×

সাময়িকী

দুঃখিনী দুই রাজকন্যা

Icon

সুজন বড়ুয়া

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দুঃখিনী দুই রাজকন্যা
২০১০ সাল, শোকের মাস আগস্টের প্রথম দিন আজ। দুই বোন বসেছে পাঁচটি চিঠি নিয়ে। ৩৫ বছর আগে ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসের প্রথম দিকে এই চিঠি পাঁচটি লেখা হয়েছিল জার্মানি থেকে। চিঠির গায়ে ঠিকানা লেখা ছিল ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়ি। ঠিকানা অনুযায়ী চিঠিগুলো এসেছিল নির্ভুলভাবে। জমা হয়েছিল লেটার বক্সে। কিন্তু লেটার বক্স খোলার সুযোগ পাননি প্রাপকরা। ভাগ্যের কী নিমর্ম পরিহাস, মুখ বন্ধ খামে সেই পাঁচটি চিঠি ৭৫ বছর পর আজ আবার এসে পড়েছে প্রেরকের হাতে। চিঠিগুলোর প্রেরক শেখ রেহানা, দুই বোনের ছোট বোন। বড় বোন শেখ হাসিনা আজ চিঠিগুলো নিয়ে এসেছেন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে। চিঠিগুলো হাতে নিয়ে হঠাৎ শেখ রেহানার দম বন্ধ হওয়ার জোগাড়। হাত-পা অবশ হয়ে আসছিল ক্রমে। কী এক চাপা কষ্টে দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল ভেতরটা। সেই কবেকার কিশোরীবেলার কথা! চিঠির লেখা থেকে জার্মানির সেইসব স্মৃতি সবই কেমন ধূসর। ধূসর নয় শুধু চিঠির প্রাপকের মুখগুলো। ইস, চিঠিগুলো ফেরত না পেয়ে যদি সেই প্রিয় মুখগুলোকে আবার ফিরে পাওয়া যেত! জীবনের কত দীর্ঘ সময় গড়িয়ে গেল, এখনো চোখ দুটো সেই প্রিয় মুখগুলোকেই খুঁজে বেড়ায়। কেউ কি স্বপ্নেও ভেবেছিল মায়া-মমতার নিবিড় বন্ধনে এত সুদৃঢ় একটি রাজপরিবার হঠাৎ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে? কেউ কি ভেবেছিল কোনো এক নিকষ কালো রাতের অন্ধকারে রাজা, রানিমাতা, স্ত্রীসহ তাদের দুই যুবরাজ আর এক নিষ্পাপ ফুলকুমারকে পৃথিবী থেকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হবে? কেউ কি ভেবেছিল সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে কোনো এক সকালে দুই রাজকন্যার ঘুম ভাঙবে রাজার সপরিবার করুণ মৃত্যু সংবাদে? কেউ কি ভেবেছিল রাজা, রানি ও যুবরাজদের নির্মম মৃত্যুশোক বয়ে বেড়াবার জন্য শুধু দুই রাজকন্যাই পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে? কেউ না ভাবলেও ভাবনার অতীত সেই ঘটনাই বাস্তবে ঘটেছে, মনে হয় যেন সবটুকু বাস্তব নয়, রূপকথা, অবিশ্বাস্য এক রূপকথা। এখনো সেই ঘটনা মনে হলে গায়ে কাঁটা দেয়। মনে হয় সবই জীবন্ত, এই তো সেদিনের কথা। রাজার সারা জীবনের সংগ্রাম সাধনায় পরাধীন দেশ স্বাধীন হলো। চারদিকে আনন্দের বন্যা। সবার মনে খুশির ঢেউ। দেশ গঠনে নিজেদের উজাড় করে দিল সবাই। যুবরাজরাও মাতোয়ারা দেশের কাজে। রাজা-রানি ভাবলেন, যুবরাজদের এবার বিয়ে