×
Icon এইমাত্র
কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কোটা আন্দোলনকারীরা বাংলাদেশ টেলিভিশনের মূল ভবনে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ। কোটা সংস্কার আন্দোলনে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ১৯ জন নিহত কোটা ইস্যুতে আপিল বিভাগে শুনানি রবিবার: চেম্বার আদালতের আদেশ ছাত্রলীগের ওয়েবসাইট হ্যাক ‘লাশ-রক্ত মাড়িয়ে’ সংলাপে বসতে রাজি নন আন্দোলনকারীরা

সাময়িকী

এ এফ এম মাহবুবর রহমান

নজরুলের বাঁশুরিয়া

Icon

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

নজরুলের বাঁশুরিয়া

‘বাবরী দোলানো ঝাকড়া চুলের মহান পুরুষ’, অধরে তাঁর মোহন বাঁশি- কাজী নজরুল ইসলামের অতি পরিচিত রূপ। বাঁশি তিনি বাজাতেন। বাঁশির টানেই তিনি ঘর ছেড়েছিলেন, ‘জন্মের ক্ষণপরে/ বাহিরিণু পথে গিরি-পর্বতে- ফিরি নাই আর ঘরে! /... জননীরে ভুলি যে পথে পলায় মৃগ-শিশু বাঁশি শুনি,/... সেই পথ ধরি পলাইনু আমি।’ পালিয়েছিলেন সেই বাঁশুরিয়ার সন্ধানে, ‘বন্ধু আমার!... তোমার বাঁশির উদাস কাঁদন/ শিথিল করে সকল বাঁধন,/ কাজ হলো তাই পথিক-সাধন- / খুঁজে ফেরা পথ-বঁধুরে/ ঘুরে ঘুরে দূরে দূরে।’ কে সেই বাঁশিওয়ালা? সেই পথই বা কি? তার উত্তর তিনি দিয়েছেন তার বাঁধনহারা উপন্যাসে, মাত্র একুশ বাইশ বছর বয়সে, ‘তাঁর বাঁশি আমি শুনেছি, তাই আমার এই অভিসারের যাত্রা!... কোথায় সে পথের বঁধু যার বাঁশি নিরন্তর বিশ্বমানবের মনের বনে এমন ঘর-ছাড়া ডাক ডাকছে?... এ পথ শাশ্বত সত্যের পথ, - বিশ্বমানবের জনম জনম ধরে চাওয়া পথ।’ এই বাঁশুরিয়া অদৃশ্য না পাওয়া অকল্পনীয় শক্তি; তার বাঁশি নিরন্তর বিশ্বমানবের মনের বনে এমন ঘর-ছাড়া ডাক ডাকছে- ‘অশেষের শেষ পেতে’ ‘অসীমের সীমা’ খুঁজতে (বাঁধনহারা উপন্যাসে নুরুল হুদার চিঠি)। সেই অসীমের পথে মানুষ হয় গৃহহারা উদাস; কবি লেখেন, ‘সেই অদেখা বন্ধু, যাঁর বাঁশির সুর আমায় দিশাহারা বাউল, পথহারা পথিক করে পথের পর পথ ঘুরিয়ে মারছে (হারা ছেলের চিঠি, ১৯২২)’। ‘পথে পথে বাজে তাহারি বাঁশি,/ সে সুরে নিখিল-মন উদাসী,/ দহে জাদুকরী বিধুর দহনে।’ এ বাঁশি ¯্রষ্টার বাঁশি। এ বাঁশি প্রকৃতপক্ষে সেই মাধ্যম, যা দিয়ে বিশ্বের সব কিছু নিয়ন্ত্রিত, আবেশ-তাড়িত। কবি নজরুলের অনেক কবিতা অনেক গানের বৈশিষ্ট্য এমন, সে কবিতা বা গান শুনে মনে হবে সে কবিতা কোনো মানুষের উদ্দেশে রচিত কিন্তু তার গভীরে সে গান ¯্রষ্টার উদ্দেশ্যে। মানব প্রেমের গহীনে বয়ে চলে ঈশ্বরপ্রেমের অনন্ত সলিল। কবির গান, ‘কে বিদেশি বন-উদাসী/ বাঁশের বাঁশি বাজাও বনে। / সুর-সোহাগে তন্দ্রা লাগে / কুসুম-বাগের গুল-বদনে। / ঝিমিয়ে আসে ভোমোরা-পাখা, / যুঁথির চোখে আবেশ মাখা, / কাতর ঘুমে চাঁদিমা রাকা’- সমগ্র প্রকৃতি এ বাঁশির তানে বিবশ। এ বাঁশি শুধু প্রকৃতিকেই কাতর করে না; দোলা দেয় মানব হিয়াতেও, ‘সহসা জাগি আধেক রাতে / শুনি সে বাঁশি বাজে হিয়াতে, / বাহু-শিথানে কেন কে জানে / কাঁদে গো প্রিয়া বাঁশির সনে।’ এ গানের মাঝে সেই শক্তির প্রচ্ছন্ন প্রকাশ যার বাঁশরির তানে সম্মোহিত নিখিল ভুবন- ফুলের বনে তন্দ্রা লাগে, ভোমরা পাখা ঝিমিয়ে আসে, ভোরের চাঁদিমা ¤øান। সে বাঁশি কবি শোনেন আপন হিয়ায়; অনুভব করেন, ‘কাঁদে নিরালা বনশিওয়ালা / তোরি উতলা বিরহী মনে।’ সেই অসীম ক্ষমতাধর বংশীওয়ালা কাঁদে নিরালা কবির বিরহী মনে- ¯্রষ্টাকে না পাওয়ার বেদনা সৃষ্টির অন্তরে। ওমর খৈয়ামের বিধাতা যেমন ‘বিরাট শিশু’- খেলে এ বিশ্ব লয়ে নিরজনে আনমনে; নজরুলের তেমন বংশীওয়ালা কাঁদে বিরহী মনে। ‘আকাশের প্যাঁটরাতে কে / এত সব খেলনা রেখে / খেলে ভাই আড়াল থেকে, /... নিশিদিন কানন গিরি / তাহারেই খুঁজে ফিরি, / বাঁশি তার আমায় ঘিরি / কেবলই যায় কেঁদে যায়।’ সেই বাঁশরির সংকেতে কখনো আবার ‘নীল ছাপিয়া এলো চাঁদের জোয়ার।/ সংকেত বাঁশরি বনে বনে বাজে / মনে মনে বাজে। / সাজিয়াছে ধরণী অভিসার-সাজে। / নাগরদোলায় দোলে সাগর পাথার।’ সেই বাঁশরির সংকেতে বিশ্ব নিখিলের সকল কিছুই আবিষ্ট। এ বাঁশরির লহরী কখনো তোলে তুফান, কবি চমকে ওঠেন। ¯্রষ্টার উদ্দেশে রবীন্দ্রনাথের যেমন গীতাঞ্জলি, ‘বজ্রে তোমার বাজে বাঁশি / সে কি সহজ গান। / সেই সুরেতে জাগব আমি / দাও মোরে সেই কান।’ নজরুলেরও প্রসারিত অঞ্জলি, ‘কে দুরন্ত বাজাও ঝড়ের ব্যাকুল বাঁশি। / আকাশ কাঁপে সে সুর শুনে সর্বনাশী \ / বন ঢেলে দেয় উজাড় করে / ফুলের মালা চরণ পরে, / নীল গগনে ছুটে আসে মেঘের রাশি \ / বিপুল ঢেউ-এর নাগর-দোলায় সাগর দুলে, / বান ডেকে যায় শীর্ণা নদীর কূলে কূলে।’ বিশ্ব জগতের সবই ঘটে সেই বাঁশরির লহরীতে। প্রচণ্ড সেই সত্ত্বার প্রলয়-উৎসবের অংশী হতে তিনি উদগ্রীব, ‘তোমার প্রলয় মহোৎসবে / বন্ধু ও গো, ডাকবে কবে? ভাঙবে আমার ঘরের বাঁধন / কাঁদন হাসি।’ চির আরাধ্য প্রিয়তম সেই মহা¯্রষ্টার উদ্দেশে কবির পূজা নিবেদন, ‘শত জনম আঁধারে আলোকে / তারকা-গ্রহে লোকে লোকে / প্রিয়তম! খুঁজিয়া ফিরেছি তোমারে \ /... ডেকেছে আমারে / তোমার বাঁশি, / যুগে যুগে তাই তীর্থ-পথিক / ফিরি উদাসী! /... তোমারি শুভ্র পূজার-পুষ্প / প্রিয়তম! ফুটিয়া ওঠে অশ্রæধারে \’ নিজেকে বিলীন করে দিতে চান বাঁশুরিয়ার চরণে, ‘মম প্রাণ-শতদল হোক প্রণামী-কমল / (ওগো) তব চরণে / আমার এ হৃদয় নাথ হোক তন্ময় / তোমারি স্মরণে \ /... মম দুঃখ-সুখে মম তৃষিত বুকে / তুমি বিরাজ, / মোর সকল কাজে বীণা-বেণু সম / নিশিদিন বাজো \/... আমি পাই যেন লয়, নাথ, তব সৃষ্টির / রূপে বরণে \’

