×

সাময়িকী

মানুষের ভাগ্য নির্মাতা মানুষ নিজেই

Icon

মতিয়ার রহমান পাটোয়ারী

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষের ভাগ্য নির্মাতা মানুষ নিজেই
জ্যঁ-পল সার্ত্রে সম্পর্কে লিখতে গেলে প্রথমে যে বিষয়টি সামনে আসে তাহলো তার নোবেল পুরস্কারের বিষয়টি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পুরস্কারের বিষয়টি তুললে জ্যঁ-পল সার্ত্রের গুরুত্ব আরো অনুধাবন করা যায়। তার সাহিত্য সৃষ্টির অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬৪ সালে তাকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। সার্ত্রে সে পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন, যা কিনা বিশ্ববাসীকে বিস্মিত করে তোলে। কেননা এ পুরস্কার বড় সম্মানের এবং অর্থ প্রাপ্তির দিক থেকে লোভনীয়। তাই এ পুরস্কার ও সম্মান কোনো লেখক বা বিজ্ঞানীর পক্ষে প্রত্যাখ্যান করা সহজ ব্যাপার নয়। মনের দৃঢ় কঠিন প্রত্যয় না থাকলে এ পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব নয়। তার আগে ১৯২৫ সালে জর্জ বার্নার্ড শ’ নোবেল পুরস্কার গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমি ডিনামাইট তৈরির জন্য আলফ্রেড নোবেলকে ক্ষমা করতে পারি। কিন্তু নোবেল প্রবর্তনকারীকে ক্ষমা করতে পারি না। কারণ মানুষরূপী একমাত্র শয়তানই এমন পুরস্কার প্রবর্তন করতে পারে। পরে তার স্ত্রী চার্লটের পীড়াপীড়িতে তিনি নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করতে রাজি হন। তবে তিনি আর্থিক পুরস্কার গ্রহণ করেননি। সার্ত্রের পুরস্কার গ্রহণ না করার যুক্তি ছিল। সে যুক্তিটি হলো- নোবেল পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে লেখকদের বিদ্রোহমূলক এবং তীক্ষè চিন্তার লেখালেখি থেকে বিরত রাখতে ব্যবস্থা নেয়া হয়। বড় বড় লেখকদের মনকে ক্রয় করা হয়। তাই তিনি ভেবে-চিন্তে নিজেকে বিক্রি করতে চাননি। সার্ত্রে ও জর্জ বার্নার্ড শ’র পুরস্কারের ব্যাপারটি তুললাম এ কারণে যে, এ বছর আমাদের দেশে বাংলা একাডেমির পুরস্কার নিয়ে তুলকালাম ঘটনা ঘটে গেছে। প্রায় ২০ বছর আগের একটি ঘটনা মনে পড়ছে, এক কবি বাংলা একাডেমির পুরস্কার না পেলে তিনি আত্মাহুতি দেবেন। সেই কবি আত্মাহুতির যে ঘোষণা দিয়েছিলেন তা সরকারের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের সামনে। তখন ক্ষমতায় ছিল কবির মতাদর্শের দল। ক্ষমতসীন দলের অনেক শীর্ষ নেতার সঙ্গে ছিল তার দোস্তী। তাই তার আত্মত্যার হুমকি কাজে লেগে যায়। ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা বাংলা একাডেমির সাহিত্য পুরস্কার দিয়ে তার জীবন রক্ষা করেন। ৪৪ বছর আগের একটি ঘটনা দিয়ে লেখার আসল বিষয়ের দিকে যাচ্ছি। সেদিন ছিল রবিবার। তখন রবিবার ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন। রংপুর শহরে বেতপট্টিতে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে একটি নড়বড়ে টিনের ঘরে বসার পর আমার ভয় হয়েছিল। ঘরটি কখন যে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে। অভিযাত্রীক নামের সাহিত্য-সংস্কৃতি গোষ্ঠী আয়োজিত ওই ঘরের কাঠের পাটাতনে বসে জীবনের প্রথম নিজের লেখা পাঠ করতে গিয়েছিলাম। অভিযাত্রিক সাহিত্য-সংস্কৃতি গোষ্ঠী প্রতি রোববার বিকালে তরুণ লেখকদের লেখা পাঠের আসর ওই নড়েবড়ে ঘরে বসত। সুফী স্যার, অর্থাৎ অধ্যক্ষ মোতাহার হোসেন সুফী ওই সংগঠনের সভাপতি ছিলেন। তার আহ্বানে আমার ওই অনুষ্ঠানে যাওয়া। অনুষ্ঠান শুরুর প্রাক্কালে সুফী স্যার ঘোষণা দিলেন, মহান মানবতাবাদী লেখক ও দার্শনিক জ্যঁ-পল সার্ত্রের মৃত্যুতে এক মিনিট নীরবতা পালনের। ওই দিন থেকে জ্যঁ-পল সার্ত্রেকে নিয়ে মনের ভেতর আগ্রহ জন্মায়। কিন্তু তাকে কোথাও খুঁজে পাই না। রংপুর শহরে একমাত্র বইয়ের আকড় পাবলিক লাইব্রেরি, সেখানে গিয়েও তার বইয়ের দেখা পাইনি। তার বইয়ের দেখা মিলল ৪ বছর পর ১৯৮৪ সালে ঢাকায়, সেন্ট্রাল পাবলিক লাইব্রেরিতে। সেখানে তার প্রথম লেখা নসিরা’র অনুবাদ এবং ‘শেকল অন্তরে’ নামের একটি ঢাউস বইয়ের দেখা মিলে। এরপর গতিধারার প্রকাশক প্রয়াত আবুল বাসার তার কয়েকটি বইয়ের অনুবাদ প্রকাশ করেন। তার মধ্যে অন্যতম হলো ‘অস্তিত্ববাদ ও মানবতাবাদ’ বইটি আমাকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। তবে জ্যঁ-পল সার্ত্রের ‘অস্তিত্ববাদ ও মানবতাবাদ’ দর্শন নিয়ে আমার মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। হয়তো অনেকের মনে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে, যারা এতদিন তার এ দর্শন সম্পর্কে অবগত রয়েছেন। কেননা মানবজাতি কখন কোন অবস্থায় কোন এলাকায় চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে তা বলা যায় না। বিপর্যয়ের মধ্যে পড়া মানে হলো মানুষের অসহায়ত্ব বোধ করা। তখন মানুষ অস্তিত্বহীন হয়ে যেতে পারে। যেমন বিশ্বব্যাপী মহামারি করোনা ছড়িয়ে পড়েছিল। এতে আক্রান্ত হয়েছে কোটি কোটি মানুষ। মারা গেছে লাখ লাখ মানুষ। বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষতার কালে মানবজাতি এমন বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে তা কখনো কল্পনাও করতে পারেনি। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এর থেকে মুক্তির উপায় খুঁজেছেন এবং আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। এরপর বিজ্ঞানীরা বিপর্যয়ের ঝড় থামাতে সফলতা দেখাতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু এতে যে মানবজাতি অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছিল সেটা তো অস্বীকার করা যাবে না। এ অবস্থায় জ্যঁ-পল সার্ত্রের অস্তিত্ববাদ নিয়ে গুণকীর্তন করা অনেকের কাছে বাহুল্য মনে হবে। এরপরও এই মহান মানবতাবাদী দার্শনিককে স্মরণ করে কিছু লিখছি। সার্ত্রের ‘অস্তিত্ববাদ ও মানবতাবাদ’ দর্শন মনে হয়েছে- মানুষের সত্তার