দেয়া দরকার। যেই ভাবা সেই কাজ। দেশ স্বাধীনের চার বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের জুলাই মাসের মাঝামাঝি যুবরাজদের বিয়ের আয়োজন হলো। বড় যুবরাজ শেখ কামাল আর মেজো যুবরাজ শেখ জামাল। দেশের ক্রীড়া ও সংস্কৃতি জগতের দুই অপরূপা গুণী কন্যার সঙ্গে একই দিনে বিয়ে হলো দুই যুবরাজের। রাজবাড়িতে আনন্দ উপচে পড়ল। কিন্তু বিয়ের সানাইয়ের পরপরই পরিবারে বেজে উঠল এক বিদায় রাগিণী। ৩০ জুলাই বড় কন্যা-জামাতা ড. ওয়াজেদ মিয়া সপরিবারে চলে যাবেন জার্মানি। তাদের ছোট দুই পুত্র-কন্যা, জয় ও পুতুল। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ। সেখানে দুটি চঞ্চল শিশুকে একা মাতার পক্ষে সামলানো কঠিন হবে। তাই ছোট রাজকন্যাকেও জার্মানি পাঠানোর সিদ্ধান্ত হলো। ছোট রাজকন্যার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ছুটি চলছে। এ সময় কিছুদিন বেড়িয়ে আসলে ক্ষতি নেই। কিন্তু একসঙ্গে দুই রাজকন্যা চলে যাবে বলে বাবা-মাসহ সবারই মন খারাপ। এয়ারপোর্টে বিদায় দিতে এসেও সবাই কাঁদল। ছোট রাজকুমার রাসেল ছোট রাজকন্যা রেহানার হাতই ছাড়তে চাইছিল না। তবু বিদায় দিতে হয়, তবু চলে যায়। জার্মানিতে এসে প্রথমদিকে ভালোই লাগছিল ছোট রাজকন্যা রেহানার। যা দেখে তা-ই নতুন, তা-ই সুন্দর! অন্যরকম অনুভূতিতে মন ভরে যায়। মনের মিষ্টি ভাবনা-অনুভূতিগুলো লিখে লিখে জানায় ঢাকার স্বজন-প্রিয়জনদের। এতে ওর আনন্দ আর ধরে না। কিন্তু এই উচ্ছল আনন্দ-খেলা এক সমান রইল বেশি দিন। মা-বাবা, ভাই-ভাবিদের জন্য মনটা কেমন করে ওঠে হঠাৎ হঠাৎ। ঢাকায় ফিরে যেতে ইচ্ছা করে বড়। ১৩ আগস্ট টেলিফোনে বাবাকে বলল, এখানে আর ভালো লাগছে না, তোমাদের কাছে ফিরে যেতে চাই। মনে হয় কতদিন হয়ে গেল, তোমাদের দেখি না। বাবা হেসে বললেন, দুদিনেই সাধ মিটে গেল মা! ঠিক আছে, ভাবিস না, তোকে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করছি। ছোট রাজকন্যা অপেক্ষায় রইল। কিন্তু তার অপেক্ষার পালা শেষ হয় না আর। তার ঢাকায় ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা আর হলো না। ১৫ আগস্ট সকালে তার ঘুম ভাঙল বড় রাজকন্যা হাসু আপার বুকভাঙা কান্নার শব্দে। মুখে কোনো কথা নেই। আপা শুধু কাঁদছে কাঁদছে। কখনো ছোট বোনকে জড়িয়ে ধরে, কখনো জয়-পুতুলকে। ছোট বোনের চোখেও তখন জলের ধারা। অনেকক্ষণ পর হাসু আপা জানায়, ঢাকার বাসায় সামরিক ক্যু হয়েছে। তখনো দুই বোনের ধারণা, হয়তো কেউ কেউ বেঁচে আছে। দুঃস্বপ্নের মতো এই সকালে রটল কী সৃষ্টিছাড়া দুঃসংবাদ! মুহূর্তেই এলোমেলো হয়ে গেল দুই বোনের জীবন। ড. ওয়াজেদ মিয়াসহ দুই বোন তখন বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে, রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের