×

সাময়িকী

বিকাশমান সভ্যতা ও একজন মা

Icon

মো. নাসিরুল আলম চৌধুরী

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বিকাশমান সভ্যতা ও একজন মা
মানব অস্তিত্বে সুন্দর এই পৃথিবী, মানুষ সুন্দর তার মানবিক গুণে। প্রতিটি শিশুর মাঝে মানবিক সেই গুণ প্রত্যক্ষ করা গেলেও পরবর্তী সময়ে প্রয়োজন হয় ধর্মের সহায়তা। মায়ের ভালোবাসাই শিশুর জীবনকে মানবিক করে তোলে। যে ভালোবাসা গড়ে ওঠে মাতৃত্বের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে সেই ভালোবাসায় সমাজ গড়ে ওঠে পারিবারিক আর সামাজিক বন্ধনে। সন্তানের প্রতি ভালোবাসা থেকেই মা গর্ভে ধারণ করা থেকে আমৃত্যু সন্তানের মঙ্গলে নিজেকে উৎসর্গ করে। এর জন্য ধর্মীয় নির্দেশ প্রয়োজন হয় না। মানুষ শ্রেষ্ঠ তার মানবিক গুণে। মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মাঝেই বিধাতার পূর্ণতা। মানুষের পূর্ণতা তার মানবতায়। বিধাতার সৃষ্টি এই সুন্দর পৃথিবী মানুষের তরেই। যেন স্বর্গ থেকে আনা এক টুকরো বাগান। সেই বাগানের শ্রেষ্ঠ ফুল মানুষ, যার সৌরভ মানবতা। সৌরভেই তার শ্রেষ্ঠত্ব। সেই সৌরভ অর্থাৎ মানবতা টিকিয়ে রাখতে বিধাতার প্রয়াশ ধর্ম। ধর্ম আসে মানবতার সমর্থনে। সৃষ্টিলগ্ন থেকেই কোনো প্রয়াস ছাড়াই স্বর্গের যে বাস্তব রূপ পৃথিবীতে আজো টিকে আছে তা মাতৃত্ব। মাতৃত্বকে টিকিয়ে রাখতে হয় না, প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার মধ্য দিয়ে এই সমাজকেই প্রতিনিয়ত রক্ষা করে চলেছে মাতৃত্ব। মানবতাকে রক্ষায় ধর্মের প্রয়োজন হয়, আর প্রজন্মকে ধারণ করার মধ্য দিয়ে ধর্মকেও টিকিয়ে রাখে মাতৃত্ব। পৃথিবী সুন্দর প্রাণের অস্তিত্বে, মাতৃত্ব তার রক্ষক। কাউকে মাতৃত্বের শিক্ষা দিতে হয় না; হোক সে দানব অথবা মানব। সব প্রতিবন্ধকতার ঊর্ধ্বে সন্তানের প্রতি মায়ের আকর্ষণ। সৃষ্টির ভক্তির তরে বিধাতার সব আয়োজন। কিন্তু সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসায় নেই কোনো বিনিময় প্রত্যাশা। মায়ের ভালোবাসা আর আত্মত্যাগেই সন্তানের জীবন গড়ে ওঠে একজন মানুষ হিসেবে। মানুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেও মাতৃত্বের মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধার একটি স্থান সৃষ্টিকর্তা সব প্রাণেই ছড়িয়ে দিয়েছেন। সমাজ পরিবর্তনের ধারায় মানবিক সমাজ গঠন অপরিহার্য। মাতৃত্বের হাত ধরেই মানবিক সেই সমাজ গড়ে উঠতে পারে। তাইতো সম্রাট নেপোলিয়ান বোনাপার্ট বলেন, ‘তোমরা আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেব’। কিন্তু মায়ের শিক্ষায় স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা কোনো ধর্ম পাঠাননি। বরং কোনো কোনো ধর্মে স্বয়ং দেবী আসেন মায়ের রূপে। আবার কখনো কখনো সংসারে মা হয়ে ওঠেন দেবী তুল্য। যিনি পরিবারকেও আগলে রাখেন সন্তানের মতো করে। তার প্রভাবেই পরিবার পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ থাকে। যা কখনো কখনো পরিবার ছাড়িয়ে তার চারিপার্শ্বে সমাজকেও প্রভাবিত করে। তাই কোনো প্রশংসাই মাতৃত্বের প্রশংসায় যথেষ্ট নয়। এমনই আদর্শ মাতৃত্বের জীবন্ত এক আলোকবর্তিকা আজো আমার জীবনকে আলোকিত করে রেখেছে। সে বিবেচনায় আমি নিজেকে পৃথিবীর