মূল হচ্ছে মানুষ। তার ভাগ্যে নির্মাতা হচ্ছে মানুষ নিজেই। অর্থাৎ মানুষ মানুষের ভবিষ্যৎ। মানুষ তার আপন ভাগ্য নির্ধারণ করবে। ঈশ্বর নির্ধারিত ভাগ্যের মাধ্যমে মানুষ পরিচালিত হবে না। কর্মেই আপন ভাগ্য নির্ধারণ করবে। এ ছাড়া মানুষই তার নৈতিক আদর্শের বিধাতা। ভালো, মন্দ ও অকল্যাণ তার নিজের হাতেই রয়েছে। সার্ত্রের এই অস্তিত্ববাদই মানবতাবাদে রূপান্তরিত হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মানুষ ভীত ও হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে সার্ত্রে ১৯৪৬ সালে অস্তিত্ববাদ ও মানবতাবাদ নামের বইটি লেখেন। তিনি দেখেছেন, মানুষের স্বাধীনতা হরণের মহড়া। এতে মানব অস্তিত্ব পদদলিত হচ্ছে। তিনি বলেছেন, মানুষকে তার মানবিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এটাই হবে মানুষের জীবন ভাবনা। মূলত সার্ত্রে তার জীবন দর্শনের অবতারণা করেছেন এই গ্রন্থে। এ দর্শন তিনি প্রচার করেছেন তার সমগ্র সাহিত্যে। তার এ দর্শন এতই জনপ্রিয়তা পায় যে, তার স্বদেশ ফ্রান্স থেকে গোটা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে সারা পৃথিবীতে এ জীবন দর্শন চিন্তার জগতে বিরাট আলোড়ন তোলে। তবে সার্ত্রের পাশাপাশি বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে মহাত্মা গান্ধীর অহিংসবাদ এবং গণসত্যগ্রহ বিশ্বের অনেক মনিষীর জীবন দর্শনের রেখাপাত করেছে। গান্ধীজির এ জীবন দর্শনও একেবারে নতুন। ঔপনিবেশিক ভারতে অবস্থান করে গান্ধীজি অহিংসবাদ ও গণসত্যগ্রহের মাধ্যমে মানুষের স্বাধীনতা ও মুক্তির নির্দেশনা দিয়েছেন। তা দর্শনের জগতে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে। তবে অস্তিত্ববাদ ও মানবতাবাদ, যাকে ইংরেজিতে বলে এক্সিস্টেনশিয়ালিজম ইজ হিউম্যানিজম। এই বহুল প্রচারিত শব্দ দুটি সাহিত্য আর দর্শনে বেশ প্রভাব ফেলেছে অনেক আগে থেকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এর আরো প্রভাব বেড়ে যায়। এখানে একটি কখা উল্লেখ করতে হয় যে, গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস এ চিন্তার উদগাতা। পরবর্তী সময়ে দার্শনিক সোরেন কিয়ার্কগাড, ফ্রেড্রিক নীটশে, মার্টিন হাইডেগারের নাম অস্তিত্ববাদের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। তবে এসব দার্শনিকদের অতিক্রম করে যান সার্ত্রে। তার প্রথম গ্রন্থ ‘নসিরা’ এবং পরে ‘নো এক্সিট’ উপন্যাসের মধ্য দিয়ে তার অস্তিত্ববাদের কথা বেরিয়ে আসে। তার প্রথম গ্রন্থ নসিয়ায় এক ব্যক্তির জীবনের নানারকম প্রতিঘাতের কথা তিনি লিখেছেন। সেখানে ব্যক্তি জীবনের নিঃসঙ্গতা বোধ নিয়ে সার্ত্রে সৃষ্টি করেছেন এক অনন্য জীবন গাঁথা। তিনি তার অন্যান্য গ্রন্থে তুলে ধরেছেন অস্তিত্ববাদী দর্শন। অস্তিত্ব সারসত্তা পূর্বগামী এই মন্ত্র নিয়ে ব্যক্তি মানুষকে ঘিরে তৈরি করেছেন এ দর্শন। এছাড়া তার দর্শন মানুষের জীবনের সম্ভাবনা, ইচ্ছের প্রত্যয়, অঙ্গীকার