বাসায়। এখান থেকে তাদের যাওয়ার কথা ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে। জার্মানির বন থেকে আচমকা রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী প্যারিস যাত্রা বাতিল করে ওয়াজেদ মিয়াকে সপরিবারে অবিলম্বে বনে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী দুই বোনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তিনি তাদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ করণীয় ঠিক করে ফেলেছেন। দুই বোনকে নিয়ে জার্মানির বনে পৌঁছলে হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী ওয়াজেদ মিয়াকে জানালেন, এখন আপনাদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ দেশ ভারত। আপনাদের ভারত সরকারের কাছে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইতে হবে। দুই রাজকন্যার পক্ষে ওয়াজেদ মিয়া ভারত সরকারের কাছে তখনি আশ্রয় চাইলেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী মায়ের মমতা দিয়ে বুকে টেনে নিলেন দুঃখিনী দুই রাজকন্যাকে। ঘটনার ১০ দিন পর ২৫ আগস্ট জার্মানির বন থেকে দুই রাজকন্যাকে নিয়ে ওয়াজেদ মিয়া পৌঁছলেন দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে। ভারত সরকারের ব্যবস্থাপনায় দিল্লিতে থাকার ব্যবস্থা হলো তাদের। ভারতে তখন জরুরি অবস্থা চলছে। বাংলাদেশ সম্পর্কে কোনো খবরবার্তা ভারতের পত্র-পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে না। সুতরাং বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থা দুই রাজকন্যার তখনো প্রায় অজানা। তাদের চোখে কেবল অবিরাম জলের ধারা। কখনো হঠাৎ দুই বোন কেঁদে ওঠে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে। কাঁদতে কাঁদতে সারা হলে এক সময় বড় বোন চোখ মুছিয়ে দেয় ছোট বোনের। আবার কখনো ছোট বোন চোখ মুছিয়ে দেয় বড় বোনের। নাওয়া নেই খাওয়া নেই কারোই। এভাবে কেটে গেল দুই সপ্তাহ। তারপর ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী তার দপ্তরে তলব করলেন বড় রাজকন্যা শেখ হাসিনাকে। রাত আটটায় স্বামী ওয়াজেদ মিয়াসহ শেখ হাসিনা হাজির হলো প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর দপ্তরে। ১০ মিনিট পর প্রধানমন্ত্রী আসেন সেখানে। তিনি শেখ হাসিনার পাশে বসেন। পরম মমতায় শেখ হাসিনার মাথায় সান্ত¡নার স্পর্শ বুলিয়ে দেন। তারপর ওয়াজেদ মিয়ার কাছে জানতে চান ঘটনা সম্পর্কে তারা কতটুকু জানেন। ওয়াজেদ মিয়া ভয়েস অব আমেরিকা ও রয়টার্সের বরাত দিয়ে জানা তথ্য প্রধানমন্ত্রীকে শোনান। প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত ভারতীয় কর্মকর্তাকে ঢাকার সর্বশেষ তথ্য জানানোর নির্দেশ দেন। কর্মকর্তা জানান, ঢাকায় বঙ্গবন্ধু পরিবারের কেউই বেঁচে নেই। শেখ হাসিনা সঙ্গে সঙ্গে কান্নায় ভেঙে পড়ে আবার। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী শেখ হাসিনাকে জড়িয়ে ধরেন বুকে। তারপর তিনি বলেন, তুমি যা হারিয়েছ কোনোভাবেই তা আর পূরণ হওয়ার নয়। এখন থেকে তুমি তোমার ছেলেকে বাবা আর মেয়েকে মা বলে জানবে। ভেঙে পড়ো না, আমি তোমাদের পাশে আছি। শেখ হাসিনা মাথার ওপর মায়ের স্নেহস্পর্শ অনুভব করল। প্রধানমন্ত্রী ওয়াজেদ মিয়ার চাকরির ব্যবস্থা করলেন। দিল্লিতে দুই রাজকন্যার থাকা-খাওয়া নিশ্চিত হলো। কিন্তু তাদের বুকের ব্যথাভার নিরসন হলো না। কখনো নিরসন হওয়ার কথাও নয়। পৃথিবীর কোনো কিছুর বিনিময়ে এ দুঃখ-ব্যথা প্রশমন হবে না। কে সান্ত¡না দেবে কাকে? দুজনের বুকের ক্ষত তো একই সমান। তবু বড় বোন ভাবে প্রাণপ্রিয় ছেট বোনটির কথা। হায়রে বেচারি, কত ছোট্ট মানুষ! বাবা-মার কোনো আদর-সোহাগই বলতে গেলে সে পেল না। কী দুর্ভাগা জীবন! ভাবতে ভাবতে গোপনে চোখ মোছে বড় বোন। মনের কষ্ট আড়াল করে ভাত তুলে দেয় ছোট বোনের মুখে। ছোট বোনের চোখের জল শুকায় না। কাঁদতে কাঁদতে বলে, তুমি তো কিছু খাওনি আপা, তুমি খাও। আমি তোমাকে খাইয়ে দিই! দিন যায়, রাত আসে, রাত যায়, দিন আসে। তবু দিন রাতের তফাৎ বুঝতে পারে না দুই রাজকন্যা। তাদের কাছে দিন-রাত একই সমান। সুখ-দুঃখ বোধ তাদের নেই। বেঁচে থাকা তাদের কাছে যেন সম্পূর্ণ অর্থহীন। তবু দুই বোন বেঁচে থাকে পাথরের মূর্তির মতো। কিন্তু জীবন তো পাথর নয়। জীবন তো থেমে থাকে না। জীবন এগিয়ে চলে সম্মুখ পানে। জীবনই ১৯৭৬ সালে ছোট রাজকন্যা শেখ রেহানাকে ডাক পাঠালো লন্ডনে। ১৯৭৭ সালের জুলাই মাসেই ছোট রাজকন্যার বিয়ে হলো সেখানে। জেলে বন্দি থাকায় বড় রাজকন্যার বিয়েতে উপস্থিত থাকতে পারেননি পিতা। মায়ের বড় সাধ ছিল, ছোট রাজকন্যার বিয়ে দেবেন ধুমধামের সঙ্গে। হায়, বিয়ে ঠিকই হলো, কিন্তু সেই বাবা-মা, ভাই-ভাবি কেউই বিয়ে দেখতে পেলেন না। এমনই মন্দ ভাগ্য, শুধু একটি টিকেটের জন্য বড় বোন শেখ হাসিনাও উপস্থিত থাকতে পারল না ছোট বোনের বিয়েতে। তবু জীবন বয়ে চলল। ১৯৮১ সালে দিল্লিতে বড় রাজকন্যা সিদ্ধান্ত পাকা করল, রাজনীতি শুরু করবেন। ছোট রাজকন্যা বলল, হাসু আপা, তোমার পাশে আছি। বাবার অসমাপ্ত সব স্বপ্ন সফল করতে হবে। তুমি রাজনীতি শুরু করো, জয়-পুতুলকে আমিই দেখব। ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে এলেন বড় রাজকন্যা। বড় প্রতিকূল, বড় পিচ্ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠ। কিন্তু সংগ্রামী পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রক্তের ধারক-বাহক শেখ হাসিনা, ছেড়ে কথা বলবেন কেন? হাল ছাড়ার পাত্র তিনি নন। পিতার প্রতিষ্ঠিত দলের কাণ্ডারি হলেন। একে একে রুখে দাঁড়াতে লাগলেন সব অন্যায়-অনাচার। পিতার হত্যাকাণ্ডের দাবি তুললেন জোর দিয়ে। দেশের মানুষ দলে দলে এগিয়ে এলো তার সমর্থনে। তবু বারবার পা হড়কে যায় পিচ্ছিল কাদা মাটিতে। হাতে ধরা দিয়েও দেয় না চূড়ান্ত বিজয়। এরই মধ্যে নেমে এলো এক পারিবারিক বিপর্যয়। ১৯৯১ সালে গুরুতর অসুস্থ হলেন ছোট বোন শেখ রেহানার স্বামী। পাশে এসে দাঁড়ালেন বড় বোন। নিয়ে গেলেন সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে। নিবিড় চিকিৎসা চলল, দীর্ঘ সময় ধরে চলল যমে-মানুষে টানাটানি। মানুষের জয় হলো, বড় বোনের জয় হলো। যমের মুখ থেকে বড় বোন ছিনিয়ে নিয়ে এলেন ছোট বোনের স্বামীকে। ছোট বোন শেখ রেহানা আবার মর্মে মর্মে উপলব্ধি করলেন, শেখ হাসিনা শুধু তার বড়ো বোন নয়, তার পিতা, মাতা, ভাই সবই, তার পরম আশ্রয়। ধৈর্যের প্রতিমূর্তির নাম শেখ হাসিনা। মানবীয় আদর্শের অপর নাম শেখ হাসিনা। ১৯৯৪ সালের ১৪ আগস্ট ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত বাসভবনকে মানুষের জন্য জাদুঘর বানিয়ে উন্মুক্ত করে দিলেন বড়ো রাজকন্যা। বললেন, আজ থেকে এ বাড়ি জনগণের সম্পদ। বাংলার জনগণও ঠিক চিনে নিল বড় রাজকন্যাকে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করল নিজের দল। এবার চূড়ান্ত বিজয় ধরা দিল হাতে। প্রথমবারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রী হলেন বড় রাজকন্যা শেখ হাসিনা। পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারকাজ শুরু করলেন সঙ্গে সঙ্গে। পাশে দাঁড়িয়ে শক্তি জোগালেন ছোট রাজকন্যা শেখ রেহানা। কিন্তু পাঁচ বছরে বিচারকাজ শেষ করা গেল না। ২০০১ সালের নির্বাচনে হেরে গেল বড় রাজকন্যার দল। চারদিকে সক্রিয় হলো স্বাধীনতাবিরোধী চক্র। ষড়যন্ত্র আর চক্রান্তে মেতে উঠল রক্তের হোলি খেলায়। ২০০৪ সালের আগস্ট মাসে নেমে এলো আরেক দুর্যোগ। শেখ হাসিনার জনসমাবেশে বোমা হামলা চালাল দুষ্কৃতকারীরা। লক্ষ্য ছিল বড় রাজকন্যা। মরতে মরতে বেঁচে গেলেন ভাগ্যক্রমে। বিপদে দূর থেকে ছুটে এসে পাশে দাঁড়ালেন ছোট রাজকন্যা। হাতে হাত রেখে সংকট কাটিয়ে উঠলেন দুই বোন। মানুষ আবার চিনে নিতে শুরু করল স্বাধীনতার শত্রæ-মিত্রকে। মানুষ চিনে ফেলল সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াশীল অপশক্তিকে। মানুষ বুঝে গেল দেশ কার হাতে নিরাপদ। কার হাতে উন্নয়ন সমৃদ্ধির চাবিকাঠি। ২০০৯ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সমর্থনে বাংলার জনগণ আবার বরণ করে নিল জাতির পিতার কন্যাকে, ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনল বড় রাজকন্যার দলকে। দ্বিতীয়বারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রী হলেন বড় রাজকন্যা শেখ হাসিনা। দেশকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে এলেন প্রগতিশীল ধারায়। জাতির পিতা হত্যার অসমাপ্ত বিচারকাজ শুরু করলেন আবার। বিচার সম্পন্ন করে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করাই তার উদ্দেশ্য। বড় রাজকন্যা চান মানুষের মনে জাতির পিতার ভাবমূর্তি দিন দিন উজ্জ্বল হবে। মাঝে মাঝে বঙ্গবন্ধু জাদুঘর পরিদর্শনেও যান বড় রাজকন্যা। আজো গিয়েছিলেন জাদুঘর দেখতে, স্বজনদের পরম প্রিয় স্পর্শ নিতে। আজ গিয়েই জাদুঘরে পেয়েছেন স্মৃতি মেদুর মুখ বন্ধ খামের সেই পাঁচটি চিঠি, যা ছোট রাজকন্যা জার্মানির বন থেকে লিখেছিল ৩৫ বছর আগে। সেই কবেকার কথা! এর মধ্যে মানুষের জীবনধারা পাল্টে গেছে কত! এখন চিঠির চলও উঠে গেছে প্রায়। এখন তথ্যপ্রযুক্তির যুগ, কম্পিউটার, ইমেইল, ইন্টারনেটের যুগ। এখন মানুষ চিঠি লেখে ফেসবুকের ইনবক্সে, ম্যাসেঞ্জারে, হোয়াটসঅ্যাপে। চিঠিগুলো হাতে নিয়ে বুকটা কেমন করে উঠল ছোট রাজকন্যার। ইস, তখন যদি কম্পিউটার, ইন্টারনেট থাকত, তবে এই চিঠিগুলো আর লেখা হতো না। আজ এত কষ্টও আর পেতে হতো না। কেন চিঠিগুলো আবার হাতে ফিরে এলো আজ? হৃদয় খুঁড়ে কেন আবার বেদনা জাগিয়ে তুলল? দুই. আচ্ছা কী লেখা আছে চিঠিগুলোতে? কী লেখা হয়েছিল পাঁচটি চিঠিতে? খুলে দেখি না কেন একবার! কাঁপা কাঁপা হাতে প্রথম চিঠিটা খুললেন ছোট রাজকন্যা শেখ রেহানা। পাশে দাঁড়িয়ে বড় রাজকন্যা দেখছেন চুপচাপ। প্রথম চিঠিটা বাবাকে লেখা। কার্লসরুহে থেকে ০৫.০.১৯৭৫ তারিখে লেখা হয়েছিল। ‘আব্বা, আমার সালাম নেবেন। আপনি কেমন আছেন? আমরা ভালো আছি। কার্লসরুহে খুব সুন্দর জায়গা। কিন্তু অসম্ভব গরম। গত রবিবার ব্ল্যাক ফরেস্ট গিয়েছিলাম। কিন্তু আব্বা জানেন, আমাদের রাঙামাটি থেকে খুব একটা পার্থক্য বুঝলাম না। এখানকার লোক খুব ভদ্র ও ভালো। আমি এখন অনেক কাজ করি। দুধ খাই, খাবার ঠিকমতো খাই। আজকে কামাল ভাইয়ের জন্মদিন। দোয়া করবেন। আপনার স্নেহের রেহানা।’ পড়তে পড়তে ছোট রাজকন্যার দুচোখ ভরে এলো জলে। স্মৃতির পাখিরা কোথায় যেন ডানা ঝাপটে উঠল একসঙ্গে। মনে পড়ছে, মাঝে মাঝে ছাদে বসে বাবার মাথার পাকা চুল বেছে দিতেন ছোট রাজকন্যা। বাবার মাথার চুলের নিচে একটি কাটা দাগ ছিল। শেষদিকে একদিন পাকা চুল বাছার সময় বাবা বলেছিলেন, আমার এই কাটা দাগটা দেখে রাখ। আমার লাশ তো তোরা পাবি না, পেলেও চিনতে পারবি না। তখন এই কাটা দাগ দেখে যদি চিনতে পারিস, আরকি! বাবার কথা শুনে মনটা খুব ভারী হয়ে গিয়েছিল ছোট রাজকন্যার। বড় অভিমান হয়েছিল বাবার ওপর। ঝনঝনিয়ে বলেছিল, তুমি পলিটিক্স করো কেন বাবা? বাবা মেয়ের মনের অবস্থা বুঝতে পেরেছিলেন। আদরমাখা কণ্ঠে মেয়েকে শুধরে দিয়ে বলেছিলেন, তুই এমন করে বলিস কেন? আমার কাছে তুই যা, সাড়ে সাত কোটি মানুষও তা। দেশের মানুষকে এত ভালোবেসেছিলেন আব্বা, কী লাভ হলো! আপনার মড়ামুখটাও আমরা দেখতে পেলাম না।