ভাগ্যবান মানুষদের একজন মনে করি। এক আদর্শ মায়ের মাতৃত্বের প্রভাব আমার জীবনকে প্রতিনিয়তই সব প্রতিকূলতা থেকে রক্ষা করে চলেছে। বয়সের প্রতিবন্ধকতাও সন্তানের মঙ্গল ভাবনা থেকে মাকে বিরত রাখতে পারেনি। বিচিত্র এই মাতৃত্ব। বয়সের ভারে ক্লান্ত মা বয়সের ভার বহনেই অপারগ, অথচ হাসিমুখেই আজো সন্তানের ভার বহন করে চলেছেন। বৃহৎ একটি পরিবার আমাদের, যেখানে সব চাহিদা মাকে ঘিরে আবর্তিত হয়ে এসেছে। হাসিমুখেই পরিবারের সব সমস্যার সমাধান করে এসেছেন আমার মা। নিজের কোনো চাহিদা নেই, পরিবারের সবার চাহিদাকেই নিজের করে নেন। মায়ের সব চাওয়া-পাওয়াই হারিয়ে যায় সবার চাওয়া-পাওয়ার মাঝে। সংসার কি বোঝে ওঠার আগেই অতি অল্প বয়সে একটি বৃহৎ পরিবারের সব ভার, অসুস্থ শ্বশুর শাশুড়ি থেকে পরিবারে আসা আত্মীয়-অনাত্মীয়, মাকে ঘিরেই ছিল তাদের সব চাহিদা। মানুষ হিসেবে আমার বাবা ছিলেন আদর্শ একজন মানুষ, তার বাবা মায়ের আদর্শ সন্তান। একজন চিকিৎসক হওয়া সত্ত্বেও অসুস্থ বাবা-মায়ের কথা বিবেচনায় চিকিৎসক হিসেবে তিনি কোনো চাকরিতে যোগ দেননি। বরাবরই বাবা-মাকে নিজের কাছে রাখতে চেয়েছেন। পুত্রবধূ হিসেবে হাসিমুখেই তাদের সব ভার বহন করেন আমার মা। শিশু সন্তানের মতো করেই দাদার সেবা করতে দেখেছি মাকে। এক পর্যায়ে আমার দাদারও মা হয়ে ওঠেন তিনি। একসময় ডাক পরিবর্তিত হয়ে বৌমা থেকে মা হয়ে ওঠে। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত দাদা মায়ের শিশু সন্তান হয়েই ছিলেন। সবার চাওয়ার মাঝে মায়ের মুখটি ত্যাগে উদ্ভাসিত এক আদর্শের প্রতীক। মাকে কোনোদিন কোনো অভিযোগ করতে শুনিনি। ৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় সবার চোখে মা অন্য এক উচ্চতায় ধরা দেন। গ্রামে আমাদের বাড়িতেই ছিল মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প। বাড়িতে আত্মীয়-অনাত্মীয়, পরিবারের সদস্য ছাড়াও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়েও মায়ের ব্যাকুলতার অন্ত ছিল না। মুক্তিযোদ্ধাদের তিনি বলতেন, এরা মা-বাবার শ্রেষ্ঠ সন্তান, মায়ের গর্বের ধন। মা প্রায়ই আরো একটি কথা বলতেন, এদের সেবায় পাপ মোচন হয়। সে সময় মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সাংসারিক ব্যয় বহনে সক্ষমতা বড় হয়ে দেখা দেয়। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসায় বাবাকে বিভিন্ন স্থানে যেতে হয়েছে। সব সময় বাড়িতে থাকার সুযোগ ছিল না। বাড়িতে একা মাকেই সব সামাল দিতে হয়েছে। শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও অসহায় মানুষের প্রতি মায়ের সহায়তার হাত বরাবরই প্রসারিত ছিল। একদিন পাকবাহিনীর সহযোগীদের একজনকে ধরে এনে তাকে ইন্টারোগেশনের একপর্যায়ে একটি বাচ্চা ছেলেকে তার কাঁধে তুলে মুক্তিযোদ্ধারা দৌড়াতে থাকে এবং পিঠে বেত্রাঘাত করতে থাকে। সেটা দেখে বাড়ির ভেরত থেকে বেরিয়ে এসে মা বাচ্চাটিকে নামিয়ে আনতে বলেন। বাচ্চাটিকে নিজের কাছে নিয়ে অনেকটা ধমকের সুরেই মা মুক্তিযোদ্ধাদের আর কোনোদিন এমনটি না করতে বলেন। শিশুদের মানবিক বিকাশে কোনো বাধা এলে এর প্রতিবাদে সবার আগে মা এগিয়ে আসে। মায়ের হাতেই শিশুর সঠিক মানবিক বিকাশ ঘটে। শিশুর সেই বিকাশ তার