের প্রতিভা মূল্যবান, কেননা প্রাচীন পুঁথি সাহিত্যে যে সাহিত্যরীতি প্রচলিত ছিল আধুনিক কালে নজরুলই প্রথম তাকে নতুন চিন্তার প্রকাশমাধ্যম হিসেবে সার্থকভাবে ব্যবহার করেন। মুসলিম ইতিহাস ও বিষয়াদি নিয়ে ইতোপূর্বে আয়তনে বৃহৎ কাব্য রচনার প্রয়াস হয়েছিল সত্য, কিন্তু সে সমস্ত কাব্যে নতুন কোনো বিশিষ্ট কাব্যরীতির সন্ধান মেলেনি। মুসলিম বিষয় ও চিন্তাকে কাব্যের উপজীব্য হিসেবে গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে শব্দ-চয়ন, উপমা ও রূপক ব্যবহারে তিনি যে বিশিষ্টতার পরিচয় দিয়েছেন তা সমৃদ্ধ পুঁথি সাহিত্যের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। পুঁথিতে কল্পনা-শক্তির যে-বলিষ্ঠতা আছে নজরুলে তার সার্থক পুনর্জন্মও লক্ষণীয়। এই সত্যটির পরিপ্রেক্ষিতে নজরুলকে বিচার করতে গেলে কবি হিসেবে তার প্রতিভা এবং বিদ্রোহী হিসেবে নতুন পথে চলার সাহস ও যোগ্যতাটি অত্যন্ত স্পষ্ট রেখায় ভাস্বর হয়ে ওঠে। শক্তিমান কবির সঙ্গে সাধারণ কবির একটা বড় তফাৎ এই সাহসে, আবির্ভাবকালে যাকে দুঃসাহস বলেও মনে হতে পারে। দুঃসাহসী উদ্যমে নিজের কর্মজগতে প্রচলিত মূল্যবোধের জায়গায় তিনি নতুন মূল্যবোধের প্রচলন করেছেন, অগুনতি অনুরাগী ও বহু অনুকারী রেখে গেছেন- এইখানেও তার কৃতিত্ব অসীম।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App