×

সাময়িকী

লাল পশমি চাদর

Icon

মুহাম্মদ সারোয়ার হোসেন

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

লাল পশমি চাদর

নিতাই নদী! সীমান্ত নদী হিসেবে পুরো ধোবাউড়াকে আষ্টেপৃষ্ঠে ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছে। শেরপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনার উত্তরে গারো পাহাড় অঞ্চলটি নকরেক ও এর পূর্বের অঞ্চলটি চেরাপুঞ্জি নামে খ্যাত। উজানে নকরেক অঞ্চল থেকে নিতাই নামে নেমে আসা নদীটি বাংলাদেশেও একই নামে প্রবাহিত। নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী দুর্গাপুর উপজেলার সমান্তরাল এই ধোবাউড়ার মধ্য দিয়ে নেমে আসা নিতাই নদী মিলেছে পশ্চিমে শেরপুরের দিক থেকে পূর্বদিকে বয়ে চলা প্রবল নদী ভোগাই-কংস নদীর প্রবাহে। নিতাইয়ের দৈর্ঘ্য ৩৫ কিলোমিটার। নদীটি জোয়ার-ভাটার প্রভাবমুক্ত। খরস্রোতা নিতাই নদীর প্রবাহ সারা বছরই থাকে। জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত প্রবাহ কম থাকে।

খরস্রোতা নিতাই নদীর তীরে গড়ে উঠেছে ঘোষগাঁও বাজার। বাজার থেকে একটু দূরেই ঝিগাতলা গ্রাম। ভূঁইয়া বাড়ির মফিজ উদ্দিন ভূঁইয়ার বাসস্থান ঝিগাতলায়। তার আদি বাড়ি নান্দাইলে। হ্যাংলা-পাতলা গড়নের মাঝারি উচ্চতার মানুষটি জমি চাষ করে সংসার চালায়। ৫ ওয়াক্ত নামাজি, সদালাপী মফিজউদ্দিন ভূঁইয়ার ৪ ছেলে ১ মেয়ে। পাকভারত বিভাজনের পর বড় ভাইকে সঙ্গে নিয়ে নান্দাইল থেকে ঝিগাতলা গ্রামে চলে আসেন। মফিজ উদ্দিন ভূঁইয়ার পিতা ছানাউল্লাহ মুন্সী। ৬ ছেলে ও ১ কন্যা সন্তানের জনক ছানাউল্লাহ মুন্সী নান্দাইল ছেড়ে যেতে অপারগতা প্রকাশ করেন। ২ ছেলে ও ১ মেয়েকে নিয়ে নান্দাইলেই বসবাস করতে থাকেন। অপর ২ ছেলে সীমানা পেরিয়ে ভারতের আসামে গিয়ে বসবাস করা শুরু করেন এবং আর ফিরে আসেননি।

ছানাউল্লাহ মুন্সীর ছোট ছেলে মফিজ উদ্দিন ভূঁইয়া ছোটবেলা থেকেই ভীষণ পরিশ্রমী ও দুরন্ত সাহসী। ভালোভাবে বেঁচে থাকার তাগিদে সুলভ মূল্যে বেশি চাষের জমি পাবেন, এ আশায় চলে আসেন দুর্গম পাহাড়ি, সুবিধাবঞ্চিত সীমান্তবর্তী প্রত্যন্ত এলাকা ধোবাউড়ায়। তাদের গ্রামের অনেক পরিচিত মানুষও এই ধোবাউড়ায় চলে এসেছে। ফলে মফিজ উদ্দিন ভূঁইয়ার মনোকষ্ট থাকে না। ঘোষগাঁও বাজারের কাছাকাছি নিতাই নদীর তীর ঘেঁষে বাসস্থান তৈরি করেন। নিতাই নদীকে ভীষণ ভালোবাসেন মফিজ উদ্দিন। নদীর আঁকা-বাঁকা গতিপথ উত্থান-পত্তন, এককূল ভেঙে অন্যকূল গড়ে ওঠা, এসবই যেন তার জীবনেরই প্রতিচ্ছবি।