ও স্বাধীনতার সঙ্গে মানবতাবাদ মিশে গেছে। পাশাপাশি তিনি মানুষের অস্তিত্ব বলতে বোঝাতে চেয়েছেন ‘সেলফ মেকিং এ সিচুয়েশন’। সার্ত্রের দর্শনে ব্যক্তি স্বাধীনতার একটি বিশেষ স্থান দখল করায় অনেক মনীষী তার দর্শনকে পাশ্চাত্যে বিদ্রোহ হিসেবে মত প্রকাশ করেছেন। অনেকে আবার তার অস্তিত্ববাদকে মানবতাবাদ বলতে গিয়ে বিব্রতবোধ করেছেন। তারা মনে করেন সার্ত্রীয় দর্শনকে, দর্শনের পর্যায়ে ফেলা যায় না। তারা এ দর্শনকে সাহিত্যাশ্রয়ী মতবাদ বলে অভিহিত করেছেন। তবে তিনি যে মানুষের সত্তা ও চেতনা সম্পর্কে যে আলোকপাত করেছেন তার বিং অ্যান্ড নার্থিংলেস গ্রন্থে উপরোল্লিখিত মন্তব্যের সঙ্গে মিলে না। সার্ত্রে আরো বলেছেন, জীবনের প্রকৃত অর্থ হচ্ছে আমরা নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে যা করি তাই অস্তিত্ববাদ। তার এ উপলব্ধি এসেছে মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফরাসি সেনাবাহিনীতে যোগদান করেছিলেন মেটেরোলজিস্ট হিসেবে। তিনি নাৎসি বাহিনীর হাতে বন্দি হয়েছিলেন। বছরখানেক বন্দি থাকার পর তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। মুক্ত সার্ত্রে যুদ্ধের যে ভয়াবহতা প্রত্যক্ষভাবে দেখেছেন এতে তার জীবনে দুটি বিষয়ে উপলব্ধি দেখা দেয়। একটি হলো সত্তা, অন্যটি হলো চেতনা। একদিকে মানুষের ব্যক্তিগত চেতনা তৈরি করতে সহায়তা করে বস্তুগত সত্তা, অন্যদিকে সেই সত্তা হতে উদ্ভব হয় চেতনা বা জ্ঞান। সার্ত্রে এ দুটোর নাম ব্যবহার করেছেন দ্য বিং ইনসেলফ, যা হচ্ছে সত্তা নিজের এবং দ্য বিং ফর ইনসেলফ, যা হচ্ছে সত্তার জন্য চেতনা। সার্ত্রের সাহিত্য ও দর্শন নিয়ে ভিন্ন মত থাকলেও তার জীবনের দুটি উল্লেখযোগ্য দিক সবার দৃষ্টি কেড়েছে। প্রথমটি হলো, ফিদেল ক্যাস্ত্রো ১৯৫৯ সালে এক বিপ্লবের মাধ্যমে কিউবার ক্ষমতা গ্রহণ করেন। ক্ষমতা নেয়ার পর তিনি দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। কিউবার প্রতিবেশী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্যাস্ত্রোর এই উত্থান এবং সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠাতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিছুতেই মেনে নিতে চায়নি। মার্কিনিরা দেশটিকে আক্রমণের জন্য পারমাণবিক সাবমেরিনসহ আধুনিক সমরাস্ত্র কিউবার উপকূলে মোতায়েন করে। অন্যদিকে সমাজতন্ত্র রক্ষা ও বিপ্লবী সরকারকে টিকিয়ে রাখতে সোভিয়েত ইউনিয়ন পারমাণবিক অস্ত্রসহ তার নৌ-জাহাজগুলো কিউবার দিকে রওনা দেয়। এরপর তারা ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাক করে রাখে। কিউবা থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সীমান্ত মাত্র ৮৫ কিলোমিটার। যুদ্ধ শুরু হলে কিউবা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছারখার হয়ে যাবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মানবজাতির চরম বিপর্যয়ের রেশ তখনো কাটেনি, আবার এ সময় আর