- ভেতরের কান্নার রোল চাপতে চাপতে দ্বিতীয় চিঠিটা খুললেন ছোট রাজকন্যা। এ চিঠিটা মাকে লেখা। বন থেকে ১১.০৮.১৯৭৫ তারিখে লেখা হয়েছিল। ‘আম্মা, ...পুতলী এখন অনেক কথা বলে। আব্বা ও তুমি কেমন আছো? আমি এখন অনেক কাজ করি। তোমার জন্য অনেক জিনিস কিনতে ইচ্ছে করে। সুন্দর সুন্দর জিনিস। কামাল ভাইয়ের বিয়ের পর এটাই প্রথম জন্মদিন। সুন্দর একটা প্রেজেন্ট দিও। দুলাভাইয়ের কাজ করে ১ মার্ক পেয়েছি। কালকে বেশি কাজ করলে ৫ মার্ক দেবে। তোমার স্নেহের রেহানা’ চিঠি পড়ে আর নিজেকে ভেতরে ভেতরে সামলায় ছোট রাজকন্যা। আমাদের একটি হাসিখুশি ভালো খবরের জন্য সব সময় উৎকর্ণ হয়ে থাকতেন মা। সারা জীবন কত কষ্ট করেছেন! নীরবে হাসিমুখে ধৈর্যের সঙ্গে সব পরিস্থিতি সামলেছেন। আব্বা বা কারো কাছে তার কোনো অভিযোগ ছিল না তার। তবু কেন এভাবে প্রাণ দিতে হলো মাকে? নিজের মনে তড়পাতে তড়পাতে তৃতীয় চিঠিটা খুললেন ছোট রাজকন্যা। এ চিঠিটা ছোট ভাই রাসেলকে লেখা। ট্রিবার্গ থেকে ০৩.০৮.১৯৭৫ তারিখে লেখা হয়েছিল। ‘রাসুমণি আজকে আমরা ট্রিবার্গ গিয়েছিলাম। জার্মানির সবচেয়ে বড় ঝরনা। অনেক উপরে উঠেছিলাম। এদের ভাষায় এটাকে বলে ডধংংবৎভধষষব। আজকে ব্ল্যাক ফরেস্ট গিয়েছিলাম।.... মা’র কথা শুনবে। তোমার জন্য খেলনা কিনব। লন্ডনের চেয়ে এখানে অনেক দাম। ছোট্ট ছোট্ট গাড়িগুলো প্রায় দুই পাউন্ড দাম। তুমি ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া ও পড়াশুনা করো। ইতি রেহানা আপা’ আহ, রাসেল, ছোট্ট সোনা ভাইটি আমাদের! খেলনা বড় ভালোবাসত। সারা বাড়ি মাতিয়ে রাখত একাই। ছোট্ট একরত্তি নিষ্পাপ একটি ছেলে। কী দোষ ছিল ওর? ওকেও সরিয়ে দিতে হলো পৃথিবী থেকে! কী কষ্ট! কী বেদনা! খান খান হয়ে যাচ্ছে ভেতরটা। এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন ছোট রাজকন্যা শেখ রেহানা। বড় রাজকন্যা শেখ হাসিনা হাত রাখেন ছোট বোনের পিঠের ওপর। বড় রাজকন্যার চোখেও জল। ভাই-ভাবিদের কাছে লেখা অন্য চিঠিগুলো পড়ে রইল সামনে। সেগুলো পড়া হয় না আর। পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন দুই দুঃখিনী রাজকন্যা। কে নেবে ওদের ব্যথাভার? কে মুছিয়ে দেবে ওদের চোখের জল? পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখিনী রাজকন্যা যে ওরা!

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App