বড় ভাইয়ের সঙ্গে বসবাস করা শুরু করেন মফিজ উদ্দিন ভূইয়া। দুইটা টিনের ঘর, একটা গোয়ালঘর, একটা পাকের ঘর, ১টা বাংলা ঘর নিয়েই তাদের বসতি। পরিশ্রমী মফিজ উদ্দিন অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই বাড়িটিকে ছবির মতো সুন্দর করে গড়ে তোলেন। স্ত্রী সুক্কুরি বানুও খুব সংসারী ও পরিশ্রমী। তাই সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে খুব একটা খারাপ যাচ্ছিল না তাদের। নিতাই নদীর স্রোতের মতো সময় বয়ে যায়। বড় হয়ে ওঠে রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া। রফিক উদ্দিন কৃষিকাজে বাবাকে সহায়তা করতে চাইলেও মফিজ উদ্দিন বাধা দেন।

মফিজ উদ্দিন বলেন, বাবাজান তুমি বড় হইয়া মানুষের জন্য কাজ কইরো। মানুষের মতো মানুষ হইয়া দেশের সেবা কইরো। তুমি লেখাপড়া শেষ কইরা অনেক বড় মানুষ হও, এইডাই আমার চাওয়া।

একেতো দুর্গম এলাকা তার ওপর লেখাপড়ার সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত ধোবাউড়া। এখানে ভালোমানের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। তাই বিরিশিরি নলঝাড়া গ্রামের আ. আলীর বাড়িতে লজিং থেকে পড়াশোনা শুরু করে রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া। ঝিগাতলা থেকে দুর্গাপুরের বিরিশিরি মাত্র ১২-১৩ কিলোমিটার দূরে। দুর্গাপুরের বিরিশিরি পিসি মেমোরিয়াল হাইস্কুলে ভর্তি হয় সে। লজিং থাকার বিনিময়ে আ. আলীর ছোট ছেলেকে পড়াত রফিক উদ্দিন। পরিবার-পরিজন ছেড়ে নতুন জায়গায় একসময় মানিয়ে নেয় নিজেকে।

পিতা মফিজ উদ্দিন সব সময় বলতেন, লেখাপড়া শেষ করে মানুষের মতো মানুষ হতে হবে।

বাবার স্বপ্ন পূরণে মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করতে থাকে সে। বাবা মাঝে-মাঝেই এসে খোঁজ-খবর নিতেন ছেলের, নিয়ে আসতেন মায়ের হাতের নানা খাবার। মাসিক হাতখরচও দিয়ে যেতেন ছেলেকে। রফিক উদ্দিন অপেক্ষায় থাকত কখন বৃহস্পতিবার আসবে? প্রতি বৃহস্পতিবার সে বাড়ি আসত। যদিও আ. আলী সাহেব তাকে নিজের ছেলের মতই ভাবত। তাই আদর, যতœ-ভালোবাসার কোনো কমতি ছিল না নলঝাড়ায়। তার থাকা-খাওয়ায় কোনো সমস্যা যাতে না হয় সেদিকে সবসময় খেয়াল রাখতেন তিনি।

দুর্গাপুরে থেকেও তার মন পড়ে থাকত ঘোষগাঁওয়ের ঝিগাতলায়। ঘোষগাঁও বাজার, বাড়ির দক্ষিণের বিস্তীর্ণ ফসলি জমি, বাজারের পাশের সেই ভাঙা পুরনো মসজিদ, বাঁশঝাড়, সুপারি-নারকেল গাছ, লিচু গাছ, আর বাড়ির সামনের প্রকাণ্ড সেই আমগাছটা তাকে প্রতিনিয়ত টানে। বাড়ির পাশেই শত বছরের পুরনো কামাক্ষা মন্দির। মন্দিরের বুড়ো পুরোহিত মশাই তাকে খুব স্নেহ করত। তিনি কেমন আছেন? প্রতি পূজায় বন্ধুদের সঙ্গে প্রসাদ খাওয়ার স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে। কান পাতলেই শুনতে পায় সন্ধ্যায় মন্দিরে শঙ্খ আর মদিরা বাজছে। আচ্ছা মোয়াজ্জিন তোরাব আলী কাকা এখনো কি আজান দেন? তার সুমধুর আজানের ধ্বনি দূর দিগন্তে বাধা পেয়ে যখন কানে ফিরে আসত, মনে হতো এর চেয়ে ভালো লাগার আর কিছু হতে পারে না। ঘুঘু জোড়া কি বাচ্চা দিয়েছে? গেল বছর বড় আমগাছটার উঁচু ডালে বাসা বাঁধে ঘুঘু জোড়া।