কবি এক সময় উপলব্ধি করেন যে, নিজেই তিনি সেই বাঁশুরিয়ার বাঁশরি, ‘আমি ভগবানের হাতের বীণা’। তার সৃষ্টিকর্ম- সাহিত্য, সংগীত; কোনো কিছুই তার নিজের নয়, সবই সেই বাঁশুরিয়ার কৃতি; কবি তার হাতের বাঁশি মাত্র, যেমনি বাজান তেমনি বাজে। ‘নাচো যবে তুমি আমার বক্ষে, রুধির নাচিয়া ওঠে / সেই নাচ মোর কবিতায় গানে ছন্দ হইয়া ফোটে।’ রাজদ্রোহের অভিযোগে যখন তিনি অভিযুক্ত হন, তখনও কবির দৃপ্ত ঘোষণা, ‘আমি সেই চিরন্তন স্বয়ম-প্রকাশের বীণা, ... আমার হাতের বাঁশি কেড়ে নিলেই সে বাঁশির সুরের মৃত্যু হবে না; যে বাণী আমার কণ্ঠ দিয়ে নির্গত হয়েছে, তার জন্য দায়ী আমি নই। দোষ আমারও নয়, আমার বীণারও নয়; দোষ তার, যিনি আমার কণ্ঠে তার বীণা বাজান।’ ’বিদ্রোহী’ কবিতায় তার দাবি, ‘আমি শ্যামের হাতের বাঁশরি’। কবি-মানসে শ্যাম বা কৃষ্ণ হচ্ছেন সর্বশক্তিমান ঈশ্বর। ঈশ্বরের গুণবাচক নাম হচ্ছে শ্যাম বা কৃষ্ণ। এই শ্যাম ত্রিভুবন-সৃজনকারী, ‘মাধব বংশীধারী বনওয়ারী গোঠচারী /... পাপ-তারী, কাণ্ডারী/ ত্রিভুবন সৃজনকারী।’ শ্যাম ত্রিভুবন-পালক, ‘বংশী বাজাও ত বন-বন-চারী / ত্রিভুবন-পালক ভক্ত-ভিখারী’। কবির চেতনায় শ্যাম বা কৃষ্ণ হচ্ছেন ¯্রষ্টা, সমগ্র সৃষ্টিজগত হচ্ছে রাধা- ব্রহ্মাণ্ড রবি শশী গ্রহ তারা। শ্যাম চলেন বাঁশি বাজিয়ে, রাধা হয় উদাসী, ‘পথে পথে কে বাজিয়ে চলে বাঁশি, / হলো বিশ্ব-রাধা ঐ সুরে উদাসী\/ শুনে ঐ রাখালের বেণু / ছুটে আসে আলোক-ধেনু, /... আসে শ্যাম-পিয়ারী গোপ-ঝিয়ারি গ্রহ-তারার রাশি \’ এ বিশ্ব চরাচরে সেই বাঁশুরিয়ারই লীলা নিরন্তর। ‘আধেক বিন্দু রূপ তব দুলে / ধরায় সিন্ধু জল, / তব ছায়া বুকে ধরিয়া সুনীল, / হইল গগনতল। / তব বেণু শুনি, ওগো বাঁশুরিয়া, / প্রথম গাহিল কোকিল পাপিয়া, / হেরি কান্তার-বন-ভুবন ব্যাপিয়া / বিজড়িত তব নাম।’ কবির বিখ্যাত গান, ‘আমি যার নূপুরের ছন্দ, বেণুকার সুর / কে সেই সুন্দর কে? /... যার শিখি-পাখা লেখনি হয়ে / গোপনে মোরে কবিতা লেখায় / সে রহে কোথায় হায়!’ বংশী-বাদকের বেণুকার সুর কবি নিজেই, তিনি তার নূপুরের ছন্দও। বৈষ্ণব রীতিতে কৃষ্ণ হচ্ছেন বিশ্ববিধাতা। অবতার রূপে তার প্রতীকী আবির্ভাব। তার চরণে নূপুর, ললাটে শিখিপাখা (ময়ূর পুচ্ছ), হাতে মোহন বাঁশি। কবি সেই বিশ্ববিধাতার চরণের নূপুর, হাতের বাঁশরি। বৈষ্ণব পুরাণে তিনি লীলা করেন বৃন্দাবনে, ব্রজপুরে, যমুনার তীরে। তবু কবি প্রশ্ন করেন, ’সে রহে কোথায় হায়?’ কবি তাকে নিয়ে যান অসীমে, অনাদি কালে, ‘মম মনের ব্রজে কে কিশোর রাখাল / যেন বাজায় বাঁশি শুনি অনাদিকাল।’ কালের সীমা পেরিয়ে সে বাঁশি বাজে অনাদিকাল। কবির ভাবজগতে এই বংশীবাদক অনন্ত, অসীম। তিনি কীভাবে অবতার রূপে অবতীর্ণ হতে পারেন? বিস্ময়াভিভূত কবির কল্পনাবিহার, ‘মোর মন ছুটে যায় দ্বাপর যুগে / দূর দ্বারকায় বৃন্দাবনে।/... কেমন মানায় নরের রূপে / অনন্ত সেই নারায়ণে \’ তিনি অসীম অদেখা প্রেমময়, শুধু অনুভবসিদ্ধ। দৃষ্টির-অগম্য সেই বাঁশুরিয়াকে স্বচক্ষে দেখতেও তার সাধ হয়। লেখেন, ‘খোঁজে তোমায় চন্দ্র তপন / পূজে তোমায় বিশ্বভুবন / আমার যে নাথ ক্ষণিক জীবন / মিটবে কি সাধ ভালবেসে \ / না দেখা মোর বন্ধু ওগো / কোথায় তুমি / কোথায় বাঁশি বাজাও একা / প্রাণ বোঝে তা অনুভবে / নয়ন কেন পায় না দেখা।’ কখনো বা তাঁকে খুঁজে পান নিজেরই মাঝে, ‘এই দেহেরই রঙমহলায় / খেলিছেন লীলা-বিহারী। / মিথ্যা মায়া নয় এ কায়া / কায়ায় হেরি ছায়া তারি\ / রূপের রসিক রূপে রূপে / খেলে বেড়ায় চুপে চুপে, / মনের বনে বাজায় বাঁশি / মন-উদাসী বন-চারী \ / তার খেলা-ঘর তোর এ দেহ, / সে ত নহে অন্য কেহ।’ মানবের হিয়ার মাঝে নিত্য লীলা তার; ‘তার খেলা-ঘর তোর এ দেহ’। ‘আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন, খুঁজি তারে আমি আপনায়।’

