×

পাঠকের কলাম

নৈতিক শিক্ষাই সর্বশেষ উপায়

Icon

প্রকাশ: ৩০ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

নৈতিক শিক্ষাই সর্বশেষ উপায়

দেশজুড়ে বেড়ে চলেছে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য। সমাজে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় গড়ে ওঠা এই ‘কিশোর গ্যাং’ অপরাধের জগতের প্রত্যেকটি শাখা-প্রশাখায় বিচরণ করছে। গণমাধ্যমগুলোতে চোখ রাখলেই দেখতে পাওয়া যায় সমাজের তথাকথিত ত্রাসদের শিহরিত কর্মকাণ্ড। কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকা কিশোরদের জীবন অন্ধকারে পর্যবসিত তো হচ্ছেই, সেই সঙ্গে তাদের দ্বারা দেশ ও সমাজের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হচ্ছে।

সাধারণত ১২-১৭ বছর বয়সি শিশু-কিশোররাই এই দলের এর সদস্য হয়ে থাকে। প্রতিটি দলে সাধারণত ৮-১০ জন সদস্য থাকে। অবশ্য এর বেশিও থাকতে পারে। প্রতিটা দলের থাকে স্বতন্ত্র নাম এবং অনেক ক্ষেত্রে ড্রেসকোড ও দলের প্রতীকী চিহ্ন থাকতে দেখা যায়। শুরুতে নিজেদের পাড়া বা মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার বা তথাকথিত ‘হিরোইজম’ দেখাতে গিয়ে এ ধরনের গ্যাংয়ের উৎপত্তি হলেও ধীরে ধীরে খুন, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মারধর, ইভটিজিং, মাদকদ্রব্য সেবন ও পাচার, সাইবার ক্রাইম ও দখলদারির মতো বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডই এদের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায়। শুধু তাই নয়, আত্মরক্ষার জন্য নিজেদের কাছে রাখে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন অস্ত্র, হকিস্টিক, চাপাতি, পিস্তল, বোমা, ছুরি ইত্যাদি। এ ছাড়া মাদকদ্রব্য সেবন ও পাচার তো আছেই। তবে প্রশ্ন হচ্ছে সমাজে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা কিশোরদের এই দলগুলো শুধু কি নিজেদের স্বার্থে এসব কাজে যুক্ত হচ্ছে? এর উত্তরটি সর্বজনবিদিত। মূলত বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় কোনো রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠে এসব গ্যাং। সমাজে নিজেদের ক্ষমতা জাহির ও আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে কিশোরদের তারা কাজে লাগায়। রাজনৈতিক নেতা ছাড়াও যে কোনো স্বেচ্ছাসেবক দল বা প্রভাবশালী ব্যক্তির অধীনে গড়ে ওঠে এসব দল। কিশোরদের এই দল পরিচালনাকারী বা দলের নেতা স্থানীয়ভাবে ‘বড় ভাই’ নামে এরা পরিচিত।

দেশজুড়ে প্রায় ২৩৭টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য লক্ষ করা যায়। তবে ‘কিশোর গ্যাং’-এর তুলনায় আমাদের দেশে কিশোর সংশোধনাগারের সংখ্যা এবং তৎপরতা হওয়ায় এদের নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। কিশোর গ্যাংগুলো পারস্পরিক সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছে। ছোটখাটো বিষয়ে ঝগড়া, মতের অমিল, মারধর, তর্ক-বিতর্ক, সিনিয়র-জুনিয়র দ্ব›দ্বসহ নানা অন্তর্দ্ব›েদ্বর ফলে এরা একে অপরের হাতে খুন, জখম হয়ে থাকে।

অবশ্য এখন শুধু দরিদ্র শিশু-কিশোররাই নয়, বরং আর্থিকভাবে সচ্ছল কিশোররা ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য হচ্ছে। উচ্চ আবৃত্ত পরিবারগুলোতে অনেক ক্ষেত্রে দেখা বাবা-মা ব্যস্ততার কারণে পর্যাপ্ত সন্তানকে সময় দিতে পারছেন না, ঠিকভাবে দেখাশোনা করতে পারছেন না। এদিকে নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর উচিত সন্তানের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা, শিক্ষার সুযোগ করে দেয়া, তাকে সময় দেয়া, বিনোদন দেয়া, শিশুদের অল্প বয়সে কাজ করতে না পাঠানো, তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা, কার সঙ্গে মিশছে তা নজর রাখা এবং শৈশব থেকেই সন্তানকে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। এসব দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে পরিবারগুলো ‘কিশোর গ্যাং’-এর দৌরাত্ম্য কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পরিবারের পাশাপাশি সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনগুলোকেও শিশু-কিশোরদের নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য একটি মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইতোমধ্যেই কিশোর গ্যাংগুলোর দৌরাত্ম্যে বন্ধ করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এছাড়া আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী ও এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা প্রদান করছেন যা বড় স্বস্তির বিষয়। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত চেষ্টাই কিশোর অপরাধ দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। সর্বোপরি যত দ্রুত সম্ভব এই ভয়াবহ কর্মকাণ্ডে লাগাম ধরতে পারলেই তা আমাদের দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণকর হবে।

তনুশ্রী রায় : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App