কেমন আছে নিতাই নদী? টলমলে পরিষ্কার পানির নিচে রং-বেরঙের পাথর খুঁজতে ডুব দেয়া! আহা, কী মজা! কলা গাছের ভেলা বানিয়ে বীরদর্পে উজানে বয়ে যাওয়া। একটু এগিয়ে পূর্ব দিকের সেই বাঁকটা, যেখানটা পেরোলে মনে হতো এই বুঝি হারিয়ে গেলুম! আরও এগিয়ে গেলে নদীর পাড়ে জেলেদের মাছধরা! শফিক কেমন আছে? ডুব দিয়ে অনেকক্ষণ থাকতে পারত সে। ডুব দিয়ে অনেকক্ষণ হারিয়ে যাওয়ার পর সবাই যখন ভয়ে অস্থির, ঠিক তখনই ভুস করে ভেসে উঠত শফিক, হাতে থাকত রিডা মাছ! বাড়ির দক্ষিণে ছন গাছের ঝোপে হাঁসের ঝাঁক ডিম পাড়ত। সেই ডিম ভোরে কুড়িয়ে আনা। এ নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে সেকি মারামারি! রফিক উদ্দিনের ভাবনায় সবসময় উঁকি মারে ঝিগাতলা! কথা বলে নিতাই নদী!

হাইস্কুলে ছাত্রলীগ রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া। তাই রাজনীতির কিছু খবর ঠিকই কানে আসে। বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ ’৭০-এর নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দেশ বদলে দেবে আর সব বাঙালির মতো সেও মনে-প্রাণে তাই বিশ্বাস করত। কিন্তু ’৭০-এর নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে টালবাহানা করতে থাকে পাকি সামরিক জান্তা। প্রতিবাদে ফেটে পড়ে বাঙালি। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ সেনাশাসক ইয়াহিয়া খান অনির্দিষ্টকালের মতো জাতীয় অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন। প্রতিবাদে ময়মনসিংহের সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে রফিকউদ্দিন ভূঁইয়াও বিক্ষোভে ফেটে পড়েন।

মার্চের ৭ তারিখ। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পরদিন তৎকালীন নেত্রকোনা মহকুমার দুর্গাপুর থানাধীন ধোবাউড়ার লোকজনও স্বাধীনতার প্রশ্নে দৃঢ়চিত্ত হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ রেডিওতে শুনে রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া মনে মনে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। ফিরে আসে ঝিগাতলায়। বঙ্গবন্ধুর আদেশে অসহযোগ আন্দোলনে শামিল হয় ছাত্রলীগ নেতা রফিক উদ্দিন। ৯ মার্চ ১৯৭১ ধোবাউড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি সৈয়দ আহাম্মদ, ডা. নূর মোহাম্মদ বিশ্বাস, আবুল কাশেম ফকির, আ. ওয়াহাব, আ. লতিফ, ছাত্রনেতা মোজাম্মেল হোছাইন প্রমুখের নেতৃত্বে মুক্তিকামী জনতা তৎকালীন ঝিকুয়া বাজারে (ধোবাউড়া উপজেলা সদর) বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। এ ঘটনায় তৎকালীন ঘোষগাঁও ইপিআর ক্যাম্পে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে গ্রেফতারের নির্দেশ আসে। অসহযোগ আন্দোলনের অংশ হিসেবে অফিস-আদালত, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় আপামর জনতা বঙ্গবন্ধুর ডাকে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদে অংশগ্রহণ করেন।

২৫ মার্চ গণহত্যার পর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। রাজনৈতিক ও ছাত্র নেতৃবৃন্দের উদ্যোগে মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুট শুরু হয়। অনেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতের বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধা অভ্যর্থনা শরণার্থী ক্যাম্পে গিয়ে ওঠে। ১১ মে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় যোগদানের উদ্দেশ্যে গোয়াতলা বাজারে ১১০ জন মুক্তিযোদ্ধা একত্রিত হয়। তাদেরকে সক্রিয় সহযোগিতা করেন আবুল কাশেম ফকির ও আ. লতিফ।