পূর্ণাঙ্গ জীবনে বিকশিত করা গেলে তার জীবন মানবিক হয়ে উঠবে। মানবিক গুণাবলি আজ মানুষেই বড় অভাব। প্রাণের সৃষ্টিতে সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি সুখের আনন্দ আছে। ত্যাগের যন্ত্রণা তাকে স্পর্শ করে না। তাই সৃষ্টির ভক্তিতেই বিধাতার তুষ্টি। সেই প্রাণের সৃষ্টিতে সৃষ্টি সুখের আনন্দের পাশাপাশি মায়ের আছে আত্মত্যাগের যন্ত্রণা। নরক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে মিলে মাতৃত্বের স্বর্গসুখ। একটি শিশু মায়ের দেহ এবং আত্মার অংশ হয়েই মায়ের দেহের মাঝে বেড়ে ওঠে। একই সঙ্গে দেহমনে মাতৃত্ব গড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে একজন নারী মা হয়ে ওঠে। মায়ের দেহ আর আত্মার অংশ রূপেই শিশুটি আসে এই পৃথিবীতে। তাই একটি অদৃশ্য বন্ধন মা ও শিশুর মাঝে চিরদিনই অটুট থাকে। তাইতো প্রাণের অস্তিত্বে সৃষ্টিকর্তারও শ্রদ্ধার স্থান মাতৃত্ব। স্বর্গলাভের আশায় মানুষের আনুগত্য বিধাতার তরে। সেই স্বর্গ মিলে আবার মাতৃ পদতলে। শ্রেষ্ঠ প্রাণ মানব সৃষ্টিতে মাতৃত্ব বিধাতারই অংশ। তাই বিভিন্ন ধর্মেও মাতৃত্বকে সৃষ্টিকর্তার ক্ষমতা রূপেই দেখানো হয়েছে। শুধু প্রাণের সৃষ্টিতেই নয়, এর রক্ষাও মাতৃত্বেই। মা সন্তানকে রক্ষা করে আত্মরক্ষা বিবেচনায়। মায়ের আত্মরক্ষা বলয় যতটা না নিজেকে ঘিরে, তার চেয়ে অধিক সন্তানকে ঘিরে রচিত হয়। তাই সন্তানের জন্য মা সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। জীবন রক্ষাই হোক আর মানবিক এবং নৈতিক জীবনের সুরক্ষাই হোক আমৃত্যু মা সন্তানের রক্ষক। সন্তানকে ঘিরে মায়ের রক্ষা বলয় অনেকটা গ্রিন হাউসের মতোই বিভিন্ন প্রতিকূলতা থেকে সন্তানকে রক্ষা করে। সেই রক্ষা বলয় থেকে সন্তান নিজেই একসময় মায়ের নিয়ন্ত্রণ উপেক্ষা করে বেরিয়ে আসে। সন্তানের ওপর প্রথম আঘাতটাই আসে তখন মায়ের দেয়া নৈতিক শিক্ষার ওপর। সেই সন্তানই পরবর্তী সময়ে সমাজকে প্রভাবিত করে, নিয়ন্ত্রণ করে। সেখানে আদর্শ থাকে না। মায়ের আদর্শের সন্তানটিকে কোথাও আর খুঁজে পাওয়া যায় না। হয়তো তাই মানব সভ্যতার ইতিহাস মানবিক হয়ে উঠতে পারেনি। সন্তানকে ঘিরে মায়ের স্বপ্নগুলোও চাপা পড়ে যায় একসময়। তবে কখনো হারিয়ে যায় না। একজন মা সব সময়ই মা, কিন্তু একজন সন্তান সব সময় সন্তান থাকে না। মায়ের হাত ধরে শৈশবেই মানব জীবনের বুনিয়াদ রচিত হয়। মায়ের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত বিচ্ছিন্ন পরিবারের একটি সন্তান অনেকাংশে সামাজিকভাবেও বিচ্ছিন্ন থাকে। সন্তানের নিরাপত্তায় মা যেমন সর্বোচ্চ নিরাপদ আশ্রয়, ঠিক তেমনি সন্তানের তরে মানবিক একটি ভবিষ্যতের জন্য মায়ের শিক্ষাই সর্বোৎকৃষ্ট। সেই শিক্ষাকে বিশ্বের সব শিশু-কিশোরদের সঠিক ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় বিশেষজ্ঞ মতামতের প্রয়োগিক দিক নির্ধারণে সহায়তা করতে পারে। মানব সভ্যতার মানবিক বিকাশে প্রতিটি সন্তানকে মানবিক করে গড়ে তুলতে মাতৃত্বের এই সক্ষমতা প্রতিটি সন্তানকে আলোর পথ দেখাবে। সেই আলোর পথে মায়ের হাত ধরে আজ যে শিশুটির যাত্রা শুরু, তার হাতেই বিশ্ব একদিন আলোকিত হবে। তার চলার পথটি আলোকিত রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App