বিদ্রোহীতে যেমন লেখেন (১৯২১) ‘আমি শ্যামের হাতের বাঁশরি’, জবানবন্দিতে যেমন বলেন, আমি ‘ভগবানের হাতের বীণা’ (১৯২৩) তেমনি যখন অনুযোগ ওঠে (১৯২৬) যে, তার কবিতায় আগের মতো সেই বীরত্বের ব্যঞ্জনা নেই তখন তিনি বলেন, ‘আমি যার হাতের বাঁশি, সে যদি আমায় না বাজায় তাতে আমার অভিযোগ করবার কিছুই নেই। কিন্তু আমি মনে করি, সত্য আমায় তেমন করেই বাজাচ্ছে, তার হাতের বাঁশি করে।’ সচেতন জীবনের সায়াহ্নে (১৯৪১) তিনি লেখেন, ‘আমার কবিতা আমার শক্তি নয়; ... বীণার বেণুতে সুর বাজে কিন্তু বাজান যে গুণী, সমস্ত প্রশংসা তারই।’ হৃদয়ের গহীনে যখন বিদায়ের পদধ্বনি শুনতে পান, তখন বলেন (১৯৪১), ‘যদি আর বাঁশি না বাজে : ... আমার চির জনমের প্রিয়া এই প্রেমময়ীর প্রেম যদি না পাই, তাহলে বুঝব আমার এবারের মতো খেলা ফুরাল। আমার বাঁশি বিরহ যমুনার তীরে ফেলে চলে যাব’।

কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় গানে কথায় নানাভাবে নানা চিত্রকল্পে অহরহ বেজেছে বাঁশি। আজীবন ঈশ্বরে বিশ্বাসী, সকল কর্মে সদা সর্বদা কবি ঈশ্বরের অস্তিত্বকে আপন মাঝে অনুভব করেছেন। ঈশ্বরের প্রভাব, ঈশ্বরের নিয়ন্ত্রণ, ঈশ্বরের উপস্থিতিকে বাঁশির সুরের রূপক আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন সহ¯্র বার। শেষ কথাটি বলে গেছেন, ‘যদি আর বাঁশি না বাজে- ... আমি আপনাদের ভালোবাসা পেয়েছিলাম সেই অধিকারে বলছি- আমায় ক্ষমা করবেন, আমায় ভুলে যাবেন।’

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App