ঝিগাতলা গ্রামে বসে বন্ধুদের সঙ্গে পরামর্শ করে। মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয় রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া। মার্চের উত্তাল সময়ে মা সুক্কুরি বানু তার অন্য সন্তানদের নিয়ে বাবার বাড়ি নান্দাইল চলে যান। শুধু বড় ছেলে রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া আর স্বামী মফিজ উদ্দিন ভূঁইয়া থেকে যান ঝিগাতলায়। যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার পর বাড়ি-ঘর দেখাশোনার জন্য তারা অন্য কোথাও যায় না। ঝিগাতলায় থেকেই দেশের সামগ্রিক অবস্থার খোঁজ-খবর নিতে থাকে রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া।

যদিও তৎকালীন সময়ে ঝিকুয়া ছিল একটি ইউনিয়ন বাজার (বর্তমান উপজেলা সদর) তথাপি এটি ছিল অবহেলিত, পশ্চাৎপদ ও সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত অঞ্চল। সীমান্তবর্তী অঞ্চল হওয়ায় অত্র এলাকাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাজধানী ঢাকা থেকে দূরবর্তী এবং দুর্গম অঞ্চল হওয়ায় মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ধোবাউড়া ছিল মুক্তাঞ্চল। তারপরই পাকবাহিনী মেজর সুলতানের নেতৃত্বে ধোবাউড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করে।

মেজর সুলতান অত্যাচারী ও হিংস্র প্রকৃতির মানুষ। হত্যা, বাড়িঘরে আগুন দেয়া কিংবা পাশবিক নারী নির্যাতন এসব কিছু তার কাছে ডাল-ভাত। মেজর সুলতান এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। এলাকার মানুষ তার ভয়ে বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়।

মফিজ উদ্দিন ভূঁইয়া রফিক উদ্দিনকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য উদ্ধুদ্ধ করেন। স্বাধীনতার পক্ষে যুদ্ধ করার জন্য ছেলেকে অনুপ্রাণিত করে বলেন, বাজান, দেশ স্বাধীন করতেই হইব। যেভাবেই হোক দেশ স্বাধীন কইরা তারপর দেশে ফিরবা। স্বাধীন দেশ ছাড়া থাকা যাইব না। তুমি মুক্তিযুদ্ধে গিয়া দেশ স্বাধীন করো। আমি আল্লাহর হাতে তোমারে দিয়া দিলাম।

রফিক উদ্দিন ১৫-২০ জনের একটি দল (সবাই ছাত্রলীগ কর্মী) নিয়ে জুন মাসের প্রথম দিকে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়। ট্রেনিংয়ের জন্য তারা ভারতের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। মফিজ উদ্দিন ভূঁইয়াও ছেলের সঙ্গে রওনা হন। উদ্দেশ্য ছেলেকে সীমান্ত পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসবেন। যাত্রাপথে শিববাড়ির সীমান্তবর্তী ডেলুনিয়া গ্রামের ক্ষিতীস পোস্টমাস্টারের বাড়িতে পৌঁছান। দেশপ্রেমী ক্ষিতীস পোস্টমাস্টার তাদের সাদরে গ্রহণ করেন। মফিজ উদ্দিন তাদেরকে রেখে ঝিগাতলায় ফিরে আসেন। এখানে ৩-৪ দিন অবস্থানের পর স্থানীয় এমএনএ কুদ্দুসওল্লাহ সাহেবের সহযোগিতা ও পরামর্শে মেঘালয়ের তুরায় ট্রেনিংয়ের জন্য চলে যায় রফিক উদ্দিন ও তার দল।

ঝিগাতলার বাড়িতে একাকী হয়ে পড়েন মফিজ উদ্দিন। বড় ভাইকে নিয়ে উৎকণ্ঠায় দিন পার করতে থাকেন। একদিকে বড় ছেলে অন্যদিকে নান্দাইলে পুরো পরিবার! ধোবাউড়া অস্থায়ী ক্যাম্প থেকে পাকবাহিনী একে একে ঘোষগাঁও ইউনিয়নের ঝিগাতলা, গামারীতলার রণসিংহপুরে ক্যাম্প স্থাপন করে। একই সঙ্গে অমানবিক ও নির্মম গণহত্যা চালাতে থাকে। অধিকাংশ সময় এ দেশীয় দোসররা তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসে। দালালরা স্থানীয় রাস্তাঘাট-বাড়িঘর চিনিয়ে দিয়ে গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠন ও নারী নির্যাতনে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।

