×

সাময়িকী

বাঙালির আত্মপরিচয় ও সংস্কৃতির সংকট

Icon

শেখর ভট্টাচার্য

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

 বাঙালির আত্মপরিচয়  ও সংস্কৃতির সংকট
বাঙালির আত্মপরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তির বিষয়টিকে সুনির্দিষ্টভাবে একটি সংকট হিসেবে সর্বপ্রথম যিনি গুরুত্ব দিয়ে চিহ্নিত ও উপস্থাপন করেন তিনি হলেন বদরুদ্দীন উমর। উমরের রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে আপনি সহমত পোষণ নাও করতে পারেন, তবে তার গবেষণার নির্মোহ চরিত্রের সমালোচনা করা সহজ কাজ নয়। পাকিস্তানোত্তর পূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক সংকট নিয়ে একজন ধ্রæপদ গবেষক হিসেবে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তিনি তার বক্তব্যকে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে গেছেন। এক্ষেত্রে তিনি এতই নির্মোহ ছিলেন যে, একটি গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য ভিন্নমতের মানুষের সত্য ভাষণকে নির্বিবাদে গবেষণায় যুক্ত করতে ক্ষুদ্রতার পরিচয় দেননি। ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সালে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত তার সাক্ষাৎকার থেকে জানতে পারি তিনি কীভাবে ভাষা আন্দোলন নিয়ে বাংলা ভাষায় সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও আকর গ্রন্থ ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ বইটিতে চাক্ষুষ ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য ব্যবহার করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে তার সাক্ষাৎকারের একটি ক্ষুদ্র অংশ পাঠ করলেই পাঠক অনুধাবন করতে পারবেন বদরুদ্দীন উমরের গবেষণা ক্ষেত্রে ব্যক্তির থেকে যথাযথ বক্তব্যকে কতটুকু প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। উমরের নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গির জ¦লন্ত প্রমাণ আমরা উল্লেখিত সাক্ষাৎকার থেকে পেয়ে যাই। বদরুদ্দীন উমর ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ বইটির তথ্য সংগ্রহ প্রসঙ্গে বলেন, “প্রাথমিকভাবে যারা আমাকে গবেষণার কাজে খুব সাহায্য করেছিলেন, তাদের মধ্যে কামরুদ্দীন আহমেদ ছিলেন। অলি আহাদের কাছ থেকেও কিছু জিনিস পেয়েছি। তাজউদ্দীন আহমদের কাছ থেকেই নথি ও তথ্য পেয়েছি সবচেয়ে বেশি। তাজউদ্দীনের একটা অভ্যাস ছিল তখনকার দিনের নথিপত্র সংগ্রহ করার। আগেকার দিনে দেখা যেত, একটা লিফলেট বা পাম্পলেট বের হলো, কিন্তু তাতে কোনো তারিখ থাকত না। তাজউদ্দীন সাহেবের অভ্যাস ছিল, তিনি যেদিন লিফলেটটা পেতেন, সেই তারিখ লিখে রাখতেন। তাজউদ্দীনের সঙ্গে আমার আগে থেকেই পরিচয় ছিল। তবু কামরুদ্দীন সাহেবের সঙ্গে তাজউদ্দীনের বাড়িতে গিয়ে আনুষ্ঠানিক ইন্টারভিউ নিয়েছিলাম। তখন তিনি বললেন, ‘আমি একটা ডায়েরি লিখেছিলাম, সেই ডায়েরি আপনার কোনো কাজে লাগবে কিনা, দেখেন।’ তাজউদ্দীনের ডায়েরিগুলো ছিল ছোট ছোট। ইংরেজিতে লেখা। সাতচল্লিশ সালে লিখতে আরম্ভ করেছিলেন, ছাপ্পান্ন সাল পর্যন্ত লিখেছিলেন। সেগুলো দেখে আমি বললাম যে এগুলো তো মহামূল্যবান সম্পদ। তাজউদ্দীন বললেন, ‘আপনি এগুলো নিয়ে যান, দেখেন আপনার কোনো কাজে আসে কিনা।’ আমি আমার কাজের জন্য বায়ান্ন সাল পর্যন্ত ডায়েরি নিজের কাছে রাখলাম। বাকিটা তাকে ফিরিয়ে দিয়ে এলাম।” এই দীর্ঘ উদ্ধৃতি উপস্থাপনের উদ্দেশ্য হলো একজন গবেষক সত্য অনুসন্ধানে কতটুকু নির্মোহ হলে সত্য তথ্য সন্নিবেশ করতে ভিন্ন মত-ভিন্ন পথের মানুষের ধারণা ও মতামতকে উদারভাবে গ্রহণ করতে দ্বিধান্বিত হন না কোনোভাবেই। এখানে লক্ষণীয় তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন বাম ঘেঁষা (মস্কোপন্থি) আওয়ামী লীগ নেতা, কামরুদ্দীন আহমেদ, অলি আহাদ ছিলেন সে সময়ের আওয়ামী লীগের উল্লেখযোগ্য নেতা। বদরুদ্দীন উমরের গবেষণা প্রক্রিয়া নিয়ে এই দীর্ঘ ভূমিকা দেয়ার উদ্দেশ্য হলো তিনি যে বিষয়টি পাকিস্তানোত্তর পূর্ব বাংলায় উত্থাপন করেছিলেন সেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ‘সংস্কৃতির সংকট’ স্বাধীনতার তিপ্পান্ন বছর পরও জাতীয় জীবনে প্রবলভাবে উপস্থিত। আমাদের শ্রদ্ধেয় বুদ্ধিজীবীরা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছেন না অথবা বিভাজিত সমাজে তারা কোনো একটি পক্ষ অবলম্বন করছেন বলে স্বাধীন মতামত ব্যক্ত করতে ভয় পাচ্ছেন। আত্মপরিচয় নিয়ে আবার যে জাতীয় সংকট তৈরি হয়েছে, তার পুনঃসূচনা পঁচাত্তর-পরবর্তী সামরিক সরকারের আমলে। এই সময় সব কিছুর মধ্যেই সাম্প্রদায়িকীকরণ করে বুঝিয়ে দেয়া হয় যে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল ধর্মীয় জাতীয়তাবাদকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য, সেই জাতীয়তাবাদকে আমরা ফিরিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হচ্ছে। সংবিধানের মূল নীতির পরিবর্তন সাধন করে বার্তা দেয়ার চেষ্টা করা হয়, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আধুনিক, প্রগতিমুখী যত অর্জন আছে সেগুলোকে বর্জন করে আমরা আবার ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। জাতীয়তাবাদী চেতনাকে কোনো জাতির অন্তরে আরোপ করা যায় না। জাতীয়তাবাদ জাতীয় সংহতির মাধ্যমে হাজার বছরে ধীরে ধীরে জন্ম নেয়, বিকশিত হয়। নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর যে মাটিকে আশ্রয় করে বসবাস করে সে মাটি থেকে উত্থিত ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য থেকে জাগরিত হয় এক ধরনের চেতনার। সেই একাত্মবোধ সংহতির চেতনা হলো জাতীয়তাবোধ। পাকিস্তান সৃষ্টির পর যে প্রেক্ষাপটে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূচনা ঘটেছিল, আমরা মনে হয় সেই প্রেক্ষিত, প্রেক্ষাপট কিছুটা হলেও আবার ফিরে এসেছে। ফিরে না এলেও সেই আবহ ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে। যে বীজ বপন করা হয়েছিল সংবিধান পরিবর্তন করে সে বীজ মহিরুহ না হলেও চারাগাছে রূপান্তরিত হচ্ছে ধীরে ধীরে। বুদ্ধিবৃত্তিক নির্দেশনা দেয়ার মতো দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবীর অভাব থাকলেও সাধারণ মানুষ তা টের পাচ্ছেন নানা মাধ্যমে। ১৯৬৭ সালের ২৬ অক্টোবর যে বাস্তবতার আলোকে বদরুদ্দীন উমর তার বিখ্যাত ‘সংস্কৃতির সংকট’ গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন সে