একটি মহাযুদ্ধ। আরেক মহাবিপর্যয় মানবজাতির ওপর নেমে আসবে, এটা কয়েকজন মনীষী কিছুতে মানতে রাজি নন। আসন্ন যুদ্ধ ঠেকাতে মনীষীরা উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এতে সফলতা আসে। আর এতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন জ্যঁ-পল সার্ত্রে। তার দর্শন নিয়ে আরেকটা দিক উল্লেখ করছি, মানুষ তার নিজের ভাগ্য নিজেই গড়ে তুলবে। এখানে ঈশ্বর প্রদত্ত কোনো শক্তির প্রভাব থাকবে না। এ কথা কম লোকই মেনে নেবে। যারা তার এ দর্শন গ্রহণ করবে তাদের সংখ্যা নগণ্য। মুসলিম দার্শনিক ইবনে রুশদ বলেছেন, ধর্মীয় সত্য দর্শনের সত্যকে মেনে নেয় না এবং মেনে নিতে চায় না। তাছাড়া ধর্ম ও ঈশ্বর সম্পর্কে তিনি যা বলেছেন তা কির্কেগার্ড বা ও ফেড্রিক নীটশেকে ছাড়িয়ে গেছেন। কির্কেগাড বলেছেন, আধ্যাত্মিক সত্তা। কোনো বস্তু নয়। নীটশে বলেছেন, গড ইজ ডেথ। ঈশ্বরের যে অস্তিত্ব আছে সার্ত্রে তা মানেননি। তা যাই হোক, করোনাকালে সাড়া বিশ্বের মানুষ ছিল অসহায়। সারা বিশ্বে কয়েক লাখ মানুষ মারা গেছেন। মৃত্যু রোধ করা যাচ্ছিল না। এখানের মানুষ যেন একেকজন নিয়তির পুত্র। ইতালিতে সর্বত্র করোনা ছড়িয়ে পড়লে হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। সরকার সব ধরনের চেষ্টা করে মৃত্যু রোধ করতে পারছিল না। তখন ইতালির প্রেসিডেন্ট সের্জো মাত্তারেল্লা সংবাদ মাধ্যমের সামনে মানুষের মৃত্যু রোধের অপারগতা স্বীকার করে বলেন, উপরের দিকে দু’হাত তুলে ধরা ছাড়া তার আর করার কিছু নেই। বিশ্বব্যাপী মানুষ তখন কতটা অস্তিত্বহীন ছিল। সার্ত্রের দর্শন বাংলাদেশের মানুষের কাছে সংশয়ের সৃষ্টি করতে পারে। কেননা মানুষের ভাগ্য নির্মাতা মানুষ নিজেই। এতে নিয়তির কথাই আসে না। কিন্তু যে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় দুই কোটি। তারা যেন এক একটা নিয়তির পুত্র। নিয়তির ক্রীড়নক হয়ে কর্মসংস্থানের জন্য দিগি¦দিক ছুটে বেড়ায়। এতে কারো ঠাঁই-ঠিকানা হয়, কারো হয় না। তাদের ভাগ্য গড়ার স্বপ্ন-সাধ অধরা থেকেই যায়। তাদের কেউ কেউ ভাগ্য গড়তে শুধু দেশে নয়, বিদেশ যেতেও মরিয়া। সেটা আবার স্বাভাবিকভাবে নয়, রাবারে নৌকায় ভূমধ্যসাগরে উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিতে কিংবা কাঠের নৌকায় আন্দামান সাগর পাড়ি দিতে সলিল সমাধি হচ্ছে। দার্শনিক শোপেনহাওয়ার তার ‘দ্য ওয়ার্ল্ড এজ উইল’ গ্রন্থে বলেছেন, সব মানুষ তার ইচ্ছার নিয়ামক এবং বুদ্ধির দ্বারা পরিচালিত হয়। সার্ত্রের দর্শন, মানুষ তার নিজ ভাগ্য গড়ার বিধাতা। এটি শোপেনহাওয়ারের সঙ্গে অনেকটাই মিল রয়েছে। হ্যাঁ, মানুষ তার নিজ প্র”েষ্টায় তার ভাগ্য গড়ে তুলতে সক্ষম। কিন্তু এ দর্শন অনেক ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য না হলেও একবিংশ শতাব্দীতেও জ্যঁ-পল সার্ত্রের গ্রহণযোগ্যতা মøান হবে না।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App