ঘোষগাঁও ডাকবাংলার চৌকিদার ওমর আলী। পাকিস্তানি হানাদারদের বিভিন্ন ফরমায়েশ পালন করেন। মৃত্যুভয়ে রাজাকার বাহিনীদের অন্যায় আবদারও রক্ষা করেন তিনি। মাঝারি গড়নের ওমর আলীর এভাবে আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন হানাদারদের। কিন্তু এলাকাবাসী ঠিকই জানত ওমর আলীর দেশপ্রেমের কথা। তাই কিছুসংখ্যক ঝিগাতলাবাসী নিজ বাসস্থান ছেড়ে ঘোষগাঁওয়ে ওমর আলীর বাড়িতে উঠেন। তারা ভাবত ওমর আলীর বাড়িতে উঠলে হানাদার বাহিনী আসবে না। মফিজ উদ্দিন এবং তার ভাইও সেখানে গিয়ে উঠেন।

আগস্টের প্রথম দিকে পাকিস্তানি আর্মিরা টহলরত অবস্থায় মফিজ উদ্দিন ভূঁইয়ার বড় ভাইকে ধরে নিয়ে যায়। তিনি বড় ভাইকে খুঁজতে থাকেন বিভিন্ন জায়গায়। কিন্তু কোথাও তার কোনো হদিস পাওয়া যায় না। ভাইকে হারানো শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন তিনি। বিভিন্ন ক্যাম্পে লোক দিয়ে খোঁজও নেন। ভাইয়ের খোঁজ পাওয়া যায় না। ভাবেন হয়তো পাক আর্মি ছেড়ে দিয়েছে তারপর ভয়ে নান্দাইলে চলে গিয়েছেন। পরক্ষণেই ভাবেন তাকে একা ফেলে বড় ভাই কখনো নান্দাইল চলে যেতে পারেন না। এরই মধ্যে খবর পান বড় ছেলে ভারতে ট্রেনিং সমাপ্ত করে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করা শুরু করেছে। ছেলে বীরদর্পে রণাঙ্গন কাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে, গর্বে তার বুকটা ভরে ওঠে। আশায় থাকেন ছেলে দেশ স্বাধীন করে অচিরেই বাড়ি ফিরে আসবে।

রফিক উদ্দিন বাড়িতে নেই- এ খবর একসময় পৌঁছে যায় রাজাকার বাহিনীর কাছে। প্রথম দিকে মফিজ উদ্দিন বলে বেড়াত ছেলে নান্দাইল চলে গেছে, মামার বাড়িতে মায়ের কাছে। আবার কখনো বলত দুর্গাপুর আছে।

রাজাকার বাহিনীর সঙ্গে দেখা হলেই বলে, কী মিয়া, পোলা কই? হুনছি মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিছে। কতা যদি হাচা অয় তাইলে কিন্তু খবর আছে? তোমারেই মাইরা ফালামু।

মৃত্যু হুমকির ভয়ে আর প্রকাশ্যে বের হয় না মফিজ উদ্দিন ভূঁইয়া। ওমর আলীর বাড়িতেই লুকিয়ে থাকে। 

রাজাকার বাহিনীর অত্যাচারের মাত্রা ক্রমেই বাড়তে থাকে। ঘোষগাঁওয়ের ছালুয়াতলা গ্রামের রাজাকার কমান্ডার মেহের ডাক্তার। তার নেতৃত্বে রাজাকার বাহিনী পুরো ঘোষগাঁও এলাকাজুড়ে গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ এবং লুটতরাজ চালাতে থাকে। পল্লী চিকিৎসক দুষ্ট প্রকৃতির মেহের আলী পাকিস্তান প্রেমে উদ্ধুদ্ধ হয়ে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলে ঝাঁপিয়ে পড়ে নরহত্যায়। হানাদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচারে একের পর এক লাশ পড়তে থাকে নিতাই নদীতে। এ যেন লাশের মিছিল চলে নিতাই নদীতে! লাশের মিছিলে প্রতিদিনই যোগ হয় নতুন নতুন নাম কিংবা বেওয়ারিশ নাম না জানা কেউ!