প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বহমান রাজনৈতিক বাস্তবতার ব্যাপক সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। এই সাদৃশ্য মিলিয়ে দেখা যায় ‘সংস্কৃতির সংকট’-এর প্রথম সংস্করণের মুখবন্ধ পাঠ করে। প্রথম সংস্করণের মুখবন্ধে বদরুদ্দীন উমর লিখেছিলেন : ‘আমাদের সংস্কৃতির চরিত্র নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে এখন যে বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে তা দ্বারা এ কথাই প্রমাণিত হয় যে আমরা এখনো যথাযথভাবে নিজেদের জাতীয় এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্ধারণে সমর্থ হইনি। এসব ক্ষেত্রে যে বিভ্রান্তি, নৈরাজ্য এবং হতবুদ্ধিতা আজ পরিলক্ষিত হচ্ছে তার উৎপত্তি আমাদের বহুদিনের কুসংস্কার ও হীনম্মন্যতার মধ্যে। অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও ধর্মকে ক্ষুদ্র স্বার্থ সাধনের কাজে ব্যবহার করার ব্যাপারটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। এই পুরনো অভ্যাসের জোরে এখন এক শ্রেণির লোকে সাংস্কৃতিক আলোচনার ক্ষেত্রে ধর্মকে নিয়ে অনেক অবান্তর বিতর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। ধর্মের একটি বিশিষ্ট স্থান অনেকের জীবনে আছে এবং সে কারণে তাদের ব্যক্তিগত জীবনও ধর্মনিষ্ঠ।... সেটা হয় তাদের দ্বারা যারা ধর্মকে টেনে আনে অন্যান্য ক্ষেত্রে। এ মনোবৃত্তি এবং প্রচেষ্টার নামই সাম্প্রদায়িকতা।’ পাঠক আমরা যে সময় অতিক্রম করছি সে সময়ের সঙ্গে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট পাকিস্তান উত্তর পূর্ব বাংলার কিছু মানুষের হীনম্মন্যতার সাদৃশ্য লক্ষ্য করুন। সমুখপানে এগিয়ে যাওয়ার পথে তখনো কাঁটা বিছানো হয়েছিল, এখনো ধর্ম, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ চর্চার মাধ্যমে সব ক্ষেত্রে নতুন করে কাঁটা বিছানো হচ্ছে। সে কাঁটায় আমরা ক্রমাগত ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছি, তবে এ রকম নীরবতার সংস্কৃতি আমাদের গ্রাস করেছে বলে আমাদের চেতনা নাশ হচ্ছে ক্রমাগত। এসব দলের সঙ্গে আমরা সক্রিয়ভাবে যুক্ত দেখতে পাচ্ছি স্বাধীনতার পক্ষ নামধারী প্রগতিশীল দলগুলোকে। ধর্মাশ্রয়ী জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী দলগুলোর আদর্শকে ধারণ করে ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর নামে একই রাজনীতি অনুশীলন করে যাচ্ছে ভিন্ন মোড়কে। বহমান ‘সংস্কৃতির সংকট’ আর পাকিস্তান উত্তর সংস্কৃতির সংকটের মধ্যে চরিত্রগত অনেক পার্থক্য রয়েছে। তবে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় প্রবহমান ‘সংস্কৃতির সংকট’ অনেক বেশি বিপজ্জনক। সংস্কৃতির সংকটের স্বরূপ এবং ফলাফল আমরা যদি অনুধাবন করতে না পারি তাহলে বহমান সংকট আমাদের জাতি হিসেবে আবারো অন্ধকারে নিক্ষেপ করার সম্ভাবনা আছে। সংস্কৃতির সংকটকে কাটিয়ে ওঠা অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠার থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়টি আমাদের রাজনৈতিক দল এবং বুদ্ধিজীবীরা যত দ্রুত অনুধাবন করতে পারবেন, জাতির জন্য ততই মঙ্গল।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App