এবারের কামাক্ষার মেলায় ছেলেকে লাল পশমি চাদর কিনে দেয়ার ইচ্ছা ছিল মফিজ উদ্দিনের। গেল মেলায় ছেলে লাল চাদর চেয়েছিল কিন্তু অর্থাভাবে কিনে দিতে পারেননি। ছেলে বড় হচ্ছে, এখনতো একটু ভালো কাপড়-চোপড় থাকা চাই। শত বছরেরও বেশি পুরনো এই মেলা প্রতি বছর ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমায় অনুষ্ঠিত হয়। ঐতিহ্যবাহী এই মেলায় দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে। তখন উৎসবের এক আমেজ ছড়িয়ে পড়ে পুরো ঝিগাতলায়।

নিতাই নদীর তীরে ঐতিহ্যবাহী এই মেলায় কোথাও মনিহরি দোকান, কোথাও নিত্য ব্যবহার্য জিনিসের দোকান, কোথাওবা মিষ্টির দোকান বসে। এছাড়াও দেখা যায় গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় তৈরি কুটির শিল্পজাত দ্রব্যসামগ্রীর দোকান, নাগরদোলা, লটারির খেলা এবং সার্কাস। সবকিছুতেই আবহমান বাংলার সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া যায়। পিঠা-পুলি, নাড়–, বিন্নি ধানের খই, বাতাসা, শীতল পাটি, নকশী কাঁথা, তাল পাতার পাখা ইত্যাদির বিচিত্র সমাবেশে কামাক্ষার মেলাটি সেজে ওঠে নান্দনিকতায়। এছাড়াও থাকে দেশীয় বিভিন্ন খেলার প্রতিযোগিতা। গেল মেলায় কুস্তি খেলায় রফিক উদ্দিন হারিয়ে দিয়েছিল চট্টগ্রামের চ্যাম্পিয়ন কুস্তিগীরকে। বিজয়ী রফিককে নিয়ে ঝিগাতলাবাসীর সে কি বিজয়োল্লাস? তাকে ঘাড়ে চড়িয়ে শত শত এলাকাবাসী পুরো ঝিগাতলা ঘুরেছিল। গর্বে বুক ভরে উঠেছিল পিতা মফিজ উদ্দিনের।

ওমর আলীর বাড়িতে বসে বসে ভাবেন আর অলস সময় কাটায় মফিজ উদ্দিন। হঠাৎ খবর আসে গতকাল রাতে হানাদাররা তার বাড়িতে লুটতরাজ চালিয়েছে। সিদ্ধান্ত নেন বাড়ির অবস্থা দেখতে যাবেন। ওমর আলী তাকে একা ছাড়তে রাজি হয় না। অবশেষে একই গ্রামবাসী আব্দুল মোতালেব, আমির হোসেনসহ ৪ জন ভূঁইয়া বাড়ির উদ্দেশে বের হন। তারা ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেননি ভাগ্য তাদের কোন পথে নিয়ে যাচ্ছে? 

ঘোষগাঁও ওমর আলীর বাড়ি থেকে রওনা দেন তারা। দিনটি ছিল ৪ আগস্ট। তারা জানতেন না মফিজ উদ্দিনের বাড়িতে আস্তানা বানিয়েছে পাকি আর্মিরা। রাজাকার মেহের ডাক্তারসহ আরও কিছু রাজাকার তখন অবস্থান করছিল বাড়ির উঠানে এবং পাকসৈন্যরা ছিল ঘরের ভেতর। রাজাকার বাহিনীর সামনে পড়ে যাওয়ায় তিন সঙ্গীসহ তাকে পাকসেনাদের হাতে তুলে দেয়া হয়।

রাজাকার মেহের ডাক্তার বলে, স্যার, হালার লগে মুক্তিবাহিনীর সম্পক্ক আছে। হের পোলা মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিছে। নিজে গিয়া বর্ডার পার কইরা দিয়া আইছে। হালারে বাইন্ধ্যা পিডান তাইলেই মুক্তিবাহিনীর খোঁজ পাইবেন।

মফিজ উদ্দিনকে পাকবাহিনী নিষ্ঠুর অত্যাচার শুরু করে। সঙ্গী আব্দুল মোতালেব ও আমির হোসেনকেও ভয়াবহ নির্যাতন করে। তাদের বলা হয় মুক্তিবাহিনী কোথায় আছে? মফিজ উদ্দিনকে বেয়নেটের আঘাতে জর্জরিত করে প্রশ্ন করা হয়, তার বড় ছেলে কোথায়? অকুতোভয়ী মফিজ উদ্দিন ভূঁইয়া কোন উত্তর দেয় না। প্রশ্নের সঙ্গে চলতে থাকে চড়, থাপ্পড়, লাথি, রাইফেলের বাঁটের আঘাত আর বেধড়ক পিটুনি। অত্যাচারের নির্মম আঘাতে একসময় সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন তিনি। জ্ঞান ফিরলে আবারো ভয়াবহ নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয় তাকে।

চৌকিদার ওমর আলী ডাকবাংলার পাহারায় নিয়োজিত থাকেন, তাই হানাদাররা তাকে চিনে। প্রাণের ভয়ে ইচ্ছে থাকলেও কোনো অনুরোধ করার সাহস পায় না ওমর আলী। ভূঁইয়া বাড়ির পুকুরে কান ধরে দাঁড় করানো হয় ওমর আলীকে। শরীরের জামাকাপড় খুলে নেয়া হয় তার। সম্পূর্ণ বিবস্ত্র অবস্থায় মধ্য পুকুরে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। তার চোখের সামনেই ঘটতে থাকে নারকীয় সব ঘটনা। অনেকক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদের পরও যখন কোনো উত্তর পাওয়া যায় না তখন আব্দুল মোতালেবকে গুলি করে ফেলে দেয়া হয় নিতাই নদীতে।

মুক্তিযোদ্ধার বাবা মফিজ উদ্দিন, তাই তার ওপরই নির্যাতনের মাত্রা ছিল বেশি। নির্যাতনের পর জীবন্ত অবস্থায় হাত-পা বেঁধে ধানের বস্তায় ভরা হয় মফিজ উদ্দিন ভূঁইয়া এবং সঙ্গী আমির হোসেনকে। বস্তায় ভরে আবারও পিটানো হয় তাদের। নির্যাতনে চটের বস্তা রক্তাক্ত হয়। তাদের আর্তচিৎকারে আনন্দ যেন বেড়ে যায় পাকবাহিনীর। পাশবিক উৎসবে মেতে ওঠে রাজাকার বাহিনী। সবশেষে বেয়োনেট চার্জ করা হয় বস্তাবন্দি আমির হোসেন এবং মফিজ উদ্দিনের ওপর। তারা তখনো জীবিত ছিলেন এটা জেনেও নিতাই নদীতে নিক্ষেপ করা হয়। এভাবে নির্মম-নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয় তাদের। পাহাড়ি খরস্রোতা নিতাই নদীর স্রোতের টানে তারা হারিয়ে যান। পরবর্তী সময়ে নদীর ভাটিতে আব্দুল মোতালেবের পচে যাওয়া গলিত লাশটি পাওয়া যায়। কিন্তু আমির হোসেন ও মফিজ উদ্দিনের পবিত্র দেহ আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

জীবন্ত মানুষকে হাত-পা বেঁধে বস্তাবন্দি করে হত্যার মাধ্যমে মানবতার ইতিহাসকে কলঙ্কিত করে পাকহানাদার বাহিনী। মুসলমান নামধারী বর্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী আর তার দোসর রাজাকার বাহিনী বুঝিয়ে দিল মানবতা বলে কোনো শব্দই নেই। হানাদার বাহিনীর ভয়াল আঘাতে ভেঙে যায় মহান মানবতার সুদৃঢ় দেয়াল। মানবাধিকার লঙ্ঘনের যে নিদর্শন সেদিন তারা স্থাপন করে তা মানব ইতিহাসে আজো বিরল!

১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়। ৩০ ডিসেম্বর বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিক উদ্দিন বাড়ি ফিরে আসেন। ঐতিহাসিক বান্দরকাটা (ফুলবাড়িয়া) যুদ্ধে গুরুতর আঘাত পেয়ে বিহার ক্যান্টনমেন্ট হাসপাতালে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে আজো যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দিন কাটিয়ে যাচ্ছেন। বাবাকে কথা দিয়েছিলেন দেশ স্বাধীন করে তবেই বাড়ি ফিরবেন। দেশ তো স্বাধীন করে ঠিকই বাড়ি ফিরেছেন; কিন্তু এসে দেখেন তার প্রাণপ্রিয় বাবাই আজ নেই। জন্মদাতা পিতার লাশ নিতাই নদীর স্রোতে ভেসে গেছে। নদীর স্রোতে হারিয়ে যাওয়া বাবার লাশের হয়নি কোনো দাফন-কাফন, দেয়া যায়নি কবরও।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App